আলোর দিশারী স্বামী বিবেকানন্দ
———————————————
বিধান চন্দ্র সান্যাল
——————————————–
” তুমি বলেছিলে, জীবে প্রেম করে যেই জন
সেই জন সেবিছে ঈশ্বর
কাউকে বলোনি, তোরা নীচু জাত
যা- যা দূরে যা , ইস্ সর্ ”
—– ভবানীপ্রসাদ মজুমদার
ভূমিকা:–
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ভারত ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছিল, ঠিক তখনই এক যুগপ্রবর্তক মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে—তিনি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি কেবল একজন সন্ন্যাসী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ভারতের সুপ্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলার কারিগর, এক ‘পরিত্রাতা’ যিনি ভারতকে বিশ্ব দরবারে এক নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন:—
জন্ম:– ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে নরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম হয়।
শিক্ষা ও দর্শন:– তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসে আধ্যাত্মিক পথে চালিত হন। তিনি মনে করতেন শিক্ষা কেবল তথ্য নয়, বরং তা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ ঘটাবে।
বিশ্ব দরবারে ভারতের মুখ:-
১৮৯৩ সালে শিকাগোর বিশ্ব ধর্ম সংসদে তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা “আমেরিকার ভগিনী ও ভ্রাতৃগণ” বিশ্বকে মুগ্ধ করে। তিনি হিন্দুধর্মের মহত্ত্ব, সর্বজনীনতা এবং ‘সকলকে ভালোবাসা’র বার্তা দেন, যা ভারতকে এক নতুন আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
মূল দর্শন ও কর্ম:—
‘ জীবসেবা পরব্রহ্মসেবা’:– তিনি মনে করতেন, দরিদ্র ও পীড়িত মানুষের সেবা করাই ঈশ্বরের সেবা। এর জন্য তিনি রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
জাতীয়তাবাদ ও যুবশক্তি: — যুবকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর মতে, “তোমরা উঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।”
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে:– তিনি জাতিভেদ প্রথা এবং সমাজের অন্যান্য কুসংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করেন, নারীর অধিকার ও শিক্ষার পক্ষে সওয়াল করেন।
পরিত্রাতা বিবেকানন্দ:—
তিনি ভারতকে শুধু আধ্যাত্মিকভাবে নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক ভারত, যা আত্মনির্ভরশীল, শক্তিশালী এবং বিশ্বকে পথ দেখাতে সক্ষম। তাঁর কর্ম ও বাণী আজও কোটি কোটি ভারতীয়কে পথ দেখায়।
সাহিত্যচেতনা:–
স্বামী বিবেকানন্দ মূলত বক্তা ও আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পরিচিত হলেও, তিনি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই একজন প্রতিভাধর লেখক ও কবি ছিলেন, যিনি তাঁর দর্শন ও আধ্যাত্মিকতাকে কবিতা ও গদ্যের মাধ্যমে সহজ ও শিল্পসম্মতভাবে প্রকাশ করেছেন, যেখানে মানবতাবাদ, অদ্বৈত বেদান্ত, এবং ভারতীয় সংস্কৃতির গভীরতা ফুটে উঠেছে, তাঁর লেখাগুলিতে “রাজা যোগ”, “বর্তমান ভারত” এবং বিভিন্ন কবিতা যেমন “সন্ন্যাসীর গান” উল্লেখযোগ্য।
উপসংহার:–
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন এক মহাযুগপুরুষ, যিনি ভারতের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁর আদর্শ, তাঁর দর্শন ও তাঁর কর্ম তাঁকে ‘পরিত্রাতা’ উপাধির যোগ্য করে তুলেছে। তিনি আজও আমাদের প্রেরণা, আমাদের পথপ্রদর্শক।
