The Ego and the Mechanisms of Defence – Anna Freud (1936)
কৈশোরকাল একটি অত্যন্ত জটিল সময়, যাকে গবেষকরা “হরমোনাল ঝড়” (hormonal storm) এবং ধ্রুবক মানসিক চাপের সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত অন্তর্দন্দ্ব এবং মানসিক চাপ থেকে রক্ষা পেতে কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা কৌশল বা সাইকোলজিক্যাল ডিফেন্স মেকানিজম (Psychological Defense Mechanisms) ব্যবহার করে। এই কৌশলগুলো অবচেতন স্তরে কাজ করে মানসিক ভারসাম্য (psychological homeostasis) বজায় রাখতে, নেতিবাচক আবেগের তীব্রতা কমাতে এবং আচরণের বিশৃঙ্খলা রোধ করতে সাহায্য করে।
কৈশোরের সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত প্রধান সুরক্ষা কৌশলগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- বৌদ্ধিকরণ (Intellectualization): আন্না ফ্রয়েড কৈশোরের জন্য এটিকে একটি অন্যতম প্রধান সুরক্ষা কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিশোর-কিশোরীরা প্রায়ই আবেগের দিক থেকে হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বৌদ্ধিকরণের আশ্রয় নেয়। তারা তাদের ভেতরের প্রবৃত্তি এবং আবেগগুলোকে বিমূর্ত চিন্তায় (abstract thought) রূপান্তরিত করে এবং দার্শনিক বা তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে বাস্তব জীবনের মানসিক চাপ এবং শারীরিক অনুভূতিগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে।
- কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন (Asceticism): আন্না ফ্রয়েডের মতে, এটি কৈশোরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা কৌশল, যেখানে কিশোর-কিশোরীরা তাদের সকল প্রবৃত্তি ও আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে দমন করার চেষ্টা করে। বয়ঃসন্ধিকালে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া প্রবৃত্তিগত চাহিদার আধিক্যকে ভয় পেয়ে তারা সব ধরনের জাগতিক ও শারীরিক আনন্দ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে এবং নিজেদের ওপর কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেয়।
- প্রক্ষেপণ (Projection): এটি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত একটি কৌশল। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের এমন সব গুণ বা দোষ, যেগুলো তারা নিজেরা মেনে নিতে চায় না, তা অন্যের ওপর বা বাহ্যিক পৃথিবীর ওপর চাপিয়ে দেয়। এটি তাদের মানসিক অবস্থানকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করলেও, অনেক সময় এর কারণে অন্যদের প্রতি তাদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়, যা সম্পর্কগুলোকে খারাপ করতে পারে।
- ক্ষতিপূরণ ও অতি-ক্ষতিপূরণ (Compensation and Hypercompensation): আলফ্রেড অ্যাডলারের মতে, কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের কোনো অভাব বা ঘাটতি মেটানোর জন্য এই কৌশলগুলো ব্যবহার করে। যেমন, একজন শারীরিকভাবে দুর্বল কিশোর তার শারীরিক অক্ষমতার কথা ভুলে থাকার জন্য দাবা খেলায় খুব ভালো করার চেষ্টা করতে পারে (compensation)। অন্যদিকে, কেউ তার দুর্বল দিকটিতেই অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে তা কাটানোর চেষ্টা করতে পারে (hypercompensation)। বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েরা প্রায়ই নিজেদের বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ ‘ত্রুটি’ ঢাকতে অতি-ক্ষতিপূরণের আশ্রয় নেয়, যেমন নিজেকে অসুন্দর মনে করা কোনো কিশোরী ফ্যাশন বা সাজগোজের পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে পারে।
- যুক্তিকরণ (Rationalization): এর মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা শুধুমাত্র তাদের সুবিধাজনক তথ্য গ্রহণ করে এবং নিজেদের আচরণকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বা সঠিক বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। এটি তাদের ভুল কাজের সপক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়ে তাদের আত্মসম্মান রক্ষায় সাহায্য করে।
- পশ্চাদপসরণ (Regression): এটি এমন একটি কৌশল যেখানে কিশোর-কিশোরীরা তাদের অতীত বা শৈশবের আদিম আচরণে ফিরে যায়। এটি তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব ঢেকে রাখে এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে সাময়িক স্বস্তি প্রদান করে।
- স্থানচ্যুতি (Displacement) ও ভুলে যাওয়া: কিশোররা অনেক সময় নিজেদের আত্মমর্যাদা বজায় রাখার জন্য অপ্রীতিকর ঘটনার আসল কারণটি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে বা তাকে অন্য কোনো মিথ্যা কিন্তু যন্ত্রণাহীন কারণ দিয়ে প্রতিস্থাপন করে।
এই মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা কৌশলগুলো কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে রক্ষা করে, তাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলোর সমাধান করতে সাহায্য করে এবং বয়ঃসন্ধিকালের চরম পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে একটি মানসিক ঢাল হিসেবে কাজ করে
আনা ফ্রয়েড বর্ণিত ইগো বা অহং-এর প্রধান সুরক্ষা পদ্ধতিগুলো কী কী?
আনা ফ্রয়েড তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Ego and the Mechanisms of Defence (১৯৩৬)-এ ইগো বা অহং-এর সুরক্ষা পদ্ধতিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি মূলত তাঁর পিতা সিগমুন্ড ফ্রয়েড বর্ণিত দশটি সুরক্ষা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো হলো: দমন (repression), পশ্চাদপসরণ (regression), বিপরীত প্রতিক্রিয়া গঠন (reaction formation), বিচ্ছিন্নকরণ (isolation), বাতিলকরণ (undoing), প্রক্ষেপণ (projection), অন্তর্মুখীকরণ (introjection), নিজের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো (turning against one’s own person), বিপরীতে রূপান্তর (reversal into the opposite) এবং উন্নীতকরণ বা স্থানান্তর (sublimation or displacement)।
তবে আনা ফ্রয়েড নিজে গবেষণা ও কাজের ক্ষেত্রে মূলত পাঁচটি প্রধান সুরক্ষা পদ্ধতির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। এই প্রধান পাঁচটি পদ্ধতি হলো:
- দমন (Repression): অগ্রহণযোগ্য আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তাভাবনাকে চেতনা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া বা অবদমনে রাখা, যদিও কখনও কখনও এগুলো ভিন্ন বা বিকৃত রূপে ফিরে আসতে পারে।
- পশ্চাদপসরণ (Regression): মানসিক ও শারীরিক বিকাশের আগের কোনো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও কম চাহিদাপূর্ণ স্তরে ফিরে যাওয়া।
- প্রক্ষেপণ (Projection): নিজের সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য অনুভূতি বা অবচেতন তাড়নাকে এড়িয়ে তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা অন্যের আচরণের মধ্যে তা দেখতে পাওয়া।
- বিপরীত প্রতিক্রিয়া গঠন (Reaction formation): অবচেতন মন যেভাবে আচরণ করতে নির্দেশ দেয়, তার ঠিক বিপরীত আচরণ করা। এটি প্রায়শই অতিরঞ্জিত ও আবেশমূলক (obsessive) হয়ে থাকে।
- উন্নীতকরণ (Sublimation): মানসিক উদ্বেগকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে প্রকাশ করা। এটিকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মানসিক সুরক্ষা পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়।
এর বাইরেও আনা ফ্রয়েড তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ইগো-এর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা পদ্ধতির ধারণা দিয়েছেন:
- আক্রমণকারীর সাথে একাত্মতা (Identification with the Aggressor): এটি এমন একটি কৌশল যেখানে কোনো ব্যক্তি (বিশেষ করে শিশু) ভীতিকর পরিস্থিতি বা আঘাত থেকে বাঁচতে আক্রমণকারীর চরিত্র, বৈশিষ্ট্য বা আগ্রাসী আচরণ নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং নিজেকে ভুক্তভোগীর বদলে আক্রমণকারী হিসেবে ভাবতে শুরু করে।
- পরার্থপর আত্মসমর্পণ (Altruistic Surrender): নিজের প্রবৃত্তি বা আকাঙ্ক্ষাগুলো নিজে পূরণ করতে না পেরে অন্যের ওপর তা অভিক্ষেপ করা এবং অন্যের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সাহায্য করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নিজের তৃপ্তি লাভ করা।
- অস্বীকার (Denial): কল্পনা (Denial in Phantasy) এবং কথা ও কাজের (Denial in Word and Act) মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত বা হুমকিস্বরূপ বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মনগড়া আনন্দদায়ক বাস্তবতার আশ্রয় নেওয়া।
- কৈশোরের বিশেষ পদ্ধতি: বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের জন্য তিনি ‘কৃচ্ছ্রসাধন’ (Asceticism) এবং ‘বৌদ্ধিকরণ’ (Intellectualization)-কে প্রধান সুরক্ষা পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা তাদের হঠাৎ বেড়ে যাওয়া প্রবৃত্তিগত চাপ এবং মানসিক দ্বন্দ্ব এড়াতে সাহায্য করে।
এই পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে ইগো (Ego) যেকোনো বাহ্যিক চাপ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা সামাজিক পরিস্থিতি থেকে তৈরি হওয়া উদ্বেগ থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখে
কৈশোরে ‘ক্ষতিপূরণ’ কৌশলটি ব্যক্তিত্ব গঠনে কী প্রভাব ফেলে?
আলফ্রেড অ্যাডলারের মতে, কৈশোরে ‘ক্ষতিপূরণ’ বা কম্পেনসেশন (Compensation) কৌশলটি ব্যক্তিত্ব গঠনে অত্যন্ত গভীর এবং দ্বিমুখী প্রভাব ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘাটতি বা দুর্বলতা কাটানোর বদলে অন্য একটি বিষয়ে (যেটিতে তারা আগে থেকেই পারদর্শী) নিজেদের দক্ষতার চরম বিকাশ ঘটায়। জীবনের কোনো এক ক্ষেত্রে অযোগ্যতা বা হীনমন্যতার ভয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে অন্য একটি ক্ষেত্রে সাফল্যের দিকে তারা মনোনিবেশ করে।
ব্যক্তিত্ব গঠনে এর প্রধান প্রভাবগুলো
- অসামান্য সাফল্য অর্জন: এই সুরক্ষাকৌশল আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং অবদমিত অনুভূতির বিকল্প হিসেবে কাজ করে, যা অনেক সময় ব্যক্তিকে তার নির্বাচিত ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য এনে দেয়। যেমন, একজন শারীরিকভাবে দুর্বল কিশোর শারীরিক বিকাশের বদলে দাবা খেলায় গভীর মনোযোগ দিয়ে দারুণ সাফল্য অর্জন করতে পারে। একইভাবে দৃষ্টিশক্তিহীন কোনো শিশু পরবর্তীতে একজন অসামান্য শিল্পী হয়ে উঠতে পারে। আবার কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনায় খারাপ ফল করলে তার মনোযোগ পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত বা এক্সট্রা কারিকুলার কার্যকলাপে সরিয়ে দিয়ে সেখানে সাফল্য খুঁজতে পারে।
- ব্যক্তিত্বের অসম বা একপাক্ষিক বিকাশ: ক্ষতিপূরণ কৌশলটির ফলে কিশোর-কিশোরীদের ব্যক্তিত্বের আনুপাতিক বা সুষম বিকাশ মারাত্মকভাবে বিকৃত বা বাধাগ্রস্ত হয়। তারা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে খুব ভালো করলেও, জীবনের অন্যান্য দিকগুলো অবিকশিতই থেকে যায়।
- মানসিক কষ্ট ও অপূর্ণতা: সমাজ তাদের এই বিশেষ সাফল্যকে মূল্যায়ন করলেও, ব্যক্তি নিজে অনেক সময় মানসিক কষ্টে ভোগে। যেমন, দাবা খেলায় সফল হলেও সেই কিশোর তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে ভেতরে ভেতরে অসুখীই থেকে যেতে পারে। রবার্ট প্লুটচিকের মতে, এই ক্ষতিপূরণ কৌশলটি অনেক সময় বিষণ্ণতা এবং দুঃখবোধের সাথে সম্পর্কিত থাকে।
- অতি-ক্ষতিপূরণের (Hypercompensation) প্রবণতা তৈরি: ক্ষতিপূরণের একটি ভিন্ন রূপ হলো অতি-ক্ষতিপূরণ, যেখানে কিশোর-কিশোরীরা তাদের সবচেয়ে দুর্বল দিকটিকেই জোর করে উন্নত করার চেষ্টা করে। যেমন, দুর্বল কিশোরটি প্রতিশোধ নিতে লড়াই শেখার ক্লাসে ভর্তি হতে পারে, বা নিজেকে অসুন্দর মনে করা কোনো কিশোরী ফ্যাশন ও প্রসাধনীর পেছনে মাত্রাতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে পারে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে ‘ক্ষতিপূরণ’ হলো মানববিকাশের অপেক্ষাকৃত শেষ দিকের এবং জ্ঞানীয়ভাবে একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এটি কিশোরদের হীনমন্যতা ঢাকতে সাহায্য করলেও, এর ফলে ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের বদলে একপাক্ষিক বিকাশ ঘটে, যা তাদের ভেতরে এক ধরনের অপূর্ণতা ও কষ্ট রেখে দেয়
কৈশোরে ‘ক্ষতিপূরণ’ কৌশলটি ব্যক্তিত্ব গঠনে কী প্রভাব ফেলে?
আলফ্রেড অ্যাডলারের মতে, কৈশোরে ‘ক্ষতিপূরণ’ বা কম্পেনসেশন (Compensation) কৌশলটি ব্যক্তিত্ব গঠনে অত্যন্ত গভীর এবং দ্বিমুখী প্রভাব ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘাটতি বা দুর্বলতা কাটানোর বদলে অন্য একটি বিষয়ে (যেটিতে তারা আগে থেকেই পারদর্শী) নিজেদের দক্ষতার চরম বিকাশ ঘটায়। জীবনের কোনো এক ক্ষেত্রে অযোগ্যতা বা হীনমন্যতার ভয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে অন্য একটি ক্ষেত্রে সাফল্যের দিকে তারা মনোনিবেশ করে।
ব্যক্তিত্ব গঠনে এর প্রধান প্রভাবগুলো
- অসামান্য সাফল্য অর্জন: এই সুরক্ষাকৌশল আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং অবদমিত অনুভূতির বিকল্প হিসেবে কাজ করে, যা অনেক সময় ব্যক্তিকে তার নির্বাচিত ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য এনে দেয়। যেমন, একজন শারীরিকভাবে দুর্বল কিশোর শারীরিক বিকাশের বদলে দাবা খেলায় গভীর মনোযোগ দিয়ে দারুণ সাফল্য অর্জন করতে পারে। একইভাবে দৃষ্টিশক্তিহীন কোনো শিশু পরবর্তীতে একজন অসামান্য শিল্পী হয়ে উঠতে পারে। আবার কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনায় খারাপ ফল করলে তার মনোযোগ পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত বা এক্সট্রা কারিকুলার কার্যকলাপে সরিয়ে দিয়ে সেখানে সাফল্য খুঁজতে পারে।
- ব্যক্তিত্বের অসম বা একপাক্ষিক বিকাশ: ক্ষতিপূরণ কৌশলটির ফলে কিশোর-কিশোরীদের ব্যক্তিত্বের আনুপাতিক বা সুষম বিকাশ মারাত্মকভাবে বিকৃত বা বাধাগ্রস্ত হয়। তারা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে খুব ভালো করলেও, জীবনের অন্যান্য দিকগুলো অবিকশিতই থেকে যায়।
- মানসিক কষ্ট ও অপূর্ণতা: সমাজ তাদের এই বিশেষ সাফল্যকে মূল্যায়ন করলেও, ব্যক্তি নিজে অনেক সময় মানসিক কষ্টে ভোগে। যেমন, দাবা খেলায় সফল হলেও সেই কিশোর তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে ভেতরে ভেতরে অসুখীই থেকে যেতে পারে। রবার্ট প্লুটচিকের মতে, এই ক্ষতিপূরণ কৌশলটি অনেক সময় বিষণ্ণতা এবং দুঃখবোধের সাথে সম্পর্কিত থাকে।
- অতি-ক্ষতিপূরণের (Hypercompensation) প্রবণতা তৈরি: ক্ষতিপূরণের একটি ভিন্ন রূপ হলো অতি-ক্ষতিপূরণ, যেখানে কিশোর-কিশোরীরা তাদের সবচেয়ে দুর্বল দিকটিকেই জোর করে উন্নত করার চেষ্টা করে। যেমন, দুর্বল কিশোরটি প্রতিশোধ নিতে লড়াই শেখার ক্লাসে ভর্তি হতে পারে, বা নিজেকে অসুন্দর মনে করা কোনো কিশোরী ফ্যাশন ও প্রসাধনীর পেছনে মাত্রাতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে পারে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে ‘ক্ষতিপূরণ’ হলো মানববিকাশের অপেক্ষাকৃত শেষ দিকের এবং জ্ঞানীয়ভাবে একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এটি কিশোরদের হীনমন্যতা ঢাকতে সাহায্য করলেও, এর ফলে ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের বদলে একপাক্ষিক বিকাশ ঘটে, যা তাদের ভেতরে এক ধরনের অপূর্ণতা ও কষ্ট রেখে দেয়।
লেখক – মাধব রায়

