Koel Talukdar

অণুগল্প – নিউ স্টার অপেরা
লেখক – কোয়েল তালুকদার

মনটা কখনও কখনও ভবঘুরে মন হয়ে ওঠে। কোনও কিছু ভাল লাগে না। কারোর মায়াও কাছে টানে না। কিন্ত পথ আমাকে টেনে নিয়ে যায়। উদাস হয়ে ঘুরতে মন চায় পথে পথে, খেয়া ঘাটে। নদীতে নদীতে, নৌকায় নৌকায় । মন চায় কোনও সার্কাস দলের কিংবা কোনও যাত্রা দলের গায়েন হতে। যদি রাত্রি নিশীথে মঞ্চের পালায় গান গাইতে পারতাম!

অনেক বছর আগে এক শ্রাবণ বর্ষা মৌসুমে আমাদের গ্রামের হাটের পাশে সার্কাস পার্টি এসেছিল। নাম ‘ নিউ স্টার সার্কাস অপেরা’। প্রায় একমাস ছিল তারা আমাদের গ্রামে। তখন ছিল আমার তারুণ্যের প্রথম প্রহরের সময়। প্রায় প্রতিদিন যেতাম, ঐ সার্কাস দেখতে। কি প্রবল আকর্ষণে টেনে নিয়ে যেত আমাকে। সার্কাস দেখানোর পাশাপাশি গান হতো, নাচ হতো, কৌতুক হতো, হাতির খেলা হতো সেখানে।

ঐ সার্কাস দলে তেরো চৌদ্দ বছরের একটি বালিকা এসেছিল। সে ঘাগড়া পরে নাচত। গানও গাইত। আবার সার্কাসের বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ এর খেলা দেখাত সে। ওর এই চৌকস খেলা আমাকে ভীষণরকম মুগ্ধ করেছিল। ঐ মেয়ের অদ্ভুত সব গুণ দেখে সেদিনের এক গ্রাম্য সরল বালক সার্কাসের ঐ বালিকার ভক্ত হয়ে উঠেছিল।

তখন সেই বর্ষার দিনে নৌকায় করে স্কুলে যেতাম। ছলাৎছলাৎ বৈঠার শব্দ হতো জলে। কাঠের পাটাতনের উপর চুপচাপ বসে থাকতাম। জলের নুপুরে ঐ সার্কাস বালিকার ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পেতাম। মরা গাঙে তখন বানের জলে ভরে যেত। পামোসা মাঝি জাল পেতে রাখত মাছ ধরার জন্য। পাটের জাঁকের উপর বসে থাকত ধবল বক। মাথার উপরে উড়ত গাংচিল। ওদের চ্রিহি চ্রিহি ডাকের মধ্যে আমি শুনতে পেতাম সার্কাসের ঐ বালিকার গান আর যন্ত্রী দলের খুঞ্জরীর শব্দ।

মন প্রফুল্ল হতো কিনা বুঝতে পারতাম না। পুকুর পাড়ের কদম গাছ থেকে কদম ফুল ছিঁড়ে পুকুরের জলে ভাসিয়ে দিতাম। উজান থেকে নৌকাগুলো বাদাম তুলে চলে যেত দক্ষিণের গঞ্জে। মাঝি মল্লারও গান গাইত ভাটিয়ালী সুরে সুরে। কিন্তু সব গান আর সব সুর থেমে যেত সার্কাস দলের ঐ বালিকার গানে। জলে কদম ভাসানোর সময় মনে হতো, এর একটি ফুল তো নিতে পারত ঐ দিগবালিকা।

কাউকে কিছুই বলা হয়নি আর। ভাবতাম, লেখাপড়া করে কি লাভ হবে? তারচেয়ে আমি যদি গায়েন হতে পারতাম। যদি যোগ দিতে পারতাম ঐ সার্কাস দলে। জীবনটা কত সুন্দরই না হতো। বালিকাও তো শুনত আমার গান! দ্বৈত সঙ্গীত গাইতাম যাত্রার পালায়। জীবনের স্বপ্নগুলো পূর্ণতা পেত সার্কাসের আনন্দময় সঙ্গীত নিশীথে।

সেইদিন শ্রাবণ আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল। আমাদের বাড়ির রাখাল সমির আলি ছোট নৌকায় করে আমাকে নিয়ে যায় সার্কাস প্যান্ডেলে। হেজাক বাতির আলো জ্বলছিল ভিতরে চারিধার। যন্ত্রী দলের কেউ একজন ৰাঁশিতে সুর তুলল, তবলায় তাল দিচ্ছিল তবলচি। হারমোনিয়াম বেজে উঠল। সেদিনও বালিকা গান গাইল প্রাণ ভরে। নাচল নুপুরের ঝুমঝুম শব্দ তুলে। প্যান্ডেলের বাইরে ছিল পূর্ণিমার চাঁদ। নৌকায় আসার সময় বাইরে দেখে এসেছিলাম জ্যোৎস্নায় ভাসছে আকাশ। আমি জানতাম না, সেই রাত ছিল বালিকার শেষ রাত। জানতাম না সেইটি হবে আমার বালিকার কাছ থেকে শেষ গান শোনার।

পরের দিন দুপুরের পর সার্কাস দলটি বড় পানসী নৌকা করে চলে যায় অন্য আরেক ঘাটে। বিকেলে যখন মাঠের ঐ সার্কাস প্যান্ডেলটি দেখতে যাই, দেখি — 8সেখানে কোনও সামিয়ানা টানানো নেই। দুই একটি বাঁশের খুঁটি এলমেল হয়ে পড়ে আছে। আমার উন্মেলিত চোখ খুঁজেছিল বালিকাকে।

দেখতে পেলাম না আজ আর কাউকেই। নিঝুম বাতাসে কান পেতে থেকেছিলাম অনেকক্ষণ, সেদিন আর বালিকার কোনও ঘুঙুরের শব্দ কানে বাজলো না।

****

Comment