The Neurotic Personality of Our Time – Karen Horney (1937)
প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কারেন হর্নি: সমাজকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বের এক বৈপ্লবিক রূপরেখা
মনস্তত্ত্বের ইতিহাসে কারেন হর্নি (Karen Horney) এক উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র নক্ষত্র। প্রথাগত ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা ভেঙে তিনি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তাধারা মূলত মানুষের মানসিক বিকাশে সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছে।
ফ্রয়েডীয় মতবাদের বিবর্তন ও হর্নির সামাজিক দর্শন
সিগমুন্ড ফ্রয়েড যেখানে মানুষের আচরণ ও মনস্তত্ত্বকে মূলত জৈবিক ও সহজাত প্রবৃত্তি (Biological Determinism) দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন, হর্নি সেখানে দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, মানুষের মানসিক অস্থিরতা বা নিউরোসিস (Neurosis) কোনো সহজাত জৈবিক ত্রুটি নয়; বরং এটি শৈশবের প্রতিকূল সামাজিক পরিবেশ এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের ফসল। একটি শিশু যখন তার বিকাশের স্তরে নিরাপত্তা বা ভালোবাসার অভাব বোধ করে, তখনই তার মধ্যে গভীর হীনমন্যতা ও মানসিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
আত্মরক্ষার ত্রিবিধ কৌশল: নিউরোটিক প্রবণতা
হর্নি মানুষের এই মানসিক অস্থিরতা থেকে উত্তরণের বা আত্মরক্ষার প্রচেষ্টাকে তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত করেছেন:
অন্যের প্রতি অনুগত হওয়া (Moving Toward People): ভালোবাসা এবং গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে অন্যের কাছে সমর্পণ করা।
আগ্রাসী মনোভাব (Moving Against People): জগতকে বৈরী মনে করে আধিপত্য বিস্তার বা ক্ষমতার মাধ্যমে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা।
নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া (Moving Away From People): মানসিক আঘাত থেকে বাঁচতে সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে একাকীত্ব বরণ করা।
নারী মনস্তত্ত্ব ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজ
নারী মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণে কারেন হর্নি এক সাহসী ও অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন। ফ্রয়েডের ‘পেনিস এনভি’ (Penis Envy) তত্ত্বকে নাকচ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, নারীদের মধ্যে পরিলক্ষিত হীনমন্যতা কোনো জৈবিক কারণ নয়, বরং এটি দীর্ঘকাল ধরে চলা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাঠামোগত বৈষম্যের ফল। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে নারীবাদী মনস্তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা ও আত্মসচেতনতা
আধুনিক সাহিত্যে হর্নির তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ দেখা যায় চরিত্র নির্মাণের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে। তাঁর রচিত কালজয়ী গ্রন্থগুলো আজও বিশ্বজুড়ে পাঠকদের ব্যক্তিগত উন্নয়ন, আত্মোপলব্ধি এবং সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে।
কারেন হর্নির মনস্তাত্ত্বিক দর্শন মূলত মানবিক ও সমাজকেন্দ্রিক। তিনি মানুষকে কেবল জৈবিক সত্তা হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচার করেছেন। তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে আজও অসংখ্য মানুষ নিজের মানসিক জটিলতা কাটিয়ে আত্মসচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের সন্ধান পাচ্ছে।
জীববিজ্ঞান বনাম সংস্কৃতি (Biology vs. Culture): ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে মানুষের অনুভূতি এবং আচরণ জন্মগত জৈবিক প্রবৃত্তি (biological instinct) বা যৌন তাড়নার দ্বারা পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, হরনি মনে করতেন যে মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং মানসিকতা মূলত তার সমাজ, সংস্কৃতি এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দ্বারা গঠিত হয়, এটি কোনো জৈবিক উত্তরাধিকার নয়।
নারীর মনস্তত্ত্ব এবং ‘পেনিস এনভি’ (Psychology of Women): ফ্রয়েড ‘পেনিস এনভি’ (penis envy) তত্ত্বের মাধ্যমে দাবি করেছিলেন যে নারীরা শারীরবৃত্তীয় বা জৈবিকভাবে নিজেদের পুরুষদের চেয়ে হীন মনে করে। তিনি আরও মনে করতেন নারীরা স্বভাবগতভাবেই বেশি ম্যাসোকিস্টিক (masochistic)। হরনি এর তীব্র বিরোধিতা করে বলেন যে নারীরা পুরুষের শারীরিক কাঠামোর প্রতি নয়, বরং সমাজে পুরুষদের ক্ষমতা ও সুবিধার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়। তিনি পালটা ‘উম্ব এনভি’ (womb envy) তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, যেখানে বলা হয় পুরুষরা নারীর সন্তান জন্মদানের ক্ষমতার প্রতি মানসিক ঈর্ষা অনুভব করে এবং সমাজে আধিপত্য বিস্তার ও সাফল্যের মাধ্যমে তার ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করে।
নিউরোসিসের মূল কারণ (Root of Neurosis): ফ্রয়েড নিউরোসিসকে অবদমিত যৌনতা এবং জৈবিক প্রবৃত্তির সাথে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু হরনি প্রস্তাব করেন যে নিউরোসিসের মূল কারণ হলো ‘বেসিক অ্যাংজাইটি’ (basic anxiety), যা শৈশবে ত্রুটিপূর্ণ সম্পর্ক এবং মানসিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে জন্ম নেয়।
মানব প্রকৃতি ও সম্ভাবনা (Human Nature and Potential): ফ্রয়েডের মানব প্রকৃতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বেশ নৈরাশ্যবাদী; তিনি মনে করতেন মানুষ আত্ম-উপলব্ধি (self-actualization) এড়িয়ে চলতে চায় এবং তাদের সমস্যাগুলোকে অবদমিত করে রাখে। এর বিপরীতে হরনির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আশাবাদী; তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ভালো হওয়ার এবং বিকশিত হওয়ার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে এবং মানুষ স্বভাবতই আত্ম-উপলব্ধির সন্ধান করে।
থেরাপি এবং বর্তমান বনাম অতীত (Therapy and Present vs. Past): ফ্রয়েডের মতে বর্তমানের যেকোনো আচরণকে অবশ্যই অতীতের (বিশেষ করে শৈশবের) আলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং থেরাপির সময় রোগীরা থেরাপিস্টের সাথে অতিমাত্রায় জড়িয়ে গিয়ে প্রেমে পড়ে যায়। হরনি অতীতের পরিবর্তে রোগীর বর্তমান আচরণ বিশ্লেষণের ওপর বেশি জোর দেন এবং থেরাপিস্টকে জীবন মোকাবেলায় সাহায্যকারী একজন সাধারণ পথপ্রদর্শক বা সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করেন।
আবেগ বনাম ইগো (Emotion vs. Ego): হরনি মনে করতেন মানুষ সামগ্রিকভাবে আবেগীয় শক্তির দ্বারা চালিত হয়। কিন্তু ফ্রয়েড মনে করতেন ‘ইগো’ (ego) হলো মূল স্রোত যা মানুষের সমস্ত আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ক্যারেন হর্নি মনে করতেন যে শৈশবের মানসিক নিরাপত্তাহীনতা, অবহেলা এবং ত্রুটিপূর্ণ সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট ‘বেসিক অ্যাংজাইটি’ বা মৌলিক উদ্বেগ মোকাবেলার জন্য মানুষ কিছু আচরণগত কৌশল তৈরি করে। এই কৌশলগুলো যখন অত্যধিক মাত্রায়, অবাস্তব এবং অনমনীয়ভাবে প্রকাশ পায়, তখন সেগুলোকে তিনি ‘নিউরোটিক প্রয়োজন’ (neurotic needs) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
হর্নির মতে মোট ১০টি নিউরোটিক প্রয়োজন রয়েছে, যেগুলোকে তিনি উদ্বেগ মোকাবেলার ৩টি প্রধান কৌশলের অধীনে বিভক্ত করেছেন:
ক. মানুষের দিকে ধাবিত হওয়া বা বিনয়ী কৌশল (Moving Toward People / Compliance): এই কৌশলের অধীনে থাকা ব্যক্তিরা নিরাপত্তাহীনতা কাটাতে অন্যদের অনুমোদন ও ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করে। এর অন্তর্ভুক্ত প্রয়োজনগুলো হলো: ১. স্নেহ এবং অনুমোদনের প্রয়োজন (The need for affection and approval): সবার কাছে প্রিয় হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা, সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানের প্রতি চরম সংবেদনশীলতা এবং দ্বন্দ্ব এড়াতে নিজের রাগ চেপে রাখা। ২. নিয়ন্ত্রণকারী সঙ্গীর প্রয়োজন (The need for a partner): একা থাকার তীব্র ভয় থেকে নিজের জীবনের সমস্ত সমস্যা সমাধান এবং নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সঙ্গীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়া। ৩. জীবনকে সংকীর্ণ সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন (The need to restrict life practices): সবার অলক্ষ্যে বা আড়ালে থাকার প্রবণতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এড়িয়ে চলা, নিজের প্রতিভাকে অবমূল্যায়ন করা এবং প্রত্যাখ্যান এড়াতে নিজের চাহিদা একদম কমিয়ে রাখা।
খ. মানুষের বিরুদ্ধে ধাবিত হওয়া বা আক্রমণাত্মক কৌশল (Moving Against People / Aggression): এই ধরণের ব্যক্তিরা নিরাপত্তাহীনতা ঢাকতে অন্যদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। এর অন্তর্ভুক্ত প্রয়োজনগুলো হলো: ৪. ক্ষমতার প্রয়োজন (The need for power): অন্যদের নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য করার তীব্র ইচ্ছা এবং অন্যের দুর্বলতার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা। ৫. অন্যদের শোষণ করার প্রয়োজন (The need to exploit others): ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যদের ব্যবহার করার প্রবণতা এবং নিজে শোষিত হওয়ার ভয়ে আগে থেকেই অন্যদের প্রতারিত করার চেষ্টা। ৬. সামাজিক স্বীকৃতি বা মর্যাদার প্রয়োজন (The need for social recognition): নিজের মূল্যকে পুরোপুরি জনসমক্ষে পরিচিতি বা সামাজিক অবস্থানের সাথে যুক্ত করা এবং সম্মানহানির সামান্যতম ইঙ্গিতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়া। ৭. ব্যক্তিগত প্রশংসার প্রয়োজন (The need for personal admiration): নিজের গুণাবলি সম্পর্কে অন্যদের কাছে একটি অতিরঞ্জিত বা অবাস্তব প্রশংসার প্রত্যাশা করা। ৮. ব্যক্তিগত অর্জনের প্রয়োজন (The need for personal achievement): ব্যর্থ হওয়ার ভয়ে প্রতিনিয়ত সফল হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করা, যেখানে কোনো সাফল্যই তাদের কাছে যথেষ্ট মনে হয় না।
গ. মানুষ থেকে দূরে সরে যাওয়া বা বিচ্ছিন্ন কৌশল (Moving Away from People / Withdrawal): মানসিক আঘাত বা দ্বন্দ্ব এড়াতে এই ধরণের ব্যক্তিরা নিজেদের অন্যদের থেকে গুটিয়ে নেয়। এর অন্তর্ভুক্ত প্রয়োজনগুলো হলো: ৯. স্বনির্ভরতা এবং স্বাধীনতার প্রয়োজন (The need for self-sufficiency and independence): কারো ওপর নির্ভরশীল না হওয়ার তীব্র তাগিদ, অন্যদের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা এবং মানসিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখা। ১০. নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন (The need for perfection): নিজের কোনো ত্রুটি বা ভুল থাকার প্রবল ভয়, ক্রমাগত আত্ম-সমালোচনা এবং প্রত্যাখ্যান এড়াতে সবসময় নিখুঁত হওয়ার নিরলস চেষ্টা।
হর্নির মতে, স্নেহ এবং ক্ষমতার প্রয়োজন—এই দুটি হলো নিউরোসিসের সবচেয়ে প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিটি সুস্থ মানুষের মধ্যেই এই প্রয়োজনগুলোর কিছু কিছু থাকতে পারে, কিন্তু একজন নিউরোটিক ব্যক্তি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনকে অবাস্তব ও অনমনীয়ভাবে আঁকড়ে ধরেন, যার ফলে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক এবং মানসিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
কারেন হর্নি নারীবাদী মনোবিজ্ঞানের (Feminist Psychology) অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। নারী মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান অবদানগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
ফ্রয়েডের জীববৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রত্যাখ্যান ও সংস্কৃতির ওপর জোর: হর্নি সিগমুন্ড ফ্রয়েডের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কড়া সমালোচনা করেন এবং নারী মনস্তত্ত্বকে জন্মগত জীববিজ্ঞানের (biology) বদলে সমাজ ও সংস্কৃতির (culture) আলোকে ব্যাখ্যা করেন। ফ্রয়েড দাবি করেছিলেন যে নারীরা ‘পেনিস এনভি’ (penis envy) বা শারীরিক অভাবজনিত কারণে জন্মগতভাবেই হীনম্মন্যতায় ভোগে। এর তীব্র বিরোধিতা করে হর্নি বলেন যে, নারীদের এই হীনম্মন্যতা জৈবিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের ফল। তাঁর মতে, নারীরা পুরুষের শারীরবৃত্তীয় গঠনের প্রতি নয়, বরং সমাজে পুরুষদের যে ক্ষমতা, সুবিধা এবং আধিপত্য রয়েছে তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়।
‘উম্ব এনভি’ (Womb Envy) বা গর্ভ-ঈর্ষা তত্ত্ব: ফ্রয়েডের তত্ত্বের পালটা হিসেবে হর্নি ‘উম্ব এনভি’ তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, পুরুষরা নারীর সন্তান ধারণ ও নতুন জীবন সৃষ্টির ক্ষমতার প্রতি মানসিক ঈর্ষা অনুভব করে। যেহেতু পুরুষরা প্রাকৃতিকভাবে এই সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারী নয়, তাই তারা এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কর্মক্ষেত্রে সাফল্য, সমাজে আধিপত্য বিস্তার এবং অন্যান্য বাহ্যিক অর্জনের দিকে প্রবলভাবে চালিত হয়।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও নারীর নিউরোসিস: হর্নি তৎকালীন মনঃসমীক্ষকদের এই ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেন যে নারীরা স্বভাবগতভাবেই ম্যাসোকিস্টিক (masochistic) বা আত্ম-নির্যাতনকারী। তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং প্রথাগত লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা (gender roles) নারীদের মধ্যে নির্ভরতা, অযোগ্যতা এবং আত্ম-সন্দেহের অনুভূতি তৈরি করে, যা পরবর্তীতে নিউরোটিক আচরণের রূপ নেয়। অর্থাৎ, নারীদের এই আচরণগত দুর্বলতাগুলো জন্মগত নয়, বরং এটি প্রতিকূল সামাজিক পরিবেশ এবং পুরুষতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি কৌশল।
বিবাহ ও নারী পরিচয়ের পুনর্মূল্যায়ন: হর্নি সেকেলে ভিক্টোরিয়ান যুগের বিয়ের আদর্শকে বাস্তবসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং সমালোচনা করে বলেন যে, তৎকালীন সমাজে নারীদের নিজস্ব কোনো মূল্য ছিল না, তাদের মূল্য শুধুমাত্র সন্তান ও পরিবারের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হতো। তিনি পুরুষদের মাপকাঠিতে নারীসত্তাকে বিচার করার প্রথা ভেঙে নারীদের নিজস্ব মানসিক পরিচয়ের স্বীকৃতি দেন।
১৯২২ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে নারী মনস্তত্ত্ব নিয়ে তিনি যে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তা তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৬৭ সালে ‘ফেমিনিন সাইকোলজি’ (Feminine Psychology) নামক বইয়ে সংকলিত হয়। তাঁর এই যুগান্তকারী কাজগুলো পরবর্তীতে ন্যান্সি চোডোরো, ক্যারল গিলিগান এবং জেসিকা বেঞ্জামিনের মতো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীবাদী মনোবিজ্ঞানীদের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
লেখক – মাধব রায়

