আনা পাভলোভা: বিশ্ব ব্যালে নাচের রূপকার

আনা পাভলোভা: বিশ্ব ব্যালে নাচের রূপকার

আনা পাভলোভা (১৮৮১–১৯৩১) কেবল একজন মহান ব্যালে নৃত্যশিল্পীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ব্যালে নাচের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দূত। এমন এক যুগে যখন এই শাস্ত্রীয় নৃত্যটি কেবল ইউরোপের রাজদরবার আর রাজকীয় থিয়েটারগুলোর চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল, পাভলোভা একে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিভিন্ন মহাসাগর আর মহাদেশের আনাচে-কানাচে। তিনি এমন সব দর্শকদের সামনে নাচ পরিবেশন করেছিলেন, যারা এর আগে কখনো টুটু (ব্যালে নাচের বিশেষ স্কার্ট) বা পোয়েন্ত জুতো (পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নাচার বিশেষ জুতো) দেখেনি। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ডাইং সোয়ান’ (The Dying Swan বা মুমূর্ষু রাজহাঁস) নাচটি প্রায় ৪,০০০ বার মঞ্চস্থ করেছিলেন। তিনি বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যালে দল গঠন করেন এবং বিশ্বজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার ও দর্শকদের অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। তাঁর জীবনের গল্পটি হলো—দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, শৈল্পিক দূরদর্শিতা এবং এক অদ্ভুত সাধনার গল্প।

১০টি অধ্যায়ের এই বিস্তারিত প্রবন্ধে তাঁর অসাধারণ জীবন ও কীর্তির কথা তুলে ধরা হলো।

অধ্যায় ১: সাধারণ এক সূচনা – শৈশব ও স্বপ্নের প্রথম স্ফুলিঙ্গ
১৮৮১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে এক দরিদ্র পরিবারে আনা পাভলোভার জন্ম হয়। তাঁর বাবা মাতভেই পাভলোভিচ পাভলভ সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন এবং মা লিউবভ ফিওদোরোভনা ছিলেন একজন ধোপা, যিনি এক ধনী ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়িতে কাজ করতেন। আনার বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। ফলে চরম দারিদ্র্য আর অভাবের মধ্য দিয়েই তাঁর শৈশব কেটেছিল।

ছোটবেলায় আনা ছিলেন ভীষণ রোগা এবং প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। সময়ের আগেই জন্ম হওয়ায় তাঁর শরীর ছিল বেশ দুর্বল। তাই স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য তিনি তাঁর দিদিমার সাথে লিগোভো নামের এক গ্রামে বেশ কিছু সময় কাটান। এত কষ্টের মাঝেও আনার মা তাঁর জীবনে আনন্দের ছোট ছোট মুহূর্ত তৈরি করার চেষ্টা করতেন। ১৮৯০ সালে, আনার ৯ বছর বয়সে, তাঁর মা তাঁকে ইম্পেরিয়াল মারিনস্কি থিয়েটারে ‘দ্য স্লিপিং বিউটি’ ব্যালে নাচ দেখাতে নিয়ে যান। সেই রাতের জমকালো আলো, চমৎকার পোশাক আর জাদুকরী নাচ দেখে ছোট্ট আনার মনে এক নেভানো-না-যাওয়া আগুনের সৃষ্টি হয়।

সেই রাত থেকেই আনা সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি বড় হয়ে ব্যালে নৃত্যশিল্পী (Ballerina) হবেন। তিনি ব্যালে শেখার জন্য জেদ করতে লাগলেন এবং যেখানে-সেখানে নাচ অনুশীলন শুরু করলেন। ১৮৯০ সালে তিনি ইম্পেরিয়াল ব্যালে স্কুলে ভর্তির পরীক্ষা দেন, কিন্তু খুব ছোট ও দুর্বল হওয়ার কারণে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। তবে তিনি দমে যাননি। পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৯১ সালে ১০ বছর বয়সে তিনি আবার পরীক্ষা দেন এবং এবার ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। এভাবেই শুরু হলো তাঁর স্বপ্ন ছোঁয়ার লড়াই, যা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

অধ্যায় ২: ইম্পেরিয়াল ব্যালে স্কুল – কঠিন পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও রূপান্তর
ইম্পেরিয়াল ব্যালে স্কুলের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং নিয়মে বাঁধা। সে যুগে রাশিয়ায় সাধারণত একটু ভারী ও শক্তিশালী গড়নের ব্যালে নৃত্যশিল্পীদের পছন্দ করা হতো। কিন্তু আনার শারীরিক গঠন ছিল একদম আলাদা—লম্বা হাত-পা, বাঁকানো পায়ের পাতা এবং রোগা গোড়ালি। এই গড়নের জন্য সহপাঠীরা তাঁকে হিংসা করে ‘ঝাঁটা’ বা ‘বুনো মেয়ে’ বলে খ্যাপাত। শুরুর দিকে নাচের মুদ্রা নিখুঁত করতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

তবে তাঁর ছিল অসম্ভব মানসিক জোর এবং তাল-লয়ের দারুণ জ্ঞান। পরবর্তীতে তিনি নিজেই বলেছিলেন: “শুধু প্রতিভা থাকলেই কেউ বড় হতে পারে না। ঈশ্বর প্রতিভা দেন, কিন্তু কঠোর পরিশ্রম সেই প্রতিভাকে জিনিয়াসে রূপান্তর করে।”

তিনি সেই সময়ের সেরা সব গুরুদের কাছে প্রশিক্ষণ নেন, যাঁদের মধ্যে এনরিকো চেক্কেত্তি (Enrico Cecchetti) ছিলেন অন্যতম। চেক্কেত্তির শিক্ষা আনার নাচের মধ্যে নিখুঁত ভাব ও শক্তি ফুটিয়ে তুলেছিল। স্কুলের শেষ বছরে তিনি সাবেক প্রধান নৃত্যশিল্পী একেতেরিনা ভাজেম-এর বিশেষ ক্লাসে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। এমনকি মহান ব্যালে পরিচালক মারিউস পেতিপা-র নজরও কেড়ে নেন এই প্রতিভাবান ছাত্রী।

অবশেষে, ১৮৯৯ সালে ১৮ বছর বয়সে স্কুল থেকে পাস করার পর আনা সরাসরি ‘কোরিফে’ (Coryphée – একটি সম্মানজনক পদমর্যাদা) হিসেবে ইম্পেরিয়াল ব্যালে দলে যোগ দেন, যা সাধারণত সাধারণ ছাত্রীদের কপালে জুটত না।

অধ্যায় ৩: রাজকীয় মঞ্চে আত্মপ্রকাশ ও সাফল্যের শিখরে আরোহণ
মারিনস্কি থিয়েটারে আনার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল খুব দ্রুত। শুরুর দিকের ছোট ছোট চরিত্রেই তিনি দর্শকদের মন জয় করে নেন। সমালোচকরা লক্ষ্য করলেন যে, আনার নাচের মধ্যে এক ধরণের অপার্থিব ও রোমান্টিক কোমলতা রয়েছে, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

১৯০২ সালে ‘লা বায়াদের’ (La Bayadère) নাটকে ‘নিকিয়া’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সবার নজর কাড়েন। বিশেষ করে ‘কিংডম অব দ্য শেডস’ দৃশ্যে তাঁর হাতের মুদ্রা এবং আধ্যাত্মিক ভাবভঙ্গি দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে রেখেছিল। এরপর প্রখ্যাত পরিচালক পেতিপা নিজে আনার জন্য বিভিন্ন নাচের চরিত্র নতুন করে সাজাতে শুরু করেন।

তিনি ‘দ্য স্লিপিং বিউটি’, ‘পাকিতা’, ‘লে করসার’ এবং ‘দ্য ফারাওস ডটার’-এর মতো বিখ্যাত সব ব্যালেতে প্রধান চরিত্রে নাচেন। একবার ‘দ্য ফারাওস ডটার’ নাটকে নাচতে গিয়ে আবেগের চোটে তিনি সোজা প্রম্পটার্স বক্সের (মঞ্চের সামনের লুকানো বাক্স) ওপর গিয়ে পড়েছিলেন, যা এক মজার স্মৃতির সৃষ্টি করে। ১৯০৩ সালে বিশেষভাবে তাঁর জন্যই তৈরি ‘জিজেল’ (Giselle) নাটকে নাচ দেখিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন।

১৯০৫ সালের মধ্যে তিনি প্রধান নৃত্যশিল্পী এবং ১৯০৬ সালে ব্যালে জগতের সর্বোচ্চ পদ ‘প্রাইমা ব্যালেরিনা’ (Prima Ballerina) খেতাব অর্জন করেন। সে সময় ‘পাভলোভাতজি’ নামে তাঁর ভক্তদের একটি বিশাল দল তৈরি হয়েছিল। তাঁর এক শিক্ষক পাভেল গের্দত তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি যেন অন্য কোনো শক্তিশালী নৃত্যশিল্পীর অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের শারীরিক কসরত দেখানোর চেষ্টা না করেন; কারণ আনার এই সরলতা ও কোমলতাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।

অধ্যায় ৪: যুগান্তকারী চরিত্র এবং কিংবদন্তিদের সাথে যুগলবন্দি
আনা পাভলোভা এমন সব আবেগঘন ও নাটকীয় চরিত্রে দারুণ পারদর্শী ছিলেন, যেখানে অভিনয়ের গভীরতা ফুটিয়ে তোলার সুযোগ থাকত। প্রখ্যাত পরিচালক পেতিপা বিশেষভাবে আনার শক্তি ও গুণাবলিকে মাথায় রেখে নাচের মুদ্রা বা কোরিওগ্রাফি তৈরি করতেন। তিনি রানী নিসিয়া, পাকিতা, আসপিসিয়া সহ আরও অনেক চরিত্রে শাস্ত্রীয় কৌশল (Classical technique) এবং রোমান্টিক ভাবপ্রকাশের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়ে নাচ পরিবেশন করেছিলেন।

তবে কোরিওগ্রাফার মিখাইল ফোকিন (Mikhail Fokine)-এর সাথে তাঁর জুটি ব্যালে জগতে এক বিপ্লব এনেছিল। ফোকিন ব্যালে নাচে কেবল জাঁকজমক দেখানোর চেয়ে নাটকীয়তা, স্বাভাবিক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি এবং ঐতিহাসিক বা আবেগীয় সত্যতার ওপর বেশি জোর দিতেন। পাভলোভা হয়ে উঠেছিলেন ফোকিনের এই নতুন ভাবনার সবচেয়ে যোগ্য রূপকার।

এছাড়াও তিনি চেক্কেত্তির ইতালীয় নিখুঁত শৈলী এবং রাশিয়ান স্কুলের সুরময়তার মেলবন্ধন নিজের নাচে ধারণ করেছিলেন। সে সময় সমসাময়িক শিল্পীদের (যেমন তামারা কারসাভিনা) সাথে কিছুটা প্রতিযোগিতা থাকলেও পাভলোভার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছিল। ১৯০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি রাশিয়ার অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

অধ্যায় ৫: এক কিংবদন্তির জন্ম – ‘দ্য ডাইং সোয়ান’ এবং ফোকিনের সাথে কোলাবোরেশন
১৯০৫ সালে মারিনস্কি থিয়েটারে একটি দাতব্য অনুষ্ঠানের জন্য কোরিওগ্রাফার ফোকিন কামিল সাঁ-সঁ-এর ‘দ্য কার্নিভাল অব দ্য অ্যানিম্যালস’ সুরের ওপর ভিত্তি করে আনার জন্য একটি ছোট একক নাচ তৈরি করেন। কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের ‘দ্য ডাইং সোয়ান’ (মুমূর্ষু রাজহাঁস) কবিতা এবং রাজহাঁসের চলাফেরা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে, আনা ফোকিনকে এমন একটি নাচ তৈরি করতে বলেছিলেন যা একটি আহত রাজহাঁসের জীবনের শেষ মুহূর্তের লড়াইকে ফুটিয়ে তুলবে।

এভাবেই জন্ম নেয় ‘দ্য সোয়ান’ (যা পরবর্তীতে ‘দ্য ডাইং সোয়ান’ বা মুমূর্ষু রাজহাঁস নামে পরিচিত হয়)। পালক লাগানো একটি সাধারণ সাদা টুটু (ব্যালে স্কার্ট) পরে পাভলোভা তাঁর কাঁপানো হাত, ভেঙে পড়া হাঁটু এবং শেষ মুহূর্তের এক মর্মস্পর্শী নিস্তব্ধতার মাধ্যমে একটি পাখির জীবনাবসান ফুটিয়ে তুলেছিলেন। মাত্র চার মিনিটের এই নাচটি ব্যালে নাচের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত একক পারফরম্যান্স হয়ে ওঠে।

তিনি তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে এই নাচটি প্রায় ৪,০০০ বার পরিবেশন করেছিলেন। এই নাচটি ছিল তাঁর শৈল্পিক সত্তার আসল রূপ: যেখানে শারীরিক কোমলতা এক গভীর সৌন্দর্য ও আবেগে রূপ নিয়েছিল। এই চরিত্রটি তাঁকে ব্যালে জগতের এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত করে এবং পরবর্তীতে ‘সোয়ান লেক’ (Swan Lake) নাটকের ওডেট চরিত্রের রূপায়ণে বড় প্রভাব ফেলে।

অধ্যায় ৬: রাশিয়ার বাইরে পা বাড়াবো – ইউরোপ সফর এবং ‘ব্যালে রুস’
১৯০৭-১৯০৮ সালের শুরুর দিকেই পাভলোভা ইউরোপ সফর শুরু করেন। তিনি রিগা, স্টকহোম, কোপেনহেগেন, বার্লিন এবং প্রাগে নাচ পরিবেশন করেন। ১৯০৯ সালে তিনি সের্গেই দিয়াগিলেভের বিখ্যাত ব্যালে দল ‘ব্যালে রুস’ (Ballets Russes)-এ যোগ দিয়ে প্যারিসের মঞ্চ কাঁপাতে যান। সেখানে তিনি বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী নিজিনস্কি এবং কারসাভিনার সাথে ‘লে প্যাভিলিয়ন ডি’আরমিড’ এবং ‘লে সিলফাইডস’-এর মতো নাটকে অভিনয় করেন।

তবে দিয়াগিলেভের আধুনিকতাবাদী ভাবনার সাথে আনার মতের অমিল দেখা দেয়। তিনি ‘দ্য ফায়ারবার্ড’ নাটকের প্রধান চরিত্রে নাচতে অস্বীকৃতি জানান (কারণ তিনি ১৯ শতকের ধ্রুপদী সুর বেশি পছন্দ করতেন) এবং এই পরীক্ষামূলক দলের সাথে না থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। আনা শাস্ত্রীয় ব্যালে নাচের বিশুদ্ধতাকে ভালোবাসতেন এবং নতুন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে এই ঐতিহ্যবাহী নাচকেই বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন।

১৯১০ সালে তিনি মিখাইল মর্দকিন-এর সাথে নিউ ইয়র্ক এবং লন্ডনে নাচেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল যে, ব্যালে নাচকে কেবল রাশিয়া বা ইউরোপের উচ্চবিত্তদের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।

অধ্যায় ৭: স্বাধীনতা এবং নিজস্ব ব্যালে দলের আত্মপ্রকাশ
১৯১৩ সালে ইম্পেরিয়াল ব্যালে থেকে পাকাপাকিভাবে বিদায় নিয়ে (তিনি দীর্ঘদিন ছুটিতে ছিলেন) পাভলোভা তাঁর নিজস্ব ব্যালে দল গঠন করেন। তাঁর ম্যানেজার (এবং পরবর্তীতে স্বামী) ভিক্টর দান্দ্রে-এর সহায়তায় তিনি এমন একটি ভ্রমণকারী দল তৈরি করেন যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে ‘জিজেল’, ‘ডন কিহোতে’-এর মতো বিখ্যাত ক্লাসিক নাটকের সংক্ষিপ্ত রূপ এবং তাঁর নিজস্ব একক নাচগুলো পরিবেশন করত।

তাঁদের নাচের তালিকায় ‘স্নোফ্লেকস’, ‘অটাম লিভস’ (যা তিনি নিজেই ১৯১৮ সালে কোরিওগ্রাফি করেছিলেন), ‘দ্য ড্রাগনফ্লাই’ এবং ‘ক্যালিফোর্নিয়া পপি’-র মতো দারুণ সব পরিবেশনা ছিল। তিনি ইভান ক্লাস্টিনের মতো বিখ্যাত কোরিওগ্রাফারদের সাথেও কাজ করেছিলেন।

তাঁর এই দলটি একই সাথে একটি শৈল্পিক ও সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। দলের আর্থিক বিষয়, নতুন নাচের পরিকল্পনা এবং সহ-নৃত্যশিল্পীদের দেখভালের সমস্ত দায়িত্ব আনা একাই সামলাতেন। এই স্বাধীনতাই তাঁকে কোনো রকম আপস না করে ব্যালে নাচকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার মিশন সফল করতে সাহায্য করেছিল।

অধ্যায় ৮: বৈশ্বিক দূত – বিশ্ব সফর এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান
১৯১০-এর দশক থেকে পাভলোভা এবং তাঁর দল অবিরাম বিশ্ব সফরে মেতে ওঠে—ইতিহাসে এর আগে কোনো ব্যালে নৃত্যশিল্পী এত বড় পরিসরে বিশ্ব ভ্রমণ করেননি। তাঁরা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে পারফর্ম করেছিলেন।

বিশ্ব সফরের কিছু উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত:

দক্ষিণ আমেরিকা (১৯১৮–১৯১৯): এই সফরে তিনি রুথ পেজের মতো বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

মেক্সিকো: সেখানে তিনি মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী নাচ ‘হারাবে তাপাতিও’ (Jarabe Tapatío)-কে ব্যালের ‘পোয়েন্ত’ শৈলীতে (পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে) মঞ্চস্থ করেন; যা পরবর্তীতে মেক্সিকোর জাতীয় নাচে পরিণত হয়।

ভারত (১৯২০-এর দশক): ভারতে এসে তিনি প্রখ্যাত উদয় শংকরের সাথে যৌথভাবে ‘কৃষ্ণ রাধা’ এবং ‘ওরিয়েন্টাল ইমপ্রেশনস’ নামের নাচ তৈরি করেন। এই উদ্যোগটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের পুনর্জাগরণে এক বড় ভূমিকা রেখেছিল (এবং রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেলের মতো মহান নৃত্যশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছিল)।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড: তিনি ১৯২৬ ও ১৯২৯ সালসহ বেশ কয়েকবার সেখানে যান। তাঁর সম্মানে এবং তাঁর হালকা-পাতলা গড়নের কথা মাথায় রেখে ডিমের সাদা অংশ দিয়ে তৈরি একটি বিখ্যাত ডেজার্ট বা মিষ্টির নাম রাখা হয় “পাভলোভা” (Pavlova)।

চীন, জাপান এবং আমেরিকা: তিনি এই দেশগুলোতেও অসংখ্যবার সফল সফর করেছিলেন।

আনা পাভলোভা যেখানেই যেতেন, সেখানকার স্থানীয় লোকনৃত্যগুলো দেখতেন, সেগুলোর কৌশল শিখতেন এবং নিজের অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত করতেন। তাঁর দল এমন সব মানুষের কাছে ব্যালে নাচকে পৌঁছে দিয়েছিল, যারা এর আগে কখনো এই নাচ দেখেইনি। অনেক সময় তাঁদের সাধারণ বা অস্থায়ী মঞ্চেও নাচতে হতো। তিনি কেবল নাচের কৌশলই ছড়াননি, বরং নাচের ভেতরের আবেগ ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে মানুষের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন।

অধ্যায় ৯: ব্যক্তিগত জীবন, জনকল্যাণ এবং নির্বাসিত দিনগুলো
১৯১২ সালে পাভলোভা লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিনের ‘আইভি হাউস’-এ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এটি ছিল তাঁর স্বপ্নের বাড়ি, যার প্রাঙ্গণে একটি সুন্দর হ্রদ ছিল। সেখানে তিনি বেশ কিছু রাজহাঁস পুষতেন, যার মধ্যে একটির নাম ছিল ‘জ্যাক’। তিনি প্রাণীদের ভীষণ ভালোবাসতেন; তাঁর বাড়িতে কুকুর, বিড়াল ও নানা জাতের পাখি ছিল।

১৯১৪ সালে তিনি ভিক্টর দান্দ্রে-কে গোপনে বিয়ে করেন (কেউ কেউ অবশ্য বলেন তাঁদের সম্পর্ক আরও আগে থেকেই ছিল)। ভিক্টর তাঁর ক্যারিয়ারের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন এবং পরবর্তীতে আনার একটি জীবনীও লিখেছিলেন। এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না।

পাভলোভা মানবসেবায় দারুণ অবদান রেখেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি রাশিয়ার অনাথ শিশুদের পাশে দাঁড়ান। প্যারিসের সাঁ-ক্লু (Saint-Cloud) এলাকায় শরণার্থী মেয়েদের আশ্রয় ও পড়াশোনার জন্য তিনি নিজের খরচে একটি হোম বা আশ্রম গড়ে তোলেন।

জীবনের শেষ বছরগুলোতে শরীরের ওপর প্রচণ্ড ধকল যাওয়া সত্ত্বেও তিনি নাচ থামাননি। তিনি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন, যার মধ্যে ‘দ্য ডাইং সোয়ান’ (১৯Mj৫) এবং ‘দ্য ডাম্ব গার্ল অব পোর্টিসি’ (১৯১৫) উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল শিল্পী, যাঁর ব্যক্তিগত জাদুকরী ব্যক্তিত্ব বয়সের সাথে সাথে কমে আসা শারীরিক শক্তিকেও ঢেকে দিত।

অধ্যায় ১০: কীর্তি, মহাপ্রয়াণ এবং চিরন্তন রাজহাঁস – যেভাবে পাভলোভা বদলে দিলেন ব্যালে নাচের ইতিহাস
১৯৩০ সালের শেষের দিকে এক বিশ্ব সফরের সময় আনা প্যারিস থেকে দ্য হেগ (নেদারল্যান্ডস) যাওয়ার পথে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর নিউমোনিয়া থেকে ফুসফুসের মারাত্মক রোগ (Pleurisy) দেখা দেয়। ১৯৩১ সালের ২৩ জানুয়ারি, তাঁর ৫০তম জন্মদিনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে, দ্য হেগের ‘হোটেল ডেস ইনডেস’-এ এই মহিয়সী নারী শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ কথা ছিল: “আমার ‘সোয়ান’ (রাজহাঁস) পোশাকটি তৈরি রাখো।”

লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিন মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় এবং সেখানেই তাঁর চিতাভস্ম রাখা আছে। পরবর্তীতে তাঁর স্বামী ভিক্টর দান্দ্রে মারা গেলে তাঁকেও এর কাছাকাছি সমাহিত করা হয়।

ব্যালে জগতে পাভলোভার অবদান অতুলনীয়। তিনি ব্যালে নাচকে কেবল রাশিয়া বা ইউরোপের গণ্ডি থেকে বের করে একটি বৈশ্বিক শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি ফ্রেডরিক অ্যাশটন (যিনি ছোটবেলায় পেরুতে আনার নাচ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন), অ্যালিসিয়া মার্কোভা সহ অসংখ্য নৃত্যশিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। নাচে আবেগ ফুটিয়ে তোলা এবং তালের প্রতি তাঁর যে একনিষ্ঠতা ছিল, তা বিংশ শতাব্দীর ব্যালে নাচকে পুরোপুরি বদলে দেয়।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, একজন মানুষের যদি দূরদর্শিতা আর অক্লান্ত পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকে, তবে সে একাই পৃথিবীর সংস্কৃতির মানচিত্র বদলে দিতে পারে। ‘মুমূর্ষু রাজহাঁস’ হিসেবে পাভলোভার সেই রূপটি—যা একই সাথে নাজুক অথচ অমর—আজও ব্যালে নাচের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে আছে।

আজ তাঁর নাম কেবল চমৎকার নাচের কথাই মনে করিয়ে দেয় না, বরং এই বার্তাও দেয় যে শিল্প সমস্ত সীমান্ত, ভাষা এবং কষ্টকে জয় করতে পারে। আনা পাভলোভা শুধু ব্যালে নাচেননি; তিনি এই শিল্পকে মানবজাতির কাছে উপহার দিয়ে গেছেন।

মঞ্চে হয়তো সেই রাজহাঁসটি বারবার মারা গেছে, কিন্তু আনা পাভলোভার মুক্ত আত্মা আজও বিশ্বজুড়ে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়।

সেন্ট পিটার্সবার্গের সেই রোগা-পটকা ছোট্ট মেয়েটি থেকে তাঁর সময়ের—এবং হয়তো সর্বকালের—সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যালেরিনা হয়ে ওঠার এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের পরিবর্তন তারাই আনতে পারে, যারা পৃথিবীর অন্ধকারতম কোণেও আলোর মশাল বয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখায়।

Comment