” আমি সেদিন খাইনি, তবে তৃপ্ত হয়েছিলাম”

চাকরির পরীক্ষা শেষ হয়েছে দুপুরে। মাথার ভেতর কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। সারাদিন দৌড়াদৌড়ি, সেন্টার খোঁজা, ভেতরে যাওয়া, আবার বের হওয়া। পেটেও তখন থেকে একটা শূন্যতা কাজ করছে, কিন্তু পকেটের অবস্থা দেখে সাহস পাচ্ছি না কোথাও ঢুকে খাওয়ার।

ধানমন্ডি ২৩ নম্বরে আমার এক মামা থাকেন। ওনাকে একটু দেখা দরকার ছিল, তাই পরীক্ষার পর সোজা এদিকেই এলাম। মামার জন্য ছায়ানটের পাশের এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, বাতাসে গাছের পাতার শব্দে কেমন একটা বিষণ্ণতা বাজছে। আমি দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম— “আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের হিসেবটা সবসময় টানটান থাকে—যাওয়া-আসার ভাড়া, একবেলা খাওয়া, সামান্য চা—সব মিলিয়ে কি এক অদ্ভুত অঙ্ক!” ঠিক তখনই কে যেন হঠাৎ আমার হাতটা শক্ত করে ধরল। আমি ভয়ে চমকে উঠলাম।

পাশ ফিরে দেখি—একটা ছোট ছেলে। বয়স দশ কি এগারো হবে। পরনে আধভেজা, ময়লাটে এক হাফ প্যান্ট। গায়ে কিছু নেই। চুলগুলো এলোমেলো, চোখদুটো মায়ায় ভরা। যেন কারো সামনে কিছু বলতে ভয় পাচ্ছে, আবার না বলেও পারছে না।

আমি একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলাম,
—“কী হয়েছে রে?”

ছেলেটা নিচু গলায় বলল,
—“ভাইয়া, আমি ভাত খাব।”

আমি কিছু বললাম না। ও আবার বলল,
—“দুপুর থেকে কিছু খাইনি।”

আমার বুক তখন কেঁপে উঠল। কারণ, বাক্যটা খুব সরল হলেও, তাতে একটা তীব্রতা রয়েছে। আমি বললাম,
—“ভাত পাব কোথায়?”

সে আঙুল তুলে সামনের দিকে দেখিয়ে বলল,
—“ওদিকে একটা হোটেল আছে, ওখানে ভাত পাওয়া যায়।”

আমি একটু হেসে বললাম,
—“চিপস, আইসক্রিম টাইপের কিছু খাবে?”

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,
—“না ভাইয়া, আমি ভাতই খাব।”

তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল—যেন ভাতই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আমি তখন পকেটে হাত দিলাম। সাতশো টাকার মতো আছে। হিসেব করলাম—ফরিদপুর যাওয়ার ভাড়া………. বাকি থাকবে কত?

ওই ছোট্ট ছেলেটার ক্ষুধা আমার নিজের ক্ষুধাকেও হার মানাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ওর জায়গায় আমি নিজেই দাঁড়িয়ে আছি। তাই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলাম না।

ওর হাতটা ধরে বললাম,
—“চল, ভাত খেতে যাই।”

হোটেলে ঢুকতেই নাক ভরে এল খাবারের গন্ধ। ভাত, মাংস, ডাল, ভর্তা—সবই সাজানো। আমি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম,
—“ভাত-মাংস কত?”

দোকানদার চোখ তুলে বলল,
—“একশ পঞ্চাশ টাকা।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম,
—“একটা প্লেট দেন।”
ছেলেটা চুপচাপ বসে পড়ল। আমি তার ঠিক উল্টাপাশে রাখা চেয়ারে বসলাম।

ওর সামনে থালা এলো। গরম ভাত, মাংস, সামান্য ভর্তা।
ও খেতে শুরু করল এমনভাবে, যেন বহুদিন পর পৃথিবীতে খাবার এসেছে। আমি চুপচাপ তাকিয়ে আছি।

ছেলেটি হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল,
—“ভাইয়া, তুমি খাও না?”

আমি হেসে বললাম,
—“তুমি খাও, আমি পরে খাব।”

ও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। তারপর আবার খেতে লাগল। দোকানদার মাঝেমধ্যে কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে, হয়তো ভাবছে—আমি ছেলেটার কে?

ওর খাওয়ার ভঙ্গিটা দেখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি লাগছিল। জীবনে প্রথমবার মনে হলো, কাউকে খেতে দেখাও আনন্দের হতে পারে।

ঠিক তখন মামার ফোন। ওদিকে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। আমি দোকানদারকে বললাম,
—“ওর খাওয়া শেষ হলে ভদ্রভাবে যেতে দেবেন।”

ছেলেটা চামচটা নামিয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখে পানি চিকচিক করছে। আমি বুঝে উঠার আগেই তাকানো থামিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলাম।

আকাশে তখন একটুখানি রোদ বাকি, কেমন সোনালি আলো। মনে হলো, সেই আলোটা ছেলেটার চোখে লেগে আছে—যে চোখে ছিল ক্ষুধা, তবু অদ্ভুত এক মায়া। রাস্তায় হাঁটছি, পেট খালি, মনও কেমন হালকা হয়ে গেছে।
হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, আমি আজ নিজেও খানিকটা তৃপ্ত হয়েছি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top