স্ট্রেস—মানুষের জীবনের এক অনিবার্য অংশ। কাজের চাপ, সম্পর্কের টানাপড়েন, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পরীক্ষা, কিংবা হঠাৎ কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা—সব মিলিয়ে দৈনন্দিন জীবনে আমরা স্ট্রেস থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। অনেকেই স্ট্রেসকে কেবল একটি “মানসিক চাপ” হিসেবে ভাবেন, কিন্তু বাস্তবে এটি একটি জটিল জৈব-মনস্তাত্ত্বিক (biopsychological) প্রতিক্রিয়া। আমাদের মস্তিষ্কে নানা রাসায়নিক পরিবর্তন, সংকেত আদান-প্রদান এবং শারীরিক ব্যবস্থা সক্রিয় হয় যা শরীরকে একটি সম্ভাব্য বিপদের জন্য প্রস্তুত করে।

এই প্রবন্ধে আমরা বুঝবো—স্ট্রেসের সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে, কোন কোন অংশ সক্রিয় হয়, হরমোন কীভাবে আমাদের অনুভূতি ও আচরণকে প্রভাবিত করে, দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস কেন ক্ষতিকর, এবং কীভাবে আমরা স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

স্ট্রেস কী?

স্ট্রেস হলো শরীরের “threat response system”—অর্থাৎ বিপদের সংকেত পাওয়ার পর শরীর যে স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া দেখায়। স্ট্রেস সবসময় খারাপ নয়। স্বল্পমেয়াদি স্ট্রেস (acute stress) অনেক সময় উপকারী—এটি আমাদের সতর্ক করে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, পারফরম্যান্স বাড়ায়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস (chronic stress) মস্তিষ্ক এবং শরীর উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।

স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের মস্তিষ্ক এবং একটি সুসংগঠিত হরমোনাল নেটওয়ার্ক, যা স্ট্রেসের মাত্রা অনুযায়ী শরীরকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে।

স্ট্রেসের সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে? ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা
১. অ্যামিগডালার সক্রিয়তা: বিপদের প্রথম ঘন্টাধ্বনি

আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে আছে ছোট্ট বাদামের মতো একটি অংশ, যার নাম অ্যামিগডালা (Amygdala)। এটি হলো আবেগ, বিশেষত ভয় ও বিপদ চিহ্নিত করার কেন্দ্র।

যখন আমরা কোনো চাপ, হুমকি বা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখি—

অ্যামিগডালা মুহূর্তের মধ্যে সক্রিয় হয়

বিপদ সংকেত পাঠায় মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশে

বিশেষ করে হাইপোথ্যালামাসকে নির্দেশ দেয় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া প্রস্তুত করতে

এই প্রক্রিয়া এত দ্রুত ঘটে যে আমরা অনেক সময় বুঝতেও পারি না—শরীর ইতিমধ্যেই ‘fight or flight’ মোডে আছে।

২. হাইপোথ্যালামাস: স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র

অ্যামিগডালার সংকেত পাওয়ার পর হাইপোথ্যালামাস পুরো শরীরে অ্যালার্ম সিস্টেম চালু করে। এটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথ সক্রিয় করে—

(ক) সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম (SNS)

এটি শরীরকে “তৎক্ষণাৎ” প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করে।
ফলাফল—

হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়

রক্তচাপ বাড়ে

শ্বাস দ্রুত হয়

পেশিতে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়

শরীরের শক্তি ব্যবহার শুরু হয়
এই সবই ঘটে অ্যাড্রেনালিন এবং নরঅ্যাড্রেনালিন নিঃসরণের কারণে।

(খ) HPA অ্যাক্সিস (Hypothalamus-Pituitary-Adrenal axis)

স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি অংশের দায়িত্বে এই ব্যবস্থা।
এই সিস্টেমের মাধ্যমে নিঃসৃত হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রেস হরমোন—কর্টিসল।

৩. কর্টিসল নিঃসরণ: স্ট্রেসের প্রধান হরমোন

স্ট্রেসের সময় পিটুইটারি গ্রন্থি ACTH হরমোন নিঃসরণ করে, যা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিকে কর্টিসল তৈরি করতে নির্দেশ দেয়।

কর্টিসলের কাজ হলো—

শরীরকে দীর্ঘ সময় বিপদের জন্য প্রস্তুত রাখা

রক্তে গ্লুকোজ বাড়িয়ে শক্তি সরবরাহ করা

মস্তিষ্কে সতর্কতা বৃদ্ধি

স্মৃতি তৈরিতে কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা

প্রদাহ কমানো

স্বল্পমেয়াদে কর্টিসল সাহায্যকারী হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্ষতিকর—কারণ এটি মস্তিষ্কের বেশ কয়েকটি অংশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

স্ট্রেসের সময় মস্তিষ্কের কোন কোন অংশ কীভাবে প্রভাবিত হয়?
১. প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (PFC) — সিদ্ধান্ত, ফোকাস ও বিচারবুদ্ধির কেন্দ্র

স্বাভাবিক অবস্থায় PFC আমাদেরকে—

যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে

মনোযোগ ধরে রাখতে

সমস্যা সমাধান করতে

আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে

কিন্তু স্ট্রেসের সময় কর্টিসল এবং অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে গেলে—

PFC-এর কার্যক্ষমতা কমে যায়

আমরা আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নিই

মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়

সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যায়

হঠাৎ রাগ, উদ্বেগ বা প্যানিক তৈরি হয়

এ কারণেই স্ট্রেসের সময় মানুষ প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা যুক্তিহীন প্রতিক্রিয়া দেখায়।

২. হিপোক্যাম্পাস — স্মৃতি ও শেখার কেন্দ্র

হিপোক্যাম্পাস স্ট্রেসের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর কাজ—

নতুন স্মৃতি তৈরি

পুরনো স্মৃতি ধরে রাখা

শেখার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ

স্বল্পমেয়াদি স্ট্রেস হিপোক্যাম্পাসকে কখনও কখনও সতর্ক রাখে, ফলে স্মৃতি আরও তীক্ষ্ণ হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস—

হিপোক্যাম্পাসের নিউরোনে ক্ষতি করে

স্মৃতি দুর্বল করে

নতুন তথ্য শেখার ক্ষমতা কমায়

এমনকি নিউরোনের গঠন ছোট করে দেয়

এ কারণে দীর্ঘদিন স্ট্রেস থাকা ব্যক্তিরা সহজ বিষয়ও ভুলে যান, জিনিস মনে রাখতে কষ্ট হয় এবং শেখার ক্ষমতা কমে যায়।

৩. অ্যামিগডালা — ভয়, উদ্বেগ ও আবেগের কেন্দ্র

দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস অ্যামিগডালাকে অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে।
ফলে—

সামান্য বিষয়েও বেশি ভয় বা উদ্বেগ তৈরি হয়

আবেগের প্রতিক্রিয়া অতিরিক্ত হয়ে যায়

প্যানিক অ্যাটাক বা অযৌক্তিক ভয় বাড়ে

একটি চক্র তৈরি হয়—
স্ট্রেস → অ্যামিগডালা অতিসক্রিয় → আরও স্ট্রেস → আরও উদ্বেগ

ফলে মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে পারে।

স্ট্রেসের শারীরিক প্রতিক্রিয়া ও মস্তিষ্কের নির্দেশনা

স্ট্রেস শুধু মস্তিষ্কের উপরই প্রভাব ফেলে না; পুরো শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ:

১. হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি

অ্যাড্রেনালিনের কারণে হৃদপিণ্ড দ্রুত রক্ত পাম্প করে—জরুরি শক্তি সরবরাহের জন্য।

২. শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হওয়া

মস্তিষ্ক ফুসফুসকে বেশি অক্সিজেন নিতে নির্দেশ দেয়—দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের জন্য।

৩. পেশিতে টান ধরা

“ফাইট বা ফ্লাইট” মোডে থাকার জন্য পেশি শক্ত হয়ে যায়—যা দীর্ঘমেয়াদে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে ব্যথা সৃষ্টি করে।

৪. পরিপাকতন্ত্র ধীর হয়ে যায়

মস্তিষ্ক হজম প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয় না, ফলে অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রিক বা ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়।

৫. ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে

স্ট্রেস হরমোনের কারণে ইমিউন প্রতিক্রিয়া কমে যায়, ফলে সহজে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের ফলে মস্তিষ্কে যা ঘটে

দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমাগত স্ট্রেস থাকলে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্ষমতা পরিবর্তিত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে—

১. নিউরোপ্লাস্টিসিটি কমে যায়

মস্তিষ্ক নতুন শাখা বা সংযোগ তৈরির ক্ষমতা হারাতে থাকে।

২. হিপোক্যাম্পাস সঙ্কুচিত হতে পারে

দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস স্মৃতিশক্তির অবনতি ঘটায় এবং ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বাড়ায়।

৩. প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স দুর্বল হয়

ফলে চিন্তা, যুক্তি, পরিকল্পনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৪. অ্যামিগডালা বড় এবং বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে

ফলে উদ্বেগজনিত সমস্যা, অতিরিক্ত ভয়, PTSD ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়ে।

৫. ডোপামিন ও সেরোটোনিনের ভারসাম্য নষ্ট হয়

ফলে আনন্দের অনুভূতি কমে যায়, মুড সুইং, অবসাদ, অনিদ্রা দেখা দেয়।

স্ট্রেস কেন মানসিক রোগের সঙ্গে যুক্ত?

স্ট্রেস মস্তিষ্কের হরমোন, নিউরোট্রান্সমিটার ও গঠনকে প্রভাবিত করার কারণে এটি—

ডিপ্রেশন

অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার

প্যানিক ডিসঅর্ডার

PTSD

বার্নআউট সিনড্রোম

এসব অবস্থার ঝুঁকি বাড়ায়। যাদের শৈশবের ট্রমা বা অতীত স্ট্রেস বেশি, তাদের মস্তিষ্ক আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

স্ট্রেস কমানোর বৈজ্ঞানিক উপায়: মস্তিষ্ক কীভাবে সাড়া দেয়?
১. গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস (Deep Breathing)

গভীর শ্বাস vagus nerve সক্রিয় করে, যা প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম চালু করে—
ফলে হৃদস্পন্দন কমে, উদ্বেগ চলে যায়, মস্তিষ্ক শান্ত হয়।

২. মেডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেস

গবেষণায় দেখা গেছে—

অ্যামিগডালার অতিসক্রিয়তা কমায়

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স শক্তিশালী করে

স্মৃতি ও ফোকাস উন্নত করে

কর্টিসল কমায়

৩. ব্যায়াম (Exercise)

ব্যায়াম এন্ডোরফিন বাড়ায়, যা প্রাকৃতিক mood-booster।
এটি—

অ্যামিগডালাকে শান্ত করে

হিপোক্যাম্পাসে নতুন নিউরোন তৈরি করে

স্ট্রেস হরমোন কমায়

৪. পর্যাপ্ত ঘুম

ঘুম মস্তিষ্কে স্মৃতি, আবেগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে পুনরায় সংগঠিত করে। ঘুমের ঘাটতি অ্যামিগডালাকে আরও সক্রিয় করে তোলে।

৫. সামাজিক যোগাযোগ ও সমর্থন

মানুষ সামাজিক প্রাণী, এবং সামাজিক সমর্থন মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন বাড়ায়—যা স্ট্রেস কমাতে অত্যন্ত কার্যকর।

৬. নিয়মিত বিরতি নেওয়া

দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করলে PFC ক্লান্ত হয়ে যায়। ছোট বিরতিগুলো তার কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।

স্ট্রেস কি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব?

না—স্ট্রেস পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, কারণ এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা শিখতে পারি—

কীভাবে স্ট্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়

কীভাবে স্ট্রেসের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা যায়

কীভাবে শরীরকে আরও অভিযোজিত করা যায়

মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি আমাদেরকে শেখায়—মস্তিষ্ক বদলাতে পারে। সঠিক অভ্যাস, সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে স্ট্রেসের নেতিবাচক প্রভাব অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।

Comment