স্মৃতি কীভাবে কাজ করে: ভুলে যাওয়া এবং মনে রাখার রহস্য
মানুষের মস্তিষ্ক এক আশ্চর্য অঙ্গ। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনার মুখোমুখি হই—শব্দ, দৃশ্য, অনুভূতি, তথ্য, সম্পর্ক, চিন্তা—সবকিছুই মস্তিষ্কে প্রবেশ করছে একটানা প্রবাহের মতো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সীমাহীন তথ্যের ভিড় থেকে মস্তিষ্ক কিছু অংশ সংরক্ষণ করে রাখে, কিছু অংশ সম্পূর্ণভাবে ভুলে যায়, আর কিছু অংশ আবার সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। স্মৃতি (Memory) ঠিক কীভাবে কাজ করে? কেন আমরা ভুলে যাই? আর কেন কিছু ঘটনা কখনো ভুলে থাকা যায় না? স্মৃতির এই রহস্যময় প্রক্রিয়া মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে জটিল ও আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি।
এই প্রবন্ধে আমরা স্মৃতির গঠন, কাজের পদ্ধতি, ভুলে যাওয়ার কারণ, মনে রাখার কৌশল এবং স্মৃতি উন্নত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।
১. স্মৃতির মূল ভিত্তি: তথ্য কীভাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে
স্মৃতি মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে:
(ক) এনকোডিং (Encoding)
তথ্য প্রথমে আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। যেমন—যা দেখি, শুনি, পড়ি, স্পর্শ করি, স্বাদ নিই—সবই এনকোডিংয়ের অংশ। এই ধাপটি ঠিকঠাক না হলে স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়াই ব্যাহত হয়।
যেমন:
আপনি যদি ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে না শোনেন, তবে তথ্য মস্তিষ্কে প্রবেশই করবে না। ফলে মনে রাখার প্রশ্নই ওঠে না।
(খ) স্টোরেজ (Storage)
প্রবেশকৃত তথ্য কিছু সময়ের জন্য মস্তিষ্কে সংরক্ষণ হয়। তবে সব তথ্যই দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি হয়ে থাকে না। বেশিরভাগ তথ্য স্বল্পমেয়াদিই থাকে এবং সময়ের সাথে হারিয়ে যায়।
(গ) রিট্রিভাল (Retrieval)
এটি হলো মস্তিষ্ক থেকে তথ্য পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা। যেমন পরীক্ষা হলে মনে পড়া, পুরোনো স্মৃতি হঠাৎ মনে আসা, কারো নাম মনে করার চেষ্টা করা ইত্যাদি।
এই তিন ধাপের ওপরই নির্ভর করে একজন মানুষের স্মৃতিশক্তির মান এবং কার্যকারিতা।
২. স্মৃতির ধরন: মস্তিষ্ক কতভাবে তথ্য সংরক্ষণ করে?
স্মৃতি এক রকম নয়; এটি নানা স্তর ও শ্রেণিতে বিভক্ত। মূলত তিনটি প্রধান ধরণ রয়েছে—
(১) সেনসরি মেমোরি (Sensory Memory)
এটি মাত্র ০.৫–২ সেকেন্ড স্থায়ী হয়। চোখের সামনে কোনো দৃশ্য ঝলকানো, হঠাৎ শব্দ শোনা—এসব সেনসরি মেমোরির আওতায় পড়ে।
(২) স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি (Short-Term Memory / Working Memory)
এটি কয়েক সেকেন্ড থেকে ২০–৩০ সেকেন্ড স্থায়ী থাকে। আমরা একসময় মাত্র ৫–৯টি তথ্য মনে রাখতে পারি।
উদাহরণ: appena দেখা একটি নম্বর মনে রাখা।
(৩) দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি (Long-Term Memory)
এটি ঘণ্টা, দিন, বছর, এমনকি সারাজীবন পর্যন্ত থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
(ক) এক্সপ্লিসিট (Explicit) বা সচেতন স্মৃতি
ঘটনা (Episodic memory)
তথ্য বা জ্ঞান (Semantic memory)
(খ) ইমপ্লিসিট (Implicit) বা অবচেতন স্মৃতি
মোটর স্কিল, যেমন—সাইকেল চালানো
অভ্যাস বা আচরণগত স্মৃতি
এই বিভাজনগুলো দেখায় যে আমরা শুধু তথ্যই নয়, দক্ষতা, আবেগ, অভিজ্ঞতা—সবই স্মৃতি হিসেবে বহন করি।
৩. স্মৃতি গঠনের বিজ্ঞান: নিউরনের সংযোগের গল্প
মানব মস্তিষ্কে রয়েছে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন। স্মৃতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ—যাকে বলে সিন্যাপস (Synapse)।
সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি (Synaptic Plasticity)
যখন আমরা নতুন কিছু শিখি, তখন নিউরনগুলো নতুন সংযোগ তৈরি করে বা পুরোনো সংযোগ শক্তিশালী করে। এই প্রক্রিয়াকেই বলে প্লাস্টিসিটি।
বেশি ব্যবহার → সংযোগ শক্তিশালী হয়
ব্যবহার না করলে → সংযোগ দুর্বল হয়
এটিই ব্যাখ্যা করে কেন প্রায়শই ব্যবহৃত জ্ঞান আমরা ভাল মনে রাখতে পারি।
হিপোক্যাম্পাসের ভূমিকা
স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদি রূপ দেওয়ার জন্য হিপোক্যাম্পাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘুমের সময় হিপোক্যাম্পাস দিনের অভিজ্ঞতাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তর করে।
তাই ঘুমের ঘাটতি স্মৃতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৪. আমরা কেন ভুলে যাই? ভুলে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
ভুলে যাওয়া (Forgetting) একটি সমস্যা নয়; বরং এটি মস্তিষ্কের বাছাই প্রক্রিয়ার অংশ। না-ভুললে আমরা তথ্যের ভারে জর্জরিত হয়ে যেতাম।
ভুলে যাওয়ার কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ—
১. এনকোডিং ব্যর্থতা
যে তথ্য সঠিকভাবে মস্তিষ্কে ঢোকে না, তা মনে রাখার প্রশ্নই নেই।
২. ডিকেই থিওরি (Decay Theory)
ব্যবহার না করলে স্মৃতি দুর্বল হয়ে যায়। যেমন—অনেক দিন ব্যবহার না করা গণিত সূত্র ভুলে যাওয়া।
৩. ইন্টারফেরেন্স (Interference)
একটি তথ্য অন্য তথ্যকে ব্যাহত করে।
Proactive interference: পুরোনো তথ্য নতুনটি মনে রাখতে বাধা দেয়
Retroactive interference: নতুন তথ্য পুরোনোটি ভুলিয়ে দেয়
৪. রিট্রিভাল ব্যর্থতা
তথ্য মস্তিষ্কে আছে, কিন্তু মুহূর্তে মনে পড়ছে না। যেমন—কারো নাম জিভের আগায় এসে আটকে থাকা।
৫. আবেগ বা ট্রমা
অতিমাত্রায় দুঃখজনক বা ভয়ানক অভিজ্ঞতা কখনো কখনো স্মৃতিকে চাপা দেয় বা বিকৃত করে।
ভুলে যাওয়া তাই মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া।
৫. কেন কিছু স্মৃতি কখনো ভুলে যায় না?
সব স্মৃতি সমানভাবে আচরণ করে না। কিছু স্মৃতি গভীরভাবে প্রোথিত থাকে। এর কয়েকটি কারণ—
১. আবেগের ভূমিকা (Emotional Tagging)
আবেগময় স্মৃতির শক্তি বেশি।
যেমন—প্রথম প্রেম, দুর্ঘটনা, পুরস্কার পাওয়ার দিন—এসব ঘটনায় আবেগীয় উত্তেজনা বেশি থাকে, ফলে নিউরনের সংযোগ শক্তিশালী হয়।
২. অ্যামিগডালার (Amygdala) প্রভাব
ভয়, আনন্দ, দুঃখের মতো তীব্র আবেগ অ্যামিগডালায় সক্রিয় হয়। এটি স্মৃতি সংরক্ষণকে আরও দৃঢ় করে।
৩. পুনরাবৃত্তি (Repetition)
বারবার স্মরণ করা বা আলোচনা করা স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদি করে।
৪. ব্যক্তিগত অর্থ (Meaningfulness)
যে তথ্য ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।
৬. স্মৃতি কীভাবে বিকৃত হয়: আমরা কি সত্যি সব ঠিকভাবে মনে রাখি?
মানুষের স্মৃতি ক্যামেরার মতো নয়। আমরা মনে রাখি, আবার ভুলভাবে মনে রাখিও।
বিজ্ঞান বলে—স্মৃতি হলো পুনর্গঠিত (Reconstructive), রেকর্ড নয়।
কেন স্মৃতি বিকৃত হয়?
নতুন অভিজ্ঞতা পুরোনো স্মৃতিকে প্রভাবিত করে
গল্প বা শোনা তথ্য যোগ হয়ে স্মৃতিকে পরিবর্তিত করে
আবেগ স্মৃতিকে বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখাতে পারে
মস্তিষ্ক ফাঁকগুলো নিজের মতো করে পূরণ করে
এ কারণে প্রত্যেক মানুষের একই ঘটনার স্মৃতি আলাদা হতে পারে।
৭. মনে রাখার শক্তি বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক উপায়
স্মৃতি উন্নত করার অসংখ্য পদ্ধতি রয়েছে। এখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কয়েকটি কার্যকর কৌশল উল্লেখ করা হলো—
১. স্পেসড রিপিটিশন (Spaced Repetition)
একবার পড়ে বারবার পড়া নয় — বরং বিরতির ফাঁকে পড়া।
যেমন—১ দিন পর → ৩ দিন পর → ৭ দিন পর → ১৫ দিন পর।
এটি দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতির জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
২. সক্রিয় রিকল (Active Recall)
পড়া না দেখে নিজেকে পরীক্ষা করা।
যেমন—একটি অধ্যায় পড়ে বই বন্ধ করে প্রশ্ন করা।
৩. ভালো ঘুম
দিনের শেখা জ্ঞানকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তর করতে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. মনোযোগ বৃদ্ধি করা
স্মৃতি শুরু হয় এনকোডিং থেকে। মনোযোগহীনতা স্মৃতিকে দুর্বল করে।
৫. মাইন্ড ম্যাপিং ও ভিজুয়ালাইজেশন
দৃশ্যমান আকারে তথ্য সাজালে তা সহজে মনে থাকে।
৬. ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য
ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়, নিউরনের কার্যকারিতা উন্নত করে।
ওমেগা-৩, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রোটিন—স্মৃতিশক্তি বাড়াতে প্রমাণিত।
৭. স্ট্রেস কমানো
দীর্ঘমেয়াদি চাপ কর্টিসল বাড়িয়ে স্মৃতি ধ্বংস করতে পারে।
ধ্যান, যোগ, গভীর শ্বাস—এগুলো উপকারী।
৮. ডিজিটাল যুগে স্মৃতির পরিবর্তন
আজকের যুগে আমরা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, নোট, ক্যালেন্ডার—সবকিছুর ওপর নির্ভর করি। ফল—
তথ্য মনে রাখার পরিবর্তে আমরা কোথায় তথ্য পাবো তা বেশি মনে রাখি।
একে বলে Digital offloading।
এটি খারাপ নয়, কিন্তু মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করে দিলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে। তাই ডিজিটাল ও মানসিক স্মৃতির মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
৯. স্মৃতি ও বার্ধক্য: বয়স বাড়লে কি স্মৃতি কমে যায়?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া স্বাভাবিক।
কারণ—
নিউরনের সংযোগ দুর্বল হয়
রিট্রিভাল কমে যায়
ব্রেইন প্রসেসিং ধীর হয়ে যায়
তবে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—বয়স স্মৃতিশক্তির শেষ নয়।
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত:
নতুন কিছু শেখার অভ্যাস নিউরনকে সক্রিয় রাখে এবং স্মৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
