মানব জীবন।।
আলি আসগার
ভুলে ভরা এই জীবন এগিয়ে চলে আপন ছন্দে। সব ভুল সংশোধন করা যায় না। ভুল মানুষের সঙ্গে পরিচয়, ঘনিষ্টবৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলেও পুরোপুরি ভোলা যায় না। মুস্কিল হচ্ছে, বুদ্ধিমান প্রাণী এই মানুষ নিজের ভুলগুলি অনেকসময় স্বীকার করতে চায় না। সে ভাবে জগতের সবাই কিছু না কিছু ভুল করে, ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃত,সেই একমাত্র নির্ভুল ব্যক্তি যে কোন ভুল করতেই পারে না। এতখানি আত্মবিশ্বাস থাকে কিছু মানুষের।
অথচ মানুষের জীবনটাই পুরোপুরি ভুলে ভরা। শৈশবের নিষ্পাপ জীবন পেরিয়ে তার জীবনে হরেকরকম ভুল বাড়তেই থাকে।
যতই সে এই জটিল পৃথিবীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, ততই তার জীবনে ভুল ভ্রান্তি, অন্যায়, অপরাধ বাড়তেই থাকে। সে সবসময় যে ইচ্ছে করে জীবনের এই নেতিবাচক পর্বে ঝুঁকে পড়ে তা নয়, অনেক সময় পরিবেশ পরিস্হিতি তাকে বাধ্য করে জীবনের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়তে। তবে একসময় মানুষ তার চারিত্রিক দৃঢ়তার বলে জীবনের নেতিবাচক দিক থেকে বেরিয়ে আসতে পারত। বিদ্যালয়ের ইট কাঠ পাথরের ঘেরাটোপে আদর্শ শিক্ষকের অনুশাসনে তার চরিত্র গড়ে উঠত, ভাল মন্দ ন্যায় অন্যায়ের বোধ তৈরি হয়। মানুষ গড়ার সেই কারখানা আমরা নিজেরাই ধ্বংস করে দিয়েছি। ছাত্রদের নিয়মানুবর্তিতা , শৃঙ্খলা হারিয়ে যাবার পাশাপাশি শিক্ষকদের ছাত্র – শাসনের বেত আমরা কেড়ে নিয়েছি। ফলে এক বিশৃঙ্খল সমাজ আমরা তৈরি করে ফেলেছি। এখানে লঘু – গুরু জ্ঞান নেই, ন্যায় অন্যায় বোধ নেই, ক্ষমা নমনীয়তা হারিয়ে গেছে, আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে।
মানুষের ন্যায় নীতি পরার্থপরতা মূল্যবোধ সব কিছুই যেন বিশ্বায়নি সংস্কৃতির মোহজালে পুরোপুরি ভেসে গেছে। আত্নকেন্দ্রিক মানসিকতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। তুমি আমি আর আমাদের সন্তান – এই আমাদের পৃথিবী। আদিকাল থেকে যৌথ জীবন যাপনের যে চালচিত্র আমরা দেখে আসছি, প্রযুক্তির এই ধাবমান যুগে যেন সেটা উবে যেতে বসেছে। এখন আমি নিজেই সব কিছু জানি, আমি মহাজ্ঞানী, আমার কোন ভুল ভ্রান্তি হয় না, আমি একজন পারফেক্ট মানুষ। ভুল করে অন্য লোকে, অন্যায় করে অপর লোকে, অবিচার করে আলাদা লোকে। এই দুনিয়াতে পাপ পুণ্য বলে কিছু নেই,পরজন্মে কিসের বিচার হবে জানতে চাই না। মোট কথা, এই দুনিয়ায় খেয়ে পরে মৌজ মস্তি করে জীবনটা কে পুরোপুরি উপভোগ করে কাটিয়ে দিতে চায়। এটাই জীবনের সাফল্য, জীবনের সত্যিকারের যাপন।
যে শিক্ষা একসময়ে আমাদের মান আর হুশ নিয়ে মানুষ হবার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল, অক্ষরজ্ঞান হীন মানুষের সঙ্গে একটা পার্থক্য সূচিত করেছিল, সেই জ্ঞান বিবেক প্রজ্ঞা আজকে বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষের মন থেকে মুছে যেতে বসেছে। শিক্ষিত মানুষের মধ্যে যেন জটিলতা, কুটিলতা, ঘৃণা, হিংসা, বিদ্বেষ বেড়েই চলেছে। বরং তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে সরলতা, পরোপকারিতা, ভালবাসার প্রাবল্য এখনও বিদ্যমান। জানিনা এই সোজা সরল দিলদরিয়া মানুষগুলোও তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের সংস্পর্শে জটিলতায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে কিনা। অপরদিকে যে ধর্ম একদিন সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখিয়েছিল, মানুষকে সোজা সরল পথে চলার অভিমুখ তৈরি করে দিয়েছিল; সেই ধর্ম আজকে ব্যবসা ও রাজনীতির পঙ্কিল আবর্তে নিমজ্জিত হয়ে মানুষকে এক কানাগলি তে পৌঁছে দিয়েছে। ধর্মের মানবিক দিকগুলি পরিহার করে ধর্ম – ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা ধর্মকে বিকৃত করে নানারকম কুসংসারে জারিত করে মানুষের কাছে নেশার উপাদান হিসেবে উপহার দিচ্ছে। তার ফলে বিশ্বময় জাতি – বিদ্বেষ, ধর্ম – বিদ্বেষ, বর্ণ – বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে।
মানুষের সভ্যতা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছিল ভালোবাসার মন্ত্র দিয়ে , জাতপাত,ধর্ম বর্ণ সেখানে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে নি। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ কায়েমী স্বার্থের কবলে পড়ে সেই ভালোবাসার বিপণি টাকেই তুলে দিতে চাইছে। হিংসা, দ্বেষ, ঘৃণা,পরশ্রীকাতরতা যেমন ব্যক্তি জীবনে জাঁকিয়ে বসেছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় জীবনকে গ্রাস করেছে এই অমানবিক উপাদানগুলি।
তাহলে কি দীর্ঘদিনের চড়াই উৎরাই ডিঙিয়ে যে মানব সভ্যতা আমরা তৈরি করেছিলাম, হিংসার দাবানলে সেই সভ্যতা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবে? নাকি আদিকালের সেই যুথবদ্ধ জীবন যেখানে ভালোবাসার ফল্গু ধারা তির তির বয়ে মানব সমাজ কে উর্বর করে তুলেছিল, সেই পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতার সোনালী দিনগুলি আবার ফিরে আসবে!
মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী, অস্তিত্বের জন্য লড়াই করে সে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা লাভ করেছে।কাজেই এত সহজে মানুষ হারবার পাত্র নয়। ঘৃণা, হিংসা, হানাহানির কবল থেকে মুক্ত হয়ে সে আবার সযত্নে ভালোবাসার বাগান গড়ে তুলবে এবং পুনরায় মানব জীবন উত্তরণের পথে এগিয়ে যাবে, এই আশা ব্যক্ত করা যায়।

