গল্প বিক্রি আছে
চৈতন্য দাশ
ভোর সাড়ে চারটা-পাঁচটা হবে। কুলতলা গ্রামের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো, আধা-পাকা বাড়িটার ভেতর নীলিমা বসে আছে। বাড়ির সদর দরজার ডানদিকের জানলার সঙ্গে মুদিখানার দোকান। ঘরের জানলাটাই এখন দোকানের মুখ। জানলাটা বেশ বড় থাকায় বাইরের বেঞ্চে বসে দোকানটা পরিষ্কার চোখে আসে। কাস্টমারদের বসার জন্য তিনখানা ছোট ছোট বেঞ্চ সামনে সেট করা আছে।
বাড়ির সেই দোকানঘরের ডানদিকে আর একটা বড় জানলা রয়েছে। কাঁচা মেঝের মাটি ছোঁয়া সেই জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরের আবছা অন্ধকারে তাকিয়ে রয়েছে। তার কপালে চিন্তার বলিরেখা। মুখের অভিব্যক্তিতে নিঃসঙ্গতার প্রতিবিম্ব স্পষ্ট। দৃষ্টির গভীরতায় সব হারানোর শূন্যতা।
কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে সূর্যের কমলা হাসিতে পুবের আকাশ উথলে উঠল। কমলা হাসি-আভায় পুরো দিগন্ত নৈসর্গিক সৌন্দর্যে আপ্লুত।
বছর পঁয়ত্রিশ আগেকার এক সন্ধ্যায়, এই বাড়ির উঠোনে তার পা পড়েছিল। সে গরিব ঘরের মেয়ে হলেও যথেষ্ট সুন্দরী। বিয়ের আগে কমপক্ষে দুই ডজন পাত্র তাকে দেখতে এসেছে। অনেকেরই পছন্দ হয়েছে, কিন্তু তার বাবা পণের টাকা জোগাড় করতে না পারায় পাত্রপক্ষের পছন্দ অপছন্দের পর্যায়ে রয়ে গেছে…
শেষ পাত্র নীলু বিনা পণে রাজি হতেই বিয়েটা হয়ে যায়। নীলু তখন বয়সে চুয়াল্লিশ ছুঁই ছুঁই। গায়ে রোদে পোড়া তামাটে রং। হাতে-পায়ে পরিশ্রমের চিহ্ন। চোখে ক্লান্তি। বিপরীতে নীলিমার বয়স তেইশ। যথেষ্ট সুন্দরী। এমন একটি বুঝদার মেয়ে নীলুকে কী করে পছন্দ করল, সেটা ভাববার বিষয়…
আসলে কিছু মানুষের দু-পাঁচটা ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও তাকে শিক্ষিত বলতে কোথায় যেন আটকায়। কারণ হিসেবে বলতে হয়, তাদের মধ্যে ভালো-মন্দ বোধটাই থাকে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে ভালো-মন্দের জট থেকে তারা ভালোটাকে আলাদা করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু নীলিমা সামান্য উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করলেও তার চিন্তাভাবনা উন্নত, উর্বর, পরিশীলিত। তাই সে নীলুর বয়স ও বাইরের চাকচিক্য দেখে বিচার করেনি। নীলুর সঙ্গে দু-চার কথা বলেই বুঝতে পেরেছিল, মানুষটি একজন প্রকৃত মানুষ। চেষ্টা করলে অনেকেই শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু সকলে হাজার চেষ্টা করলেও সুশিক্ষিত মানুষ হতে পারে না…
সুতরাং নীলুর মতো মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়াটা নীলিমার দূরদর্শিতার পরিচয় বইকী।
নীলু পাঁচ বোনের দাদা-ভাই। বাবা-মা বেঁচে থাকতে তাদের সামান্য দুই বিঘে জমি দু-বারে বিক্রি করে বড় দুই বোনের বিয়ে দিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর, সে কঠোর পরিশ্রম করে টাকা-পয়সা রোজগার করে তিলে তিলে কিছুটা জমিয়ে বাকিটা ধারদেনা করে ছোট তিন বোনের বিয়ে দিয়েছে। প্রত্যেকটা বোনকে ভালো সম্ভ্রান্ত পরিবারে পাত্রস্থ করেছে। কোনও বোনের পরিবারে অভাব-অনটন নেই।
একটা বছর এসেছে, একটা বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। পরের বছর আসতে আসতে আবার চিন্তা, অনেক টেনশন, পরেরটার বিয়ের ব্যবস্থা করা। তার জন্য অর্থ জমানো। সুতরাং কঠোর পরিশ্রম। গায়ের রক্ত জল করে বোনদের ভালো ঘরে বিয়ের ব্যবস্থা করা, নিজে খেয়ে-না খেয়ে বোনদের কথা ভাবা…এটা নীলুর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এমন দাদা, এমন ভাই, ক-জনের মেলে। বিয়ের খরচাপাতির বাইরেও ছোটবোনদের পোশাক আশাক, সাজগোজের জিনিস কিনে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নীলু কখনো কার্পণ্য করেনি। তাদের সব রকম সখ-আহ্লাদ চাহিদা পূরণ করেছে।
বোনদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চিন্তায় নিজের বিয়ে, নিজের সুখ-সংসারের কথা কখনো ভাবেনি। বোনগুলোকে ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়াটা ছিল তার কর্তব্য, আর নিজের জীবন যেন একটা দায়িত্ব পূরণের খাতায় উৎসর্গীকৃত নাম।
সব কটা বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, চুয়াল্লিশের কোঠায় এসে নিজে বিয়ে করে। বিয়ের পর বাড়ির ভেতরেই সদর দরজার ডান দিকের জানলা লাগোয়া ছোট্ট মুদিখানার দোকান খুলেছিল। পাড়ার ভেতরের রাস্তার মোড়ের কাছেই বাড়িটা, সেজন্য বাড়ির ভেতরে দোকান হলেও টুকটাক চলত।
ধীরে ধীরে সংসার বড় হয়। পরপর দুই ছেলে-মেয়ে, অরূপ ও রূপা। ছেলেমেয়েসহ চারজনের সংসার চালিয়ে যা বেঁচেছে, একটু একটু করে জমিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে দুই বিঘে ধানিজমি কিনেছিল। নীলিমা জানত, সে জমির প্রতিটি কুচো মাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার স্বামীর ঘাম-রক্ত। অনেক সংগ্রাম, ঝড়ঝাপটার পর দোকানটা চালু হওয়া থেকে একটু সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিল।
দুই
সময় বদলেছে। বোনদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে ওঠে। নতুন নতুন দাবি ওঠে। নীলু নিজের ছেলেমেয়ের প্রয়োজনের কথা না ভেবে বোনের ছেলেমেয়েদের কথা ভেবেছে। তাদের চাহিদা সাধ্যমতো পূরণ করেছে। সে একবারও ভাবেনি, তার বোনদের যা আর্থিক অবস্থা তাতে করে নীলুকে তুড়ি মেরে কিনতে পারে। তাদের অর্থশক্তি, জীবনযাত্রার কাছে নীলু ভিখিরিতুল্য। তবুও বোনগুলো ও তাদের ছেলেমেয়েদের চাহিদার শেষ নেই। তাদের কাছে নীলু যেন টাকা যোগান করার মেশিন। যখন যা চাইবে, পেয়ে যাবে সহজেই…
এখানেই শেষ নয়… একদিন আচমকা পাঁচ বোন একত্রে এসে হাজির হয়। তারা নীলুর নিজের পরিশ্রমের অর্থে কেনা দুই বিঘে ধানিজমির প্রসঙ্গ তোলে। কথার মারপ্যাঁচে তারা বলে, “ওটা তো বাবার জমি ছিল। সুতরাং পৈত্রিক সম্পত্তিতে আমাদেরও ভাগ আছে।”
বোনদের কথা শুনে নীলু অবাক হয়ে বড় দুই বোনের উদ্দেশ্যে বলে, “তোদের বিয়ে দেওয়ার পর খেয়ে-না খেয়ে পয়সা জমিয়ে অরূপ ও রূপার ভবিষ্যতের কথা ভেবে সামান্য জমিটুকু কিনেছি। তোরা ভালো করেই জানিস, বাবার যেটুকু জমি ছিল বিক্রি করে আগে তোদের দু-জনের বিয়ে দিয়েছি, তারপর হাড়মাস পরিশ্রম করে ছোট তিনটে সুমি, সোমা ও শর্মিলার বিয়ে দিয়েছি। সব জিনিস নিয়েও তোরা ওইটুকু জমির লোভে মিথ্যে কথা বলছিস? তোদের কিসের অভাব বলতো? তোদের যা আছে, আমার মতো তুচ্ছ মানুষকে তুড়ি মেরে কিনতে পারিস। একটা ভিখিরিও আমার থেকে ভালো আছে… তোরা এমন কথা কী করে বললি?”
“আমরা মিথ্যা বলছি না। আমাদের ভাগ দেওয়ার ভয়ে তুই মিথ্যে কথা বলছিস! ওটা বাবার সম্পত্তি। তুই লুকিয়ে রেখেছিলি।”
আদরের দিদি-বোনদের তেমন মিথ্যে অভিযোগে নীলুর মাথা হেট হয়ে যায়। বিরক্তি-ঘেন্নায় উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বলে,
“তোরা ওইটুকু জমির ভাগ নিয়ে নিলে আমার তো কিছুই থাকবে না। আমার অরূপ, রূপার ভবিষ্যতের কী হবে বলতো? আমার রূপা, মেয়েমানুষ, দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাবে। ওর বিয়ে-থা’র কথাও তো ভাবতে হবে! ওটা নিয়ে নিলে আমাকে তো পথে বসতে হবে…”
“তুই শুধু তোর নিজের ছেলেমেয়ের কথা ভাবছিস। আমাদেরও তো ছেলেমেয়ে আছে। তাদের ভবিষ্যতের কথা তো ভাবতে হবে…”
সব থেকে বড় বোন মুখের ওপর কঠোর জবাব দিয়ে দিল। বড় বোনের মুখ থেকে এমন রূঢ় কথা শুনে নীলু চমকে যায়। এর জবাবে সে কী বলবে, কিছুই ভেবে পায় না। মাথা নত করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা-কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে। মায়ের কথা মনে পড়ে। বাবার কথা মনে পড়ে… দু-চোখের কোনা ভেদ করে বাঁধভাঙা জল উপচে পড়ে।
নীলিমা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি, যে বোনেরা গলায় পেঁচানো দড়ির মতো সোনার গহনা পরে, দামি গাড়ি চড়ে, সেই বোনেরা কী করে দেবতুল্য ভাইয়ের চোখে-চোখ রেখে এমন দাবি করে? এদের তো চোখে পর্দা বলে কিছু নেই…!
নীলু অবুঝ বোনদের সামনে আর বাক্যব্যয় করে না। হঠাৎ ঘাড় কাত করে দেখে, বাড়ির সামনে একটা দামি গাড়ি এসে দাঁড়াল। দু-জন কোট-বুট পরা সাহেব গোছের লোক নেমে এল। দেখে মনে হল, উকিলটুকিল হবে।
তাঁদের দেখিয়ে নীলুর সব থেকে বড় বোন বলল, ওঁরা শহরের নামকরা উকিল। সব কাগজপত্র রেডি করেই এনেছে। শুধু সই করে দিলেই হবে। তোর ভাগেরটা রেখে বাকি জমি পাঁচ ভাগ হয়েছে আমাদের পাঁচ জনের নামে। আমাদের ভাগে জমির দাম ধরে দিতে পারিস, নাহলে আমাদের অংশ আমাদের নামেই থাকবে…বাড়িটার ক্ষেত্রেও তাই। বাড়িটা ছয় ভাগ ধরে আমাদের অংশের টাকা ধীরে ধীরে আমাদের দিয়ে দিস, তাহলেই হবে। এতে বাড়িটা তোর পুরোই থাকবে…”
এত সময় ধরে নীলিমা সব শুনছিল। পরিবারের সব থেকে বড় বোন কত সুন্দর করে ভাগ-বাঁটোয়ারার কথা ভাইকে বুঝিয়ে দিল। ভাই যেন কিছুই বোঝে না! এমনভাবে বলল, যেন জমির ভাগ নেওয়ার পর বাড়িটা দয়া করে ভাইকে দিয়ে যাচ্ছে…
নীলিমা নীলুর দিকে তাকিয়ে হাঁ করে রইল। ননদগুলোর এমন আকাশভাঙা কথাবার্তায় সে বাকরুদ্ধ।
নীলু অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে ডাইনে-বাঁয়ে চিন্তা না করে চুপচাপ যাবতীয় কাগজপত্রে সই করল। এক মায়ের পেটের বোন। একই রক্ত তাদের শরীরে। সেই বোনেরা কতগুলো কাগজ বাড়িয়ে দিয়েছে সই করার জন্য। সে কাগজ পড়ে দেখাও একজন দাদার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া। তেমন আদর্শচ্যুত কাজ নীলু করতে পারে না। তাই না পড়েই প্রয়োজনীয় সইগুলো করে দিল। তার প্রিয় বোনেরা সুখে থাকলে সেও সুখী।
আদালতের রায়ে ঠিক হয়ে গেল, দুই বিঘে জমি ছয় ভাগ করে একটা অংশ নীলুর জন্য, বাকি পাঁচ ভাগ পাঁচ বোনদের।
তিন
নীলিমার দুই ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার স্বপ্ন চোখের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে। বাড়ি, দোকান, উঠোন…সব যেন এক ঝটকায় অচেনা হয়ে যায়…
দিন গড়াতে থাকে। দোকানের বিক্রিবাট্টা কমে। চারজনের এলআইসির কিস্তির টাকা দিতে না পারায় একদিন দোকানের প্রতীকী শাটারই নামিয়ে দিতে হয়।
নীলু ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন সকালে উঠে উঠোনের শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। একদিন হঠাৎ, কোনও কথা না বলেই, সকালে উঠে, শিউলি গাছটার নিচে একটু বসে, তারপর বেরিয়ে পড়ে। সঙ্গে না টাকা, না জামাকাপড়, না কোনও উদ্দেশ্য। শুধু একটা থলে, শুকনো মুড়ি আর গামছা।
নীলিমা প্রথমে ভেবেছিল, কোনও কাজে গেছে। তারপর দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়… নীলু ফেরে না। তার নাম করে গ্রামের একটা আশ্রমে খোঁজ করে। কিন্তু আশ্রমে পৌঁছে জানা যায়, সে ঠিকই এসেছিল। এক রাত ছিল। তারপর আবার কোথাও চলে গেছে…
নীলিমা কাঁদে, খোঁজে, কিন্তু তার আর কোনও হদিস মেলে না।
নীলিমা ভেঙে না পড়ে আরো শক্ত হয়। সে ভাবে, সংসারটা একটা নৌকার মতো। মাঝি চলে গেলেও নৌকো ডোবে না, যদি পাল ঠিক থাকে, সঠিক সময়ে হাল ধরা যায়। কিন্তু তার সে নৌকার পালও ছিঁড়ে গেছে, হালও খসে পড়েছে। মাঝি নীলু হারিয়ে গেছে। সে দাঁড়িয়ে আছে তীরহীন এক নদীর মাঝে, দিকহারা।
দু-টি শিশু — বড়টা অরূপ, ছোটটা রূপা। অরূপ তখন মাত্র দশ আর রূপা সাত। দোকান নেই, আয় নেই। চাষের জমি তো বোনেরা নিয়ে গেছে। থাকার জন্য শুধু ভাঙাচোরা ইঁটের দেওয়াল-মাটির মেঝের বাড়ি, সামনে স্মৃতি বিজড়িত উঠোন। সেটুকুও কবে ভাগ-বাঁটোয়ারার মারপ্যাঁচে বোনেরা নিলামে চড়াবে, তার ঠিক নেই।
নীলিমা প্রথমে লোকলজ্জায় নিজের সমস্যার কথা কাউকে কিছুই বলতে পারেনি। তারপর সাহস করে কুলতলার একদম শেষ প্রান্তের বাড়িতে, মালি পিসির কাছে গিয়ে কাজ চায়।
মালি পিসি চোখ সরু করে তাকায়, “তুই? নীলুর বউ? তোর তো দোকান ছিল, জমি ছিল…”
নীলিমা মাথা নিচু করে বলে, “ছিল। এখন শুধু ক্ষুধা আছে। ছেলেমেয়ে আছে। দিন গেলে একবেলা ভাত না দিলে ওরা মরে যাবে।”
মালি পিসি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। তারপর তাকে রান্নার কাজ দিয়েছিল। ভোরবেলায় এসে রান্না করবে, কাপড় কাচবে, আর সন্ধ্যাবেলা ফিরবে।
এভাবেই শুরু হয় নীলিমার দ্বিতীয় জীবন।
রোজ সকালে ছেলেমেয়েদের হাতে এক বোতল করে জল আর শুকনো মুড়ি ধরিয়ে দিয়ে নীলিমা বেরিয়ে পড়ত। কাজের শেষে ফিরে আসত ক্লান্ত শরীরে। মালি পিসি সকালে টিফিন দুপুরে একবার ভাত খেতে দিত, যার অর্ধেক নিয়ে বাড়ি ফিরত। কিন্তু তা দিয়ে সন্তানদের পেট ভরত না।
কিছুদিন পর অরূপ জ্বরে পড়ে। গা সাংঘাতিক গরম। কিছুতেই জ্বর পড়ে না। মুখে কথা নেই। ডাক্তার বলতে গ্রামের কম্পাউন্ডার এসে দেখে যায়। বলে, “অসুখ শরীরে বসে গেছে। পুষ্টির অভাব। ওকে ভালো ভালো খাবার দিতে হবে। শুধু ওষুধে কিছু হবে না।”
নীলিমা কম্পাউন্ডারের মুখের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকে। স্বগতোক্তি করে— ভালো ভালো খাবার, কে দেবে? এক মা হয়ে সে কি বোঝে না, ছেলে-মেয়েদের কখন কী ধরনের খাবার দিতে হয়!
নীলিমার শেষ সম্বল, যেটা নীলু বিয়ের পর ওকে গড়িয়ে দিয়েছিল। সরু ফিনফিনে এক চিলতে সোনার চেন। নিজের গলা থেকে চেনটা খুলে বিক্রি করে দেয়। স্বামীর দেওয়া শেষ স্মৃতি। সেই টাকা দিয়ে ফলপাকড়া, ওষুধ কেনে, দুধ কিনে ছেলের মুখে দেয়। কয়েকটা দিন ভালো যায়। মনে হয়, এই বুঝি জীবনটা ঘুরে দাঁড়াল।
শত চেষ্টা করেও ছেলে অরূপের অবস্থার উন্নতি হয় না। তারপর এক রাতে, আচমকা, সে নিঃশব্দে চলে যায়…
ছেলের মৃত্যু নীলিমাকে পুরোপুরি নীরব করে দেয়। আর চিৎকার করে কাঁদে না। শরীরটা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। শুয়ে থাকলে মনে হয় যেন জলে ভেজা পাখির পালক। নড়েও না-চড়েও না।
ছোট রূপা কিছুই বোঝে না। মায়ের আঁচল ধরে কাঁদে। কখনও বলে, “দাদা কই মা? অরূপদাদা আমারে ফেলে কোত্থাও যাবে না!”
নীলিমা নিজের কান দুই হাতে চেপে ধরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে — “অরূপ, তুই চলে গেলি? আমায় একবারও বলে গেলি না, বাবা? তোর ছোট বোনের কথা একবারও ভাবলি না!”
কিন্তু তার কান্নায় কেউ সাড়া দেয় না।
ছেলে অরূপের চিন্তায় নীলিমার শরীর এতই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, কাজে যাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে। ছোট মেয়েটার যত্নও নিতে পারে না। এইভাবে কয়েকটা মাস কেটে যায়।
একদিন সকাল থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টি। দুর্বল শরীরে নীলিমা ঘুমিয়ে পড়েছে। সেই সুযোগে রূপা খুশিমতো বৃষ্টিতে ভিজেছে। মায়ের অজান্তে বৃষ্টিতে তিরিং বিরিং করে নেচেছে।
নীলিমা ঘুম থেকে উঠে দেখে, রূপা মাথার কাছে বসে ঘন ঘন হাঁচি দিচ্ছে। মায়ের বুঝতে অসুবিধা হয় না, বৃষ্টিতে ভেজার জন্যই মেয়ের এই অবস্থা।
সন্ধে নামতেই রূপার ধুম জ্বর। পরের দিন এসে কম্পাউন্ডার কাকা রুপাকে দেখে ওষুধপত্র দিয়ে যায়। জ্বর এই নামে-এই বাড়ে। এই করতে করতে তিন দিনের দিন সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শরীরে জোর নেই। নীলিমা সকালবেলা ঘুম থেকে তুলে বার্লি গরম করে খাইয়ে জানলার কাছে বসিয়ে রাখে। বালিশে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। হঠাৎ জ্বর উঠলে, শরীরে কষ্ট হতে লাগলে ‘মা মা’ করতে করতে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে।
এক বৃষ্টির রাতে বজ্রবিদ্যুতের চমকানিতে যখন আকাশ ফেটে পড়ছে, রূপার গা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। নীলিমা সরষের তেল গরম করে হাত-পায়ের তলা ভালো করে মালিশ করে উষ্ণ গরম জলে ন্যাকড়া চুবিয়ে গা-হাত-পা মুছে দেয়। পরক্ষণে মেয়ের গা ছুঁয়ে সে বুঝতে পারে, সে আর নেই…!
চার
দুই সন্তানকে হারিয়ে নীলিমার বুকটা যেন পাথর হয়ে যায়। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। চিৎকার করে কান্না এখন আর আসে না। কোনও-কোনওদিন সারারাত উঠোনে বসে থাকে। কোনও শব্দ নেই। যতদূর চোখ যায় শুধু আঁধারের শূন্যতা। যে শূন্যতার সঙ্গে বুকের শূন্যতা মিলেমিশে একাকার। শূন্যতা পূরণের কোনও অবলম্বন নেই…
কোনও-কোনওদিন সকালে উঠে নিজেকে আয়নায় দেখে — চুলে অকালপক্কতার ছাপ। কপালে বলিরেখা। চোখের নিচে কালি…
সে জানে, এক মায়ের কাছে বেঁচে থাকার মতো কোনও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই! এ জীবনের আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। কোনও লক্ষ্য নেই।
নীলু ঘর ছাড়ার পর যাবতীয় প্রতিকূলতার চাবুকে আঘাত সহ্য করে হিমালয় পাহাড়ের মতো রুখে দাঁড়িয়েছে। মন ও শরীরের যাবতীয় শক্তি দিয়ে সামনে এগিয়েছে। স্বামীর অবর্তমানে দুটো সন্তানকে আপদ-বিপদ থেকে রক্ষা করে মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব যে তার। নিজের সবটুকু দিয়েও শেষমেষ তার যক্ষের ধন সন্তান দুটোকে বাঁচাতে পারল না। স্বামীর বিয়োগ, তারপরে দুই সন্তানের চিরোবিয়োগ, শেষে একাকী জীবন…
মাঝে মাঝে মালি পিসি আসে। তারও বয়স হয়েছে। তার পরামর্শমতো টুকটাক কাজ করে কোনওরকমে পেটটা চলে যায়।
দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। মালি পিসি আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারে না। একদিন পিসিকে বলল, “আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না পিসি। ওরা দুটো আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অপেক্ষায় ছিলাম, নীলু একদিন ফিরে আসবে। তার অপেক্ষায় পথ চেয়ে চেয়েও হতাশ হলাম। আর পারছি না গো পিসি। আর একদিনও বাঁচার ইচ্ছে নেই…”
“আজ মরলে কাল দুই দিন। মরাটা খুব সোজা। বেঁচে থাকাটাই কঠিন। তাইতো অনেকেই মরে পালাতে চায়। যারা মরে পালাতে চায়, তারা দুর্বল, কাপুরুষ…আমি যতদূর তোকে জানি, তুই কাপুরুষ-দুর্বলদের দলে পড়িস না। তুইতো সাহসিনী, দশ হাতে অস্ত্রধারী মা দুর্গা। দুর্বলের মতো মৃত্যু তোকে মানায় না। তুই আমার শেষ পরামর্শটা শোন। নীলুর উদ্দেশ্যে একবার বেরিয়ে পড়। ভগবান সহায় থাকলে ঠিক পেয়ে যাবি।”
“কোথায় খুঁজব? এই পৃথিবীটা কি আমার হেঁশেলখানা? সীমাহীন এই পৃথিবী, যেখানে ঠিকানাহীন তার অবস্থান। এমন মানুষকে খুঁজে বের করা সম্ভব, বলো?”
“আরে পাগলি, সারা পৃথিবী খোঁজার কোনও দরকার নেই। তুই যেখানে যেখানে মন্দির রয়েছে, বা ভবঘুরে মানুষের থাকার আশ্রম রয়েছে, সেখানে সেখানে খোঁজ করে দেখ।”
“দেশে কি দু-একটা মন্দির আশ্রম নাকি মাসি। শত শত, হাজার হাজার মন্দির-আশ্রম রয়েছে। সেসব জায়গায় খুঁজতে গেলে গাড়িঘোড়ার ভাড়া প্রচুর। অত টাকা-পয়সা কোথায় পাব?”
“আমি তোকে টাকাপয়সার ব্যবস্থা করে দেব। আমার এ কূলে আর কেউ নেই। যেটুকু জমানো-গোছানো আছে, তোকে দিয়ে দেব। তুই নীলুর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়। সৎ মনে খুঁজলে ঈশ্বর ঠিক তাকে মিলিয়ে দেবে।”
মালি মাসির কথা শুনে নীলিমার দু-চোখ থেকে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। মালি মাসিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে চোখ মুছে বলল, “আর আমার কোনও দুঃখ নেই গো মাসি। যার তোমার মতো মাসি আছে, তার কি কোনও দুঃখ থাকতে পারে?”
“ওসব বাদ দে। আমি সব ব্যবস্থা করছি, তুই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়…”
পরেরদিন সন্ধেবেলা মালি মাসি লাঠি ভর দিতে দিতে এসে এক বান্ডিল টাকা নীলিমার হাতে গুঁজে দেয়। নীলিমা বাকরুদ্ধ হয়ে মাসির দিকে তাকিয়ে থাকে। মাসিকে জড়িয়ে ধরে আর একবার কেঁদে নেয়…
পরদিন ভোরে এক কাপ জল খেয়ে, নীলিমা হাঁটা শুরু করে। কুলতলা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, কারওর কাছে কিছু না বলে। এগিয়ে চলে যেদিকে মন চায়। সে যেন উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা… কত শত, হাজার, লক্ষ মন্দির, আশ্রম রয়েছে গ্রাম-শহরের অলিগলিতে। আগে কোথায় কোন দিকে যাবে, মনের মধ্যে তেমন হাজারো প্রশ্ন আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে।
গ্রামের শেষে রেললাইন ধরে, গ্রাম ছাড়িয়ে শহরের গা ঘেঁষে এক মন্দির-চত্বরে এসে পৌঁছায়। সন্ধে নেমে এসেছে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ জানতে পারে, অনেক বছর হয়ে গেল, এক রাতের জন্য এক ভবঘুরে এসেছিল। পরদিন সকালে না বলেই কোথায় চলে যায়। সে কথা শুনে নীলিমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। মুখমণ্ডলে নতুন করে কিছু হারানোর ছাপ স্পষ্ট। সন্ধের অবসানে রাত নেমে এসেছে। এই রাতে সে কোথায় যাবে…
আশ্রমের কেয়ারটেকারের দয়ায় আশ্রমের বারান্দায় সেদিনের রাতটা কাটিয়ে দেয়।
এইভাবে এই আশ্রম থেকে সেই আশ্রম করতে করতে বছর ঘুরে যায়। নীলুর চিন্তায়, বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটিতে শরীরটাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। মালি মাসির দেওয়া টাকা-পয়সাও শেষ হয়ে এসেছে। হাতে যা আছে একবার গুনে দেখে, সামান্যই রয়েছে। সে ভাবে, আর দুই-একটা আশ্রম খুঁজবে, তার বেশি নয়, তারপর এ জীবনের শেষ ঠিকানা খুঁজে নেবে…
হাঁটতে হাঁটতে, হাঁটতে হাঁটতে একটা আশ্রমের সন্ধান পায়। আশ্রম-চত্বরে ঢুকতেই দেখতে পায়, সেখানে একাধিক সারিতে লম্বা লাইন। গণভোজন চলছে— খিচুড়ি পরিবেশন। সারি সারি লাইনের পর লাইন। নীলিমা একটা লাইনে বসে পড়ে। গলা শুকিয়ে এসেছে। পেট খিদেয় জ্বলছে। তার চোখ অর্ধেক খোলা, মিটমিট করছে। সেই মুহূর্তে তার মাথায় কেবল একটাই শব্দ ঘুরছে— ‘খিচুড়ি…’
তার সামনে এসে দাঁড়াল একজন সন্ন্যাসী। পরনে গেরুয়া পোশাক। মাথায় গেরুয়া কাপড় বাঁধা। মুখে দাড়ি। চোখে তীব্র স্থিতি। হাতে একটি পাতা। পাতাটি নীলিমার সামনে রাখে। পরক্ষণেই ফিরে এসে দু-হাতা খিচুড়ি ও পাঁচমিশালি তরকারিতে নীলিমার পাত ভরিয়ে দেয়।
নীলিমা থমকে যায়। সন্ন্যাসীর মুখ তার খুব চেনা এক মুখাবয়ব। সেই চোখ, সেই চিবুক, সেই চুপচাপ দাঁড়ানো ভঙ্গি…
সে জিজ্ঞেস করে না কিছু। কেবল চেয়ে থাকে।
সন্ন্যাসী খিচুড়ির পাতা ধরে একটু এগিয়ে দিয়ে বলে, — “খেয়ে নিন মা। মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে হেঁটে এসেছেন…”
সেই কণ্ঠ!
সেই ভঙ্গি!
নীলিমার বুকের ভেতরটা ধ্বনিত হতে থাকে। হাত কাঁপে। তার মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়— “নীলু?”
সন্ন্যাসী থেমে যায়। একটু চমকে তাকায়।
দু-জনের চোখে জল। সন্ন্যাসীর চোখে সংসারের প্রতিচ্ছবি। জীবনের নতুন ব্যাখ্যা। নীলিমার চোখে দেখা দেয় আশ্রয়।
জীবনের সমস্ত মায়াজাল ছেঁড়া দুটি নিঃস্ব প্রাণ পুনরায় মুখোমুখি।
সেই মুহূর্তটা যেন আটকে গেল সময়ের ক্যানভাসে।
একদিকে বসে থাকা, সারা শরীরে ধুলোবালি মাখা, ক্ষুধার্ত, জীবনে ধাক্কা খাওয়া এক নারী, নীলিমা।
অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকা এক সন্ন্যাসী, গেরুয়া বসনে, নির্লিপ্ত মুখে, খিচুড়ির বালতি হাতে। মাঝখানে তাদের হাজারো না-বলা কথা, হাজারো দুঃখ, ত্যাগ, অভিমান…সব মুহূর্তে জেগে উঠল।
নীলিমার ঠোঁট ফাটা কণ্ঠে আবার— “নীলু?”
সন্ন্যাসীর চোখ স্থির, নির্লিপ্ত। তিনি খিচুড়ির বালতি নিচে রাখলেন, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে
নিভৃত স্বরে বললেন, “তুমি…?”
নীলুর প্রত্যুত্তরে নীলিমা ভেতর থেকে ভেঙেচুরে, মুচড়ে নুয়ে পড়ল। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বহুদিন ধরে জমে থাকা কান্নার ঢেউ তুলে চোখ মুছতে লাগল।
গণভোজনের লাইন তখন এগিয়ে চলেছে। খিচুড়ি পরিবেশনে সামান্য ছন্দপতনে পেছনের লোকজন উষ্মা প্রকাশ করছে। কিন্তু তারা কিছু শুনতে পাচ্ছে না, কিছু বুঝতেও পারছে না। ক্ষণিকের জন্য যেন চারপাশ থেমে গেল।
সন্ন্যাসী নীলু ততক্ষণাৎ খিচুড়ির বালতি অন্যের হাতে দিয়ে নীলিমাকে ইশারায় ডেকে আশ্রমের চাতালের কাছে নিয়ে পাশে বসতে বলল।
নীলিমা নির্দ্বিধায় বসে পড়ল। মুখে অনাবিষ্কৃত এক অনুভব। মনে হল, সে যেন একটা স্বপ্নে ঢুকে পড়েছে।
“তুমি এখানে?” নীলু জিজ্ঞেস করল।
“তুমি এভাবে না বলে-কয়ে কেন পালালে?”
নীলিমার চোখে জল টলটল করছে।
নীলু মাথা নিচু করে বলল,
“কী করব বলো? এক মায়ের পেটের, এক রক্তের বোনদের পক্ষ থেকে এত বড় বেইমানি, এত বড় অপমান আমি সহ্য করতে পারিনি। ওরা ভালোভাবে চাইলে আমি ওদের সর্বোচ্চ দিয়ে দিতাম। ওরা রীতিমতো প্রতারণা করে, আমাকে কিছু না জানিয়ে, একেবারে উকিল-আইন-আদালত সঙ্গে করে চলে এলো সম্পত্তির ভাগ নিতে। এ সমাজ কত বড় স্বার্থপর, বেইমান হতে পারে, সেটা আমার আপন বোনদের মাধ্যমে প্রমাণ পেলাম। একদিন বুঝলাম, এ সংসার, এ সমাজ আমাকে আর কিছু দিতে পারবে না। আমার পরিবারকে দেওয়ার মতো আর কিছুই রইল না। আমি তোমার অনুমতি ছাড়াই ভাগ-বাঁটোয়ারার কাগজপত্রে সই করেছি। এটা আমার চরম অন্যায়। তোমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আমার সন্তানদেরকেও আমি প্রতারণা করেছি। এ লজ্জামুখ নিয়ে তোমাদের সামনে দাঁড়ানোর শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“এসব তুমি কী বলছ? তুমি কোনওরকম অন্যায় করোনি। একজন উপযুক্ত দাদার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করেছ।”
“এমন কথা একমাত্র আমার নীলিমাই বলতে পারে। তাইতো তুমি নীলিমা, যে নীলিমা তার নীলুর কোনও দোষই দেখতে পায় না..”
নীলিমা মাথা নিচু করে চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, “তুমিও তো আমার নীলু, শুধু আমার…”
নীলু নীলিমার বাঁ-হাতের পাঞ্জা চেপে ধরে আবার শুরু করে, “…যখন বেঁচে থাকার সম্বলটুকু ওদের বেইমানিতে শেষ হয়ে গেল, নিজেকেও আর খুঁজে পাইনি। ওই মুহূর্তে অস্থির মন যেটা সায় দিল, সেটাই করলাম। সেই মুহূর্তে কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক ভাবার অবকাশ ছিল না… তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
নীলিমা কাঁপা গলায় বলল,
“ক্ষমা চাওয়ার মতো অপরাধ তুমি করোনি। সামান্য সম্পত্তিটুকুই তো চলে গিয়েছিল, আমরা তো ছিলাম…আমি অরূপ, রূপা।”
এই নাম দুটো শুনেই নীলু থমকে গেল। বলল,
“ওরা কেমন আছে?”
এই প্রশ্নে নীলিমা ভেতর থেকে অ্যামিবার মতো ভেঙে পড়ল। মুখ ঘুরিয়ে মাটির দিকে তাকাল। সামনে রাখা খিচুড়ির পাতে তার চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
নীলু মাথা তুলে ধরে মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওরা কোথায়?”
“ওরা নেই। ভগবান ওদের তুলে নিয়েছেন। অরূপ আগে গেল…রূপা কিছুদিন পরে…”
নীলু চোখ বন্ধ করল। তার তো কিছুই বলার নেই। তবু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল —
“সব দোষ আমার। পালিয়েছিলাম, তোমার আর ওদের থেকে নয়, নিজের থেকে। আমি সব কিছুতে ব্যর্থ হয়েছি — ভাই হিসেবে, স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবেও…আমার কান্নারও অধিকার নেই…”
পাঁচ
“এবারে তুমি আগে খেয়ে নাও, তারপর বাকি কথা।”
“খাচ্ছি। তুমি এত বছরের সন্ন্যাস-জীবনের কাহিনি বলো—”
নীলুর সন্ন্যাস-জীবন —-
বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধে নাগাদ কয়েকটা গ্রাম ছাড়িয়ে শহর লাগোয়া আশ্রমে পৌঁছয়। সেখানে এক রাত থেকে পরের দিন সকাল আটটার পরে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ে। এদিক-ওদিক কিছুদিন ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ায়। একদিন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে দেখল, গেরুয়াবসনে কিছু মানুষ রেলস্টেশনের দিকে হাঁটছে। তাদের দেখে দুঃখিত, হতাশাগ্রস্থ, ভারী মনটা হালকা মনে হতে লাগল। তাদের কিছু না বলে পিছু পিছু হাঁটা শুরু করল। স্টেশনে ঢুকেই তারা সকলে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে উঠে পড়ল। নীলুও ট্রেনে উঠল। অল্প সময়ের মধ্যে ও জানতে পারল, ট্রেনটি বেনারস যাবে…
ট্রেন ধরে সোজা বেনারস। নেমে হাঁটতে হাঁটতে, হাঁটতে হাঁটতে মণিকর্ণিকা। প্রতিদিন মণিকর্ণিকার ঘাটে চুপ করে বসে থাকত। কেউ ভাবত, ভিখারি, কেউ পাগল। আরো কিছুদিন ভবঘুরের মতো ঘুরল। তারপর একটা আশ্রমে আশ্রয় নিল। সেখানে মাথা কামিয়ে সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করে। সন্ন্যাস নেওয়ার পর আশ্রমের নিয়মানুযায়ী কিছুদিন মৌনব্রত পালন করতে হয়।। মৌনব্রত শেষে শুরু হল গীতা পাঠের পর্ব। গীতা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক সন্ন্যাস-জীবন শুরু হল। সন্ন্যাস-জীবনে অতীত ভুলে সাংসারিক মোহ-মায়ামুক্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। আশ্রম-মন্দিরের প্রয়োজনীয় কাজ, জনসেবা এইসব কাজে মনটা সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে উঠল। সময় ভালোই কেটে যেতে লাগল…
একদিন হঠাৎ এক কিশোর এসে তার পায়ে পড়ে বলল, “বাবা, আমার জন্য আশীর্বাদ করো। মা বলেছে, তুমি ভালো মানুষ। ভালো সন্ন্যাসী। তোমার আশীর্বাদে সকলের ভালো হবে।”
সেই মুহূর্তে তার ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল।
কেননা সে জানত, সে নিজে একদিন বাবা হয়েছিল। তারও কিশোরটির মতো সন্তান আছে। অতিকিশোরী মেয়েও আছে। এক পিতার দায়িত্ব সে পালন করতে পারেনি…
তখন থেকে সে ভাবতে শুরু করে, সত্যিই কি এটা সন্ন্যাস নেওয়া নাকি পালিয়ে বাঁচা? সে যাইহোক, আর কিছু করার নেই। কিছু কিছু ভুল আর শোধরানো যায় না। এ ভুলটাও জীবনের একটা চরম ভুল। যে ভুলের মাশুল গোনা ছাড়া পথ নেই।
পেছনের কথা পেছনে ঠেলে দিয়ে বর্তমান সময়কে মেনে নিয়ে আরো আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, আর ফিরে যাবে না।
তবে এমন একটা অবস্থায় পুনরায় নিজের জীবনের মুখোমুখি হতে হবে, নীলু ভাবতে পারেনি। সে আশ্রমের কাজকর্ম করত। গণভোজনে খাবার বিতরণে অংশ নিত। যেমন আজকের এই গণভোজন, যেখানে নীলিমার সঙ্গে দেখা।
নীলিমার খিচুড়ি প্রসাদ গ্রহণ শেষ হল। দু-জনে পাশাপাশি বসে রইল। মুখের কথা কম, চোখের কথা বেশি।
নীলিমা বলল— “তুমি আর একা পালিয়ো না। যদি পালাতেই হয় এবার দু-জনে একসঙ্গে… এ পালানো নতুন সংসার গড়ার জন্য নয়, কেবল বাঁচতে। জীবনের সামনে যতটুকু সময় আছে, একটা আশ্রয় চাই। সেই আশ্রয়ে থেকে তোমার সঙ্গে মানবসেবা করে কাটিয়ে দেব।”
নীলু অত্যন্ত ধীরে মাথা নাড়ল। স্বগতোক্তি করল—- তোমার হাত ধরেই ফিরব এবার। না সংসারে, না জীবনে। কেবল মানবসেবায়।
তারা একসঙ্গে খিচুড়ির পাতা তুলে নিল।
দুই হাত একসঙ্গে ছুঁয়ে গেল পাতের কিনারে।
খিচুড়ির গন্ধে ভেসে এলো অতীতের দৃশ্য — শিউলি গাছ, উঠোন, দোকান, দুইটা ছোট মুখ, আর হারানো সংসার।
এবার আর চোখে কান্না নেই। কেবল স্বীকার, ক্ষমা এবং এক নতুন যাত্রার শুরু। যাত্রায় সবকিছু হারিয়ে ফেলার পরও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খুঁজে পায় এক নতুন সম্পর্কের রূপ, যেখানে জাগতিক প্রেম নেই, আছে দায়িত্ব পালনের সঙ্গে মহাজাগতিক প্রেম। সংসার নেই, আছে মানবিকতার আশ্রয়।
দিন ফুরোতে ফূরোতে কখন যেন সন্ধে নেমে এসেছে। নীলিমা চোখেমুখে চিন্তার ছাপ তুলে বলল, “চারদিকে অন্ধকার হয়ে এলো। রাতটা কিভাবে কাটবে? আমি থাকব কোথায়?”
“তুমি চিন্তা করো না। আশ্রমের কেয়ারটেকার ভীষণ ভালো মানুষ। আশ্রমে হঠাৎ কোনো আগুন্তক এসে পড়লে, নারী-পুরুষ যে-ই আসুক না কেন, ঠিক ব্যবস্থা করে দেয়। আলাদা আলাদা ঘরও রয়েছে।”
সেইমতো কেয়ারটেকারের কাছে পৌঁছতেই রাতে খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। তার আগে প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে ওদের মুখ থেকে কেয়ারটেকার একটা অদ্ভুত জীবনকাহিনি শুনল। এমন একমুখী স্বার্থপরতা, উল্টোদিকে মানবতার নিদর্শনের গল্প সে আগে কখনো শোনেনি। এমন গল্পে নীলু ও নীলিমার থেকে বয়সে বড় কেয়ারটেকারের ওদের প্রতি সহানুভূতি বেড়ে গেল। কেয়ারটেকার মনে মনে ভাবল, আশ্রমে একজন ভালো সেবকের সঙ্গে সেবিকাও মিলে গেল।
ছয়
ওরা আশ্রমের আলাদা আলাদা ঘরে ঘুমালেও অদ্ভুতভাবে ভোররাতে দু-জনেই একসঙ্গে উঠে পড়ে। ভোর হতে তখনও দেরি আছে। দরজা খুলে বাইরে বেরোয়…
আকাশের রং ধূসর। না রাত, না দিন। দু-জনে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মন্দির-চত্বর ফাঁকা। কয়েকটা কাক ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূরে কোথাও একটা শঙ্খ বাজছে। ভোর রাতে শঙ্খ বাজার কথা নয়। তবুও বাজার কারণ কিছু রয়েছে। বাঙালির বারো মাসে ছত্রিশ পার্বণ। তো ভোর রাতে শঙ্খ বাজতেই পারে…
ওরা বাইরে বেরিয়ে আশ্রমের সামনে পাশাপাশি বসে। শিশিরভেজা ঘাস। পায়ে হালকা ঠাণ্ডা লাগছে। অনেক বছর পর তাদের একসঙ্গে বসা একান্তে, নিরালায়। তাও কারো উঠোনে নয়, কারো সংসারে নয়, আশ্রম-প্রাঙ্গণে।
ধীরে ধীরে চারপাশ ফর্সা হয়ে এলো। নীলু বলল, “চা খাবে?”
“মজা করছ? এখানে কে তোমাকে চা দেবে?”
“সূর্যের আলো ফুটুক, ঠিক পাবে…”
নীলিমা বহু বছর পর নীলুর মুখে খুশির দীপ্তি দেখে প্রশান্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চেনা হাসি।
“একটা কথা বলব?”
“কী কথা? বলো—”
“তুই এখন আর আমাকে তুই বলিস নাতো?”
নীলুর কথায় নীলিমা হেসে ফেলল। বলল,
“এখন আমরা বড় হয়ে গেছি, ওসব কি বলা যায়? ‘তুই-তোকারি’ করেই তো অনেক বছর বেঁচে ছিলাম। সংসারটাও তো তোমার সঙ্গে ‘তুই’ করেই করেছি। তুমি সংসার ছেড়ে পালানোর পর ‘তুই-তোকারি’র মৃত্যু হয়েছে। সেসব আর ফিরবে না, ফিরে আসবে না… ওসব ছেলেমানুষী, আবার তুই-তোকারি ফিরিয়ে আনা মানে নিজেদের লজ্জায় ফেলা”
নীলু হেসে মাথা নাড়ল। মন্দিরের সীমানার বাইরে রাস্তা লাগোয়া জমিতে এক বৃদ্ধ দম্পতি চা বিক্রি করে। নাম মাধবদা আর পুণ্যি মাসি। পুণ্যি মাসি একটা মাটির উনুনে চা বানায়। চা পাতা কম, আদা একটু বেশি দেয়। সকালের সূর্যের হলদে আবিরগুঁড়ো পুবদিগন্ত আলো করতেই চায়ের দোকানের ঝাঁপ উঠল। ইতিমধ্যে ওরা পাশাপাশি অবস্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসেছে।
মাধবদা আর পুণ্যি মাসির দীর্ঘদিনের চায়ের দোকান। তাদের ভালোমানুষী ব্যবহারের গুণে তারাও যেন আশ্রমের মানুষ। আশ্রমের বহু কাজে তারা সহযোগিতা করে…সেই কারণে তাদের কাছে নীলুর আবদারটা একটু বেশি।
নীলিমা উঠে গিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দু-কাপ চা চাইল। পুণ্যি মাসি চায়ের কেটলির ঢাকনা তুলতে তুলতে বলল,
“পয়সা আছে মা? এখনও বহুনি হয়নি তো!”
নীলিমা ম্লান হেসে বলল, “সকল সন্ন্যাসীদের তো বহুনি ছাড়াই চা দাও, তাই না?”
“কে সন্ন্যাসী?”
“ওই যে, বসে রয়েছে, তোমাদের সন্ন্যাসী,” নীলিমা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল।
“ও তো আমাদের সন্ন্যাসী বাবাজি…”
“ওর সঙ্গে আমাকেও আজকে বিনা বহুনিতে চা খাওয়াবে। তবে কাল থেকে কাজ খুঁজব। কোনও মন্দিরে বাসন মাজা, ঝাড়ুদারি, মানুষের সেবা করা…, যে কোনও কাজ হলে করব। আমার আজকের পয়সাও দিয়ে দেব।”
ইতিমধ্যে নীলু এসে নীলিমার পাশে দাঁড়াল।
পুণ্যি মাসি মৃদু হাসল। কিছু বলল না। মাথা নেড়ে চা ঢালল। তাদের প্রিয় সন্ন্যাসীর পাশে হঠাৎ একজন মাকে দেখে গালভরা হাসি দিয়ে বলল,
“তোদের মুখে একটা শান্তি দেখছি আজ, অনেক দিন পর। আমাদের সন্ন্যাসীর সঙ্গে তোকেও বিনা পয়সায় চা দিচ্ছি, একজন সন্ন্যাসিনী হিসেবে। আমার দোকান থেকে সন্ন্যাসী বিনা পয়সায় চা পেলে সন্ন্যাসিনী কেন পাবে না? আজ থেকে তুই আমাদের সন্ন্যাসিনী মাতা।”
পুণ্যি মাসির অদ্ভুত কথায় নীলিমা মুগ্ধ হয়ে গেল। দুই পাত্র চা নিয়ে নীলিমা ও নীলু চাতালে ফিরে এলো। দুটো মাটির ভাঁড়, হালকা ফাটল ধরা, কিন্তু উষ্ণতায় ভরে আছে। চা নিয়ে দু-জনে পাশাপাশি বসল।
নীলু চায়ে এক চুমুক দিয়ে বলল,
“এই চা যেন পুরনো দিনগুলোকে মনে করিয়ে দিল…”
নীলিমা বলল, “হ্যাঁ, শুধু রূপা পাশে নেই। অরূপ নেই। শুধু আমরা দু-জন…”
“তুমি ঠিকই বলেছ…”
“জানো তো, আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, তোমার সঙ্গে এই আশ্রমেই থেকে যাব। পুরনো নামে নয়, পুরনো অভ্যাসে নয়, কেবলমাত্র পুণ্যি মাসির দেওয়া ‘সন্ন্যাসিনী’ পরিচয়ে। শুধু একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। সঙ্গে যেকোনও কাজ করতে রাজি। কারওর দয়ায় নয়, নিজের ঘামের দামে পরিশ্রম করে বাঁচতে চাই।”
নীলুও নীলিমার সঙ্গে সহমত হয়। তার জীবনে যা ছিল, তা সে রেখে এসেছে কোথাও। সেসব অতীত। পুরনো ভুল আর করতে চায় না। এখন নীলিমার মতে সায় দিয়ে তার মন জুগিয়ে চলতে চায়। একজন সাধারণ, ক্ষুদ্র, কিন্তু সত্যিকারের মানুষ হিসাবে নীলিমাকে সঙ্গে নিয়ে বাকি জীবনটা মানুষের সেবায় কাটিয়ে দিতে চায়।
নীলিমা এখনও জানে না, এই আশ্রমটা ছোট হলেও কর্মকাণ্ড অনেক বড়। অনেক বড় বড় আশ্রম, যেসব আশ্রমের সাধারণ কর্মী থেকে সন্ন্যাসীরা সারাজীবন অনাথ শিশু, অভুক্ত, অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সেবার কাজ করে যায়, সেসব আশ্রমের সঙ্গে এই আশ্রমের যোগসূত্র রয়েছে। ধীরে ধীরে সবই নীলিমাকে জানাবে।
“ঠিক আছে, তুমি যেটা ভালো মনে করবে সেটাই হবে।” নীলু সম্মতি জানাল।
“আমি বলতে চাইছি, আমরা সারাজীবন মানুষের হয়ে কাজ করব, তবে আশ্রমে থেকে নয়। আমাদের একটা নতুন মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। একটা ছোট্ট উঠোন, একটা মাটির ঘর, দুইজন মানুষ আর এক কাপ চা…”
নীলু মৃদু হেসে বলে, “ঠিক আছে চলো, তোমাকে একজন সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে যাই। ওঁর সঙ্গে পরিচয় হলে তোমার ভীষণ ভালো লাগবে।
নীলু আশ্রমের মহন্ত অর্থাৎ প্রধান সেবকের কাছে গিয়ে নীলিমার পরিচয় করায়। তারপর তাদের অতীত জীবনের ঘটনা খুলে বলে। এখন তারা বাকি জীবনটা এই মন্দির-আশ্রমের সেবায় কাটিয়ে দিতে চায়। তবে উপযুক্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে। সঙ্গে ও বলে, নীলিমার হাতের রান্না ভীষণ ভালো। তাই রান্নাবান্নার কাজে যদি নীলিমাকে সুযোগ দেওয়া হয়। নীলু নিজেও আশ্রমের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত হতে চায়…
প্রধান সেবক নিগমানন্দ মহারাজ নীলুকে প্রতিদিনের ভোগ রান্নার দায়িত্ব দেন আর নীলুকে আশ্রমের ফুলের বাগান দেখভাল করার দায়িত্ব দেন।
অল্প দিনের মধ্যে তাদের কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও ব্যবহার আশ্রমের সকলের মন জয় করে নেয়। তারা ধীরে ধীরে চিনে নিতে শুরু করে — “ওই যে, দুই ঈশ্বর-সেবক অনেক কিছু হারিয়েও মুখের হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করে। ঈশ্বরের সেবা তথা মানুষের সেবায় তারা নিজেদেরকে নিবেদন করেছে।”
আশ্রম-মন্দিরের ভোগ রান্নার কাজ সকাল দশটায় শুরু হয়। তার আগে নীলিমার তেমন কাজ থাকে না। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠে। সকালের ব্যক্তিগত কাজকর্ম সেরে ছটার সময় পুণ্যি মাসির দোকানে চলে আসে। হাতে হাতে দোকানের কাজ করে দেয়। নীলুও দোকানে এসে বসে। ঘন্টা দুয়েক থেকে দু-কাপ চা খেয়ে তারপর বাগানের কাজে ঢোকে। পুণ্যি মাসি জেনে গেছে, নীলিমার হাতের রান্না ভালো। চা-ও নিশ্চয়ই ভালো করবে। তাই সকালে কাস্টমার এলে নীলিমাকেই বলে চা করে দিতে। তার হাতের চা খেয়ে অনেকেই খুশি হয়, প্রশংসা করে।
একদিন সন্ধ্যায়, এক দম্পতি মন্দিরে এলো। সঙ্গে সাত-আট বছরের একটা মেয়ে। মেয়েটা হঠাৎ চায়ের টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ায়।
নীলিমা তাকে দেখে বলল, “চা খাবে?”
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল,
“না। জানো, তোমাদের দু-জনকে দেখে আমার দাদু-ঠাকুমার কথা মনে পড়ে যায়।”
নীলু তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে।
নীলিমা শুকনো পাতায় এক চামচ শুকনো খিচুড়ি মেয়েটির হাতে দিয়ে বলল, “এই নাও, মিষ্টি খিচুড়ি। আমার ঠাকুরমা ছোটবেলায় আমাকে এমন মিষ্টি খিচুড়ি বানিয়ে খাওয়াত।”
মেয়েটা হাসল। আর সেই হাসিতে যেন হারানো রূপার ছায়া ফুটে উঠল।
এমন এমন টুকরো ঘটনা কঠিন হয়ে যাওয়া মন-হৃদয়ে কোনও সজোরে ধাক্কা নয়, ভেতর থেকে উথলে ওঠা কোনও করুণ কান্না নয়, এসব জীবনের, ভালোবাসার আর পুনর্জন্মের নীরব প্রতিফলন। নীলু-নীলিমার এ জীবন ওদের পুনর্জন্ম।
আজকের এক কাপ চা, একটা সকাল, একটা মন্দিরের চাতাল…সবটাই দুইজন হারানো মানুষের ধীরে ধীরে ফের বাঁচতে শেখা।
তারা জানে না, কতদিন বাঁচবে, কিন্তু তারা জানে, এবার আর কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। কারণ এবার তারা সংসার করছে না। পরহিতে জীবন ভাগ করে নিচ্ছে।
সাত
সেদিন সকালে অল্প অল্প বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল। আশ্রম-চত্বর ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে।
নীলিমা চায়ের জল বসিয়েছে। উনুনে জল ফুটছে। কেটলির মুখ দিয়ে সরু সরু রেখায় ধোঁয়া উঠছে।
নীলু তখনও দোকানের সামনে চাতালে বসে চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবছিল। এমন ভাবনা এখন প্রায়ই হয়। দৃষ্টির গভীরে অতীত আর বর্তমানের মাঝখান দিয়ে যেন একটা নিঃশব্দ রেললাইন চলে গেছে। সে লাইনে ওপার থেকে অতীতকে তুলে এপারের বর্তমানে সংযোজনের সব রাস্তা বন্ধ।
সেই সকালেই আসে চমকপ্রদ এক আগন্তুক।
একটি অচেনা মুখ। পঞ্চাশ পেরোনো বয়স। পরনে সাদা শাড়ি। চোখে মফস্বল শহরের ক্লান্তি।
সে সরাসরি এসে দাঁড়াল চায়ের টেবিলের সামনে।
নীলিমা প্রথমে চিনতে পারেনি।
সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি চা খাবেন?”
আগন্তুক মাথা নাড়ল।
“আমি নীলুর ছোটবোন, শর্মিলা। চিনতে পারলেন না?”
নীলিমার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“আপনি…?”
নীলু দোকানের ভেতরে বেঞ্চে বসেছিল। এই দৃশ্য দেখে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে যেন এক সাগর-বিস্ময়।
জিজ্ঞেস করল, “তুই? এত বছর পর?”
শর্মিলা কিছু বলল না। হাতে ধরা একটা চিঠি এগিয়ে দিল।
“এটা তোর জন্য। আমি লিখেছিলাম… বহুদিন আগে। পাঠাইনি। সাহস হয়নি।”
নীলু চিঠিটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে খুলল। মলিন কাগজে কাঁচা হাতের লেখা। তারিখবিহীন।
সে বোন শর্মিলার দিকে একবার তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে পড়তে শুরু করল:
দাদা,
তুই যখন সব কিছু ছেড়ে চলে গেলি দাদা, তখন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, তোর আর আমাদের মধ্যে কোনও স্নেহমায়া-মমতার বন্ধন রইল না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, আমরা যারা তোর সামান্য জমির ‘অংশ’ চেয়েছিলাম, তারা আসলে ভাগ পেয়েছিলাম জমির, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছিলাম তোকে। তোর মতো দাদার প্রকৃত স্নেহ-ভালোবাসা, আত্মত্যাগকে উপেক্ষা করে আমরা পেয়েছিলাম জমির ভাগ, সঙ্গে বাড়ির একচিলতে মাটি, কিন্তু হারিয়েছিলাম সেই মানুষটাকে, যে কিনা নিজেকে নিঃশেষ করে আমাদের গড়েছিল। আমাদের সুখে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। দুই বিঘা জমি ছয় ভাগে ভাগ হয়ে গেল, অথচ দেবতুল্য দাদার একফোঁটা ঘামের মূল্য দিতে শিখলাম না।
আমি জানি, ক্ষমা চাওয়ার ভাষা নেই। শুধু বলি — কখনও যদি ফিরিস, এই চিঠিটা পড়ে জানিস, আমাদের ভেতরে এখনও ফোঁটা ফোঁটা আফসোস আছে। রুপা আর অরূপের মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি দিন গুনছিলাম, যদি তোকে কোথাও খুঁজে পাই। কিন্তু তুই তো খুঁজে পাওয়ার নয়। তুই তো হারিয়ে যাওয়ার মানুষ।
শর্মিলা, তোর ছোটবোন
চিঠি পড়া শেষ হতেই শর্মিলা আরেকটা খাম নীলুর হাতে ধরিয়ে দিল। খামটা বেশ ভারী। সেটা খুলতেই কয়েকটা মোটাসোটা কাগজ বেরিয়ে পড়ল। নীলু চোখ বোলাতেই বুঝতে পারল— জমির দলিল। মাথা উঁচু করে শর্মিলার দিকে তাকাতেই সে মুখ নিচু করে বলল, “আমরা পাঁচবোন মিলে আমাদের অংশ ফিরিয়ে দিয়েছি তোর নামে। সব কাগজ রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি। এখন সব তোর আর নীলিমা বউদির। তুই চাইলে আবার সব ফিরে পেতে পারিস।”
নীলু গম্ভীর, নীরব, স্তব্ধ।
নীলিমা এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আমার অরূপ আর রূপাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে?”
“তুমি ওভাবে বলো না বউদি। দাদাকে বলো, বাড়ি ফিরে যেতে।”
“আমরা তো ফিরে যাওয়ার মানুষ নই। আমরা অনেক কিছু হারানোর পরও বাঁচতে শিখেছি। জমি নিয়ে এখন কী করব?”
শর্মিলা দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা এখন বুঝতে পেরেছি, সম্পত্তি মানে শুধু মাটি নয়, সম্পর্কও। সেই সম্পর্ক আমরা ভেঙেছিলাম। যদি পারিস, মাফ করে দিস।”
নীলু শর্মিলার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল,
তারপর এগিয়ে এসে দু’হাত জোড় করে বলল,
“তোরা যা করেছিস, তাতে তখন রাগ ছিল, অভিমান ছিল, এখন আর নেই। তোর কাছে শুধু একটা অনুরোধ, ফিরে যা। ভালো থাকিস। আর কাউকে হারাতে যাস না।”
শর্মিলা কাঁদতে শুরু করল। কাঁদো কাঁদো অবস্থায় বলল, “যা হারাবার তা তো হারিয়ে ফেলেছি। স্বামীটা অকালে চলে গেল। তোর বিধবা বোনের আর হারানোর কিছু নেই। ভালো থাকিস দাদা…”
সে পায়ে পায়ে ফিরে গেল, যেমন এসেছিল। যে বোঝা দিতে এসেছিল, সেটা দাদার হাতে তুলে দেওয়ার পর যেন অনেকটা হালকা হল। ভুলের এটুকু প্রায়শ্চিত্ত করতে পারাটাও কম কিসের?
নীলিমা কাগজগুলো তুলে একটা টিনের বাক্সে ঢুকিয়ে রেখে দিল।
নীলু বলল, “তুমি এগুলো রাখতে চাও? কী করবে এসব দিয়ে?”
নীলিমা মৃদু হাসল, “এটা দিয়ে যা করব, সেটা জমির জন্য নয়। এই কাগজগুলো মনে করিয়ে দেবে আমরা একদিন কিছু ছিলাম আর এখন আমরা যা আছি, সেটা অনেক বেশি কিছু। সর্বোপরি, এটা না রেখেও উপায় ছিল না। এটা তুমি এই অবস্থায় ফেরত দিলেও শর্মিলা কিছুতেই নিত না। কারণ শর্মিলার আজকের কাজ একমুখী। সে যে কাজে এসেছে, সে কাজে বিফল হয়ে ফিরে যাবে বলে আসেনি।”
“তুমি কী করে বুঝলে?”
“ও এখন বিধবা নারী। জীবনের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিটা মুহূর্ত ও অতিক্রম করে এসেছে। জমির এই দলিল ওর কাছে বর্তমানে সামান্য কাগজের টুকরো ছাড়া আর কিছু নয়। একটা ফালতু কাগজ ছাড়া এর কোনও গুরুত্ব ওর কাছে নেই। বিপরীতক্রমে আমাদের কাছেও এর কোনও মূল্য আজ আর নেই, ও সেটাও জানে…”
নীলিমার তাত্ত্বিক কথাবার্তায় নীলু অভিভূত হয়ে গেল। তার মুখে তার কোনও জবাব রইল না।
ততক্ষণে উনুন নিভে চায়ের জল ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। নীলিমা আবার উনুনে জল চড়াল।
সে জানত, জমি ফিরে পাওয়া মানে সব ফিরে পাওয়া নয়। কিন্তু মারাত্মক ভুল করার পর কারো মনে, কারো চোখে যদি অনুতাপ জেগে ওঠে, তাহলে তার চেয়ে বড় ‘ফেরত’ কিছু হতে পারে না।
সাত
সন্ধে নামার আগে গ্রামের পথ যেন সোনালি আলোয় মোড়া। জীবনের চেনা সেই রাস্তা, ধুলো-মাটি, তাল গাছের ছায়া…
সবকিছু যেন কুয়াশার আড়াল থেকে একে একে ফিরেছে।
নীলিমা আর নীলু ফিরছে বহু বছর বাদে তাদের বাড়ির ভেতরের সেই দোকানটায়, যেখান থেকে একদিন সব কিছু শুরু হয়েছিল।
শর্মিলার দেওয়া দলিল অনুযায়ী, তারা আবার হারানো জমির মালিক। কিন্তু এই ‘মালিকানা’ যেন কেবল একটা প্রতীক। তাদের ফিরে আসা নয়, বরং পুরনো দুঃখগুলোকে একবার স্পর্শ করে যাওয়া।
বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই, দু-জনের মুখে অদ্ভুত এক মৌনভাব। জায়গাটা এখনও রয়েছে, তবে মৃতপ্রায়। জংধরা টিনের চাল, ইঁটের গাঁথুনির দেওয়ালে ফাটল, মাটির মেঝেতে আগাছা।
বাড়ির উঠোনের শেষ প্রান্তে চেনা সেই বটগাছটা এখন আরও বড়, ছায়া ফেলে রেখেছে বাড়ির মুখে।
নীলিমা বলল, “এই তো সেই জায়গা। আমার অরূপ ও রূপা খেলা করত ওই কোনাটায়, আর আমি কাজ করতে করতে ওদের খেলাধুলা, খুনসুটি দেখতাম…”
নীলু কিছু বলল না। চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল।
পুরনো একটা চাবিতে বন্ধ দরজা খুলল।
শর্মিলা চাবিটাও দিয়ে গিয়েছিল আর বলেছিল, “একদিন গিয়ে দেখি, দরজার তালা ভাঙা। আমি অন্য একটি তালা মেরে রেখেছিলাম। এটা সেই তালার চাবি।”
নীলু পকেট থেকে বের করে সেটা তালায় ঢোকাল।
একটু টানতেই দরজা কর্কশ শব্দে খুলে গেল।
ধুলোময় ভিতরটা যেন এক লুকোনো ইতিহাসের ঘর।
কেউ ছুঁয়েও দেখেনি এত দিন, মাস, বছর।
ওরা ভিতরে ঢুকে পড়ল।
ঘরের ভেতরে দোকানের পেছনের দিকে একটা পুরনো কাঠের তাক ছিল, যেখানে এক সময় নীলু চাল, ডাল, নুন রাখত। সেই তাক সরাতে গিয়ে সে হঠাৎ থেমে গেল। মাটির মেঝে কেমন খোঁড়া মতো, ওপরের মাটি এলোমেলো। সে হাত দিয়ে মাটি ছুঁয়ে দেখতে লাগল। মাটি অন্যরকম। কেউ মাটি খুঁড়ে মাটির নিচে কিছু রেখে যাওয়ার পর মাটির অবস্থা যেমন হয়ে থাকে আর কী!
নীলু, নীলিমাকে ইশারায় দেখাল। নীলিমা হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল।
নীলু হালকা মাটি খুঁড়তে লাগল। হাত দিয়ে খুঁড়তে খুঁড়তেই একটা লোহার বাক্সের কোনা পেল। আশপাশের ধুলোমাটি তুলে ফেলার পর একটা লোহার ছোট বাক্স বেরিয়ে পড়ল।
ধুলোমাখা সেই বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল কিছু হলদে পুরনো খাতা, কিছু কাগজ, আর একটা ছোট লাল গিঁট দেওয়া কাপড়ের পুঁটলি।
নীলু সেই খাতাটা খুলে দেখল, নিজের হাতের লেখা—
১২ চৈত্র
চাল: ৩ কেজি
নুন: ১ কেজি
কাস্টমার: রামুকাকা বাকিতে নিলেন।
খাতার পেছনে ছোট্ট করে লেখা দু-চারটে পঙক্তি—
“বোনদের বিয়ে দিয়েছি। বাবা-মায়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করেছি। শেষের দিকে দোকানে যা বেচাকিনি হত, সেটা দিয়ে নিজের সংসার ঠিকমতো চলত না, অথচ দিদি-বোনদের ছেলেমেয়েদের কোনও চাহিদা অপূর্ণ রাখিনি। আর পারলাম না। নিজের কাছে ফিরে গেলাম। সেই বোনদের কাছ থেকে এত বড় অপমান সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। তাই আজই আমার অন্তিম দোকানদারি…”
—নীলু
নীলিমার চোখে জল চলে এলো। সে বলল,
“তুমি কখনও হার মানোনি। মনের কথা সবই কাগজে লিখে রাখতে—কী হারালে, কী পেলে। কিন্তু সেই তুমিই আপন বোনের দিক থেকে এত বড় অপমান সহ্য করতে না পেরে হার মানলে…”
এবারে লাল কাপড়ের পুঁটলিটা খুলতেই বেরোল
একটি ছোট মাটির পুতুল, অরূপের হাতের কাজ।
একটি সাদা ফিতে, রূপার স্কুলের ব্যাজ।
একটা চিঠি, নীলিমার লেখা, কিন্তু পাঠানো হয়নি।
চিঠিতে লেখা:
নীলু,
আমি জানি, তুই অনেক কিছু হারিয়েছিস আমাদের জন্য। যখন দেখলি, আমাদের ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রইল না, তুই পৃথিবীর যাবতীয় কষ্টের বোঝা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বাঁচলি… কিন্তু জানিস, আমি তোকে ভালোবাসি। তুই যা করিস, সেটা শুধু কর্তব্য নয়, সেটা ভালোবাসাও।
একদিন যদি কখনও হারিয়ে যাস, জানবি, আমি তোকে খুঁজব না, কারণ আমি তো তোকে নিজের ভেতরেই রেখেছি।
— নীলিমা
নীলু অবাক হয়ে তাকাল। বলল,
“তুমি… এটা লিখেছিলে? তার মানে, এই বাক্সে সবকিছু ঢুকিয়ে তুমিই পুঁতে রেখেছিলে?”
নীলিমা মাথা নিচু করে বলল,
“হ্যাঁ। আর চিঠিটা তুমি চলে যাওয়ার পর পর লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম, দোকানে রেখে দেব। তারপর সেটা যে এই বাক্সের মধ্যেই রেখেছিলাম, আর মনে পড়েনি।”
পরিবেশ থমথমে। হাওয়া-বাতাস নেই।
দু-জনে চুপ করে বসে আছে সেই ধুলোমাখা দোকানে। পেছনে ইতিহাস, সামনে অনিশ্চয়তা, আর মাঝখানে একটি পুতুল, একটি ব্যাজ, একটি চিঠি, একটি খাতা।
কিছুক্ষণ পর নীলু বলল,
“আবার দোকানটা শুরু করবা?”
নীলিমা হেসে বলল, “এবার আর শুধু চাল, ডাল নয়, চা, কথা আর কিছু গল্প বিক্রি করব।”
নীলুও হাসল, বলল “তাহলে দোকানের নাম হবে — ‘গল্প বিক্রি আছে’।”
“হ্যাঁ, ভীষণ ভালো নাম। কাব্যিক!”
জীবন আবার শুরু হল, কিন্তু এবার কোনও হিসেব রেখে নয়। এবার আর কেউ কাউকে প্রমাণ করতে চাইছে না। কেউ দাদা নয়, কেউ বউ নয়, কেউ বোন নয়, দোকানদারও নয়। এবার তারা কেবল মানুষ, যাদের হাতে আছে একটু চা, কিছু পুরনো খাতা, আর মাটি খুঁড়ে পাওয়া কিছু স্বপ্ন।
আট
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ।
দিনগুলো যেন ধীরে চলা ঘড়ি। সূর্য যেন একটু বেশি সময় ধরে আকাশে লেগে থাকে।
সূর্যাস্তের আলো যেন একটু বেশি কোমল মনে হয়।
‘গল্প বিক্রি আছে’ নামটা এখন পাড়ার অনেকের মুখে মুখে।
দোকানে চা পাওয়া যায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি পাওয়া যায় গল্প।
অনেকেই আসে তবে শুধু চা খেতে নয়। চা খাওয়ার বাহানায় বিনে পয়সায় গল্প কিনতে।
তবে কেউ কেউ আসে নীলিমার হাতের এক কাপ দুধ-চা খেতে। কেউ আসে কোনো নামগন্ধহীন শোক নিয়ে।
নীলিমা আর নীলু কেউ আর বয়স নিয়ে ভাবে না।
দু-জনের চুল পেকে গেছে। হাঁটাচলা ধীর, কিন্তু মন শান্ত। একটা আত্মবিশ্বাস আছে দু-জনের চোখে।
তারা যা হারিয়েছে, তাতে আফসোস নেই।
তারা যা পেয়েছে, তাতে তৃপ্তি আছে।
সেই হারানো বিকেল। সেই বিকেলটা অন্যরকম।
আকাশ কমলা লাল হয়ে আছে। সন্ধ্যার মুখে ওদের পাড়ার পুরনো মন্দির থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে আসছে।
নীলু চুপ করে বসে আছে বাড়ি-দোকানের সামনের বেঞ্চিতে। হাতে তার সেই পুরনো খাতাটা,
যেখানে এখন সে আর হিসেব রাখে না।
শুধু লেখে প্রতিদিনের ছোট ছোট অনুভব।
নীলিমা চা বানিয়ে এগিয়ে দিল। নীলু এক চুমুক দিয়ে বলল, “আজকে যেন রূপা আর অরূপ দু-জনেই এসেছে আমার স্বপ্নে। বলল, ওরা ভালো আছে। ওরা সেই ছোট্টটি নেই। অনেক বড় হয়ে গেছে…”
নীলিমা চুপ করে রইল। তার চোখের কোনে হালকা জল, কিন্তু মুখে হাসি।
“তাহলে ওরা জানে, আমরা একসঙ্গে আছি,”
নীলিমা বলল।
নীলু মাথা নাড়ল। বলল, “তুমি জানো, আমি যখন আশ্রমে ছিলাম, আমি একটাও ছবি রাখিনি তোমার বা ওদের। ভয় ছিল, দেখে আবার কষ্ট পাব। কিন্তু তোমার সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার পর মনে হল, সব ছবি ফিরে এসেছে মুখোমুখি হয়ে।”
সূর্য ডুবে যাচ্ছে। নীলিমা চায়ের কাপ ধুতে চলে যায় দোকানের পেছনে।
নীলু একা বসে থাকে বেঞ্চিতে। স্থির দৃষ্টি আকাশের দিকে।
হঠাৎ সে যেন একটু কাঁপে, তারপর খাতাটা বুকের কাছে টেনে নেয়। খাতার পৃষ্ঠায় সে শেষ লাইনটি লেখে—
“আজকের শেষ আলোয় আমি পূর্ণ। কোনো অভিমান নেই। অনেকটা জীবন পেরিয়ে এসে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছি ভালোবাসা দিয়ে, নির্ভয়ে।”
তারপর… চোখ বোজে। ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কমে আসে। হঠাৎ তীব্র গতিতে শেষ নিঃশ্বাস…
নীলিমা কাপ দুটো ধুয়ে ফিরে আসে।
নীলুর নির্মল মুখটি দেখে তার কপালে একটা শান্তির বলিরেখা ফুটে ওঠে। মনে মনে ভাবে, এই মানুষটা, যে তার জীবনের প্রতিটি ভাঙা ধাপে ছায়ার মতো পাশে থেকেছে। জীবনের শেষ কটা দিন তার ছায়াতেই থাকতে চাই। চরম শান্তি, পরম প্রাপ্তি…
বলতে বলতে নীলুর কপালে হাত দেয়। কপালটা এত ঠাণ্ডা কেন! নাকের ছিদ্রে আঙুল রাখে। উষ্ণতাহীন…নীলু—উউউউ…
নীলিমা ওপরের দিকে তাকায়…কোথায় ছায়া? সেই ছায়া, কিছু না বলে নীলিমাকে অন্ধকারে রেখে নিজেই আলোয় মিলিয়ে গেল! আর কিছু বলে না।
চোখ বন্ধ করে নীলুর কাঁধে মাথা রাখে।
চারপাশে নেমে আসে গোধূলির ছায়া। একটা বালক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দোকানের দিকে তাকিয়ে। নীলিমা তাকে ডাকে, “এখানে এসো বাবা, তোমার নীলুদাদু চা বানিয়েছিল, দু-কাপ। চা রেখে চলে গেছে। আজ ওর বানানো শেষ চা খাও।”
বালকটি আসে। এক কাপ চা নিয়ে বসে পড়ে দোকানের মাটিতে। নীলিমা কাঁদে না। দাঁতের মাড়ি শক্ত করে, চোখ দুটো স্থির করে, দৃঢ় দৃষ্টিতে বালকটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
বালকটি চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোমার কী হয়েছে?”
“আমার কিছুই হয়নি। ওই যে সূর্যটা প্রতিদিন একা একা অস্ত যায়, আজ সূর্যটা একা নয়, ওর সঙ্গে আরেকজন অস্ত গেল, অস্ত…”
সেদিনের সেই সূর্যাস্তের সঙ্গে একটা মানুষ চলে যায় আর অন্য কেউ হয়তো জন্ম নেয়, শুধু আলোর নিচে নয়, ভালোবাসার মাঝে।
‘গল্প বিক্রি আছে’ নামাঙ্কিত দোকান তখনও থাকে।
হয়তো চালাবে কেউ, হয়তো রয়ে যাবে শুধু স্মৃতি হয়ে। কিন্তু সেই বেঞ্চি, সেই খাতা, সেই এক কাপ চা
থেকে যাবে জীবনের এক গভীর প্রতীক হিসেবে।
ভালোবাসা, ত্যাগ, বিচ্ছেদ… সবকিছুর পরেও যদি এক কাপ চা ভাগ করে নেওয়া যায়, তবে সেই জীবন বৃথা যায় না।
নয়
বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। ‘গল্প বিক্রি আছে’ এখন আর আগের মতো নেই, তবু আছে।
দোকানটার সামনের বেঞ্চিতে ধুলোবালি, ময়লা পড়ে। কেউ একজন রোজ এসে সেই ধুলো মুছে যায়। দোকানের সামনে এখন একটি ছোট ফলক ঝোলে—
‘নীলু ও নীলিমার স্মৃতিতে’
পাঁচ গ্রামের অনেকেই জেনে গেছে, এই দোকানে গল্প বিক্রি হয়। তারা বলে, “ওখানে বসলে নাকি মন হালকা হয়। মনের মধ্যে কোনও চাপ থাকে না। শুধু গল্প আর গল্প…
একদিন এক তরুণী আসে শহর থেকে।
হাতে ক্যামেরা, ব্যাগে ডায়েরি। সে গ্রামের ইতিহাস লিখছে। সে দোকানের সামনে বসে এক বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলে। তার প্রশ্নের উত্তরে বৃদ্ধা বলেন, “নীলু আর নীলিমা… ওরা শুধু চা বিক্রি করত না মা। ওরা বিনে পয়সায় গল্প বিক্রি করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ গড়ত।
এই গ্রামে যারা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে, তারা এসে চুপ করে বসে থাকত ওদের পাশে। বসে বসে বিনা পয়সায় গল্প কিনতো।”
তরুণী জিজ্ঞাসা করে, “আপনি কি তাদের চিনতেন?”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বলে, “আমি সেই কিশোরীটি, যে একদিন শেষ চা-টা খেয়েছিল নীলুদাদুর হাতে।”
তরুণী বিস্তারিত শুনে তার ডায়েরিতে লেখে—
….এই দোকানটাকে আমি দেখেছি নিজের চোখে।
কিন্তু যাদের নিয়ে গল্প, তারা ছিল না।
তবু যেন প্রতিটি কাপ, প্রতিটি বেঞ্চ, প্রতিটি শ্যাওলা ধরা দেওয়ালে তাদের নিঃশ্বাস লেগে আছে।
আমি বুঝেছি, ভালোবাসা চিৎকারে নয়, থাকে নীরবতায়। আর কিছু সম্পর্ক মৃত্যু পেরিয়েও রয়ে যায়, একটি চায়ের গন্ধে, পেছনে ফেলে যাওয়া একটি খাতায়…
দশ
সন্ধে নেমে আসে। একটা কিশোর তার মায়ের হাত ধরে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“মা, এখানেই দাদু-ঠাকুরমা বসতো?”
মা মাথা নেড়ে চোখের জল মোছে। ছেলেটা বেঞ্চিতে বসে। সে চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। গভীর দৃষ্টিতে চারদিকে তাকায়, তারপর বলে, “আমি বড় হলে এই দোকান আবার চালু করব। দোকানের নাম দেব, ‘গল্প বিক্রি আছে’।”
সন্ধের আবছা আঁধারের চরেরা ঘন হতে হতে রাতের রূপ নেয়। গ্রামের বাইরে এক ছোট্ট লাইব্রেরিতে বসে আছে তরুণ লেখক সৌরভ। বয়স মাত্র ২৫। সে সেই তরুণী লেখিকার লেখা ডায়েরিটা পড়ছে — ‘হারানো ভালোবাসার ডায়েরি’। তার প্রতিবেদনের শিরোনাম—গল্প বিক্রি আছে।
চৈতন্য দাশ, সাহিত্যনীড়, ধুবুলিয়া 1/4 নং গ্রুপ, জেলা: নদিয়া, পোস্টাপিস: টিবি হাসপাতাল,
পিনকোড; 741140, মোঃ 6295266344
