গল্প বলার নতুন কৌশল

গল্প বলার নতুন কৌশল

মিগেল দে থের্ভান্তেস: যিনি আধুনিক উপন্যাসকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন

মিগেল দে থের্ভান্তেস সাভেদ্রা (আনুমানিক ১৫৪৭–১৬১৬) বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন লেখক। তাঁর জীবন ছিল এক রূপকথার মতো—তিনি একাধারে ছিলেন সৈনিক, ক্রীতদাস, কর সংগ্রাহক, নাট্যকার, কবি এবং ঔপন্যাসিক। জীবনের পদে পদে তিনি যেমন রোমাঞ্চের স্বাদ পেয়েছেন, তেমনই সহ্য করেছেন চরম কষ্ট। আর এই বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তৈরি করেছিলেন তাঁর জীবনের সেরা সৃষ্টি: ‘ডন কিহোতে দে লা মাঞ্চা’ (প্রথম খণ্ড ১৬০৫ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৬১৫ সালে প্রকাশিত)। দুই খণ্ডের এই বইটিকে পৃথিবীর প্রথম ‘আধুনিক উপন্যাস’ এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা বই হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি ৬০টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। নাটক, সিনেমা, ছবি ও অপেরায় একে নিয়ে অজস্র কাজ হয়েছে। ফিল্ডিং, ফ্লোবের, দস্তয়েভস্কি থেকে শুরু করে কাফকার মতো পরবর্তীকালের বিখ্যাত লেখকদের ওপর থের্ভান্তেসের প্রভাব ছিল অপরিসীম।

থের্ভান্তেস কেবল একজন পাগল যোদ্ধা আর তার সহকারীর মজার গল্প লেখেননি। তিনি গল্প বলার ধরনটাই বদলে দিয়েছিলেন। অবাস্তব কল্পকাহিনীর বদলে তিনি উপন্যাসে নিয়ে আসেন বাস্তব জীবনের জটিলতা, ব্যঙ্গ-রস, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। গল্প বলার নতুন কৌশল ও অবিস্মরণীয় চরিত্র তৈরির মাধ্যমে তিনি উপন্যাসের এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা আজও লেখকেরা অনুসরণ করেন।

দশটি অধ্যায়ের এই বিস্তারিত লেখায় তাঁর অসাধারণ জীবন এবং রেখে যাওয়া কীর্তির কথা তুলে ধরা হলো।

অধ্যায় ১: ভূমিকা – যিনি কথাসাহিত্যের রূপ বদলে দিয়েছিলেন
মিগেল দে থের্ভান্তেস ১৫৪৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি সময়ে মাদ্রিদের কাছে আলকালা দে হেনারেস নামক জায়গায় জন্মগ্রহণ করেন (৯ অক্টোবর তাঁর খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা বা ব্যাপটিজম হয়)। তিনি ১৬১৬ সালের ২২ এপ্রিল মাদ্রিদে মারা যান—যে বছর উইলিয়াম শেকসপিয়রও মারা গিয়েছিলেন (যদিও দুজনের দেশের ক্যালেন্ডার আলাদা ছিল)। এক সম্ভ্রান্ত কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তাঁর বাবা রদ্রিগো দে থের্ভান্তেস ছিলেন একজন নাপিত-চিকিৎসক (সেকালে নাপিতরাই ছোটখাটো অস্ত্রোপচার করতেন)। ঋণের দায়ে তাঁর বাবাকে প্রায়ই এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরতে হতো। তাঁর মা লিওনর দে কর্তিনাস ছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত নারী।

থের্ভান্তেসের জীবন ছিল কোনো সিনেমার গল্পের মতো। ১৫৭১ সালে তিনি ‘লেপান্তোর যুদ্ধে’ বীরত্বের সাথে লড়াই করেন, যেখানে তিনি তাঁর বাঁ হাতের কর্মক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। এরপর জলদস্যুদের হাতে বন্দী হয়ে আলজিয়ার্সে পাঁচ বছর ক্রীতদাস হিসেবে কাটান। দেশে ফিরে কর সংগ্রাহকের কাজ করার সময় বেশ কয়েকবার জেলেও যান। অবশেষে, প্রায় ৫৮ বছর বয়সে, চরম দারিদ্র্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে তিনি তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ডন কিহোতে’ প্রকাশ করেন। এই কঠিন জীবনই তাঁকে এক নতুন দূরদর্শী লেখক হিসেবে গড়ে তুলেছিল।

‘ডন কিহোতে’ উপন্যাসটি সেকালের জনপ্রিয় বীরত্বগাথার একটি নিখুঁত ব্যঙ্গচিত্র। এটি একই সাথে যেমন হাসির, তেমনই কষ্টের। এর চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষের মতো, যারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের ভুল থেকে শেখে। উপন্যাসে লেখক মজা করে দাবি করেন যে, তিনি আসলে ‘সিদি হামেতে বেনেনগেলি’ নামের এক আরব ঐতিহাসিকের লেখা বইয়ের অনুবাদ করছেন। এভাবে তিনি গল্পের ভেতরে গল্পের এক চমৎকার জাল বোনেন। এই লেখার ধরন ও গভীর মানবতাবোধই আধুনিক উপন্যাসের জন্ম দেয়।

থের্ভান্তেস তাঁর সময়ের স্পেনের বাস্তব ছবিটা তুলে ধরেছিলেন—একদিকে দেশের সাম্রাজ্যবাদী অহংকার, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দা; একদিকে মধ্যযুগীয় আদর্শ, অন্যদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া। লেখকদের এক জরিপে ‘ডন কিহোতে’-কে প্রায়ই ‘সর্বকালের সেরা বই’ বলা হয়। আর এর মূল চরিত্র ‘ডন কিহোতে’ এবং তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী ‘সানচো পানজা’ পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত কাল্পনিক চরিত্র।

অধ্যায় ২: সাধারণ শুরু – প্রারম্ভিক জীবন, পরিবার ও শিক্ষা
থের্ভান্তেসের শৈশব কেটেছে চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে। বাবার কাজের সূত্রে তাঁদের কর্দোবা, সেভিল এবং মাদ্রিদে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। তাঁর বাবার হাড় জোড়া দেওয়া বা রক্তমোক্ষণের মতো চিকিৎসা কাজের আয় দিয়ে সংসার চলত না, ফলে ঋণের দায়ে ১৫৫৩-৫৪ সালের দিকে তাঁকে জেলেও যেতে হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, তাঁদের পরিবারে হয়তো ইহুদি বংশানুক্রম ছিল, তবে এর কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

থের্ভান্তেসের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, তিনি সেভিলের একটি জেসুইট স্কুলে পড়েছিলেন। ১৫৬৯ সালে মাদ্রিদের এক মানবতাবাদী শিক্ষক হুয়ান লোপেজ দে হোয়োস ‘মিগেল দে থের্ভান্তেস’ নামে একজনকে তাঁর ‘প্রিয় ছাত্র’ বলে উল্লেখ করেন। থের্ভান্তেস ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়তেন। ১৫৬৯ সালে রানী এলিজাবেথ অব ভ্যালোয়ার মৃত্যু উপলক্ষে লেখা একটি কবিতার মাধ্যমে তাঁর প্রথম সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়।

২১ বা ২২ বছর বয়সে থের্ভান্তেস স্পেন ছেড়ে ইতালিতে চলে যান। সম্ভবত কোনো দ্বৈরথে (তলোয়ার যুদ্ধ) কাউকে আহত করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল, যা এড়াতে তিনি দেশ ছাড়েন। ইতালির রোমে তিনি কার্ডিনাল জুলিও অ্যাকুয়াভিভার প্রাসাদে কিছুদিন সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এই শুরুর দিনগুলো তাঁর মনে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা এবং ইতালীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সংস্কৃতির প্রতি এক গভীর অনুরাগ তৈরি করেছিল।

অধ্যায় ৩: যুদ্ধের ডাক – সামরিক জীবন এবং লেপান্তোর যুদ্ধ
১৫৭০ সালে থের্ভান্তেস নেপলসে (যা তখন স্পেনের অধীনে ছিল) স্প্যানিশ পদাতিক বাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর ভাই রদ্রিগোও তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিলেন। সেটি ছিল অটোমান সাম্রাজ্য ও ভেনিসের মধ্যকার যুদ্ধ এবং তুর্কিদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার সময়।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ১৫৭১ সালের ৭ অক্টোবর, করিন্থ উপসাগরে ঐতিহাসিক লেপান্তোর যুদ্ধে। থের্ভান্তেস তখন মারাত্মক জ্বরে (সম্ভবত ম্যালেরিয়া) ভুগছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি জাহাজের ভেতরে বিশ্রাম নিতে রাজী হননি। ‘মার্কেসা’ নামের যুদ্ধজাহাজে থেকে তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। যুদ্ধে তাঁর বুকে দুটি এবং বাঁ হাতে একটি গুলির আঘাত লাগে। এই আঘাতের কারণে তাঁর বাঁ হাতটি চিরতরে অকেজো হয়ে যায়। পরবর্তীতে তিনি গর্ব করে বলতেন, “ডান হাতের গৌরব বাড়ানোর জন্যই বাঁ হাতটি উৎসর্গ হয়েছিল।”

অস্ট্রিয়ার ডন জনের নেতৃত্বে খ্রিষ্টান বাহিনী সেই যুদ্ধে এক বিশাল জয় পায় এবং ভূমধ্যসাগরে অটোমানদের আধিপত্য ভেঙে দেয়। থের্ভান্তেস ১৫৭৫ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে কাজ চালিয়ে যান এবং নাভারিনো ও তিউনিসের মতো বেশ কয়েকটি অভিযানে অংশ নেন। সেনাপ্রধানদের কাছ থেকে তিনি প্রশংসাপত্রও পেয়েছিলেন। এই যুদ্ধক্ষেত্রের দিনগুলো তাঁকে যুদ্ধের ভয়াবহতা, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বৈচিত্র্য এবং সৈনিক জীবনের সুখ-দুঃখের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা ও গর্ব তিনি আজীবন বুকে লালন করেছিলেন।

অধ্যায় ৪: বন্দিত্বের শিকল – আলজিয়ার্সে ক্রীতদাস জীবন
১৫৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, নেপলস থেকে ‘সল’ নামের এক যুদ্ধজাহাজে করে ভাই রদ্রিগোর সাথে দেশে ফেরার পথে বার্সেলোনার কাছাকাছি জায়গায় থের্ভান্তেস জলদস্যুদের (যার প্রধান ছিল আরনত মামি) হাতে বন্দী হন। জলদস্যুরা দুই ভাইকে উত্তর আফ্রিকার খ্রিষ্টান ক্রীতদাস ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র আলজিয়ার্সে নিয়ে যায়।

সেনাবাহিনী থেকে পাওয়া থের্ভান্তেসের প্রশংসাপত্রগুলো দেখে জলদস্যুরা ভেবেছিল তিনি বুঝি কোনো বড় ও ধনী কর্মকর্তা। তাই তাঁর মুক্তির জন্য ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা (এসকুর্দো) দাবি করা হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে দেওয়া অসম্ভব ছিল। এর ফলে তাঁর বন্দিজীবন দীর্ঘায়িত হয়। তিনি প্রায় পাঁচ বছর দালি মামি এবং পরে হাসান পাশার অধীনে ক্রীতদাস হিসেবে কাটান। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি সাহসের পরিচয় দেন এবং খ্রিষ্টান বন্দীদের নেতা হয়ে ওঠেন।

বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে তিনি চারবার দুঃসাহসিক পালানোর চেষ্টা করেন। প্রতিবারই দলবল গুছিয়ে, এমনকি বড় ধরনের বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেও তিনি ব্যর্থ হন। তবে তাঁর এই অসীম সাহস ও নেতৃত্ব গুণের কথা সে সময়ের সবাই মনে রেখেছিল। ১৫৭৭ সালে তাঁর ভাই রদ্রিগো মুক্তি পেলেও থের্ভান্তেসকে ওখানেই থেকে যেতে হয়। অবশেষে, ১৫৮০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, তাঁর পরিবার ও সমাজসেবীদের জমানো অর্থ নিয়ে ত্রিনিতারিয়ান সন্ন্যাসীরা (যার মধ্যে হুয়ান হিল অন্যতম) ৫০০ স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে তাঁকে মুক্ত করেন। হাসান পাশা যখন তাঁকে নিয়ে কনস্টান্টিনোপলের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছিলেন, ঠিক তার আগমুহূর্তে থের্ভান্তেস মুক্তি পান।

এই বন্দিজীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থের্ভান্তেসের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। এটি পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ডন কিহোতে’-র “বন্দীর গল্প” (Captive’s Tale) অংশটিকে এবং তাঁর লেখা বেশ কিছু নাটক ও গল্পকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই বন্দিত্বই তাঁকে অন্য সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার, স্বাধীনতার আসল অর্থ বোঝার এবং মানুষের টিকে থাকার লড়াইকে উপলব্ধি করার সুযোগ দিয়েছিল।

অধ্যায় ৫: স্পেনে প্রত্যাবর্তন – কষ্ট, কর সংগ্রহ এবং কারাবাস
১৫৮৮ সালে স্প্যানিশ আর্মাডার (নৌবাহিনী) পরাজয় এবং একের পর এক যুদ্ধের কারণে স্পেন তখন চরম অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। থের্ভান্তেস যখন দেশে ফেরেন, ততদিনে তাঁর পৃষ্ঠপোষকেরা অনেকেই মারা গেছেন। জীবনধারণের জন্য তিনি নানা রকম ছোটখাটো কাজ শুরু করেন। প্রথমে উত্তর আফ্রিকায় রাজকীয় দূত বা গুপ্তচর হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর, ১৫৮৭ সালে তিনি সেভিলে নৌবাহিনীর জন্য রসদ সংগ্রাহক এবং পরে আন্দালুসিয়ায় কর সংগ্রাহকের চাকরি নেন।

১৫৮৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি নিজের চেয়ে অনেক কম বয়সী ক্যাটালিনা দে সালাজার ই প্যালাসিওসকে বিয়ে করেন। তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না, তবে অন্য এক নারীর সাথে থের্ভান্তেসের ‘ইসাবেল’ নামে একটি কন্যাসন্তান ছিল, যার দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন। চাকরি করলেও তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। উল্টো হিসাবের গড়মিলের কারণে ১৫৯২ সালে এবং পরবর্তীতে আরও কয়েকবার তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল। এমনকি আমেরিকার (নতুন আবিষ্কৃত ভূখণ্ড) চাকরিতে আবেদনের সুযোগও তিনি পাননি।

১৫৯০-এর দশকে তিনি সেভিলে ছিলেন এবং ১৬০৬ সালের দিকে মাদ্রিদে চলে আসেন। দারিদ্র্য, সরকারি দপ্তরের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং বারবার জেল খাটার এই তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাঁকে স্প্যানিশ সমাজের আসল রূপ দেখতে সাহায্য করেছিল। এই দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচতেই তিনি লেখালেখিকে জীবনের প্রধান অবলম্বন করে নেন। এই কঠিন সময়েই তিনি কবিতা, নাটক এবং তাঁর প্রথম বড় গদ্যগ্রন্থ রচনা করেন।

অধ্যায় ৬: সাহিত্যের জাগরণ – প্রথম দিকের কাজ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা
থের্ভান্তেস সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। আলজিয়ার্সের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তাঁর শুরুর দিকের নাটকগুলো লেখেন। ১৫৮৫ সালে তিনি ‘লা গালাতিয়া’ (La Galatea) নামে একটি যাজকীয় বা গ্রাম্য প্রেমের উপন্যাস প্রকাশ করেন। বইটি প্রশংসা পেলেও ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি এবং এর পরবর্তী খণ্ড লেখার কথা থাকলেও তিনি তা আর শেষ করেননি।

তিনি আর্মাডার যুদ্ধ নিয়ে কবিতা এবং প্রায় ২০টিরও বেশি নাটক লিখেছিলেন, যদিও সেগুলোর বেশিরভাগই থিয়েটারে খুব একটা চলেনি। তবে তাঁর নাটকের সংলাপ ও চরিত্রগুলো ছিল উপন্যাসের মতো বাস্তবসম্মত। পরবর্তীতে ১৬১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ছোটগল্পের সংকলন ‘নভেলাস এজেম্পলারেস’ (Novelas ejemplares)-এ সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

১৬০০ সালের শুরুর দিকে, দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সাহিত্যিক নীরবতা ভেঙে থের্ভান্তেস তাঁর জীবনের সেরা সৃষ্টি নিয়ে হাজির হওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। জীবনের সব কষ্ট ও অভিজ্ঞতা ততদিনে তাঁর দেখার চোখ, হাস্যরস এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতিকে আরও পরিপক্ব করে তুলেছিল।

অধ্যায় ৭: এক মহাকাব্যের জন্ম – ডন কিহোতে, প্রথম খণ্ড (১৬০৫)
১৬০৫ সালের জানুয়ারি মাসে মাদ্রিদের প্রকাশক হুয়ান দে লা কুয়েস্তা ‘এল ইনহেনিওসো হিদালগো দন কিহোতে দে লা মাঞ্চা’ (El ingenioso hidalgo don Quijote de la Mancha) বইটি প্রকাশ করেন। তখন থের্ভান্তেসের বয়স প্রায় ৫৮ বছর, এক হাত অকেজো এবং তিনি তীব্র অর্থকষ্টে ভুগছেন। কিন্তু বইটি বাজারে আসার সাথে সাথেই এক অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করে।

গল্পটি ছিল আলোনসো কিহানো নামের এক বয়স্ক গ্রামীণ জমিদারের, যিনি বীর যোদ্ধাদের (নাইট) রূপকথা পড়তে পড়তে একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তিনি নিজেকে ‘ডন কিহোতে’ নামে এক বীর যোদ্ধা হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেন। এরপর মরিচা ধরা পুরোনো বর্ম পরে, ‘রোসিনান্তে’ নামের এক রোগা ঘোড়ায় চড়ে তিনি পৃথিবী থেকে অন্যায় দূর করতে বেরিয়ে পড়েন। নিজের সহকারী বা স্কয়ার হিসেবে তিনি পাশে নেন সানচো পানজা নামের এক বাস্তববাদী ও সাধারণ কৃষককে। আর আলদোনজা লোরেঞ্জো নামের এক সাধারণ গাঁয়ের মেয়েকে নিজের কল্পিত রানী বা প্রেমিকা ‘দুলসিনিয়া দেল তোবোসো’ বলে মান্য করেন।

বইয়ের গল্পে ডন কিহোহের কাণ্ডকারখানা—যেমন উইন্ডমিল বা পবনচक्कीকে দানব ভেবে আক্রমণ করা, ভেড়ার পালকে শত্রু সৈন্য ভেবে লড়াই করা কিংবা বন্দীদের মুক্ত করে দেওয়া—পাঠককে যেমন হাসায়, তেমনই এক অদ্ভুত মায়ায় জড়ায়। উপন্যাসটি একদিকে যেমন সেকালের অবাস্তব রূপকথাকে ব্যঙ্গ করে, অন্যদিকে মানুষের কল্পনাশক্তির জয়গান গায়।

থের্ভান্তেস এই উপন্যাসে এক অসাধারণ ও জটিল গল্প বলার কৌশল ব্যবহার করেছেন: তিনি দাবি করেন এটি আসলে ‘সিদি হামেতে বেনেনগেলি’ নামের এক আরব লেখকের লেখা ‘সত্য ইতিহাস’, যা তিনি অনুবাদ করিয়েছেন। পুরো গল্প জুড়ে মূল কথক বা ন্যারেটর বারবার নিজে এসে হাজির হন এবং গল্প থামিয়ে কথা বলেন। এই অভিনব কৌশলের মাধ্যমে লেখক আসলে গল্প বলার ক্ষেত্রে ‘সত্যের’ রূপ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বইটির সফলতা ছিল আকাশচুম্বী। এটি প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে সাজগোজের ধুম পড়ে যায়, একে নিয়ে থিয়েটারে নাটক তৈরি হয় এবং খুব দ্রুত এর দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য চারদিকে দাবি উঠতে থাকে।

অধ্যায় ৮: ডন কিহোতে উপন্যাসের মূল ভাব, চরিত্র এবং সাহিত্যের বিপ্লব
‘ডন কিহোতে’ এর চরিত্র গঠন এবং কাঠামোর মাধ্যমে পুরো কথাসাহিত্যের দুনিয়ায় এক বিপ্লব এনেছিল। ডন কিহোতে চরিত্রটি আমাদের এক মহৎ অথচ হাস্যকর আদর্শবাদী পাগলামির কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে, সানচো পানজা হলো মাটির মানুষ—যার মধ্যে রয়েছে বাস্তব জ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞান, তবে ধীরে ধীরে সেও তার মালিকের মহান আদর্শে কিছুটা অনুপ্রাণিত হয়। সাহিত্যে তাঁদের এই গড়ে ওঠা বন্ধুত্বকে অন্যতম সেরা হিসেবে গণ্য করা হয়।

উপন্যাসের মূল বিষয়গুলো হলো:

বাস্তব বনাম বিভ্রম: আসলে ‘বাস্তব’ কী? কার দৃষ্টিভঙ্গি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

আদর্শবাদ বনাম বাস্তববাদ: মানুষের স্বপ্ন এবং কঠিন পৃথিবীর মধ্যকার এক হাসিকান্নার লড়াই।

গল্পের শক্তি (এবং বিপদ): বই মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে—ভালো এবং মন্দ উভয় অর্থেই।

সামাজিক ব্যঙ্গ: সেকালের স্প্যানিশ সমাজ, শ্রেণীবিভাগ, আভিজাত্যের অহংকার এবং আমলাতন্ত্রের সমালোচনা।

গল্পের ভেতরে গল্প (মেটাফিকশন): উপন্যাসের চরিত্ররা নিজেরাই বই নিয়ে আলোচনা করে; এমনকি দ্বিতীয় খণ্ডে চরিত্রগুলো তাঁদের নিয়ে লেখা একটি নকল বইয়ের প্রতিবাদ করে।

থের্ভান্তেস সাহিত্যে প্রথম চরিত্রের মনের গভীরতা, মনের ভেতরের সংলাপ এবং বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবহার শুরু করেন। তিনি একটি সাধারণ রোমাঞ্চকর গল্পকে মানুষের জীবনের গভীর উপলব্ধিতে রূপান্তর করেছিলেন। এই কারণেই পণ্ডিতেরা একে প্রথম আধুনিক উপন্যাস বলেন: এটি সাধারণ মানুষকে গুরুত্ব দেয়, উঁচু-নিচু সংস্কৃতির পার্থক্য দূর করে এবং পাঠককে গল্পের অংশ করে তোলে।

অধ্যায় ৯: দ্বিতীয় খণ্ড, পরবর্তী কাজ এবং শেষ জীবন
১৬১৪ সালে আলোনসো ফার্নান্দেজ দে অ্যাভেলানেডা নামের একজন লেখক ডন কিহোহের একটি নকল দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে থের্ভান্তেস নিজেই ১৬১৫ সালে আসল ‘দ্বিতীয় খণ্ড’ প্রকাশ করেন। অনেক সমালোচক মনে করেন এই খণ্ডটি প্রথম খণ্ডের চেয়েও বেশি চমৎকার—এটি ছিল আরও বেশি দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিদীপ্ত। এখানে ডন কিহোতে এবং সানচো পানজা ততদিনে বিখ্যাত হয়ে গেছেন এবং গল্পের অন্যান্য চরিত্ররা ইতিমধ্যেই তাঁদের প্রথম খণ্ডের গল্পটি পড়ে ফেলেছেন! এই খণ্ডের সুর ছিল অনেক বেশি গম্ভীর, যাতে এক ধরনের বিষণ্ণতা ও প্রজ্ঞা লুকিয়ে ছিল।

তাঁর জীবনের শেষ সময়ের অন্যান্য প্রধান কাজগুলো হলো:

নভেলাস এজেম্পলারেস (১৬১৩): বারোটি চমৎকার ছোটগল্পের সংকলন, যা থের্ভান্তেসের লেখার বৈচিত্র্য প্রকাশ করে।

ওচো কমেডিয়াস ই ওচো এন্দ্রেমেসেস (১৬১৫): বেশ কিছু নাটক ও ছোট প্রহসনের সংকলন।

ভিয়াহে দেল পারনাসো (১৬১৪): সেকালের কবিদের নিয়ে লেখা একটি ব্যঙ্গাত্মক দীর্ঘ কবিতা।

লস ত্রাবাহোস দে পেরসিলেস ই সিহিসমুন্দা (১৬১৭, মৃত্যুর পর প্রকাশিত): একটি রোমাঞ্চকর উপন্যাস, যাকে থের্ভান্তেস নিজেই তাঁর জীবনের সেরা কাজ মনে করতেন।

১৬১৩ সালে থের্ভান্তেস সেন্ট ফ্রান্সিসের একটি ধর্মীয় আদেশের সাথে যুক্ত হন। এরপর ১৬১৬ সালের ২২ এপ্রিল মাদ্রিদে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন তাঁর কবরের সঠিক সন্ধান জানা ছিল না, তবে ২০১৫ সালে মাদ্রিদের একটি মঠে তাঁর দেহাবশেষ পুনরায় খুঁজে পাওয়া যায় এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত করা হয়।

অধ্যায় ১০: চিরন্তন কীর্তি – আধুনিক উপন্যাস এবং বিশ্ব সংস্কৃতিতে প্রভাব
বিশ্ব সাহিত্যে থের্ভান্তেসের প্রভাব পরিমাপ করা অসম্ভব। ‘ডন কিহোতে’ ইউরোপীয় উপন্যাসের জন্ম দিতে সাহায্য করেছিল। হেনরি ফিল্ডিং এবং লরেন্স স্টার্নের মতো বিখ্যাত ইংরেজ লেখকেরা সরাসরি থের্ভান্তেসের লেখার ধরন অনুসরণ করেছিলেন। গুস্তাভ ফ্লোবের তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মাদাম বোভারি’ লেখার সময় ডন কিহোহের আদর্শ ধরে রেখেছিলেন। দস্তয়েভস্কি এই বইয়ের গভীরতার প্রশংসা করেছিলেন। আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।

সংস্কৃতির দিক থেকে, ডন কিহোতে এবং সানচো আজ দুটি চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছেন—একজন স্বপ্নদ্রষ্টা এবং অন্যজন বাস্তববাদী। ইংরেজিতে কোনো কাল্পনিক বা অসম্ভব শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই বোঝাতে “পবনচাকির বিরুদ্ধে লড়াই করা” (Tilting at windmills) প্রবাদটি এই বই থেকেই এসেছে। এই বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পিকাসো ছবি এঁকেছেন, অপেরা ও ব্যালে নাচ তৈরি হয়েছে, সিনেমা এবং বিখ্যাত মিউজিক্যাল নাটকও (ম্যান অব লা মাঞ্চা) নির্মিত হয়েছে।

থের্ভান্তেস দেখিয়েছিলেন যে একটি গল্প একই সাথে যেমন বিনোদন দিতে পারে, তেমনই গভীর দার্শনিক চিন্তায় উস্কে দিতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একটি উপন্যাসের ভেতরে হাসি-কান্না, কল্পনা-বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের গল্প—সবকিছুকে একসাথে মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব। যুদ্ধ, দাসত্ব, দারিদ্র্য এবং ব্যর্থতায় ভরা নিজের কঠিন জীবন থেকে তিনি এমন এক সৃষ্টি রেখে গেছেন, যা মানুষের স্বপ্ন দেখার এবং লড়াই করার ক্ষমতাকে সম্মানিত করে।

চার শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও, থের্ভান্তেস বেঁচে আছেন প্রতিটি উপন্যাসে, যেখানে মানুষের মন নিয়ে কথা বলা হয়, বাস্তবতাকে প্রশ্ন করা হয় কিংবা কল্পনার জয়গান গাওয়া হয়। তিনি শুধু প্রথম আধুনিক উপন্যাসটিই লেখেননি—তিনি উপন্যাস লেখার নতুন পথ তৈরি করে গেছেন। তাঁর কলম তরবারির চেয়েও শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে এবং তাঁর সেই পঙ্গু হাতটি মানব আত্মার জন্য এক অমর কীর্তিস্তম্ভ তৈরি করে গেছে।

Comment