আঠারো শতকের শুরুর দিকে ক্যারিবিয়ান সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে যখন জলদস্যুদের দাপট তুঙ্গে, তখন অনেক কিংবদন্তির জন্ম হয়েছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত এবং সাহসী নাম হলো মেরী রিড। তিনি এমন এক নারী ছিলেন যিনি জীবনের অধিকাংশ সময় পুরুষ সেজে কাটিয়েছেন। তিনি কখনো সৈনিক, কখনো নাবিক, আর শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত নারী জলদস্যু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অ্যান বনি এবং “ক্যালিকো জ্যাক” র্যাকহ্যামের সাথে তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু দুর্ধর্ষ জীবন তাঁকে সাহসিকতা আর বিদ্রোহী চেতনার এক অমর প্রতীকে পরিণত করেছে।
প্রতারণার শৈশব মেরী রিডের শুরুর জীবন সম্পর্কে আমরা যা জানি তার বেশিরভাগই পাওয়া যায় ১৭২৪ সালে প্রকাশিত ক্যাপ্টেন চার্লস জনসনের একটি বিখ্যাত বই থেকে। যদিও কিছু তথ্য নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে মূল গল্পটি টিকে থাকার এক অনন্য লড়াইয়ের কথা বলে।
মেরী ১৬৮০ বা ১৬৯০ সালের দিকে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন এক বিধবা নারী। মেরীর জন্মের আগেই তাঁর সৎ ভাই মারা যায়। পরিবারে আর্থিক সহায়তা বজায় রাখার জন্য মেরীর মা তাঁকে তাঁর মৃত ভাইয়ের মতো সাজিয়ে বড় করেন এবং তাঁর নাম দেন “মার্ক”। ঠাকুমার কাছ থেকে টাকা পাওয়ার জন্য শৈশব থেকেই মেরীকে ছেলের অভিনয় করতে হতো। ১৩ বছর বয়সে ঠাকুমার মৃত্যুর পর এই ছদ্মবেশ তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়। তিনি পরিচারক বা চাকর হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পুরুষশাসিত পৃথিবীতে টিকে থাকার দক্ষতা অর্জন করেন।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উত্তাল সমুদ্র অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় তরুণী মেরী সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের যুদ্ধে পদাতিক এবং অশ্বারোহী বাহিনীতে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। সেখানে তিনি এক ফ্লেমিশ সৈনিকের প্রেমে পড়েন। লোকগাথা অনুযায়ী, মেরী তাঁর আসল পরিচয় প্রকাশ করেন এবং তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁরা সেনাবাহিনী ছেড়ে একটি সরাইখানা (Inn) চালু করেন। কিন্তু স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর মেরী আবার বিপদে পড়েন। তিনি আবারও পুরুষের পোশাক পরে নাবিক হিসেবে সমুদ্রযাত্রায় নামেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাওয়ার পথে তাঁর জাহাজটি জলদস্যুদের কবলে পড়ে। মেরী ভাগ্যকে মেনে নিয়ে জলদস্যুদের দলেই যোগ দেন। ১৭১৮ সালে জলদস্যুদের জন্য রাজকীয় ক্ষমা ঘোষণা করা হলে তিনি কিছুকাল স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেন, কিন্তু শীঘ্রই আবার পুরোনো পেশায় ফিরে আসেন। ১৭২০ সালের আগস্টে তিনি কুখ্যাত জলদস্যু “ক্যালিকো জ্যাক” র্যাকহ্যামের দলে যোগ দেন।
দুই জলদস্যু রানী: মেরী রিড এবং অ্যান বনি র্যাকহ্যামের জাহাজ ‘উইলিয়াম’-এ মেরীর সাথে দেখা হয় আরেক কিংবদন্তি নারী জলদস্যু অ্যান বনি-র। অ্যান ছিলেন আইরিশ বংশোদ্ভূত এবং র্যাকহ্যামের প্রেমিকা। অ্যান সবসময় নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখতেন না, কিন্তু মেরী তখনও “মার্ক রিড” নাম নিয়ে পুরুষ নাবিক হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত ছিলেন।
মেরী ও অ্যানের বন্ধুত্ব ছিল গভীর। তাঁরা দুজনেই পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তলোয়ার চালিয়েছেন এবং জাহাজে লড়াই করেছেন। কথিত আছে, মেরী ও অ্যান যখন লড়াই করতেন, তখন তাঁরা সাধারণ পুরুষ জলদস্যুদের চেয়েও বেশি হিংস্র ও সাহসী হয়ে উঠতেন।
ক্যাপ্টেন জনসনের বর্ণনা অনুযায়ী, শুরুতে অ্যান বনি এই সুদর্শন নতুন ক্রু সদস্যের (ছদ্মবেশী মেরী) প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু মেরী যখন প্রকাশ করলেন যে তিনিও একজন নারী, তখন তাঁদের মধ্যে এক গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং সমাজের নিয়ম ভাঙার অদম্য সাহস দুজনেই লালন করতেন। জাহাজে তাঁরা এক দুর্ধর্ষ জুটি হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁরা ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী এবং তলোয়ার চালনায় দক্ষ। পরবর্তীকালে তাঁদের বিচারের সময় ডরোথি থমাস নামে এক সাক্ষী জানান, মেরী ও অ্যান পুরুষদের জ্যাকেট ও প্যান্ট পরে হাতে পিস্তল আর তলোয়ার নিয়ে লড়াই করতেন এবং প্রচণ্ড সাহসিকতার পরিচয় দিতেন।
কথিত আছে, মেরী ওই জাহাজেরই এক তরুণ ছুতারের (Carpenter) প্রেমে পড়েছিলেন। যখন অন্য একজন দস্যু সেই তরুণকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে, তখন মেরী নিজেই এগিয়ে যান এবং সেই দস্যুকে হত্যা করেন। এটি ছিল বছরের পর বছর সামরিক বাহিনীতে থেকে অর্জন করা তাঁর তলোয়ার ও পিস্তল চালনার দক্ষতার প্রমাণ।
শেষ লড়াই মেরী রিডের জলদস্যু জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঝোড়ো। ১৭২০ সালের ২২ আগস্ট, র্যাকহ্যামের দল নাসাউ বন্দর থেকে ‘উইলিয়াম’ নামক একটি জাহাজ চুরি করে। তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিভিন্ন বণিক জাহাজে লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁদের এই ভাগ্য বেশিদিন সহায় হয়নি।
১৭২০ সালের ২২ অক্টোবর, জ্যামাইকার নেগ্রিল পয়েন্টের কাছে জোনাথন বার্নেট নামে এক সরকারি শিকারি তাঁদের জাহাজটিকে ধরে ফেলেন। সেই রাতে জাহাজের বেশিরভাগ জলদস্যু মদ্যপ অবস্থায় থাকায় তাঁরা কোনো প্রতিরোধই করতে পারছিলেন না। র্যাকহ্যাম এবং তাঁর পুরুষ সঙ্গীরা সহজেই আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু মেরী এবং অ্যান হার মানেননি।
জনসনের লেখা বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী:
“যখন লড়াই শুরু হলো, তখন মেরী রিড, অ্যান বনি আর একজন বাদে কেউ ডেকে (জাহাজের উপরের অংশে) ছিল না। মেরী নিচে লুকিয়ে থাকা পুরুষদের উপরে এসে পুরুষোচিত লড়াই করতে চিৎকার করে ডাকছিলেন। যখন কেউ নড়ল না, তখন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে নিচের দিকে নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়েন, যাতে একজন মারা যায় ও অন্যরা আহত হয়।”
মাত্র দুজন নারী আর একজন পুরুষ মিলে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। এই অসম সাহসী লড়াই তাঁদের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
বন্দিত্ব, বিচার এবং এক ট্র্যাজিক সমাপ্তি পুরো জলদস্যু দলটিকে জ্যামাইকার স্প্যানিশ টাউনে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৭২০ সালের ১৮ নভেম্বর র্যাকহ্যাম ও অন্য পুরুষ দস্যুদের ফাঁসি দেওয়া হয়। ২৮ নভেম্বর মেরী ও অ্যানের বিচার শুরু হয়। তাঁদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুজনেই দাবি করেন যে তাঁরা অন্তঃসত্ত্বা। তৎকালীন ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, গর্ভবতী নারীদের ফাঁসি দেওয়া হতো না। ফলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
কিন্তু মেরী রিড আর কোনোদিন স্বাধীনতার মুখ দেখেননি। ১৭২১ সালের এপ্রিল মাসে জ্যামাইকার কারাগারে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তিনি আসলেও গর্ভবতী ছিলেন কি না, তা আজও রহস্য। অন্যদিকে, অ্যান বনি পরবর্তীতে মুক্তি পেয়েছিলেন কি না তা জানা যায় না; তিনি ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হারিয়ে যান।
মেরী রিডের উত্তরাধিকার মেরী রিডের গল্পটি আজও জনপ্রিয়, কারণ তিনি কেবল একজন জলদস্যু ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যে যুগে নারীদের সমুদ্রে যাওয়ার কথা ভাবাই যেত না, সেখানে তিনি নিজের দক্ষতা আর সাহস দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধে লড়েছেন, আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছেন এবং এমন এক সময়ে লড়াই করেছেন যখন শক্তিশালী পুরুষরাও ভয়ে পালিয়েছিল।
মেরী এবং অ্যানের এই কাহিনী জলদস্যু জীবনের রোমাঞ্চকর দিকটির পাশাপাশি সমাজের কঠিন নিয়ম ভাঙার লড়াইকেও ফুটিয়ে তোলে। যদিও তাঁর জীবনের অনেক তথ্যই কিংবদন্তির মতো মনে হয়, কিন্তু তাঁর শেষ দিনগুলোর বীরত্বের কাহিনী সমসাময়িক নথিপত্রে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে।
আজও মেরী রিড নারী শক্তির এক আইকন বা প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জলদস্যুদের সেই আইনহীন যুগেও সাহস আর বুদ্ধিমত্তা থাকলে নিজের জীবনের নিয়ম নিজেই লেখা সম্ভব—এমনকি সেই নারীর পক্ষেও, যিনি সমুদ্রে লড়াই করার জন্য বছরের পর বছর পুরুষের ছদ্মবেশে কাটিয়েছেন।
আরও জানার জন্য পড়তে পারেন:
ক্যাপ্টেন চার্লস জনসনের বই: এ জেনারেল হিস্ট্রি অফ দ্য পাইরেটস (১৭২৪)।
জ্যামাইকার সমসাময়িক বিচার বিভাগীয় রেকর্ড।
মেরী রিড হয়তো জ্যামাইকার এক অন্ধকার কারাগারে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু তাঁর বীরত্বের কাহিনী আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। নিজের শর্তে স্বাধীনভাবে বাঁচার এক অসাধারণ ইচ্ছাশক্তির নামই মেরী রিড।

