আধুনিক মনোবিজ্ঞানের বিকাশের ইতিহাসে দুইটি নাম বিশেষভাবে উজ্জ্বল—Wilhelm Wundt এবং তাঁর ছাত্র Edward Titchener। তাঁদের চিন্তা, পদ্ধতি ও গবেষণার মধ্য দিয়ে মনোবিজ্ঞান দর্শনের বিমূর্ত জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে একটি পরীক্ষাভিত্তিক, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক শাস্ত্রে রূপ নেয়। যদিও তাঁরা একই বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের অংশ, তবুও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিগত পার্থক্য মনোবিজ্ঞানের গতিপথকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে।
প্রথমত, ভিলহেল্ম ভুন্টকে সাধারণত পরীক্ষামূলক মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৮৭৯ সালে লাইপজিগে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রথম মনোবিজ্ঞান ল্যাবরেটরি মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ভুন্টের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের চেতনা কীভাবে কাজ করে তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মন একটি সক্রিয় শক্তি, যা শুধুমাত্র বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং নিজস্ব ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে অভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করে। এই ধারণাকে তিনি “ভলান্টারিজম” নামে অভিহিত করেন। ভুন্টের মতে, চেতনা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া—এটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন মানসিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত।
অন্যদিকে, তাঁর ছাত্র এডওয়ার্ড টিচনার এই ধারণাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং “স্ট্রাকচারালিজম” বা কাঠামোবাদের সূচনা করেন। টিচনারের মতে, মনকে বোঝার জন্য এটিকে ছোট ছোট মৌলিক উপাদানে বিভক্ত করা প্রয়োজন, যেমন অনুভূতি, সংবেদন এবং চিত্র। তাঁর পদ্ধতি অনেকটা রসায়নের মতো—যেখানে জটিল পদার্থকে বিশ্লেষণ করে মৌলিক উপাদান নির্ণয় করা হয়। টিচনারের এই দৃষ্টিভঙ্গি মনোবিজ্ঞানে একটি নতুন কাঠামোগত বিশ্লেষণের ধারা তৈরি করে, যেখানে মনের গঠন বা স্ট্রাকচারকে কেন্দ্র করে গবেষণা পরিচালিত হয়।
দুই চিন্তাবিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো তাঁদের ব্যবহৃত পদ্ধতি—ইন্ট্রোস্পেকশন বা অন্তর্দৃষ্টি। এই পদ্ধতিতে ব্যক্তি নিজের মানসিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ ও বর্ণনা প্রদান করে। তবে, এই পদ্ধতির প্রয়োগে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল। ভুন্টের ইন্ট্রোস্পেকশন তুলনামূলকভাবে নমনীয় এবং অভিজ্ঞতার সামগ্রিকতা বোঝার ওপর গুরুত্ব দেয়। তিনি তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতা এবং প্রতিক্রিয়ার সময়কাল পরিমাপের মতো বিষয়েও আগ্রহী ছিলেন। বিপরীতে, টিচনার এই পদ্ধতিকে অত্যন্ত কঠোর এবং নিয়ন্ত্রিত রূপ দেন। তাঁর গবেষণাগারে অংশগ্রহণকারীদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করা হতো, যাতে তারা তাদের অভিজ্ঞতাকে নিরপেক্ষ ও বিশদভাবে বর্ণনা করতে পারে। তিনি “স্টিমুলাস এরর” এড়ানোর জন্য জোর দিতেন—অর্থাৎ, কোনো বস্তু দেখে তার নাম না বলে, বরং তার মৌলিক সংবেদনগত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা।
তবে এই দুই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাও ছিল। ইন্ট্রোস্পেকশন মূলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা সবসময় নির্ভরযোগ্য বা পুনরুত্পাদনযোগ্য ছিল না। এর ফলে পরবর্তীকালে John B. Watson-এর মতো মনোবিজ্ঞানীরা বিহেভিয়ারিজমের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যেখানে শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় একটি নতুন মোড় আসে।
টিচনারের উত্তরসূরিরা তাঁর কাঠামোবাদের ধারাকে কিছু সময় ধরে এগিয়ে নিয়ে গেলেও, এই ধারা ধীরে ধীরে প্রভাব হারাতে থাকে। একই সময়ে William James-এর ফাংশনালিজম জনপ্রিয়তা লাভ করে, যেখানে মনের গঠন নয়, বরং তার কার্যকারিতা এবং পরিবেশের সাথে অভিযোজনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া, Sigmund Freud-এর মনোবিশ্লেষণ তত্ত্ব মানুষের অবচেতন মনকে সামনে নিয়ে আসে, যা মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করে।
সামগ্রিকভাবে, ভুন্ট এবং টিচনারের কাজ মনোবিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে। ভুন্টের ভলান্টারিজম চেতনার সক্রিয় প্রকৃতিকে তুলে ধরে, যেখানে টিচনারের স্ট্রাকচারালিজম সেই চেতনাকে বিশ্লেষণ করার একটি কাঠামোগত পদ্ধতি প্রদান করে। তাঁদের এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মনোবিজ্ঞানকে দর্শনের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে একটি পরীক্ষাভিত্তিক, স্বতন্ত্র শাস্ত্রে রূপান্তরিত করে।
আজকের আধুনিক মনোবিজ্ঞানে যদিও তাঁদের তত্ত্ব সরাসরি ব্যবহৃত হয় না, তবুও তাঁদের অবদান মৌলিক ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে। তাঁদের কাজই পরবর্তীকালের বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ধারার জন্ম দিয়েছে এবং মানুষের মন ও আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।
উন্ড এবং টিচনারের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্যগুলো কী কী?
উইলহেম উন্ড (Wilhelm Wundt) এবং এডওয়ার্ড টিচনার (Edward Titchener) দুজনেই মনোবিজ্ঞানের প্রাথমিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বেশ কিছু সুস্পষ্ট ও মূল পার্থক্য রয়েছে:
১. মনস্তাত্ত্বিক ফোকাস (Voluntarism বনাম Structuralism):
- উন্ড: উন্ডের প্রাথমিক ফোকাস ছিল মনের সক্রিয় প্রক্রিয়াগুলোর (active processes) ওপর। তিনি ভলান্টারিজম (Voluntarism) বা ইচ্ছাবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন। এই ধারণাটি মূলত মানুষের ইচ্ছাশক্তির ওপর জোর দেয়, যা মনের কনটেন্ট বা উপাদানগুলোকে উচ্চস্তরের চিন্তন প্রক্রিয়ায় সংগঠিত করতে সাহায্য করে।
- টিচনার: উন্ডের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও টিচনার স্ট্রাকচারালিজম (Structuralism) বা কাঠামোগত মনোবিজ্ঞানের বিকাশ ঘটান। তিনি মনের সক্রিয় প্রক্রিয়ার পরিবর্তে চেতনার স্থির উপাদানগুলোর (static elements) ওপর বেশি মনোযোগ দেন। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল মানসিক প্রক্রিয়াগুলোকে তাদের সবচেয়ে মৌলিক উপাদানে, যেমন- সংবেদন (sensations), চিত্র (images) এবং অনুভূতিতে (feelings) ভেঙে ফেলা।
২. অন্তর্দর্শন (Introspection) পদ্ধতির ব্যবহার:
- উন্ড: উন্ড তার গবেষণায় মনের প্রাথমিক উপাদানগুলো বিশ্লেষণের জন্য অন্তর্দর্শন পদ্ধতি ব্যবহার করলেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেক বেশি নমনীয় (flexible)। মজার বিষয় হলো, উন্ড কখনোই টিচনারের মতো করে অভিজ্ঞতাকে উপাদান হিসেবে ভেঙে ফেলার পক্ষে ছিলেন না; এমনকি পরবর্তীকালে তিনি টিচনারের ব্যবহৃত কঠোর অন্তর্দর্শন পদ্ধতিকে “ভুল পদ্ধতি” বা ‘verfehlte Methode’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
- টিচনার: টিচনারের অন্তর্দর্শন পদ্ধতি ছিল অনেক বেশি কঠোর এবং নিয়মতান্ত্রিক (rigid and systematic)। তিনি “স্টিমুলাস এরর” (stimulus error) এড়ানোর জন্য পরীক্ষার্থীদের কঠোর নিয়মের মধ্যে রাখতেন। যেমন, পরীক্ষার্থীদের কোনো বস্তুর নাম (যেমন- পেন্সিল) বলতে নিষেধ করা হতো, বরং তাদের শুধু বস্তুর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যগুলোর (রঙ, দৈর্ঘ্য ইত্যাদি) কাঁচা তথ্য বর্ণনা করার নির্দেশ দেওয়া হতো।
৩. গবেষণার মূল লক্ষ্য এবং উপাদান বিশ্লেষণ:
- উন্ড: উন্ডের লক্ষ্য ছিল মন কীভাবে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে সংগঠিত করে এবং চেতনার উপাদানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কী, তা গভীরভাবে বোঝা।
- টিচনার: টিচনার মনে করতেন, কোনো কিছুর কাজের ধরন (how/why) বা কাজ বোঝার আগে তার কাঠামো বা উপাদানগুলো (what) সম্পর্কে জানা অপরিহার্য। উন্ড যেখানে উপাদানগুলোর সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছিলেন, টিচনার সেখানে মৌলিক উপাদানগুলো শনাক্ত করার ওপরই মূল ফোকাস দেন। তিনি নিজের কাজটিকে ব্যবচ্ছেদের (vivisection) সাথে তুলনা করেন, যার মাধ্যমে মনের সূক্ষ্ম গঠন বিশ্লেষণ করা যায়।
৪. আবেগের মাত্রা (Dimensions of Affect):
- উন্ড: উন্ড আবেগের তিনটি স্বতন্ত্র মাত্রার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
- টিচনার: টিচনার উন্ডের তত্ত্বের সাথে দ্বিমত পোষণ করে আবেগের শুধুমাত্র একটি মাত্রা (আনন্দদায়ক থেকে বিরক্তিকর বা pleasant to unpleasant) নির্ধারণ করেন। উন্ডের বর্ণিত বাকি মাত্রাগুলোকে টিচনার কেবল শারীরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে গণ্য করেছিলেন, বিশুদ্ধ মানসিক উপাদান হিসেবে নয়।
সংক্ষেপে, উন্ড মনের অভিজ্ঞতা সংগঠনের সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং তার পদ্ধতি তুলনামূলক নমনীয় ছিল। অন্যদিকে, টিচনার মনের মৌলিক কাঠামো এবং উপাদানগুলো কঠোরভাবে ব্যবচ্ছেদ করে শনাক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে কাঠামোগত মনোবিজ্ঞান বা স্ট্রাকচারালিজম নামে পরিচিতি পায়।
স্ট্রাকচারালিজম বা গঠনবাদ কীভাবে মনের মৌলিক উপাদানগুলোকে ব্যাখ্যা করে?
স্ট্রাকচারালিজম বা গঠনবাদ মানুষের মনকে এর সবচেয়ে মৌলিক উপাদানে (basic elements) বা ‘অণু’-তে ভেঙে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে চেতনার কাঠামো ব্যাখ্যা করে। এডওয়ার্ড টিচনার ছিলেন এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা। তিনি মনকে একজন রসায়নবিদের মতো বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিলেন—ঠিক যেভাবে একজন রসায়নবিদ পানিকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত করেন, তেমনি টিচনার মনে করতেন মনের জটিল প্রক্রিয়াগুলোকেও মৌলিক উপাদানে ভাগ করা সম্ভব।
উৎস অনুযায়ী, স্ট্রাকচারালিজম মনের মৌলিক উপাদানগুলোকে যেভাবে ব্যাখ্যা করে তা নিচে দেওয়া হলো:
১. চেতনার তিনটি প্রধান উপাদান: টিচনার মানুষের সচেতন অভিজ্ঞতাকে বা মনকে তিনটি প্রাথমিক উপাদানে ভাগ করেছেন: সংবেদন (sensations), চিত্র (images), এবং অনুভূতি বা আবেগ (feelings/affect)।
- সংবেদন ও চিত্র: টিচনারের মতে, আমাদের জটিল ধারণা (ideas) এবং উপলব্ধিগুলো (perceptions) মূলত সংবেদনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়। সংবেদন এবং চিত্রের মধ্যে আচরণগত মিল থাকলেও এদের মূল পার্থক্য হলো এদের ‘স্পষ্টতা’ বা vividness।
- সংবেদনের বৈশিষ্ট্য: প্রতিটি সংবেদনের চারটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে টিচনার উল্লেখ করেছেন—তীব্রতা (intensity), গুণ বা ধরন (quality), স্থায়িত্ব (duration), এবং বিস্তার (extent)।
- অনুভূতির মাত্রা: টিচনার অনুভূতির মাত্রা হিসেবে কেবল একটি বিষয়কেই স্বীকার করেছেন, তা হলো আনন্দদায়ক থেকে বিরক্তিকর (pleasant to unpleasant) অনুভূতি।
২. কঠোর অন্তর্দর্শন (Introspection) পদ্ধতির ব্যবহার: এই মৌলিক উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করতে স্ট্রাকচারালিস্টরা অন্তর্দর্শন পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। এই পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তিকে কোনো উদ্দীপকের (যেমন- একটি পেন্সিল) সংস্পর্শে এনে তার রঙ, দৈর্ঘ্য বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে বলা হতো। এখানে মূল বস্তুর নাম বলা নিষেধ ছিল (যাকে টিচনার ‘স্টিমুলাস এরর’ বলতেন), বরং বস্তুটি নিয়ে ব্যক্তির কাঁচা বা অপরিশোধিত মানসিক অভিজ্ঞতাই ছিল মুখ্য।
৩. উপাদানগুলোর সমন্বয়: স্ট্রাকচারালিজমের লক্ষ্য কেবল উপাদানগুলো শনাক্ত করা ছিল না, বরং এই উপাদানগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি জটিল মানসিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে তা বোঝাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। টিচনার মনে করতেন, মন কেন বা কীভাবে কাজ করে (why/how) তা জানার আগে মনের ভেতরে ঠিক কী কী উপাদান আছে (what) এবং কী পরিমাণে আছে, তা উদ্ঘাটন করা অপরিহার্য।
সংক্ষেপে, স্ট্রাকচারালিজম আমাদের মানসিক অভিজ্ঞতাগুলোকে সংবেদন, চিত্র এবং অনুভূতির মতো মৌলিক এককে বিভক্ত করে এবং অন্তর্দর্শনের মাধ্যমে এদের স্বরূপ ও পারস্পরিক সম্পর্ক আবিষ্কারের চেষ্টা করে।
টিচনারের ‘ইন্ট্রোস্পেকশন’ পদ্ধতি কেন আধুনিক মনস্তত্ত্বে সমালোচিত হয়েছিল?
টিচনারের ‘ইন্ট্রোস্পেকশন’ (Introspection) বা অন্তর্দর্শন পদ্ধতিটি বেশ কয়েকটি মূল কারণে আধুনিক মনস্তত্ত্বে সমালোচিত হয়েছিল:
- সাবজেক্টিভ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফলাফল: অন্তর্দর্শন পদ্ধতির প্রধান সমস্যা ছিল এটি পরীক্ষার্থীর নিজস্ব বা সাবজেক্টিভ অনুভূতির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে প্রাপ্ত তথ্যগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে স্ট্যান্ডার্ডাইজ বা প্রমিত করা খুবই কঠিন ছিল।
- নির্ভরযোগ্যতার তীব্র অভাব: স্বয়ং উন্ড (যাঁর ছাত্র ছিলেন টিচনার) এই পদ্ধতিকে “ভুল পদ্ধতি” বা ‘verfehlte Methode’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। উন্ডের মতে, এই পদ্ধতিটি অনির্ভরযোগ্য এবং এটি স্বেচ্ছাচারী পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে, যা অনেক ক্ষেত্রেই ভুল পথে পরিচালিত হয় বা পরীক্ষার্থীকে কেবল একাকী আত্মমগ্নতার দিকে ঠেলে দেয়।
- সংকীর্ণ ও কঠোর নিয়মাবলি: টিচনারের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিধি ছিল বেশ সংকীর্ণ এবং তাঁর গবেষণার পদ্ধতি ছিল অতিরিক্ত মাত্রায় সীমিত ও কঠোর। তাঁর এই সীমাবদ্ধ ও কঠোর নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির কারণেই তাঁর মৃত্যুর পর স্ট্রাকচারালিজম বা গঠনবাদের পতন ঘটে।
- নতুন মতবাদের উত্থান: অন্তর্দর্শন পদ্ধতির এই দুর্বলতাগুলোর কারণেই মনোবিজ্ঞানে এর ব্যবহার ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায় এবং এর শূন্যস্থান পূরণ করতে আরও বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মতবাদ, যেমন—ফাংশনালিজম (functionalism) এবং বিহেভিয়রিজম (behaviorism)-এর উত্থান ঘটে।
পদ্ধতিটির আত্মগত বা সাবজেক্টিভ প্রকৃতি এবং বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতার অভাবেই এটি সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
স্ট্রাকচারালিজম বা কাঠামোগত মনোবিজ্ঞানের পতন কেন হয়েছিল?
স্ট্রাকচারালিজম বা কাঠামোগত মনোবিজ্ঞানের পতনের পেছনে বেশ কয়েকটি মূল কারণ দায়ী ছিল:
১. অত্যধিক সাবজেক্টিভ পদ্ধতি: স্ট্রাকচারালিজমের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘অন্তর্দর্শন’ বা ইন্ট্রোস্পেকশন (introspection)। কিন্তু এই পদ্ধতিটি পরীক্ষার্থীর একান্ত নিজস্ব বা সাবজেক্টিভ অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফলগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে স্ট্যান্ডার্ডাইজ বা প্রমিত করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।
২. সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর পদ্ধতি: টিচনারের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিধি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং তাঁর গবেষণার নিয়মাবলি ছিল অতিরিক্ত মাত্রায় সীমিত ও কঠোর, যা এই মতবাদের পতনের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি কেবল মনের উপাদানগুলো কী (what) তা নিয়েই গবেষণা করেছিলেন এবং মন কেন বা কীভাবে কাজ করে (why/how), সেই দিকটিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
৩. প্রতিষ্ঠাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: স্ট্রাকচারালিজম মতবাদটি টিচনারের সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর নির্দেশনার ওপর এতটাই নির্ভরশীল ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর পর সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে এই ক্ষেত্রটি মুখ থুবড়ে পড়ে এবং এর বিকাশ থেমে যায়।
৪. নতুন ও কার্যকর মতবাদের উত্থান: অন্তর্দর্শন পদ্ধতির দুর্বলতার কারণে সময়ের সাথে সাথে মনোবিজ্ঞানে অন্যান্য মতবাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে, ফাংশনালিজম (functionalism) এবং বিহেভিয়রিজম (behaviorism)-এর মতো অধিকতর কার্যকর ও বস্তুনিষ্ঠ মতবাদগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করায় স্ট্রাকচারালিজমের আবেদন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।
ফাংশনালিজম কীভাবে স্ট্রাকচারালিজমের থেকে আলাদা ছিল?
স্ট্রাকচারালিজম (গঠনবাদ) এবং ফাংশনালিজম (কার্যবাদ) হলো প্রাথমিক যুগের মনোবিজ্ঞানের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানা।
১. মূল ফোকাস (What বনাম Why/How): স্ট্রাকচারালিজমের মূল লক্ষ্য ছিল মনের কাঠামো বা উপাদানগুলো আবিষ্কার করা, অর্থাৎ মন “কী” (what) দিয়ে গঠিত তা জানা। অন্যদিকে, ফাংশনালিজমের ফোকাস ছিল মন “কেন” এবং “কীভাবে” (why and how) কাজ করে তা বিশ্লেষণ করা।
২. মানসিক প্রক্রিয়া বনাম মানসিক উপাদান: অ্যাঞ্জেলের মতে, ফাংশনালিজম হলো মানসিক ক্রিয়াকলাপের (mental operations) মনোবিজ্ঞান। বিপরীতে, স্ট্রাকচারালিজম হলো মানসিক উপাদানের (mental elements) মনোবিজ্ঞান। স্ট্রাকচারালিস্টরা (যেমন- টিচনার) মনকে একটি স্থির কাঠামো হিসেবে দেখতেন এবং একে সংবেদন বা অনুভূতির মতো মৌলিক উপাদানে ভেঙে বিশ্লেষণ করতে চাইতেন। টিচনারের মতে, কোনো কিছুর কাজের ধরন বোঝার আগে তার উপাদানগুলো জানা বেশি জরুরি।
৩. বিবর্তনবাদের প্রভাব এবং অভিযোজন: ফাংশনালিজম মূলত চার্লস ডারউইনের বিবর্তনীয় ধারণা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। ফাংশনালিস্টরা (যেমন- উইলিয়াম জেমস) মনে করতেন, একটি জীব পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য বা টিকে থাকার জন্য কীভাবে তার মনকে ব্যবহার করে (adaptive activity), মনোবিজ্ঞানে সেটাই অনুসন্ধান করা উচিত। অন্যদিকে, স্ট্রাকচারালিস্টরা মনের উদ্দেশ্য বা উপযোগিতার দিকে কোনো নজর দিতেন না। টিচনার মনে করতেন, উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের ওপর এই নির্ভরতা (teleological) মনোবিজ্ঞানকে পুনরায় দর্শনের দিকে ঠেলে দেবে, তাই এটি ত্রুটিপূর্ণ।
৪. মন, শরীর এবং পরিবেশের সম্পর্ক: ফাংশনালিজম জীব ও তার পরিবেশের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধনে মনের ভূমিকা এবং মন ও শরীরের পারস্পরিক সম্পর্কের (mind-body relationship) ওপর জোর দেয়। কিন্তু স্ট্রাকচারালিজমের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মনের উপাদানগুলো এবং তাদের পরিমাণ নির্ণয় করা, মন কী কাজে ব্যবহৃত হয় তা নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না।
স্ট্রাকচারালিজম যেখানে মনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ব্যবচ্ছেদ (vivisection) করতে ব্যস্ত ছিল, ফাংশনালিজম সেখানে মানুষের বেঁচে থাকা ও পরিবেশের সাথে অভিযোজনের ক্ষেত্রে মনের ব্যবহারিক উদ্দেশ্য বা উপযোগিতা নিয়ে কাজ করেছে।
ফাংশনালিজমে মন ও শরীরের সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়?
ফাংশনালিজম বা কার্যবাদে মন ও শরীরের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীর এবং অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী জেমস রোল্যান্ড অ্যাঞ্জেল তাঁর লেখায় ফাংশনালিজমকে “সাইকোফিজিক্যাল সাইকোলজি” (psychophysical psychology) হিসেবে উল্লেখ করে মন ও শরীরের সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেছেন।
উৎস অনুযায়ী, ফাংশনালিজমে মন ও শরীরের সম্পর্ক নিচের বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করা হয়:
- মানসিক জীবন মূল্যায়নে অপরিহার্য: ফাংশনালিজম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, মানুষের মানসিক জীবনের যেকোনো সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য মন ও শরীরের মধ্যকার সম্পর্কের (mind-body relationship) তাৎপর্য স্বীকার করা অপরিহার্য।
- পরিবেশ ও জীবের চাহিদার মধ্যে মধ্যস্থতা: এই মতবাদ অনুযায়ী, মনের প্রাথমিক কাজ হলো চারপাশের পরিবেশ এবং জীবের (organism) বা শরীরের বিভিন্ন চাহিদার মধ্যে সমন্বয় বা মধ্যস্থতা (mediating) করা।
- চেতনার উপযোগিতা: ফাংশনালিজম মূলত চেতনার মৌলিক উপযোগিতার (fundamental utilities) মনোবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ, মন এবং শরীর কীভাবে একসাথে কাজ করে মানুষের বেঁচে থাকার বা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করে, সেটাই এখানে মুখ্য বিষয়।
ফাংশনালিজম মন ও শরীরকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কিছু না ভেবে, এদের পারস্পরিক সম্পর্ককেই মানসিক জীবন বোঝার মূল চাবিকাঠি হিসেবে মনে করে।
স্ট্রাকচারালিজমের তুলনায় ফাংশনালিজম কেন বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল?
স্ট্রাকচারালিজম বা গঠনবাদের তুলনায় ফাংশনালিজম বা কার্যবাদ বেশি জনপ্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। মূলত স্ট্রাকচারালিজমের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা এবং ফাংশনালিজমের বিজ্ঞানভিত্তিক ও ব্যবহারিক উপযোগিতাই এর মূল কারণ:
১. ‘কী’ (What) বনাম ‘কেন/কীভাবে’ (Why/How) এর পার্থক্য: স্ট্রাকচারালিজমের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানুষের মন ‘কী’ দিয়ে তৈরি, অর্থাৎ এর উপাদানগুলোকে (যেমন- সংবেদন) কেবল চিহ্নিত করা ও ব্যবচ্ছেদ করা। অন্যদিকে, ফাংশনালিজম মন ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণা করেছে । মানুষের আচরণ এবং মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর পেছনের কার্যকারণ ও উদ্দেশ্য জানাটা শুধুমাত্র উপাদান খোঁজার চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ ও বিজ্ঞানসম্মত বলে প্রমাণিত হয়।
২. বিবর্তনবাদের প্রভাব এবং অভিযোজন (Adaptation): ফাংশনালিজম চার্লস ডারউইনের বিবর্তনীয় ধারণা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল । এটি মনকে এমন একটি সক্রিয় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করত, যা জীবকে তার চারপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বা বেঁচে থাকতে সাহায্য করে । অন্যদিকে, টিচনার ও তাঁর স্ট্রাকচারালিজম মনের উদ্দেশ্য বা উপযোগিতা খোঁজার বিরোধী ছিলেন এবং একে দর্শনের দিকে ফিরে যাওয়া মনে করতেন ।
৩. মন ও শরীরের বাস্তবসম্মত সম্পর্ক: ফাংশনালিজম মন ও শরীরের মধ্যকার সম্পর্ককে (mind-body relationship) মানসিক জীবন বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করত । এটি মানসিক অবস্থাকে নিছক স্থির কাঠামো হিসেবে না দেখে জীবের শারীরিক ও পরিবেশগত চাহিদার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মূল্যায়ন করত ।
৪. অন্তর্দর্শন (Introspection) পদ্ধতির অসারতা ও সমালোচনা: স্ট্রাকচারালিজমের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘অন্তর্দর্শন’ পদ্ধতি, যা ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক (subjective) এবং প্রমিত করার অযোগ্য । স্বয়ং উন্ড এই পদ্ধতিটিকে “verfehlte Methode” বা ‘ভুল পদ্ধতি’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, কারণ এটি অনির্ভরযোগ্য এবং মনগড়া পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল ছিল । এর ফলে বিজ্ঞানীরা ফাংশনালিজমের মতো অধিকতর কার্যকর মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
৫. প্রতিষ্ঠাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি: স্ট্রাকচারালিজম মতবাদটি টিচনারের অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাঁর মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই সংকীর্ণ ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর পর সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে এই মতবাদটি মুখ থুবড়ে পড়ে এবং এর বিকাশ চিরতরে থেমে যায় ।
স্ট্রাকচারালিজম যেখানে মনের স্থির উপাদানগুলো নিয়ে একটি অনির্ভরযোগ্য কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, ফাংশনালিজম সেখানে মানুষের বেঁচে থাকা, চারপাশের পরিবেশের সাথে অভিযোজন এবং মন-শরীরের ব্যবহারিক উপযোগিতাকে যুক্ত করতে পেরেছিল বলেই এটি আধুনিক মনোবিজ্ঞানে অনেক বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল
বিহেভিয়রিজম কীভাবে এই দুই মতবাদের সীমাবদ্ধতা দূর করেছিল?
বিহেভিয়রিজম বা আচরণবাদ কীভাবে এই দুই মতবাদের (বিশেষ করে ফাংশনালিজমের) সীমাবদ্ধতা দূর করেছিল, সে বিষয়ে সরবরাহকৃত উৎসগুলোতে খুব বিস্তারিত আলোচনা নেই। তবে স্ট্রাকচারালিজমের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে একটি নতুন ও বিজ্ঞানসম্মত বিকল্প হিসেবে এর উত্থান সম্পর্কে উৎসগুলো থেকে নিচের বিষয়গুলো জানা যায়:
- অন্তর্দর্শন (Introspection) পদ্ধতির অসারতা দূর করা: স্ট্রাকচারালিজমের প্রধান সমালোচনার জায়গা ছিল অন্তর্দর্শন পদ্ধতির ওপর এর অতিরিক্ত নির্ভরতা। পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক (subjective) এবং এর ফলাফলগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে স্ট্যান্ডার্ডাইজ বা প্রমিত করা কঠিন ছিল। এই পদ্ধতিগত দুর্বলতাগুলোর কারণেই মনোবিজ্ঞানে স্ট্রাকচারালিজমের পতন ঘটে এবং এর বিকল্প হিসেবে বিহেভিয়রিজম (এবং ফাংশনালিজম) অনেক বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে।
- টিচনারের মতবাদের সরাসরি বিরোধিতা: মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিহেভিয়রিজম এবং এর সমর্থকদের অবস্থান ছিল টিচনারের স্ট্রাকচারালিজমের সম্পূর্ণ বিপরীতে। অর্থাৎ, মনের সাবজেক্টিভ বা ব্যক্তিগত উপাদানগুলো নিয়ে গবেষণার বদলে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিল।
- পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণের ওপর ফোকাস: উৎসগুলোতে বিহেভিয়রিজমের প্রসঙ্গে জন বি. ওয়াটসনের (Watson) মতবাদ এবং প্যাভলভের কুকুর (Pavlov’s Dog) ও থর্নডাইকের বিড়ালের (Thorndike’s Cats) ওপর করা গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, বিহেভিয়রিজম মানুষের মনের অদৃশ্য ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুভূতির পরিবর্তে বাহ্যিক, পরিমাপযোগ্য এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণের ওপর জোর দিয়েছিল, যা মনোবিজ্ঞানকে আরও বেশি বস্তুনিষ্ঠ (objective) করে তোলে।
যেহেতু আপনার দেওয়া উৎসগুলোতে ফাংশনালিজমের সীমাবদ্ধতা এবং বিহেভিয়রিজম কীভাবে তা দূর করেছিল সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হলো না। তবে আপনি চাইলে আমি আমার সাধারণ জ্ঞান (যা এই উৎসগুলোর বাইরের তথ্য) ব্যবহার করে এ বিষয়ে আপনাকে জানাতে পারি, যদিও সেটি আপনার স্বাধীনভাবে যাচাই করে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
প্যাভলভ ও থর্নডাইকের গবেষণা কীভাবে আচরণবাদকে প্রভাবিত করেছিল?
সরবরাহকৃত উৎসগুলোতে ইভান প্যাভলভ (Pavlov) এবং এডওয়ার্ড থর্নডাইকের (Thorndike) গবেষণার বিস্তারিত বিবরণ নেই। উৎসগুলোতে শুধুমাত্র একটি মনস্তাত্ত্বিক কোর্সের সিলেবাস বা সূচিপত্রে ‘বিহেভিয়রিজম’ বা আচরণবাদ অধ্যায়ের অধীনে “প্যাভলভের কুকুর এবং থর্নডাইকের বিড়াল” (Pavlov’s Dog and Thorndike’s Cats) শিরোনামের একটি পাঠ্যতালিকার উল্লেখ রয়েছে [৬৫]। এর বাইরে তারা কীভাবে আচরণবাদকে প্রভাবিত করেছিল সে সম্পর্কে উৎসগুলো থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
তবে, আমি আমার সাধারণ জ্ঞান (যা এই উৎসগুলোর বাইরের তথ্য এবং আপনি চাইলে স্বাধীনভাবে যাচাই করে নিতে পারেন) থেকে আপনাকে এ বিষয়ে একটি ধারণা দিতে পারি:
- প্যাভলভের গবেষণা (ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং): ইভান প্যাভলভ কুকুরের ওপর গবেষণা করে প্রমাণ করেছিলেন যে, একটি স্বাভাবিক উদ্দীপকের (যেমন- খাবার) সাথে যদি একটি নিরপেক্ষ উদ্দীপককে (যেমন- ঘণ্টার ধ্বনি) বারবার যুক্ত করা হয়, তবে প্রাণীটি একপর্যায়ে কেবল নিরপেক্ষ উদ্দীপকের প্রতিই একই রকম প্রতিক্রিয়া (যেমন- লালা নিঃসরণ) দেখাতে শেখে। এটি আচরণবাদে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে যে, প্রাণীর আচরণ পরিবেশের উদ্দীপকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত এবং শেখানো সম্ভব।
- থর্নডাইকের গবেষণা (অপারেন্ট কন্ডিশনিং-এর ভিত্তি): এডওয়ার্ড থর্নডাইক বিড়ালের ওপর ‘পাজল বক্স’ (puzzle box) ব্যবহার করে গবেষণা করেছিলেন। তিনি “ল অব ইফেক্ট” (Law of Effect) বা ফলাফলের সূত্র প্রস্তাব করেন, যার মূল কথা হলো—যে আচরণের ফলাফল আনন্দদায়ক বা সন্তোষজনক, সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং যে আচরণের ফলাফল বিরক্তিকর তা কমে যায়। এই ধারণাটি পরবর্তীতে বি. এফ. স্কিনারের মতো আচরণবাদীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
মূলত, অন্তর্দর্শন (introspection) পদ্ধতির মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা সাবজেক্টিভ পদ্ধতির বিপরীতে, প্যাভলভ ও থর্নডাইকের এই ধরনের বস্তুনিষ্ঠ ও পর্যবেক্ষণযোগ্য পরীক্ষামূলক কাজগুলোই মনোবিজ্ঞানকে পরিমাপযোগ্য আচরণের দিকে ধাবিত করেছিল, যা পরবর্তীতে আচরণবাদের (Behaviorism) মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
লেখক – মাধব রায়

