The Practice and Theory of Individual Psychology – Alfred Adler (1927)
আলফ্রেড অ্যাডলারের ব্যক্তিগত মনোবিজ্ঞান: তত্ত্ব ও অনুশীলন (১৯২৭)
আলফ্রেড অ্যাডলার বলেন, ‘হীনমন্যতার অনুভূতি’ (feeling of inferiority) মানুষকে চালিত করে শ্রেষ্ঠত্বের দিকে। আর এই চিন্তাধারার সবচেয়ে সুন্দর সংকলন তাঁর ১৯২৭ সালের বই The Practice and Theory of Individual Psychology।
এই বইটি আসলে অ্যাডলারের বিভিন্ন লেকচার ও প্রবন্ধের সংকলন। এখানে তিনি শুধু তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেননি, বরং বাস্তব জীবনে কীভাবে এই তত্ত্ব প্রয়োগ করবেন তাও দেখিয়েছেন। পেশাদার মনোবিজ্ঞানীদের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের জন্যও আকর্ষক। কারণ অ্যাডলারের কথা সহজ, মানবিক এবং আশাবাদী। তিনি বলেন, আমরা কেউই নির্ধারিত নই। আমাদের অতীত আমাদের ভবিষ্যৎ নয়। আমরা নিজেরাই আমাদের জীবনের স্থপতি। আজকের এই নিবন্ধে আমরা এই বইয়ের মূল কথাগুলোকে সহজ, কৌতূহলী ভঙ্গিতে অন্বেষণ করব। চলুন, একসঙ্গে আবিষ্কার করি মানুষের মনের এই অদ্ভুত শক্তি!
অ্যাডলার কে? একজন ডাক্তারের অসাধারণ যাত্রা
আলফ্রেড অ্যাডলার ১৮৭০ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ছিল চ্যালেঞ্জিং। ছোটবেলায় রিকেটস নামক রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি অনেক কষ্ট পান। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তেন, এমনকি একবার প্রায় মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন। বাবা-মা তাঁকে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অ্যাডলার নিজে প্রথমে ব্যবসায়ী হতে চেয়েছিলেন। পরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসে পড়েন এবং ১৮৯৫ সালে ডাক্তার হন।
১৯০২ সালে তিনি সিগমন্ড ফ্রয়েডের সঙ্গে যোগ দেন। ফ্রয়েডের সাইকোঅ্যানালিসিস গ্রুপে তিনি সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু ১৯১১ সালে তাঁদের পথ আলাদা হয়ে যায়। কেন? ফ্রয়েড মনে করতেন, মানুষের আচরণের মূলে যৌন প্রবৃত্তি এবং অতীতের অভিজ্ঞতা। অ্যাডলার বললেন, না। মানুষ সামাজিক জীব। আমাদের চালিত করে সমাজে নিজের জায়গা খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তিনি ফ্রয়েডের গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ১৯১২ সালে গড়ে তোলেন ‘Individual Psychology’ বা ব্যক্তিগত মনোবিজ্ঞানের সমিতি।
অ্যাডলারের এই বইটি ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাগুলোকে একত্রিত করেছেন। বইয়ের অধ্যায়গুলোতে আছে: ব্যক্তিগত মনোবিজ্ঞানের মূল ধারণা, নার্ভাস রোগের মূলে ‘মাসকুলাইন প্রোটেস্ট’, শিশু মনোবিজ্ঞান, নিউরোসিসের চিকিত্সা ইত্যাদি। পুরো বই জুড়ে তিনি বলেন, মানুষকে বোঝার জন্য তাকে ‘অখণ্ড’ (indivisible) হিসেবে দেখতে হবে।
ব্যক্তিগত মনোবিজ্ঞানের মূল তত্ত্ব: হীনমন্যতা থেকে শ্রেষ্ঠত্বের পথে
অ্যাডলারের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণা হলো হীনমন্যতার অনুভূতি। প্রত্যেক শিশুই জন্ম নেয় অসহায় অবস্থায়। বাবা-মা, বড় ভাই-বোনের তুলনায় সে ছোট। এই অনুভূতি স্বাভাবিক। কিন্তু এটাই আমাদের চালিত করে। আমরা চাই ‘উন্নতি’ বা ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ (striving for superiority)। এটা কোনো খারাপ জিনিস নয়। এটাই জীবনের চালিকাশক্তি।
উদাহরণ দিই। ধরুন, একটি ছোট ছেলে স্কুলে গান গাইতে পারে না। সে লজ্জা পায়। এই লজ্জা থেকে সে হয়তো কঠোর পরিশ্রম করে গায়ক হয়ে ওঠে। এটাই স্বাভাবিক ক্ষতিপূরণ (compensation)। কিন্তু যদি সে এই অনুভূতিকে অতিরিক্ত করে ফেলে, তাহলে জন্ম নেয় হীনমন্যতা জটিলতা (inferiority complex)। সে ভাবে, “আমি কখনোই ভালো হতে পারব না।” ফলে সে সবকিছু এড়িয়ে চলে। অপরদিকে, যদি সে নিজেকে অতিরিক্ত বড় করে দেখায়, তাহলে জন্ম নেয় শ্রেষ্ঠত্ব জটিলতা (superiority complex)। সে অন্যদের ছোট করে দেখে, অহংকারী হয়।
অ্যাডলার বলেন, এই দুটোই সমস্যা। সঠিক পথ হলো সামাজিক আগ্রহ বা সামাজিক অনুভূতি (social interest বা Gemeinschaftsgefühl)। আমরা যদি নিজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজেরও উন্নতি চাই, তাহলেই সত্যিকারের সুখ পাব। এটাই মানসিক স্বাস্থ্যের মাপকাঠি। বইয়ে তিনি বলেন, “সামাজিক আগ্রহ ছাড়া কোনো ব্যক্তি সুস্থ হতে পারে না।”
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা জীবনধারা বা লাইফস্টাইল (style of life)। ছোটবেলায় (প্রথম ৪-৫ বছর) আমরা একটা ‘নিজস্ব পরিকল্পনা’ তৈরি করে ফেলি। এটাই আমাদের জীবনের গাইডলাইন। এই পরিকল্পনা তৈরি হয় পরিবার, জন্মক্রম (birth order), প্রথম স্মৃতি (early recollections) থেকে।
যেমন, বড় ছেলে-মেয়ে প্রায়ই দায়িত্বশীল হয়, কারণ সে ছোটবেলায় ‘রাজা’ ছিল। মেজো সন্তান প্রতিযোগিতামূলক হয়। ছোট সন্তান আদুরে হয়ে যায়। কিন্তু এটা নিয়ম নয়, শুধু সম্ভাবনা। অ্যাডলার বলেন, পরিবারের ‘সম্পর্কের নকশা’ (family constellation) আমাদের জীবনধারাকে প্রভাবিত করে।
আরও আছে কল্পিত চূড়ান্ত লক্ষ্য (fictional final goal)। আমরা একটা কাল্পনিক লক্ষ্য তৈরি করি যা আমাদের চালিত করে। যেমন, “আমি যদি সবচেয়ে ধনী হই, তাহলে সবাই আমাকে সম্মান করবে।” এটা সত্যি নাও হতে পারে, কিন্তু এটাই আমাদের মোটিভেশন। অ্যাডলার বলেন, এই লক্ষ্যটা আমরা নিজেরাই তৈরি করি—এটাই আমাদের ‘সৃজনশীল শক্তি’ (creative self)।
বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত মনোবিজ্ঞানের মূল ধারণা হলো: মানুষকে পুরোপুরি বোঝার জন্য তার লক্ষ্য দেখতে হবে, অতীত নয়। এটা ‘টেলিওলজিক্যাল’ (goal-oriented) দৃষ্টিভঙ্গি। ফ্রয়েডের মতো ‘কজাল’ (causal) নয়।
অনুশীলন: থেরাপি কীভাবে কাজ করে?
বইয়ের বড় অংশ জুড়ে আছে প্র্যাকটিস। অ্যাডলার বলেন, নিউরোসিস (মানসিক অসুস্থতা) হলো ভুল জীবনধারার ফল। রোগী তার লক্ষ্য পূরণের জন্য ‘সুরক্ষা ব্যবস্থা’ (safeguarding) তৈরি করে—যেমন অসুস্থতার অজুহাত, ভয়, দ্বিধা।
থেরাপিতে ডাক্তার রোগীর সঙ্গে বন্ধুর মতো বসেন। প্রথমে রোগীর জীবনধারা বোঝেন—তার প্রথম স্মৃতি, স্বপ্ন, দৈনন্দিন আচরণ থেকে। তারপর তাকে দেখান যে তার লক্ষ্য ভুল পথে চলছে। উৎসাহ দেন (encouragement) যাতে সে সামাজিক আগ্রহ বাড়ায়।
উদাহরণ: একজন মহিলা সবসময় ভয়ে থাকেন। অ্যাডলার দেখেন, তাঁর ছোটবেলায় বাবা অত্যন্ত কড়া ছিলেন। তিনি ‘মাসকুলাইন প্রোটেস্ট’ (masculine protest) করছেন—অর্থাৎ দুর্বলতা অস্বীকার করে পুরুষালি আচরণ করছেন। থেরাপিতে তাঁকে বোঝানো হয় যে সত্যিকারের শক্তি হলো সহযোগিতা, না লড়াই।
শিশু মনোবিজ্ঞানেও অ্যাডলারের অবদান অসাধারণ। তিনি বলেন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের কাজ হলো শিশুর সামাজিক আগ্রহ জাগানো। শাস্তি নয়, উৎসাহ। বইয়ে তিনি শিশুদের নিউরোসিসের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন—পরিবারে অবহেলা বা অতিরিক্ত আদর।
দৈনন্দিন জীবনে অ্যাডলারের শিক্ষা
আজকের যুগে এই তত্ত্ব কতটা প্রাসঙ্গিক! স্কুলে বুলিং হচ্ছে? শিশুর হীনমন্যতা থেকে। কর্মক্ষেত্রে অহংকার? শ্রেষ্ঠত্ব জটিলতা। সম্পর্কে ঝগড়া? সামাজিক আগ্রহের অভাব।
অ্যাডলারের শিক্ষা: প্রত্যেকেই তিনটি জীবন-টাস্ক পূরণ করতে হয়—কাজ (work), বন্ধুত্ব (friendship), প্রেম (love)। এগুলো সফল হলে জীবন সুন্দর হয়।
আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় অ্যাডলারিয়ান স্কুলগুলোতে শিশুদের সহযোগিতা শেখানো হয়, প্রতিযোগিতা নয়। অভিভাবকরা শেখেন, সন্তানকে ‘উৎসাহ’ দিতে, সমালোচনা নয়। কর্মক্ষেত্রে লিডাররা বুঝতে পারেন, টিমের সদস্যদের ‘সামাজিক আগ্রহ’ বাড়ালে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে।
আশার আলো
অ্যাডলারের ১৯২৭ সালের বই আজও আমাদের বলে: মানুষ ভালো হতে পারে। আমরা সবাই একই মানবিকতায় যুক্ত। হীনমন্যতা আমাদের শত্রু নয়, বরং বন্ধু—যদি আমরা সঠিক পথে চলি।
পড়ার পর আপনি নিজেকে প্রশ্ন করুন: আমার জীবনধারা কেমন? আমি কি সমাজের জন্য কিছু করছি? আমার লক্ষ্য কি সত্যিকারের সুখের দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
অ্যাডলারের এই তত্ত্ব শুধু মনোবিজ্ঞান নয়, জীবনদর্শন। এটি আমাদের শেখায়—আমরা সবাই অখণ্ড, সৃজনশীল এবং সমাজের অংশ। তাঁর বই পড়ুন, চিন্তা করুন, এবং নিজেকে বদলান। কারণ, যেমন অ্যাডলার বলেছেন, “জীবনের অর্থ হলো অন্যের জন্য কিছু করা।”
লেখক – মাধব রায়

