#পাঠপ্রতিক্রিয়া
গ্রন্থ – কবি চন্দ্রাবতীর রামায়ণ
সম্পাদনা – লিপিকা ঘোষ
প্রকাশক – কিতাবe
সম্প্রতি কিতাবe পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত ও লেখিকা শ্রীমতী লিপিকা ঘোষ সম্পাদিত ‘কবি চন্দ্রাবতীর রামায়ণ’ পড়ে শেষ করলাম। যদিও পাঠপ্রতিক্রিয়া আমি লিখতে পারি না এবং কোনদিন লিখিওনি তবুও এই বইটি সম্পর্কে দু-চার কথা লিখতে ইচ্ছে হল।
‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের বিখ্যাত লেখক ও গায়ক দ্বিজ বংশীদাসের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র কন্যা কবি চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম স্বীকৃত মহিলা কবি। রচনা করেছেন অজস্র পালাগান, ছড়া ও গীতিকা। তাঁরই এক অনন্য সৃষ্টি এই রামায়ণ। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে লিখিত এই রামায়ণ সেই সময় ও পরবর্তীকালে মৈমনসিংহ অঞ্চলে বহু গ্রাম্য বালা ও বধূর কন্ঠস্থ ছিল, এবং বিবাহ বাসর ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে পাঁচালীর ভঙ্গিতে গাওয়া হোতো। ১৯৩২ সালে অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর সম্পাদিত ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ তে এই অনুপম সৃষ্টি প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করেছিলেন।
কবি চন্দ্রাবতীর রামায়ণ আমাদের অতি পরিচিত আর পাঁচটা রামায়ণের মতো নয়। জনপ্রিয় রামায়ণগুলির থেকে আকারে ক্ষুদ্র ও অসমাপ্ত। মাত্র তিন খন্ড ও উনিশ টি অধ্যায় নিয়ে এই রামায়ণ। কবি চন্দ্রাবতী সযত্নে এড়িয়ে গেছেন রামের বীরগাথা, দীর্ঘ যুদ্ধ বর্ণনা, রামের দীক্ষা। খুব অল্প ছুঁয়ে গেছেন হরধনুভঙ্গ, অভিষেক, বনবাস, স্বর্ণমৃগ, অকালবোধন, সেতু নির্মাণ, ইন্দ্রজিৎ, রাবন ও কুম্ভকর্ণ বধের কাহিনী। এ রামায়ণ শুরুই হয়েছে লঙ্কাপুরীর শোভা, বৈভব ও রাবণের বিক্রম বর্ণনা করে। আছে মন্দোদরীর কথা ও সীতার জন্মকাহিনী। এখানে সীতা জনক রাজার কন্যা নন। তিনি রাবন ও মন্দোদরীর কন্যা। বরং বলা ভালো রাবন ও মন্দোদরীর জৈবিক সন্তান নন, তিনি মন্দোদরীর একার দৈবিক সন্তান। চন্দ্রাবতী তাঁর কাব্যে সীতার জন্মবৃত্তান্তকে এক অলৌকিক এবং নাটকীয় মোড় দিয়েছেন। চতুর্থ অধ্যায়ে সীতার সেই জন্ম-কাহিনী সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন কবি।
অপরাপর রামায়ণ রচয়িতাগণ রামের যে ঐশ্বরিক ও লার্জার দ্যান লাইফ চরিত্র চিত্রণ করেছেন কবি চন্দ্রাবতী একেবারেই সেই পথে হাঁটেননি। তাঁর রামায়ণে রাম অতি সাধারণ। তিনি আদর্শ পুরুষ নন। এমনকি এখানে রাবণের মৃত্যুর কারণ রাম নন। সীতার কারণেই যে রাবণ ধ্বংস হবেন সে কথাও চতুর্থ অধ্যায়ে সীতার জন্মকাহিনীর মধ্যেই বলা আছে। শুধুমাত্র একবারই রামকে নারায়ণ এর অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া রাম এক দুর্বল প্রেমিক, একজন হীনমন্য এবং লোকনিন্দার ভয়ে ভীত স্বামী হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন। সীতার প্রতি তাঁর অবিচার এবং অগ্নিপরীক্ষার নির্দয়তাকে চন্দ্রাবতী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। এ কাহিনী কোনো মহাকাব্যিক যুদ্ধজয়ের কাহিনি নয়, বরং সীতার বিলাপ এবং নারীর আত্মপরিচয়ের আখ্যান যা একে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী রামায়ণে পরিণত করেছে। প্রথাগত রামায়ণের বীরত্বগাথা বা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ কাটিয়ে চন্দ্রাবতী রামায়ণকে পরিবেশন করেছেন নারীত্বের গভীর সংকট ও যন্ত্রণার আখ্যান হিসেবে। বহুলাংশে একে রামায়ণ না বলে সীতায়ণ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
ভাবতে অবাক লাগে ষোড়শ শতকে বসে গ্রাম বাংলার এক মহিলা কবি রামায়ণের মতন এক জনপ্রিয় মহাকাব্যকে ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করছেন, যেখানে রামের প্রচলিত ইমেজকে বীর বা দেবতাতুল্য, ‘মর্যাদাপুরুষোত্তম’ হিসেবে নয়, বরং একজন সংশয়ী, দুর্বলচিত্ত এবং অবিচারকারী স্বামী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সম্ভবত তাঁর এই সাহিত্যিক অবদানের পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর বিয়োগান্তক অধ্যায় মিশে আছে। কিন্ত সে কাহিনী বলে আমি পাঠকের রসভঙ্গ করবো না। এই বইতেই কবি চন্দ্রাবতীর সংক্ষিপ্ত জীবনী দেওয়া আছে, আর আছে তাঁর বংশ-তালিকা ও চন্দ্রাবতী রামায়ণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। প্রত্যেক অধ্যায়ের শেষে রয়েছে শব্দার্থ। বইটির পাতার মান বেশ ভালো। প্রচ্ছদ যথাযথ বলেই আমার মনে হয়েছে। পরিশেষে শ্রীমতী লিপিকা ঘোষ ও কিতাবe পাবলিকেশন কে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এমন দুর্লভ একটি সাহিত্য সম্ভার কে কালের গর্ভ থেকে তুলে এনে দুই মলাটের মধ্যে আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। আমার মতে সমস্ত সাহিত্যপ্রেমি বাঙালি পাঠকের সংগ্রহে রাখার মতন বই এটি।
