বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র উপেন্দ্রকিশোর
বিধান চন্দ্র সান্যাল
————ভূমিকা :- শিশুসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ, বাংলা ছাপাখানার অগ্রপথিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক চিত্রকর, প্রকাশক, শখের জ্যোতির্বিদ, বেহালাবাদক ও সুরকার।বিখ্যাত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তাঁর ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীকে “বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসা, শৈল্পিক উদ্ভাবন এবং শিল্প ও সাহিত্যের সেরা সমন্বয়” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ‘বাঙালি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি’-প্রবাদের মতো উচ্চারিত কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। শুনতে শুনতে মনে হয়, বাঙালির জন্য বিস্মৃতি কোনো দোষ নয়, বরং মহিমান্বিত করার মতো বিশেষ ব্যাপার। আদতে বাঙালি বুঝতেই পারে না তার ইতিহাস, আদর্শ ও ভবিষ্যতকে। কিন্তু ফাঁপা গর্বের বিরাট বোঝা কাঁধে নিয়ে বাঙালি বরাবরই আনন্দে উচ্ছ্বসিত থাকে। কে তাকে ধরিয়ে দেবে, বিশ্ব-ইতিহাসের বিশাল সভায় তার আসনটি অত্যন্ত দুর্বল।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীকে স্মরণ করতে গিয়ে এই কথাগুলো মনে এলো। কারণ অসম্ভব প্রতিভাধর বহুপ্রান্তস্পর্শী এই ব্যক্তিত্বকে আমরা হৃদয় ও মস্তিষ্ক দিয়ে মনে রাখিনি। একজন সৃষ্টিশীল লেখক, চিত্রকর, সম্পাদক কিংবা পুস্তক বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি। প্রয়োজনীয় আলো ফেলে দেখা হয়নি বাঙালির সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণে তার ভূমিকাকে।
জন্ম ও পরিচয় :-উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ১৮৬৩ সালের ১০ মে ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া গ্রামে জম্মগ্রহণ করেন যা অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। উপেন্দ্রকিশোরের পৈত্রিক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। তিনি ছিলেন তার পিতা মাতার আট সন্তানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসন্তান। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে নিসন্তান আত্মীয় জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। উপেন্দ্রকিশোরের বাবা কালীনাথ রায় চৌধুরী। কালীনাথ রায় চৌধুরী ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ ও পণ্ডিত। তিনি আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতে সুপণ্ডিত ছিলেন। মেধাবী ছাত্র বলে পড়াশোনায় ভাল ফল করলেও ছোটোবেলা থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের পড়াশোনার থেকে বেশি অনুরাগ ছিল বাঁশী, বেহালা ও সঙ্গীতের প্রতি। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে উপেন্দ্রকিশোর প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। তারপর কলকাতায় এসে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। স্কুল জীবনেই তিনি চিত্রাঙ্কনে দক্ষতা অর্জন করেন। তরুণ বয়সেই উপেন্দ্রকিশোরের সাহিত্যচর্চায় হাতেখড়ি ঘটে এবং তৎকালীন শিশুকিশোর পত্রিকা সখা, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত বালক, সখা ও সাথী, মুকুল ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৮৩ সালে ছাত্রাবস্থায় সখা পত্রিকায় তাঁর প্রথম রচনা প্রকাশিত হয়। তাঁর সমগ্র জীবনেই তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন।
শিশু সাহিত্যিক হিসেবে অবদান :-উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা শিশুসাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় নাম, যিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা, ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর মতো ক্লাসিক গল্প ও ‘ছেলেদের রামায়ণ’-এর মতো অনুবাদ-সৃজনের মাধ্যমে শিশুদের জন্য একটি স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করেন; তিনি কেবল লেখকই ছিলেন না, চিত্রশিল্পী ও মুদ্রণশিল্পী হিসেবেও আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যকে উন্নত মানের ছবি ও প্রকাশনার মাধ্যমে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন, যা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।
তাঁর প্রধান অবদানসমূহ:—
‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠা: ১৯১৩ সালে তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকা শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে সুকুমার রায় ও সত্যজিৎ রায় সম্পাদনা করেন এবং এটি বাংলা শিশুসাহিত্যের এক প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
মৌলিক ও অনুবাদ সাহিত্য: তিনি ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘ছেলেরা রামায়ণ’, ‘ছেলেরা মহাভারত’ ইত্যাদি লিখেছেন ও অনুবাদ করেছেন, যা শিশুদের কাছে গল্প ও জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছে।
বিজ্ঞান ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান: তিনি ‘আকাশের কথা’ ও ‘সেকালের কথা’-র মতো বই লিখে শিশুদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলেছেন, যা তাঁর বন্ধু জগদীশ চন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রভাবে রচিত।
সঙ্গীত ও শিক্ষা: ‘সহজ বেহালা শিক্ষা’ ও ‘শিখাবার রীতিতে হারমোনিয়াম’-এর মতো বই লিখে সঙ্গীত শিক্ষার পথও সহজ করেছেন।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা শিশুসাহিত্যকে শুধুমাত্র মনোরঞ্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও নৈতিকতার এক সমৃদ্ধ ভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যার প্রভাব আজও বিদ্যমান।
সঙ্গীত ও মুদ্রণে অবদান :-উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সঙ্গীত ও মুদ্রণ উভয় ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন; তিনি বেহালা ও বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী ছিলেন এবং সঙ্গীত বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতেন, অন্যদিকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত “ইউ. রে অ্যান্ড সন্স” ছাপাখানা আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তির প্রবর্তক ছিল, বিশেষত হাফ-টোন ব্লক তৈরির উদ্ভাবন এবং ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রকাশ করে বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনা জগতে বিপ্লব আনেন, যা পরবর্তী প্রজন্মকে (সুকুমার ও সত্যজিৎ রায়) প্রভাবিত করে।
বহুমুখী প্রতিভা :-উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, যিনি শিশুসাহিত্যিক, চিত্রকর, প্রকাশক, মুদ্রণশিল্পী, সুরকার, ও শখের জ্যোতির্বিদ হিসেবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখেন, বিশেষত ‘সন্দেশ’ পত্রিকার মাধ্যমে এবং উন্নত ছাপাখানা ও হাফটোন প্রযুক্তি প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলা প্রকাশনা শিল্পকে আধুনিকীকরণে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। সংক্ষেপে, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন বাংলা সাহিত্য, শিল্প, ও প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর সংমিশ্রণ, যা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়।
মৃত্যু :- বিখ্যাত বাঙালি শিশুসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও প্রকাশক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ১৯১৫ সালের ২০শে ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
উপসংহার :- আজকের দিনেও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম, কারণ তিনি কেবল বাংলা শিশুসাহিত্যের জনক নন, বরং ছাপাখানা ও মুদ্রণ প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন এবং তাঁর সৃষ্ট ‘সন্দেশ’ পত্রিকা ও তাঁর পরিবার (সুকুমার, সত্যজিৎ) বাংলা সংস্কৃতিতে আজও গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, যা আধুনিক বাংলা সাহিত্য, শিল্প ও প্রকাশনাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার প্রসারে সাহায্য করেছে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী শুধু অতীতের এক ব্যক্তিত্ব নন, বরং সাহিত্য, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে তিনি আজও সমান প্রাসঙ্গিক এবং নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করে চলেছেন।
—————
Bidhan Chandra Sanyal
