ধারাবাহিক গল্প: ধোঁয়াশা( রোমাঞ্চকর আখ্যান ) ।। পর্ব:০৩

ধোঁয়াশা

জান্নাতুল ফেরদৌসী

রাত গভীর। চারদিকে সুনসান নীরবতা। শুধু পেঁচাদের ডাক আর বাতাসে পাতার খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছে। নুসরাতের মন অজানা এক আশঙ্কায় ভারী হয়ে আছে। আজকের রাতটা যেন অন্য রাতগুলোর চেয়ে অনেক বেশি অস্বাভাবিক।

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। অন্ধকারে দূরের আমগাছটা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ গাছের নিচে একটা কিছু নড়েচড়ে উঠল। সে চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করল।
একজন নারী—সাদা কাপড়ে মোড়া, লম্বা চুল ঘাড় বেয়ে নেমে এসেছে। সে ধীরে ধীরে উপরের দিকে তাকাল, যেন সরাসরি নুসরাতের দিকেই দেখছে। তার চোখজোড়া ছিল অস্বাভাবিক লাল।
নুসরাতের গলা শুকিয়ে গেল। সে নড়তে পারছিল না। শরীর যেন পাথর হয়ে গেছে। সে তাকিয়ে দেখল, নারীটি তার দিকে এগিয়ে আসছে—ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে।

ঘরের বাতি আচমকা দপ করে নিভে গেল।
নুসরাত চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল, যেন কেউ ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে। সে জানালার দিকে তাকাল। সেই ছায়া নেই!
তারপরই দরজায় সশব্দে কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
“নুসরাত! দরজা খোলো!”
এটা তার বাবার গলা! কিন্তু কেমন যেন শুষ্ক আর অনুনয় মেশানো স্বর।

নুসরাত দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দরজার দিকে এগোলো। হাত কাঁপছিল। দরজার হাতল ধরতেই একটা শীতল অনুভূতি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে দরজা খুলল।
সামনে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তার চোখে গভীর অন্ধকার। তার মুখে কোনো রক্তিম আভা নেই।
“বাবা, এত রাতে…?”

তার বাবা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন। ঘরের বাতি তখনো নিভে আছে। নুসরাত লক্ষ করল, তার বাবার জামায় লালচে দাগ। সেটা কি রক্ত?
“বাবা, তোমার জামায় কী লেগেছে?” নুসরাতের কণ্ঠ কাঁপছিল।
তার বাবা কিছু বললেন না। শুধু দরজাটা ধীরে বন্ধ করলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, “তোমার জানা দরকার, নুসরাত। আমাদের পরিবারের সত্যটা।”
নুসরাত থমকে গেল।
তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যেতে লাগল।

নুসরাত জানত, এই রাতও আগের রাতগুলোর মতো হবে না। আজ তার ভেতরের ভয় নয়, বরং এক অজানা উত্তেজনা কাজ করছিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—এবার সে পালাবে না, সে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবে।

বাতাসে আবার সেই পোড়া কাঠের গন্ধ ভেসে আসে। জানালার কাচে ধোঁয়ার মতো কিছু ছোপ লেগে ছিল, যেন কেউ আঙুল দিয়ে অদৃশ্য চিহ্ন এঁকেছে। ঘরের কোণ থেকে শীষ বাজানোর মতো শব্দ ভেসে এলো, ধীর কিন্তু ভয়ানক।

নুসরাত ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখ এবার ভয় নয়, বরং দৃঢ় সংকল্পে পূর্ণ।
একটা ছায়া আচমকা তার সামনে নড়ে উঠল। সেটা যেন এক মুহূর্তের জন্য আকার পেল—একজন নারীর অবয়ব, চোখ দুটো লালচে অন্ধকারে জ্বলছে। একই কণ্ঠ…
“তুমি জানো না, নুসরাত… কিন্তু আমরা জানি…” ফিসফিস শব্দটা এবার আরও স্পষ্ট শোনা গেল।

নুসরাতের শরীর শিউরে উঠল, কিন্তু সে পিছু হটল না। “কে তুমি? আমার পিছু কেন নিয়েছো?” তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল না।
ছায়াটা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হলো, এবং নুসরাত আতঙ্কে এক ধাপ পেছনে সরল। সে চিনতে পারল মুখটা।
এটা তার মায়ের মুখ!
কিন্তু তার মা তো জীবিত! তাহলে?

মুহূর্তের মধ্যে জানালার কাচ কেঁপে উঠল, যেন কেউ ওটার ওপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ছায়ামূর্তি এবার হাসল—একটা ঠান্ডা, শীতল হাসি।
“তুমি জানো না, নুসরাত, তুমি আসলে কে।” ফিসফিস আওয়াজটা যেন জানালার কাঁচ ভেদ করে তার কানে পৌঁছাল।
নুসরাত এবার সত্যিই কেঁপে উঠল। হঠাৎ বাতি দপ করে নিভে গেল। ঘর পুরো অন্ধকারে ছেয়ে গেল, আর সেই ছায়াটি মিলিয়ে গেল ধোঁয়ার মতো।

নুসরাতের শ্বাস তখন দ্রুত ওঠানামা করতে থাকে।

নুসরাত কিছু বলতে পারল না। তার গলা শুকিয়ে গেল। ছায়ার সেই মুখ হাসল, কিন্তু সেটা স্বাভাবিক হাসি ছিল না। সেটা ছিল ঠান্ডা, নির্দয়, এক ভয়ানক অভিব্যক্তি।
“তোমার মা জানে না, তুমি জানবে। কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকে না।” ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে জানালার বাইরে মিলিয়ে গেল, শুধু একটা ধোঁয়ার রেখা রেখে গেল।

নুসরাত ছুটে গিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
তার বুক ধকধক করছিল।
ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই চোখ বড় হয়ে গেল।
বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তার জামায় রক্তের দাগ। তার মুখ থমথমে।

“বাবা, এটা কী?” নুসরাত শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে বলল।
বাবা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। দরজা লক করলেন। তার চোখদুটো অসম্ভব গাঢ় দেখাচ্ছিল, যেন গভীর অন্ধকারের সমুদ্র।
“নুসরাত, আমাদের কথা বলতে হবে। এটা শুধু তোমার মায়ের অভিশাপ নয়। এটা আমাদের পরিবারের ইতিহাস।”
নুসরাতের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। সে অনুভব করল, রাত আরও গভীর হয়েছে, এবং সে এক ভয়ঙ্কর সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

নুসরাতের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তার বাবার কণ্ঠে এক অদ্ভুত ভারী ভাব, যেন তিনি নিজেও জানেন না কীভাবে এই সত্য উন্মোচন করবেন।
“বসো,” তার বাবা ধীরে ধীরে বললেন।
নুসরাতের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু সে ধীরে ধীরে বিছানার কোণায় বসল। বাতাসে একটা ভারী অনুভূতি ঝুলে আছে, যেন পুরো ঘরটাই শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠেছে।
তার বাবা ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করলেন, “তুমি কি জানো, তোমার মা কেন এমন অদ্ভুত আচরণ করত? কেন তার উপর বারবার জ্বীনের আছর পড়ত?”

নুসরাত চুপ। সে শুধু তাকিয়ে থাকল।
“কারণ এই পরিবার অভিশপ্ত,” তার বাবা এক নিঃশ্বাসে বলে উঠলেন।
ঘরের বাতি এক মুহূর্তের জন্য ফ্লিকার করল। যেন কোনো অশরীরী উপস্থিতি এই কথাগুলো শুনছে।
“বাবা, তুমি কী বলছ?” নুসরাত এবার কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

তার বাবা গভীর শ্বাস নিলেন। “তোমার দাদী… তিনি শুধু একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি এক ভয়ঙ্কর পাপ করেছিলেন। সেই পাপের কারণে আমাদের পুরো পরিবার অভিশপ্ত। আর সেই পাপের শাস্তি আমরা আজও বহন করছি।”
নুসরাত হতভম্ব হয়ে গেল। তার মনে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
“কিন্তু, কী পাপ করেছিলেন দাদী?”

তার বাবা এবার চোখ বন্ধ করলেন, যেন সেই ভয়ানক অতীতের স্মৃতি তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
“তিনি খুন করেছিলেন, নুসরাত। একজন নির্দোষ মানুষকে। আর সেই রক্তের বদলা আজও আমাদের রক্তের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
নুসরাতের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
“কিন্তু বাবা… কাকে খুন করেছিলেন?”

তার বাবা এবার নুসরাতের দিকে সরাসরি তাকালেন।
“তোমার মায়ের বড় বোনকে।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর নিশ্চুপ হয়ে গেল। বাতাস যেন থমকে গেছে।
নুসরাত অনুভব করল, এই সত্যের সঙ্গে সে কখনোই মানিয়ে নিতে পারবে না।

তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল।
“তাহলে, মা… তিনি জানেন?”
তার বাবা মাথা নিচু করলেন। “তোমার মা জানেন, কিন্তু তিনি কখনোই এটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন সেই দিনের পর থেকে। আর সেই কারণেই তিনি মাঝে মাঝে ভুলে যান, মাঝে মাঝে ভয় পান…।”
নুসরাতের মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। এই সত্য এতদিন তার সামনে গোপন ছিল ? তার পুরো জীবনই কি তাহলে এক মিথ্যা ছায়ার মধ্যে কেটেছে ?

তার বাবা এবার উঠে দাঁড়ালেন। “আমরা এটা পাল্টাতে পারি না, কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, অভিশাপ কখনো শেষ হয় না…”
হঠাৎ দরজার বাইরে কারও ছায়া নড়ল।
নুসরাত ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল।
“কে ওখানে?”
কেউ উত্তর দিল না।
তারপরই দরজায় ধীরে ধীরে একটা রক্তমাখা হাত উঠতে দেখা গেল।
নুসরাতের শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল।

নুসরাত পেছনে সরে গেল। দরজার ওপাশ থেকে একটা ফিসফিস শব্দ ভেসে এলো। “নুসরাত… দরজা খুলো…”
শব্দটা পরিচিত, কিন্তু ভয়ানক বিকৃত। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো কণ্ঠ একসাথে ফিসফিস করছে।
তার বাবা দ্রুত দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। “যে-ই হও, চলে যাও!” তার কণ্ঠ কঠোর হয়ে উঠল।
কিন্তু দরজায় আরও জোরে ধাক্কা পড়তে লাগল। ঘরের বাতি দপদপ করে জ্বলতে নিভতে লাগল।
একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো, যেন কিছু একটা জানালার বাইরে পড়ে গেল।
তারপরই নিস্তব্ধতা।
কে ছিল ওখানে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ—সে কি আবার ফিরে আসবে?

ঘরের বাতি মিটমিট করে জ্বলছিল। নুসরাত তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বাবার চোখের গভীরে যেন এক অদ্ভুত অন্ধকার খেলা করে গেল।
“তুমি কি কখনও অনুভব করেছ, কেউ আমাদের উপর নজর রাখছে?” তার বাবা ফিসফিস করে বললেন।
নুসরাত গলা শুকিয়ে গেল। সত্যিই, মাঝে মাঝে তার এমন মনে হতো, কিন্তু সে কখনো বিষয়টা গুরুত্ব দেয়নি।
“বাবা, তুমি কী বলতে চাচ্ছো?”
তার বাবা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন। “আমাদের পরিবারের অভিশাপ শুধু অতীতেই সীমাবদ্ধ নয়, নুসরাত। এটা এখনো আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
ঠিক তখনই জানালার বাইরে শোঁ শোঁ শব্দ শোনা গেল। যেন কেউ জানালার খুব কাছ থেকে নিঃশ্বাস ফেলছে।
নুসরাত এক ঝটকায় পিছিয়ে গেল। তার বাবা জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন।

জানালার কাচে একটি হাতের ছাপ দেখা গেল—একটা রক্তমাখা হাত।
তার বাবা হঠাৎ পিছিয়ে এলেন। “এটা আবার এসেছে… আমাদের নিতে।”
নুসরাত ভয়ে কাঁপতে লাগল। “কে, বাবা? কে এসেছে?”
তার বাবা এবার ধীরে ধীরে বললেন, “সে, যে আমাদের রক্ত চায়…”

রাত গভীর। চারদিক নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার মাঝেও একটা চাপা ফিসফিসানি যেন বাতাসের সঙ্গে মিশে ছিল।
নুসরাত বিছানায় বসে ছিল, কিন্তু তার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল ভয়ে। জানালার বাইরে অন্ধকারের মধ্যে কিছু একটা যেন নড়ছে।
“বাবা, আমরা কী করব?” তার কণ্ঠ অস্পষ্ট শোনাল।
তার বাবা কিছু বললেন না। শুধু চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে একটা ছায়া ভেতরে প্রবেশ করল। যেন অন্ধকার নিজেই জীবন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ছে।
নুসরাত শ্বাস নিতে পারছিল না। ছায়াটা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।
তার বাবা হাত বাড়িয়ে নুসরাতকে কাছে টানলেন। “চোখ বন্ধ করো! কোনোভাবেই তাকাবে না!”
নুসরাত তার বাবার শক্ত হাত আঁকড়ে ধরল। কিন্তু তার কৌতূহল তাকে বাঁধা মানতে দিল না। সে আস্তে আস্তে চোখ খুলল।
সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন নারী। তার মুখ অন্ধকারে ঢাকা, কিন্তু চোখজোড়া লালচে অগ্নির মতো জ্বলছে।
সে ঠোঁট নড়াল। কিন্তু তার কণ্ঠ শোনা গেল নুসরাতের মাথার ভেতর।
“তুমি আমার কাছ থেকে পালাতে পারবে না…”
ঘরের বাতি এক ঝটকায় নিভে গেল। নুসরাত চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

কে এই নারী? সে কি সত্যিই তাদের পরিবারের অভিশাপের অংশ, নাকি এটি কেবল একটি ভয়ঙ্কর অলৌকিক বিভ্রম? নুসরাত কি এই আতঙ্কের শেকল থেকে মুক্ত হতে পারবে? নাকি অন্ধকার তাকে গিলে ফেলবে চিরতরে?
নুসরাতের গলা শুকিয়ে আসছিল। সে তার বাবার হাত শক্ত করে ধরল। বাতি নিভে যাওয়ার পর ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকারে তলিয়ে গেল।
“বাবা… সে কি সত্যিই এখানে?” তার কণ্ঠ ফিসফিস করে বের হলো।
তার বাবা কিছু বললেন না। শুধু ঘরের কোণ থেকে একটা ছোট্ট প্রদীপ নিয়ে সেটা জ্বালালেন। মৃদু আলোয় নুসরাত দেখতে পেল মেঝেতে কিছু লেখা রয়েছে—গাঢ় লাল রঙের লেখা!
“রক্তই তোমার মুক্তি, নুসরাত। আমি আসছি।”
নুসরাত এক ঝটকায় পিছিয়ে গেল।
তার বাবা মুখ শক্ত করে বললেন, “এখন শুধু সত্যটা জানার পালা।”

বাতির মৃদু আলোয় বাবার মুখটা আরও রহস্যময় লাগছিল। নুসরাত কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার বাবা তাকে ইশারায় থামিয়ে দিলেন।
“তুমি কি জানো, এই বাড়ির দেয়ালগুলো রক্ত শুষে নিয়েছে?” তার বাবা ফিসফিস করে বললেন।
নুসরাত অবাক হয়ে তাকাল। “কী বলছো, বাবা?”
তার বাবা ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকালেন। জানালার কাচে আবারও সেই রক্তমাখা হাতের ছাপ। এবার সেটা আরও স্পষ্ট। যেন কেউ বারবার জানিয়ে দিচ্ছে তার অস্তিত্ব।
তার বাবা চাপা স্বরে বললেন, “এই বাড়িতে শুধু আমরা নেই, নুসরাত। আরও কেউ আছে। যে আমাদের রক্ত চায়। যে আমাদের অতীতকে মুছে ফেলতে দিচ্ছে না।”

নুসরাতের কণ্ঠ কাঁপছিল। “কে বাবা? কে আছে এখানে?”
তার বাবা চোখ বন্ধ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তোমাকে তো আগেও বলেছি তোমার দাদাীর সময় থেকেই এই অভিশাপ আমাদের পিছু নিয়েছে। তোমার দাদাকে এক রাতে এই ঘরেই খুন করা হয়েছিল। তার দেহ পাওয়া যায়নি, কিন্তু রক্তের দাগগুলো আজও উঠেনি।”
নুসরাত অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল। “কিন্তু বাবা, পুলিশ? তারা কিছু বলেনি?”

তার বাবা হালকা হেসে বললেন, “পুলিশ? তারা কখনো এই বাড়ির ইতিহাস জানতে পারেনি। কারণ মৃতরা কথা বলে না, কিন্তু এই বাড়ির দেয়াল বলে।”
ঠিক তখনই, এক বিকট আওয়াজে জানালার কাচ ভেঙে গেল। ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে এক অদৃশ্য শক্তি ঘরে প্রবেশ করল। বাতি ফ্ল্যাশ করে নিভে গেল।

নুসরাত চোখের সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু অনুভব করল, কেউ একজন ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
তার বাবার কণ্ঠ কাঁপছিল, “নুসরাত, যে-ই হোক না কেন, আজ রাতে সে আমাদের পরীক্ষা নেবে।”

নুসরাতের শ্বাস আটকে আসছিল। তার কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিস করে বলল, “আমাকে খুঁজে বের করো… নুসরাত…”
তার সারা শরীর শিউরে উঠল। সে আলো জ্বালাতে ছুটে গেল, কিন্তু সুইচ কাজ করল না। ঘরের ভেতর ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
তার বাবা টেবিলের নিচ থেকে একটা পুরনো লাল খাম বের করলেন। “এটা তোমার দাদার শেষ চিঠি।”
নুসরাত কাঁপা হাতে খামটা খুলল। ভেতরে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ। তাতে লেখা ছিল:
“আমার মৃত্যু অকারণ নয়। সে ফিরে আসবে। আমাদের রক্তেই তার মুক্তি।”

নুসরাতের কণ্ঠ আটকে গেল। “এটা কী মানে, বাবা?”
তার বাবা কিছু বললেন না। শুধু ধীরে ধীরে ঘরের দরজার দিকে তাকালেন। দরজার নিচ দিয়ে আবার সেই কালো ছায়াটা ভেতরে ঢুকতে থাকে।
“সে এখানে আছে,” তার বাবা ফিসফিস করে বললেন।
তারপরই বাতাসে ভেসে এলো এক নারীর গলায় চাপা হাসি।
নুসরাত জানত, এই রাতে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এমনকি সে পালাতেও পারবে না।

হঠাৎ ঘরের বাতি আবার দপ করে জ্বলে উঠল। কিন্তু আলোটা ছিল অস্বাভাবিক লালচে। নুসরাতের বুক ধকধক করছিল।
তার বাবার কণ্ঠ আরেকবার শোনা গেল, এবার আরো চাপা স্বরে, “নুসরাত, দৌড়াও!”

ঠিক তখনই, দরজার নিচ দিয়ে ঢুকে আসা কালো ছায়াটা আকার নিতে শুরু করল। সেটার চোখ দুটো অগ্নির মতো জ্বলছিল, আর মুখে ছিল এক বিভৎস হাসি।
নুসরাত বুঝতে পারছিল না, কী করবে। কিন্তু সে জানত, আজ রাতেই তার পরিবারের রক্তের ইতিহাসের সমাপ্তি বা নতুন কিছু শুরু হতে চলেছে।

সে সিদ্ধান্ত নিল—সে লড়বে, অথবা সব কিছু শেষ হয়ে যাবে।
নুসরাতের চোখে অন্ধকার নেমে এলো। বাবার কণ্ঠ যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
“তুমি কি কখনো অনুভব করেছো, রাতের গভীরে কেউ আমাদের তাকিয়ে দেখে?”
নুসরাত গলাটা পরিষ্কার করে বলল, “বাবা, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”

তার বাবা জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। কাঁচের ওপরে একটা হাতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, ধীরে ধীরে, যেন কেউ জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।
“ওরা ফিরে এসেছে, নুসরাত। আমাদের অতীতের জন্য, আমাদের রক্তের জন্য।”

তারপরই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল এক নারীর হাসি—ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ, এবং অচেনা।
নুসরাতের পুরো শরীর শিউরে উঠল।

নুসরাত দৌড়ে বাবার কাছে গেল। “বাবা, ওরা কারা? তুমি কেন এত ভয় পাচ্ছো?”
তার বাবা চুপ। তারপর আস্তে করে বললেন, “তোমার দাদার মৃত্যুর পরে, এই বাড়ির এক অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তুমি কখনো ওদিকটায় যাওনি, তাই না?”
নুসরাত মাথা নেড়ে না বলল।

“আজ সময় এসেছে। তুমি ওখানে যেতে বাধ্য হবে।”
তার বাবা ধীরে ধীরে তাকালেন বাড়ির পেছনের লাল দরজার দিকে, যা অনেক বছর ধরে বন্ধ ছিল।
এক ঝলক বাতাস এসে দরজাটা কাঁপিয়ে তুলল।
তারপরই দরজার ওপাশ থেকে শোনা গেল কারো ফিসফিস কণ্ঠ:
“নুসরাত… তুমি কি আমাকে মনে রেখেছো?”
নুসরাত এক ধাপ পিছিয়ে গেল। তার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল। দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠটা পরিচিত! কিন্তু কাউকে মনে পড়ছে না।

বাবা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন, হাত বাড়িয়ে তালা খুলতে গিয়েই থমকে গেলেন।
“তুমি কি সত্যিই প্রস্তুত?” তিনি ফিসফিস করে বললেন।
নুসরাত কিছু বলতে পারল না। দরজার ফাঁক দিয়ে একটা ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এলো। বাতাসে লোহা আর কাঁচের গন্ধ।
তারপরই একটা হাত ধীরে ধীরে ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো—চিকন, কঙ্কালের মতো, আর তাতে লালচে দাগ ! হাতটা দরজার ফ্রেম শক্ত করে চেপে ধরল।
নুসরাতের শরীর অবশ হয়ে গেল।

“দরজা বন্ধ করো!” বাবা চিৎকার করলেন।
কিন্তু দরজা এমনিতেই বন্ধ হয়ে গেল। সেই হাতটা যেন এক মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বাতাসে আবার সেই নারীর হাসি শোনা গেল। “এটা তো কেবল শুরু, নুসরাত…”

নুসরাত বাবার দিকে তাকাল। “বাবা, এটা কে?”
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তোমার খালা।”
নুসরাতের চোখ বিস্ফারিত হলো। “আমার খালা?”
বাবা জানালার দিকে তাকালেন। “ও মারা গেছে। তবু, সে ফিরে এসেছে।”
নুসরাতের মনে পড়ল, শৈশবে তার মা তাকে বলেছিলেন, মায়ের এক বড় বোন ছিল, যিনি এক রাতে নিখোঁজ হয়ে যান। তার লাশ কখনো পাওয়া যায়নি।

তারপর? কেউ আর তার কথা বলেনি।
কিন্তু সে কি সত্যিই মারা গিয়েছিল? নাকি লাল দরজার ওপারে বন্দী ছিল?

নুসরাতের মনে হলো, রাতটা আরও গভীর হয়ে এলো।
নুসরাতের গলা শুকিয়ে গেল। বাবার কথাগুলো তাকে আরও দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলছিল।
“কিন্তু বাবা, যদি তিনি মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে ফিরে আসছেন কীভাবে?”
বাবা তার দিকে তাকালেন, চোখে গাঢ় দুশ্চিন্তা। “সব মৃত্যু প্রকৃত মৃত্যু নয়, নুসরাত। কিছু মৃত্যু থেকে ফেরত আসা যায়, যদি কোনো অসমাপ্ত কাজ থেকে যায়।”
নুসরাত শ্বাস নিতে পারছিল না ঠিকমতো। দরজার ওপাশ থেকে এবার চাপা কান্নার শব্দ আসতে লাগল। কাঁপা কণ্ঠে কেউ বলল, “আমি মুক্তি চাই…”

হাতের তালা এবার নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটি অবয়ব—চোখদুটো ফাঁকা, ঠোঁট নীলচে, এবং গায়ের চামড়া পচনের লক্ষণ দেখাচ্ছে।
নুসরাত আর্তনাদ করে পেছনে সরে গেল। বাবা সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“তুমি কে?” তিনি দৃঢ় গলায় বললেন।
নারী অবয়বটি ধীরে ধীরে হাসল। “আমাকে চিনতে পারছো না, দুলাভাই?”
বাবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“তাহলে, তুমি সত্যিই বেঁচে আছো…”
নারীটি সামনে এগিয়ে এলো, তার হাড়গোড়ের মতো হাতটা বাড়িয়ে দিল। “না, আমি মরে গিয়েছি। কিন্তু আমার আত্মা এখানে রয়ে গেছে, যতক্ষণ না আমি প্রতিশোধ নিচ্ছি।”

নুসরাতের শরীর জমে গেল। “প্রতিশোধ?”
নারীটি এবার কেঁদে উঠল। “হ্যাঁ, প্রতিশোধ! আমার খুনি এখনো বেঁচে আছে!”
বাতাসের ভেতর আবার সেই চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল, এবার আরও গাঢ় আর ভয়ংকর।
“তুমি জানো না, কিন্তু তুমি এর অংশ, নুসরাত…”
বাবার মুখে ভয় ফুটে উঠেছে। তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
“আমরা এই রাতের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, নুসরাত।”
নুসরাত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “মানে?”

বাবা জানালার দিকে ইশারা করলেন। সেখানে কুয়াশার মধ্যে লাল দরজার অবয়ব ফুটে উঠেছে। দরজাটির কাঠ রক্তমাখা, যেন বহু বছর ধরে জমে থাকা শুষ্ক রক্তে ঢেকে আছে।
“ওপারে কে আছে?” নুসরাত ফিসফিস করে বলল।
“তোমার অতীত।” বাবা চুপচাপ বলে উঠলেন।
দরজার ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ এলো। নারীকণ্ঠ, গভীর যন্ত্রণায় ভরা।
“আমাকে মুক্ত করো…”

নুসরাতের শরীর কাঁপতে লাগল। দরজার ওপাশের কণ্ঠস্বরে তার হৃদয় কেঁপে উঠল।
“ওই কণ্ঠ… আমি যেন চিনি?” সে বাবার দিকে তাকাল।
বাবা চোখ নামিয়ে নিলেন। “তুমি ওকে দেখেছ, নুসরাত।
তোমার স্বপ্নে, তোমার দুঃস্বপ্নে।”
নুসরাতের মনে পড়ল। সেই ছোটবেলায়, যখন সে একা একা ঘুমোতো, মাঝরাতে তার কানে একটা নারীকণ্ঠ ফিসফিস করতো।
“আমাকে মুক্ত করো…”
তখন সে বুঝত না, ভয় পেত। আজও ঠিক তেমনই অনুভূতি হচ্ছে।

আচমকা দরজার কবজা নিজে থেকেই খসে পড়ল। বাতাস ভারী হয়ে উঠল, যেন চারপাশ থেকে কেউ শ্বাস নিচ্ছে।
বাবা পেছনে সরে গেলেন। “দরজা খুলে যাচ্ছে…”
নুসরাতের নিঃশ্বাস আটকে রইল। দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো দুটি রক্তাক্ত হাত। তারপর ধীরে ধীরে আবারও এক নারীর অবয়ব বেরিয়ে এলো।

তার চোখ দুটি একেবারে শূন্য। ঠোঁটে অস্বাভাবিক হাসি।
সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“নুসরাত… তুমি কি সত্যিই প্রস্তুত, কে তোমার আসল শত্রু ?”
নুসরাতের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হতে চলেছে সে…

নুসরাত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নারীর রক্তাক্ত চোখ সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“তুমি কে?” নুসরাত ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞাসা করল।
নারীটি হাসল, ঠোঁটে অদ্ভুত ব্যঙ্গাত্মক অনুভূতি। “তুমি আমায় ভুলে গেছো, তাই না? অথচ তোমার মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলাম আমি।”

নুসরাতের শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। তার মা? তার মায়ের সাথে এই নারীর কী সম্পর্ক?
“তুমি কি জানো, নুসরাত, আমি কে?”
চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎই দেয়ালের আয়নাগুলো কেঁপে উঠল, যেন সেগুলো ফেটে যেতে চাইছে। নারীর চোখ এক মুহূর্তের জন্য আগুনের মতো জ্বলজ্বল করল।
“তোমার মা আমাকে হত্যা করেছিল, নুসরাত! আমাকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হতে হয়েছিল।”

নুসরাতের শ্বাস আটকে এলো। সত্য আস্তে আস্তে তার সামনে স্পষ্ট হতে লাগল। কিন্তু সে জানত,খুনটা করেছিল তার দাদী। আজ জানছে, দাদী নয় তার মা। কেমন যেন সব উল্টাপাল্টা হয়ে যাচ্ছে…

বাতাসে একটি কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। নুসরাত দেখল, তার সামনে সময়ের পর্দা উঠে যাচ্ছে।
সে দেখতে পেল, একটি পুরনো দিনের দৃশ্য। তার মা, তখন তরুণী, এক নারীর সাথে দাঁড়িয়ে আছেন।
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, আমিরা!” সেই নারী আর্তনাদ করল। “কিন্তু তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছো!”
তার মা পিছিয়ে গেলেন। “আমি কিছুই করিনি, আমি শপথ করছি।”
কিন্তু সেই নারী ভয়ানক ক্রোধে কেঁপে উঠল। “তুমি আমাকে মরতে দিয়েছো! তুমি আমার সন্তানকে কেড়ে নিয়েছো!”
এক মুহূর্তের মধ্যে, দৃশ্যটি অন্ধকার হয়ে গেল। নুসরাত কেঁপে উঠল।
তার মা কি সত্যিই কাউকে হত্যা করেছিলেন? এই নারীর সাথে তার মায়ের সম্পর্ক কী?

নারীটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। “তোমার মা যা করেছিল, তার মূল্য তোমাকে দিতে হবে, নুসরাত।”
নুসরাত মাথা নাড়ল। “না! আমার মা ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি কাউকে হত্যা করতে পারেন না!”
নারীটি হাসল। “তাহলে তুমি কি প্রমাণ চাও?”
এক মুহূর্তের মধ্যে, নুসরাত নিজেকে একটি পুরনো বাড়িতে দেখতে পেল। এটি তার দাদির পুরনো বাড়ি! সেখানে মাটির নিচে কিছু যেন লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
নারীটি ফিসফিস করে বলল, “সত্য খুঁজে বের করো, নুসরাত।”

নুসরাত বাড়িটির পুরনো আঙিনায় এসে দাঁড়াল। মাটি খুঁড়ে সে কিছু একটা বের করল—একটি পঁচা কাঠের বাক্স।
হাত কাঁপতে কাঁপতে সে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে একটি নারীর কঙ্কাল! আর তার সাথে একটি চিঠি।
“আমিরা, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। তুমি আমার সন্তানকে কেড়ে নিয়েছো। তুমি আমার জীবন নষ্ট করেছো। আমি প্রতিশোধ নিয়ে ফিরে আসব।”
নুসরাতের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। তার মা কি সত্যিই এই নারীর সন্তান কেড়ে নিয়েছিলেন?
নারীটি এবার নুসরাতের দিকে এগিয়ে এল। “তুমি জানো, এই কঙ্কাল কার?”

নুসরাত মাথা নাড়ল।
“এটা আমার, নুসরাত। তোমার মা আমায় হত্যা করেছিল।”
বাতাস ভারী হয়ে উঠল। নারীর কণ্ঠস্বর গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠল। “এখন আমি তোমার কাছে এসেছি, তোমার শরীর, তোমার জীবন কেড়ে নিতে!”
নুসরাত চিৎকার করে পেছনে সরে গেল।

“তুমি আমার শরীরে আসতে পারবে না!” নুসরাত চিৎকার করল।
নারীটি হাসল। “আমি পারব। কারণ তুমি আমারই রক্তের একজন।”
নুসরাত হতভম্ব হয়ে গেল। “তুমি কি বলছো?”
“তোমার মা আমাকে হত্যা করেছিল, কিন্তু আমার আত্মা তোমার মাঝে বেঁচে আছে। তুমি আমারই অংশ, নুসরাত!”
নুসরাত কাঁপতে লাগল। সত্য যেন তার অস্তিত্বকে গিলে ফেলছে।

নুসরাত বুঝতে পারল, সে আর স্বাভাবিক নেই। তার শরীরের ভিতরে অন্য এক শক্তি বিরাজ করছে।
তার হাত কাঁপতে কাঁপতে রক্তে ভিজে যেতে লাগল।
“আমার অস্তিত্ব তোমার মধ্যেই আছে, নুসরাত। তুমি কখনো মুক্তি পাবে না।”

নুসরাত চিৎকার করে উঠল। তার ভিতরের ছায়াটি তাকে গ্রাস করছে।
সে পালাতে চাইল, কিন্তু পারল না। তার শরীর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
তার চারপাশে ধোঁয়া ঘিরে ধরেছে। নারীর রক্তাক্ত হাত এবার তাকে ধরে ফেলেছে।
“তোমার আত্মা এখন আমার, নুসরাত।”
শেষ মুহূর্তে, নুসরাত নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। তার মুখে সেই নারীর শূন্য দৃষ্টি।

সে নিজেই এখন সেই নারী হয়ে গেছে।
এটাই হওয়ার কথা ছিল। নুসরাত যাকে মা বলে জানত,সে আসলে তার খালা ছিল। তার দাদা-দাদী, বাবা আর খালা মিলে তার মাকে হত্যা করে। নুসরাত তখন ছয় মাসের শিশু।
নুসরাতের মায়ের সাথে তার বাবার বিয়ে হলেও বাবা খালাকেই পছন্দ করত। সেই ভালোলাগা-ভালোবাসা নুসরাতের জীবনে অভিশাপ হয়ে বেড়ে ওঠে।

পরদিন, সবাই দেখল, নুসরাত নিখোঁজ হয়ে গেছে।
বাড়ির দরজা খোলা। বাতাস ভারী।
তার বাবা তাকিয়ে আছেন দরজার দিকে।
এক মুহূর্তের জন্য, তিনি দেখলেন এক নারীর ছায়া। তার চোখ দুটি একেবারে শূন্য।
নারীটি হাসল।
তারপর মিলিয়ে গেল ধোঁয়ায়…

( সমাপ্তি )

Comment