মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি: বদলে যাওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা
মানুষের মস্তিষ্ককে নিয়ে আমাদের ধারণা বহু শতাব্দী ধরেই পরিবর্তিত হয়েছে। এক সময় মনে করা হতো, জন্মের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মস্তিষ্ক গঠন ও পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে; এরপর তা স্থায়ী হয়ে যায়—যেন পাথরে খোদাই করা কোনো নকশা। কিন্তু আধুনিক নিউরোসায়েন্স আমাদের জানালো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্য: মস্তিষ্ক সারাজীবন ধরে বদলাতে পারে, শিখতে পারে, নতুন সংযোগ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষমতাকেই বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি—অর্থাৎ মস্তিষ্কের প্লাস্টিকের মতো নমনীয় ও পরিবর্তনশীল ক্ষমতা।
এই “বদলে যাওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা” মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে গভীর প্রভাব ফেলে—শিক্ষা, অভ্যাস, স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব, এমনকি মানসিক ব্যথা বা ট্রমা নিরাময়ের ক্ষেত্রেও। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি কী, কীভাবে এটি কাজ করে, কেন এটি মানব সম্ভাবনার কেন্দ্রে, এবং কিভাবে আমরা সচেতনভাবে এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের জীবনকে বদলে নিতে পারি।
১. মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি কী?
মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন থাকে, প্রতিটি নিউরন অন্য নিউরনের সাথে সিন্যাপস নামের ক্ষুদ্র সংযোগের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। আমরা যখন নতুন কিছু শিখি, অভ্যাস গড়ে তুলি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি বা আবেগগত কিছু অনুভব করি—তখন নিউরনের সংযোগগুলোর ভেতরে পরিবর্তন ঘটে। কখনো সংযোগ আরও মজবুত হয়, কখনো দুর্বল হয়, আবার কখনো সম্পূর্ণ নতুন সংযোগ তৈরি হয়।
এই পরিবর্তনগুলোই মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি।
প্লাস্টিসিটি প্রধানত দুই ধরনের:
ক. স্ট্রাকচারাল প্লাস্টিসিটি (Structural Plasticity)
যখন মস্তিষ্কে বাস্তব গঠনগত পরিবর্তন ঘটে—অর্থাৎ নতুন সিন্যাপস তৈরি হয়, নিউরন শাখা বাড়ায়, সংযোগ সংখ্যা বাড়ে বা কমে। দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস, গভীর অনুশীলন—এসব থেকে এটি তৈরি হয়।
খ. ফাংশনাল প্লাস্টিসিটি (Functional Plasticity)
যখন মস্তিষ্কের এক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য অংশ তার কাজ গ্রহণ করে, বা কোনো দক্ষতা বাড়তে থাকলে মস্তিষ্ক সেই দক্ষতার জন্য নির্দিষ্ট অংশকে আরও সক্রিয় করে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ, যারা অন্ধ, তারা স্পর্শের মাধ্যমে পড়া (ব্রেইল) শিখলে তাদের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স স্পর্শ-সংক্রান্ত তথ্য প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত হতে পারে। এই বদলটি ফাংশনাল প্লাস্টিসিটিরই জোরালো উদাহরণ।
২. মস্তিষ্ক কীভাবে বদলায়: অভ্যাস থেকে অভিজ্ঞতা
আমাদের দৈনন্দিন আচরণ, পরিবেশ, অভ্যাস—সবকিছু মস্তিষ্ককে ক্রমাগত আকৃতি দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলেন: “Neurons that fire together, wire together.”
অর্থাৎ, যেসব নিউরন বারবার একসঙ্গে সক্রিয় হয়, তাদের সংযোগ তত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
শেখার প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিসিটি
আপনি যখন প্রথম সাইকেল শেখেন, বারবার পড়ে যান। কারণ তখন নিউরনের সংযোগগুলো দুর্বল। অনুশীলন করতে করতে সাইকেল চালানোর সমন্বয়—ব্যালান্স, প্যাডেল, ব্রেক—সবই শক্তিশালী নিউরোনাল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। তখন আর সচেতনভাবে ভাবতে হয় না।
এটি মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটিরই ফল।
ভুলে যাওয়া ও মনে রাখার সম্পর্ক
যে সংযোগগুলো ব্যবহার হয় না, সেগুলো দুর্বল হয় এবং মুছে যায়—একে বলা হয় synaptic pruning, যা মস্তিষ্ককে দক্ষ রাখতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ, ভুলে যাওয়াও এক ধরনের প্লাস্টিসিটি।
৩. প্লাস্টিসিটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
হেবিয়ান লার্নিং
হেব নামের এক বিজ্ঞানী প্রস্তাব করেন যে বারবার ব্যবহার হওয়া নিউরনগুলোর সংযোগ শক্তিশালী হয়। আজ এটি নিউরোসায়েন্স ও মেশিন লার্নিংয়ের মূল ভিত্তি।
লং-টার্ম পোটেনশিয়েশন (LTP)
এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট সিন্যাপস দীর্ঘকাল ধরে সক্রিয় থাকলে সেগুলো আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। স্মৃতি তৈরির ক্ষেত্রে LTP অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিউরোজেনেসিস
দীর্ঘদিন মনে করা হতো মানুষের মস্তিষ্ক নতুন নিউরন তৈরি করতে পারে না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, হিপোক্যাম্পাসে (যা শিখন ও স্মৃতির মূল কেন্দ্র) নতুন নিউরন তৈরি হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক শুধু সংযোগ নয়, নতুন কোষও তৈরি করতে পারে।
৪. পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা কীভাবে মস্তিষ্ককে বদলায়
মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি একা কাজ করে না; এটি পরিবেশ, অভ্যাস, সম্পর্ক, কাজের ধরন, এমনকি আমরা কী ভাবি তার ওপরও নির্ভর করে।
শিক্ষা ও শেখার ভূমিকা
অধিক চিন্তাশীল, কৌতূহলী, অনুশীলনমুখী জীবনধারা মস্তিষ্কের নতুন সংযোগ বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বহুভাষী মানুষদের মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটার তুলনামূলক ঘন হয়, কারণ ভাষা শিখতেই বহু নিউরাল নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়।
সামাজিক সম্পর্ক ও আবেগ
ধরুন আপনি এমন একজন মানুষের সাথে নিয়মিত দেখা করেন যিনি আপনাকে অনুপ্রাণিত করেন। এই অভিজ্ঞতা আপনার মস্তিষ্কে নতুন ইতিবাচক সংযোগ তৈরি করবে। বিপরীতে বিষাক্ত বা নেতিবাচক সম্পর্ক স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) বাড়িয়ে মস্তিষ্কের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিনোদন ও সৃজনশীলতা
সংগীত শেখা, আঁকা, নাচ—এগুলো মস্তিষ্কের বহু এলাকা সক্রিয় করে। সংগীত শেখার ফলে স্মৃতি, মনোযোগ ও ভাষাগত দক্ষতাও বাড়ে, কারণ এটি জটিল নিউরাল সমন্বয় প্রয়োজন করে।
৫. স্ট্রেস, মানসিক ট্রমা ও প্লাস্টিসিটি
স্ট্রেসের স্থায়ী প্রভাব মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্লাস্টিসিটি সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা ট্রমার অভিজ্ঞতা হিপোক্যাম্পাসের গঠন ছোট করতে পারে, মনোযোগ কমাতে পারে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইতিবাচক অভ্যাস, থেরাপি, ব্যায়াম, ধ্যান—এসবের মাধ্যমে মস্তিষ্ক আবার সেরে উঠতে পারে। এটি নিউরোপ্লাস্টিসিটিরই শক্তি।
ট্রমা নিরাময়ে প্লাস্টিসিটি
EMDR, CBT, mindfulness meditation—এসব থেরাপি মস্তিষ্কের সংযোগকে পুনর্গঠন করে পুরোনো ট্রমার প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
৬. বয়স ও নিউরোপ্লাস্টিসিটি: কি শুধু তরুণদের জন্য?
অনেকে ভাবেন বয়স বাড়লে মস্তিষ্ক বদলানোর ক্ষমতা কমে যায়। সত্য হলো—শৈশবে প্লাস্টিসিটি সবচেয়ে দ্রুত, কারণ তখন মস্তিষ্ক শেখার জন্য প্রস্তুত থাকে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ও বৃদ্ধ বয়সেও মস্তিষ্ক যথেষ্ট নমনীয় থাকে, যদি তাকে সঠিক অভ্যাস দেওয়া যায়।
বয়স বৃদ্ধির পর প্লাস্টিসিটি বাড়ানোর উপায়
নতুন দক্ষতা শেখা
নতুন পরিবেশে থাকা
চ্যালেঞ্জিং মানসিক কাজ (যেমন পাজল, গণিত, ভাষা)
শারীরিক ব্যায়াম
সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা
বিজ্ঞানীরা বলেন: “Use it or lose it.”
অর্থাৎ মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে থাকলে তা আরও শক্তিশালী হয়।
৭. নিউরোপ্লাস্টিসিটির ব্যবহারিক প্রভাব: আমরা কী বদলাতে পারি?
(১) অভ্যাস
নতুন অভ্যাস তৈরি বা পুরোনো অভ্যাস ভাঙা মূলত নিউরাল সংযোগ বদলানোর প্রক্রিয়া।
যেমন:
ধূমপান ছাড়া
সকালে ব্যায়াম শুরু করা
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া
মনোযোগ বাড়ানো
প্রতিটি অভ্যাসই নিউরোপ্লাস্টিক পরিবর্তনের ফল।
(২) দক্ষতা বিকাশ
আপনি যদি গান, আঁকাআঁকি, কoding, ভাষা শেখা, গণিত—যে কোনো দক্ষতাই শেখেন, নিয়মিত অনুশীলন করলে আপনার মস্তিষ্ক সেই দক্ষতার জন্য বিশেষ নেটওয়ার্ক তৈরি করবে।
(৩) মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন
ধ্যান, যোগ, রিলাক্সেশন টেকনিক—এসব প্রমাণ করেছে যে এগুলো মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বাড়াতে পারে, স্ট্রেস সেন্টার অ্যামিগডালার অতিরিক্ত সক্রিয়তা কমাতে পারে।
(৪) স্মৃতি শক্তি বাড়ানো
মেমরি প্যালেস, পুনরাবৃত্তি, নোট নেওয়া—এসব কৌশল সিন্যাপস শক্তিশালী করে।
(৫) শারীরিক অক্ষমতার ক্ষেত্রে পুনর্বাসন
স্ট্রোকের পর অচল হাত পুনরায় চালু হতে পারে, কারণ মস্তিষ্ক নতুন পথ তৈরি করে হারানো দক্ষতাকে পুনর্গঠন করতে পারে। এটি নিউরোপ্লাস্টিসিটির অভূতপূর্ব উদাহরণ।
৮. কীভাবে সচেতনভাবে নিউরোপ্লাস্টিসিটি বাড়ানো যায়
নিচে বিজ্ঞানসম্মত কিছু উপায়:
১. ব্যায়াম
কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়াম (দৌড়, সাইক্লিং, দ্রুত হাঁটা) BDNF নামের একটি প্রোটিন বাড়ায়, যা নতুন নিউরন তৈরিতে সাহায্য করে।
২. ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেস
প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট অভিনিবেশ করা মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রেস কমানো এবং মস্তিষ্কের কর্টেক্স পুরু করা—all scientifically proven.
৩. পর্যাপ্ত ঘুম
ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের অভিজ্ঞতাগুলো ছেঁকে রাখে, অপ্রয়োজনীয় সংযোগ কেটে দেয় এবং দরকারি সংযোগ মজবুত করে।
৪. নতুন কিছু শেখা
শিখন যত কঠিন, নিউরোনাল পরিবর্তন তত বেশি।
উদাহরণ:
নতুন ভাষা
বাদ্যযন্ত্র
জাগলিং
জটিল খেলা যেমন দাবা বা টেনিস
৫. ইতিবাচক চিন্তা ও আффার্মেশন
নেতিবাচক চিন্তাও প্লাস্টিসিটি তৈরি করে, তবে ক্ষতিকর। ইতিবাচক চিন্তা, কৃতজ্ঞতা বা স্বীকৃতিমূলক বাক্য নতুন নিউরাল পথ গঠন করে।
৬. পরিবেশ পরিবর্তন
নতুন লোক, নতুন কাজ, নতুন অভিজ্ঞতা—সবই মস্তিষ্ককে চ্যালেঞ্জ দেয় এবং প্লাস্টিসিটি বাড়ায়।
৭. স্বাস্থ্যকর খাদ্য
ওমেগা-৩, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন-বি—এসব নিউরোলজিক্যাল স্বাস্থ্য উন্নত করে।
৯. নেতিবাচক প্লাস্টিসিটি: মস্তিষ্কের অন্ধকার দিক
নিউরোপ্লাস্টিসিটি যেমন ভালো কাজে লাগে, খারাপ কাজেও পারে। একে বলে নেতিবাচক প্লাস্টিসিটি।
উদাহরণ:
সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম
নেতিবাচক চিন্তা ও আত্মসমালোচনার অভ্যাস
দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস
অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক
বারবার এই অভিজ্ঞতা হলে মস্তিষ্ক ক্ষতিকর সংযোগ মজবুত করে, যা পরিবর্তন করতে হলে সচেতন অনুশীলন দরকার।
১০. নিউরোপ্লাস্টিসিটি আমাদের জীবনকে কী শেখায়?
মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি আমাদের তিনটি মৌলিক শিক্ষা দেয়:
১. পরিবর্তন সম্ভব
আপনি যতই ভাবুন আপনার অভ্যাস বদলানো অসম্ভব—বিজ্ঞান বলে, এটি সম্ভব।
মস্তিষ্কের কাজই হলো পরিবর্তন করা।
২. অনুশীলনই ভবিষ্যতের রূপকার
নিয়মিত পুনরাবৃত্তি আপনার মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ককে বদলে দেয়। যে পথে হাঁটবেন, সেই পথই প্রশস্ত হবে।
৩. জীবন হলো এক অবিরাম শেখার প্রক্রিয়া
বয়স কোনো বাধা নয়। মস্তিষ্ক শিখতে পারে, নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
