কেন আমরা ব্যর্থ হই?

কেন আমরা ব্যর্থ হই?

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী বি.এফ. স্কিনার এর কথায় – “ব্যর্থতা সর্বদা কোনো ভুল নয়, এটি কেবল পরিস্থিতির অধীনে একজন মানুষের পক্ষে করা সর্বোত্তম কাজ হতে পারে।” এই উক্তিটি কেবল মনোবিজ্ঞানের একটি তত্ত্ব নয়, বরং এটি মানুষের জীবনসংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা এবং প্রচেষ্টার এক গভীর স্বীকৃতি। আমাদের সমাজে সাধারণত সাফল্যকে মেধার মাপকাঠি এবং ব্যর্থতাকে অযোগ্যতা বা ভুলের ফলাফল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু স্কিনারের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, ফলাফলের চেয়েও বড় সত্য হলো সেই মুহূর্তের পরিস্থিতি এবং সেই পরিস্থিতিতে একজন মানুষের সর্বোচ্চ সামর্থ্য।

পরিস্থিতির শক্তি এবং মানুষের সীমাবদ্ধতা

মানুষের প্রতিটি কাজ বা সিদ্ধান্ত শূন্য থেকে তৈরি হয় না। প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে থাকে নির্দিষ্ট কিছু পারিপার্শ্বিক কারণ, যা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Environmental Determinants’ হিসেবে পরিচিত। স্কিনারের মতে, একজন মানুষ যখন কোনো কাজে ব্যর্থ হয়, তখন আমরা দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই যে সে হয়তো যথেষ্ট পরিশ্রম করেনি অথবা সে ভুল পথে হেঁটেছে। কিন্তু আমরা গভীরে গিয়ে দেখি না যে, সেই মুহূর্তে তার কাছে যে সম্পদ, জ্ঞান এবং মানসিক শক্তি ছিল, তা দিয়ে সে তার সেরাটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

একজন শিক্ষার্থী একটি কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারল না। বাহ্যিকভাবে এটি একটি ব্যর্থতা। কিন্তু পর্দার আড়ালে হয়তো তার পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল, ছিল অসুস্থতা অথবা সঠিক নির্দেশনার অভাব। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও সে যেটুকু পড়াশোনা করেছে এবং পরীক্ষায় বসবার সাহস দেখিয়েছে, সেটিই হয়তো সেই পরিস্থিতিতে তার পক্ষে করা সম্ভব সবচেয়ে ভালো কাজ ছিল। এখানে ব্যর্থতাটি কোনো ভুল নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তার সামর্থ্যের শেষ সীমানা।

আচরণের বিজ্ঞান: কেন আমরা ব্যর্থ হই?

বি.এফ. স্কিনার ছিলেন আচরণবাদের (Behaviorism) পথিকৃৎ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের আচরণ মূলত তার পরিবেশের উদ্দীপক (Stimuli) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যখন কোনো ব্যক্তি একটি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে তার পরিবেশ তাকে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘রিইনফোর্সমেন্ট’ বা ইতিবাচক সহায়তা প্রদান করতে পারেনি।

আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় লজিক্যাল বা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। চাপের মুখে বা সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, সেটি সেই মুহূর্তের জন্য আমাদের কাছে সঠিক মনে হয়। পরে ফলাফল নেতিবাচক হলে আমরা সেটিকে ‘ভুল’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু স্কিনারের দর্শন অনুযায়ী, যদি একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং একই সীমাবদ্ধতা বজায় থাকে, তবে একজন মানুষের পক্ষে ভিন্ন কিছু করা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ, ব্যর্থতাটি পূর্বনির্ধারিত পরিস্থিতির একটি স্বাভাবিক পরিণতি মাত্র।

সমাজ এবং সাফল্যের ভ্রান্ত ধারণা

আধুনিক সমাজ সাফল্যের একটি নির্দিষ্ট ছক তৈরি করে দিয়েছে। এই ছকে যারা ফিট করে না, তাদের গায়ে ‘ব্যর্থ’ তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু স্কিনারের উক্তিটি এই সামাজিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। সাফল্য সবসময় ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; এটি সুযোগের সমবণ্টন এবং অনুকূল পরিবেশের ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল।

যখন আমরা কাউকে ব্যর্থ বলি, তখন আমরা পরোক্ষভাবে তাকেই সমস্ত দায়ভার দিয়ে দিই। এটি একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু যদি আমরা মেনে নিই যে, পরিস্থিতির কারণে এটিই তার সেরা চেষ্টা ছিল, তবে সহমর্মিতার জায়গা তৈরি হয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়, বরং কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

বিবর্তন এবং অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যর্থতা

বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ব্যর্থতা আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিখন প্রক্রিয়া। তবে এই শিখনটি তখনই কার্যকর হয় যখন আমরা বুঝতে পারি যে ব্যর্থতাটি আমাদের ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল ছিল না। অনেক সময় আমরা কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা ব্যবসায়িক উদ্যোগে ব্যর্থ হই। যদি সেই ব্যর্থতাটি সমস্ত নিয়ম মেনে কাজ করার পরেও আসে, তবে সেটিকে ভুল বলা যায় না। এটি আসলে প্রকৃতির বা পরিস্থিতির একটি সংকেত যে—এই পথে ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়।

একজন বিজ্ঞানী যখন ল্যাবরেটরিতে হাজার বার চেষ্টা করেও কোনো সূত্র আবিষ্কার করতে পারেন না, তখন প্রতিটি ব্যর্থ চেষ্টা আসলে তার সেই পরিস্থিতির অধীনে সেরা প্রচেষ্টা। থমাস আলভা এডিসনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক—তিনি বলেছিলেন যে তিনি ব্যর্থ হননি, বরং ১০,০০০টি উপায় খুঁজে বের করেছেন যা কাজ করে না। স্কিনারের দর্শন এডিসনের এই মানসিকতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এটি বলে যে, ওই প্রতিটি প্রচেষ্টাই ছিল সেই মুহূর্তের জন্য সঠিক, কারণ ওই সময়ের জ্ঞানের পরিধি অনুযায়ী বিজ্ঞানী এর চেয়ে ভালো আর কিছু করতে পারতেন না।

কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি

বর্তমান করপোরেট বিশ্বে ব্যর্থতাকে একটি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু স্কিনারের এই উক্তিটি যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ধারণ করে, তবে সেখানে উদ্ভাবনের পথ প্রশস্ত হয়। একজন কর্মী যখন জানেন যে তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পর ফলাফল আশানুরূপ না হলেও তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হবে না, তখন তিনি ঝুঁকি নিতে সাহস পান।

অনেক সময় বাজারের মন্দা, কাঁচামালের অভাব বা আকস্মিক কোনো সংকটের কারণে একটি প্রকল্প ব্যর্থ হতে পারে। একজন ব্যবস্থাপক যদি কেবল চূড়ান্ত ফলাফল দেখেন, তবে তিনি সেই কর্মীকে অযোগ্য মনে করবেন। কিন্তু স্কিনারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, সেই সংকটের মধ্যে কর্মীটি যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, সেটিই হয়তো ছিল শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা। পরিস্থিতির এই স্বীকৃতি কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করে এবং তাদের পুনরায় চেষ্টা করতে উৎসাহিত করে।

আত্ম-সমালোচনা বনাম আত্ম-উপলব্ধি

মানুষ নিজের প্রতি সবচেয়ে কঠোর বিচারক হয়। আমরা যখন কোনো কাজে সফল হতে পারি না, তখন নিজেদের অপরাধী ভাবি, হীনম্মন্যতায় ভুগি। আমরা ভাবি, “আমি যদি আরও একটু চেষ্টা করতাম” অথবা “আমি কেন এই ভুলটি করলাম?” কিন্তু বি.এফ. স্কিনার আমাদের এই আত্ম-গ্লানি থেকে মুক্তি দেওয়ার একটি পথ দেখিয়েছেন।

আমাদের বুঝতে হবে যে, অতীত বর্তমানে দাঁড়িয়ে বিচার করা সহজ (Hindsight Bias)। কিন্তু যখন আমরা সেই পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম, তখন আমাদের কাছে ভবিষ্যতের কোনো তথ্য ছিল না। আমাদের হাতে থাকা সীমিত রসদ এবং সেই সময়ের মানসিক অবস্থা অনুযায়ী আমরা যা করেছি, তা-ই ছিল আমাদের ‘বেস্ট’। এই উপলব্ধি মানুষের মানসিক প্রশান্তির জন্য অপরিহার্য। এটি আমাদের শেখায় যে ব্যর্থতা মানেই আমাদের সত্তার অবমূল্যায়ন নয়।

পরিস্থিতির পরিবর্তনই কি সমাধানের পথ?

যেহেতু স্কিনার বিশ্বাস করতেন যে আচরণ পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তাই ব্যর্থতা এড়ানোর উপায় কেবল ব্যক্তিকে দোষারোপ করা নয়, বরং পরিবেশের পরিবর্তন ঘটানো। যদি কোনো ব্যক্তি বারবার একই ধরণের পরিস্থিতিতে ব্যর্থ হয়, তবে বুঝতে হবে তার পরিবেশ বা ‘সিস্টেম’-এ কোনো ত্রুটি আছে।

একটি চারাগাছ যদি পর্যাপ্ত আলো এবং জলের অভাবে মারা যায়, তবে কি আমরা গাছটিকে দোষ দিই? অবশ্যই না। আমরা বলি যে পরিবেশটি চারাগাছটির জন্য অনুকূল ছিল না। মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি শিক্ষা ব্যবস্থা বা সামাজিক কাঠামো একজন ব্যক্তিকে তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ না দেয়, তবে তার ব্যর্থতা আসলে সমাজের বা কাঠামোর ব্যর্থতা। ব্যক্তি সেখানে কেবল পরিস্থিতির শিকার।

ব্যর্থতা এবং মানুষের মর্যাদা

ব্যর্থতাকে যখন আমরা ভুল হিসেবে না দেখে পরিস্থিতির ফসল হিসেবে দেখি, তখন মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। এটি আমাদের শেখায় যে প্রত্যেক মানুষের সংগ্রাম আলাদা। অন্যের চোখে যা ব্যর্থতা, সেই ব্যক্তির নিজের কাছে সেটি হয়তো এক বিশাল যুদ্ধের গল্প। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে না পারা মানেই আরোহণকারীর অযোগ্যতা নয়; হয়তো মাঝপথে এমন ঝড় এসেছিল যা উপেক্ষা করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে ছিল। সেই ঝড়ের মধ্যেও যে সে টিকে ছিল এবং ফিরে এসেছে, সেটিই তার চরম সার্থকতা।

বি.এফ. স্কিনারের এই দর্শন একটি মানবিক পৃথিবী গড়ার ডাক দেয়। এটি আমাদের অন্যের প্রতি আরও দয়ালু এবং বিচারহীন হতে শেখায়। আমরা যখন কাউকে বিচার করি, তখন আমরা কেবল তার শেষ ফলাফলটি দেখি। কিন্তু যদি আমরা তার প্রেক্ষাপট, তার সীমাবদ্ধতা এবং তার জীবনযুদ্ধের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে সে আসলে তার সাধ্যমতো সেরা লড়াইটাই লড়েছে।

বি.এফ. স্কিনারের উক্তিটি জীবনের একটি গভীর সত্যকে প্রতিফলিত করে। ব্যর্থতা জীবনের শেষ কথা নয়, এমনকি এটি সবসময় আমাদের ত্রুটিও নয়। অনেক সময় এটি কেবল একটি বাস্তবতা যে, আমরা একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়েও জয়ী হতে পারিনি। কিন্তু সেই ‘সেরাটা দেওয়া’র মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত বীরত্ব।

সাফল্য এবং ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা প্রচেষ্টাকে সম্মান করতে শিখি, তবে মানুষের জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, আমরা সবাই নিজের নিজের পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করছি। কখনো সেই পরিস্থিতিতে আমরা বিজয়ী হই, কখনো হই না। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের প্রচেষ্টাটি থাকে অকৃত্রিম। ব্যর্থতাকে ভুলের তকমা না দিয়ে পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা হিসেবে গ্রহণ করাই হলো জীবনকে দেখার সবচেয়ে পরিপক্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যর্থতা কোনো গ্লানি নয়। এটি কেবল একটি সংকেত যে পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে ছিল না। স্কিনারের এই দর্শন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় যে, হার মেনে নেওয়া বা হেরে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রতিকূলতার মাঝে টিকে থাকার চেষ্টাটাই হলো মানুষের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

“A failure is not always a mistake, it may simply be the best one can do under the circumstances.” – B.F. Skinner

লেখক – মাধব রায়

Comment