দুই পৃথিবী

এক শনিবারের অলস দুপুর। সূর্যের নরম মিহির আলোর ওম যেন আঙ্গুল বুলিয়ে দিচ্ছিল শহরের উপর। সেই আলো গায়ে মেখে আমার মনেও এক ধরনের অচেনা উষ্ণতা জমে উঠেছিল – নিস্তব্ধ আর নির্মল। শীতের আমেজ আর সোনালী রোদ্দুর মন কেমন করা সব চিন্তা বয়ে আনছিল।

বিদ্যালয় ছুটির পর প্রায় জনশূন্য পথ ধরে হেলতে দুলতে এসে পৌঁছালাম আমার প্রিয় লাল নীল ম্যাজিক গাড়ি গুলোর সামনে। যাত্রী নেই। শুধু আমি, আমার ব্যাগ আর সযত্নে লালিত আমার কিছু ভাবনা।

গাড়ি নরম সিটে বসে জানালার বাইরে তাকাতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ভর করল। কানে ইয়ারফোন গুঁজে দিলাম। বিঠোভেনের গভীর সুর আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবেগঘন দার্শনিক মেজাজ মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ভালোলাগার সৃষ্টি করতে লাগলো। নরম, মায়াভরা, দূর অতীতের স্মৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল এই পৃথিবীর অনেক উপরে যে আকাশ আছে সেখানে পাখির মত উড়ে বেড়াচ্ছি আমি। দুঃখ নেই, ব্যাথা নেই। কেবল শান্তি আর আনন্দের অনুভব।

কোন তাড়া নেই, টেনশন নেই, দায়িত্ব নেই। বাইরে জগৎ ছুটে চলেছে। হাত থেকে বেশ কিছুটা সময় বাঁচিয়ে আমি নিজের সঙ্গে নিজে বসে ছিলাম। শীতের সূক্ষ্ম ঠান্ডা আর রোদ্দুরের স্নিগ্ধ উষ্ণতায় স্নাত আমার মন এক অদ্ভুত বিষণ্নতা আর আনন্দে ভরে উঠেছিল।

“এই ড্রাইভার বালিঘাট যাবে?”

ড্রাইভারের হ্যাঁ উত্তর শুনে গাড়িতে চটপট উঠে বসলেন বিগত যৌবনা, স্থূলকায়া দুই মহিলা। গাড়িটা বেশ দুলে উঠলো। আমার মন কেমন করা অলস ভাবনায় ছেদ পড়ল। প্রায় পঞ্চাশ উত্তীর্ণা দুই মহিলারই ছিল ধনাঢ্য সাজসজ্জা। চড়া মেকআপে তাঁদের কুঞ্চিত চামড়ার সকল বলিরেখা লুকিয়ে পড়েছিল। লিপস্টিক রঞ্জিত ঠোঁটে তীক্ষ্ণ ইংরেজি উচ্চারণ, চোখে ধোঁয়াটে আইলাইনার, অনামিকায় হীরকখচিত স্বর্ণাঙ্গুরীয়, গলায় আর কানে ভারী সোনার গহনা। তাঁদের উগ্র পারফিউমের গন্ধে গাড়ির ভিতরকার স্তব্ধ বাতাস স্পন্দিত হচ্ছিল। সুন্দর নেল আর্ট উজ্জ্বল করে রেখেছিল তাঁদের নখ। মাখনের মত কোমল শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল আভিজাত্যের বর্ণময় আলো।

তাঁদের কথার সিংহভাগ জুড়ে ছিল তাদের ছেলেমেয়েদের কথা। কেউ আমেরিকায় সেটেল্ড, কেউ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নিয়ে ব্যস্ত, কেউ পোল্যান্ডে গবেষণা করছে, কেউবা আবার ইংল্যান্ডে ডাক্তারি পড়তে গেছে। স্বদেশে কেউ ফিরবে না। তাঁদের ঝকঝকে সাদা দাঁতের হাসি বুঝিয়ে দিচ্ছিল মা হিসেবে তাঁরা কতটা গর্বিত ও আনন্দিত।

আমি চুপচাপ শুনছিলাম। মানুষের শো অফ করার বাসনা যত পুরানো তত নতুন। ওঁদের হাসিগুলি কী মার্জিত, ভারী, পরিমিত! যেন সাজানো। কথাবার্তায় এক নিখুঁত দম্ভ। পৃথিবীর মাটি থেকে বহু উঁচুতে অবস্থিত কোন স্বপ্নের দেশের বাসিন্দা এঁরা। ওঁদের কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম কেবল আমার নিঃশ্বাসের শব্দ।

প্রায় আধঘন্টা কেটে গেছিল। বিরক্তির অনুভবে ঘন ঘন পড়ছিল তাদের সুগন্ধিত দীর্ঘশ্বাস।

হঠাৎ করে একটি ক্ষীণ, কালো হাত আমার চোখের সামনে এসে থামলো। অপরিষ্কার হাতটিতে প্রচুর কাটা দাগ। আমি চমকে উঠলাম। চোখ তুলে দেখি হাড় বেরিয়ে আসা, খালি গা, চুলে জট, মুখে ধুলোর আস্তরণ মাখা একটি শিশু হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইছে। তার বড় বড় দুটি বিস্মিত আর কৌতূহলী চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি ওর পিছনে আরো কিছু বাচ্চা আর তিনজন মহিলা।

“ও দিদি, দুটো পয়সা দেনা রে, বাচ্চাগুলা কিছু খায় নাই তিনদিন ধরে। ও দিদি ….ও দিদি….”

মহিলার মুখ পুড়ে যাওয়া কাগজের মত। চোখে অসহ্য ক্লান্তি। শুকনো ঠোঁট আর কালো ছোপ ধরা হলুদ দাঁত আমায় অন্যমনস্ক করছিল। আমায় বুঝিয়ে দিচ্ছিল তাঁদের জীবনের চরম বেদনা আর দারিদ্র্যের কথা। তাঁর কণ্ঠে ভিক্ষা নয়, বিনয় নয়। শুধু বেঁচে থাকার আদিম প্রার্থনা ধ্বনিত হচ্ছিল।

বাচ্চাগুলো পিছন থেকে ম্যাজিক গাড়ি গুলোর সামনে এগিয়ে আসছিল। পথচলা মানুষের কাছে পরম মমতায় তুলে দিতে চাইছিল ওঁদের দারিদ্র্যের কাঠগোলাপ। বিনিময়ে চাইছিল বেঁচে থাকার জন্য দুটো পয়সা।

“এইজন্যই আমি গাড়ি নিয়ে বেরোতে চাই জানো তো মল্লিকা। এসব ডিসগাস্টিং। আমার ড্রাইভারের কয়েকদিন ধরেই বেশ জ্বর।”

” রিতাদি watch your earrings. They may snatch it. Dangerous. আরেকটু দেখি দাঁড়াও অপেক্ষা করে।”

চরম অস্বস্তি আর বিরক্তিতে ওরা দুজনে কানে ইয়ারফোন গুজলেন।

আমি ব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকা বার করে মহিলার হাতে দিলাম। অনুভব করলাম এই টাকা দিয়ে কি ওঁদের দারিদ্র্যের হিম গলবে ? টিকে থাকাটাই যাঁদের প্রতিদিনকার লড়াই ৫০ টাকা তাদের কি আর করবে ?

আমার চোখের সামনে দুই পৃথিবী। একদিকে সাজসজ্জা আর আভিজাত্যের ভারে নুইয়ে পড়া দুই নারী, অন্যদিকে ক্ষুধা, ক্লান্তি আর দারিদ্রে জর্জরিত মায়েরা আর শিশুরা। এ আমার ভারতবর্ষের প্রকৃত চিত্র।

গাড়ি ছাড়ছিল না। অসহ্য লাগাতে দুই মহিলা গা ঝাড়া দিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। তাঁদের উগ্র পারফিউমের গন্ধ টুকু গাড়িতে থেকে গেল।

তিনটি শিশু কয়েক পা দৌড়ে এলো। তারপর থেমে গেল। তাদের ছোট্ট শরীর গুলো রোদে ঝলক দিয়ে উঠছিল। কিন্তু জীবন ওদের ছায়া দেয়না। ওরা কেবল দারিদ্র নামক শীতের কামড় খায়। আমি ভাবছিলাম আমি যা দেখছি ততটা কি আমি অনুভব করতে পারছি ? হারিয়ে গেল আমার বিঠোভেন আর রবীন্দ্রনাথ। ওঁদের বিস্বাদ লাগছিল। ক্ষুধার সামনে সুর সাহিত্য সব অর্থহীন মনে হয়। দারিদ্র্যের অভিশাপ নষ্ট করে দেয় জীবনের মহৎ দর্শন।

বেশ কিছুক্ষণ পর যাত্রী পূর্ণ গাড়িটা চলতে আরম্ভ করলো। আমি চেয়ে রইলাম ওদের দিকে। মনে হল পৃথিবীতে ওঁরা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওঁদের প্রশ্ন আর ক্লান্তি ভরা চোখ আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। প্রতিদিনকার এই চরম বাস্তব আমরা উপেক্ষা করে যাই। দশ-কুড়ি টাকা দিয়েই সন্তুষ্ট থাকি আর ভুলে থাকি ওঁদের প্রতি আমাদের মানবিক কর্তব্য আর দায়বদ্ধতাকে। মনুষ্যত্বের কাঠগড়ায় আমরা মারাত্মক অপরাধী।

সেই ছোট্ট শূন্য হাতটা, কাতর চোখগুলো আমার কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নেয়নি। তাঁরা নিয়েছে আমার ভিতরের শান্তি আর আরামের অনুভবকে। সেই ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা আমাকে বুঝিয়েছে হিউম্যান রিসোর্সের উন্নতি কতটা প্রহসন। তাঁরা দিয়ে গেছে আমাকে গভীর প্রশ্ন – আমরা সত্যিই কি মানুষ হয়ে উঠেছি ? নাকি মানুষ মানুষ সাজছি ?

Bhaswati Deb Roy

ভাস্বতী দেব রায়

Comment