মুরাসাকি শিকিবু: বিশ্বের প্রথম উপন্যাসের পথপ্রদর্শক লেখিকা
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে মুরাসাকি শিকিবু এক অসাধারণ এবং অনন্য নাম। একাদশ শতাব্দীর জাপানের ‘হিয়ান’ (Heian) রাজদরবারের এই বিদুষী নারী রচনা করেছিলেন ‘দ্য টেল অব গেনজি’ (The Tale of Genji) বা জাপানি ভাষায় ‘গেনজি মোনোগাতারি’। এটিকে বিশ্বের প্রথম উপন্যাস এবং মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। এমন এক সময়ে তিনি এটি লিখেছিলেন যখন রাজকীয় ভাষা ছিল চীনা এবং পুরুষদেরই শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান মনে করা হতো। কিন্তু মুরাসাকি সাধারণ জাপানি লিপি (কানা) ব্যবহার করে অভিজাত সমাজের রূপ-লাবণ্য, ক্ষণস্থায়ী প্রেম, রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং মানুষের মনের গভীর বিষাদকে এক অনন্য সংবেদনশীলতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
তার আসল নাম কী ছিল, তা আজও জানা যায়নি। ‘মুরাসাকি শিকিবু’ আসলে একটি ডাকনাম। ‘শিকিবু’ শব্দটি এসেছে তার বাবার সরকারি পদমর্যাদা (আচার-অনুষ্ঠান ব্যুরো বা শিকিবু-শো) থেকে। আর ‘মুরাসাকি’ (যার অর্থ বেগুনি বা নীললোহিত রং) নামটি সম্ভবত তার অভিজাত ‘ফুজিওয়ারা’ বংশের প্রতীকী রং থেকে এসেছে, অথবা তার উপন্যাসের প্রধান নায়িকার নাম থেকে অনুপ্রাণিত। তিনি যখন বেঁচে ছিলেন, তখন জাপানের রাজদরবারে ফুজিওয়ারা বংশের দারুণ প্রভাব ছিল। তিনি নিজের জীবনের খুব কম তথ্যই রেখে গেছেন, কিন্তু যা রেখে গেছেন—তা হলো বিশ্ব সাহিত্যের এক অতুলনীয় সম্পদ।
১ম খণ্ড: হিয়ান জাপানের রহস্যময়ী কন্যা – মুরাসাকি শিকিবুর পরিচয়
মুরাসাকি শিকিবু (আনুমানিক ৯৭৩–১০১৪ খ্রিষ্টাব্দ, তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে তিনি ১০২৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন) ছিলেন একজন জাপানি ঔপন্যাসিক, কবি এবং রাজদরবারের পরিচারিকা। তার জীবনটি রহস্যে ঘেরা হলেও তার সৃষ্টি সাহিত্যজগৎকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। তৎকালীন রাজধানী হিয়ান-কিও (বর্তমান কিয়োটো)-র শক্তিশালী ফুজিওয়ারা বংশের একটি অপেক্ষাকৃত ছোট শাখায় তার জন্ম। তিনি মধ্যম সারির অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন—যারা শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা হলেও ক্ষমতার একদম শীর্ষে ছিলেন না।
ইতিহাসের পাতায় তার আসল নামটির কোনো হদিস মেলে না। হিয়ান যুগে নারীদের আসল নাম সরকারি নথিতে খুব একটা লেখা হতো না। তাদের সাধারণত বাবা বা স্বামীর পদবি অথবা কোনো কাব্যিক ডাকনামে ডাকা হতো। ১০০৭ সালের একটি আদালতের ডায়েরিতে ‘ফুজিওয়ারা নো কাওরুকা’ নামের এক নারীর উল্লেখ মেলে, ধারণা করা হয় এটিই হয়তো তার আসল নাম ছিল, তবে তা নিশ্চিত নয়। তার সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানতে পারি, তা মূলত তার নিজের লেখা ডায়েরি (ডায়েরি অব লেডি মুরাসাকি), কিছু কবিতা এবং পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিক সূত্র থেকে।
তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন তার মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘দ্য টেল অব গেনজি’-র জন্য। ৫৪টি অধ্যায়ের এই বিশাল উপন্যাসের গল্পটি প্রায় ৭০ বছর সময়কাল জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে ৪০০-রও বেশি চরিত্র রয়েছে। গবেষক ও সমালোচকদের মতে এটিই পৃথিবীর প্রথম প্রকৃত উপন্যাস। কারণ, এতে কেবল কাল্পনিক অ্যাডভেঞ্চার বা নীতিগর্ভ রূপকথা ছিল না; বরং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, ধারাবাহিকতা এবং মানুষের ভেতরের আবেগ-অনুভূতির নিখুঁত চিত্রায়ণ ছিল।
সেই যুগে নারীদের জন্য এই কৃতিত্ব অর্জন করা সত্যিই অবিশ্বাস্য ছিল। কারণ তখন নারীদের পর্দার আড়ালে থাকতে হতো, সমাজে তাদের ভূমিকা ছিল সীমিত এবং সাহিত্যজগতে জাপানি গদ্যকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। পুরুষরাই তখন চীনা কবিতা ও পড়াশোনায় রাজত্ব করতেন।
২য় খণ্ড: হিয়ান রাজদরবারের আলো ও ছায়া
মুরাসাকি শিকিবুকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে হিয়ান যুগে (৭৯৪–১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দ)। এটি ছিল জাপানের সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ, যার কেন্দ্র ছিল কিয়োটো শহর। এই সময়ে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ছিল ফুজিওয়ারা বংশের হাতে। তারা রাজপরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি করে পুরো শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত। সম্রাটরা অনেক সময় নামমাত্র শাসক হতেন, আসল ক্ষমতা থাকত ফুজিওয়ারা মন্ত্রীদের হাতে। মুরাসাকির সময়ে এমনই এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন ফুজিওয়ারা নো মিচিনাগা।
সে যুগের রাজদরবারের জীবন ছিল অত্যন্ত নান্দনিক এবং নিয়মে বাঁধা। অভিজাত সমাজের মানুষরা ‘মোনো নো আওয়ারে’ (mono no aware) নামক একটি ভাবধারায় বিশ্বাস করতেন। এর অর্থ হলো—পৃথিবীর সবকিছুরই একটা ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য আছে এবং তা শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যে এক ধরণের মিষ্টি মধুর বেদনা আছে। এই অনুভূতি তারা প্রকাশ করতেন কবিতা (ওয়াকা), সুন্দর হাতের লেখা (ক্যালিগ্রাফি), সুগন্ধি তৈরি, গান এবং বহু স্তরের রঙিন পোশাক (জুনিহিতোয়ে) পরার মাধ্যমে। নারীরা বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরেই কাটাতেন এবং বাঁশের পর্দা বা স্লাইডিং দরজার আড়াল থেকে কবিতা ও চিঠির আদান-প্রদান করে যোগাযোগ রাখতেন। পুরুষরা অফিশিয়াল কাজে চীনা লিপি ব্যবহার করলেও নারীরা লিখতেন সহজ জাপানি ধ্বনিভিত্তিক লিপি বা কানা-তে।
এই নিয়মটি নারীদের জন্য এক অনন্য সাহিত্যের দরজা খুলে দেয়। ডায়েরি, কবিতার বই এবং গল্প (মোনোগাতারি) লেখার ধুম পড়ে যায়। মুরাসাকির সমসাময়িক আরেকজন বিখ্যাত লেখিকা ছিলেন ‘সেই শানাগন’ (Sei Shōnagon), যিনি তার বুদ্ধিদীপ্ত ডায়েরি ‘দ্য পিলোঁ বুক’ লিখেছিলেন। কিন্তু মুরাসাকি তার মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যান। তবে এই সুন্দর ও পরিশীলিত রাজদরবারের আড়ালে ছিল তীব্র রাজনৈতিক চক্রান্ত, বহুবিবাহের জটলা এবং রোগব্যাধি, নির্বাসন ও মৃত্যুর এক অন্ধকার ছায়া।
৩য় খণ্ড: প্রতিভার উৎস – শৈশব, পরিবার এবং এক ব্যতিক্রমী শিক্ষা
আনুমানিক ৯৭৩ (বা ৯৭৮) খ্রিষ্টাব্দে হিয়ান-কিওতে মুরাসাকির জন্ম হয়। তার বাবা ফুজিওয়ারা নো তামেতোকি ছিলেন একজন পণ্ডিত, কবি এবং প্রাদেশিক গভর্নর। মুরাসাকির মা সম্ভবত তার শৈশবেই (হয়তো অন্য কোনো সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে) মারা যান। তাই মুরাসাকি তার বাবার কাছেই বড় হন।
তার এক ভাই (নুবুনোরি) এবং অন্তত এক বোন ছিল, যে বোনটি অল্প বয়সেই মারা যায়। পড়াশোনার চমৎকার পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে মুরাসাকি ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। তার ভাইকে যখন চীনা ক্লাসিক বা প্রাচীন সাহিত্য পড়ানো হতো, মুরাসাকি আড়াল থেকে শুনেই তা খুব দ্রুত মুখস্থ করে ফেলতেন। মেয়ের এই প্রতিভা দেখে তার বাবা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমার কপালটাই খারাপ! ও যদি ছেলে হয়ে জন্মাতো, কতই না ভালো হতো!”—এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় সেকালের সমাজে নারীদের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল।
৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার বাবার সাথে ‘এচিজেন’ প্রদেশে যান। সে যুগে কোনো অভিজাত নারীর পক্ষে এমন দূর দূরান্তে ভ্রমণ করা ছিল বেশ বিরল ঘটনা। এই ভ্রমণ তার অভিজ্ঞতার ঝুলি বাড়িয়ে দেয়। তিনি কবিতা, গান এবং ক্যালিগ্রাফি শেখেন। চীনা এবং জাপানি—উভয় সংস্কৃতির এই গভীর জ্ঞানই পরবর্তীতে তার ‘দ্য টেল অব গেনজি’ উপন্যাসটিকে দর্শনে, ভাষায় এবং উপমায় এত সমৃদ্ধ করে তুলেছিল।
৪র্থ খণ্ড: প্রেম, বিরহ এবং এক বিধবার কলম – বিয়ে ও একাকীত্ব
বয়সের বিশের কোঠার শেষের দিকে (আনুমানিক ৯৯৮–৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) মুরাসাকি তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় এক দূর সম্পর্কের কাজিন ফুজিওয়ারা নো নুবুতাকাকে বিয়ে করেন। নুবুতাকা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং তার আরও পরিবার ছিল। এই সংসারে তাদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, যে পরবর্তীতে ‘দাইনি নো সানমি’ নামে একজন নামকরা কবি হিসেবে পরিচিতি পান।
কিন্তু তাদের এই সংসার বেশিদিন টেকেনি। মাত্র দুই বছর পর, ১০০১ খ্রিষ্টাব্দে সম্ভবত একটি ওলাওঠা (কলেরা) মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে নুবুতাকা মারা যান। মুরাসাকি এক ছোট সন্তানকে নিয়ে তরুণ বয়সেই বিধবা হয়ে পড়েন। তার কিছু কবিতা থেকে বোঝা যায় যে তাদের দাম্পত্য জীবনে কিছুটা মানসিক দূরত্ব ছিল, আবার কিছু কবিতায় সাধারণ সুখের ইঙ্গিতও মেলে। তবে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি সাংসারিক ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পান, যা তাকে লেখার জন্য একটি মানসিক সুযোগ ও অনুপ্রেরণা এনে দেয়।
ইতিহাসবিদদের ধারণা, এই শোক ও একাকীত্বের সময়ই তিনি নিজের ভেতরের কষ্টগুলোকে উপন্যাসের রূপ দিতে শুরু করেন। এভাবেই জন্ম নেয় ‘দ্য টেল অব গেনজি’-র প্রথম খসড়া, যেখানে তিনি প্রেম, জীবনের নশ্বরতা এবং মানুষের মনের গভীর গোপন রহস্যগুলোকে গল্পের ছলে তুলে ধরেছেন।
৫ম খণ্ড: রাজদরবারে ডাক – অন্তঃপুরের সেবা ও সাহিত্যিক জীবন
আনুমানিক ১০০৫-১০০৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে, লেখিকা হিসেবে মুরাসাকির খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে তৎকালীন ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব ফুজিওয়ারা নো মিচিনাগা তাকে একটি বিশেষ আমন্ত্রণ জানান। সম্রাট ইচিজোর স্ত্রী এবং মিচিনাগার কন্যা—সম্রাজ্ঞী শোশি (যিনি আকিকো নামেও পরিচিত ছিলেন)-র প্রধান পরিচারিকা বা সহচরী হিসেবে মুরাসাকি রাজদরবারে যোগ দেন। শিক্ষিত ও বিদুষী নারীদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজকীয় পরিবেশে এটি ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক কিন্তু বেশ কঠিন একটি দায়িত্ব।
রাজদরবারে থেকে মুরাসাকি খুব কাছ থেকে দেখতেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরের কোন্দল, রাজপুত্রদের জন্ম, জমকালো সব রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং অভিজাত সমাজের দৈনন্দিন রীতিনীতি। তিনি মাঝে মাঝে এসবের অংশও হতেন। তিনি সম্রাজ্ঞীকে গোপনে চীনা ক্লাসিক বা প্রাচীন সাহিত্য পড়াতেন। সে যুগে নারীদের জন্য চীনা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে সামাজিক নিষেধাজ্ঞা থাকায়, এই কাজটি ছিল অত্যন্ত গোপন এবং কিছুটা বৈপ্লবিক। তার এই গভীর জ্ঞানের কারণে দরবারে তাকে অনেকে উপহাস করে ‘ইতিহাসের দেবী’ (নিহোঙ্গি নো ত্সুবোনে) বলেও ডাকতেন।
তার লেখা ‘ডায়েরি অব লেডি মুরাসাকি’ (যা মূলত ১০০৮ থেকে ১০১০ খ্রিষ্টাব্দের সময়কাল নিয়ে লেখা)-তে রাজদরবারের এক জীবন্ত এবং সমালোচনামূলক চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে তিনি তার সহকর্মী নারীদের নিয়ে স্পষ্ট কথা লিখেছেন (যার মধ্যে বিখ্যাত লেখিকা ‘সেই শানাগন’ এবং ‘ইজুমি শিকিবু’-কে নিয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্যও ছিল)। রাজদরবারের বাহ্যিক চাকচিক্য এবং পুরুষদের মদ্যপ আড্ডার প্রতি তার এক ধরণের অনীহা ছিল, যা তিনি ডায়েরিতে প্রকাশ করেছেন। তিনি তার উপন্যাসের নতুন অধ্যায়গুলো লিখে ক্যালিগ্রাফারদের (অনুলিপিকার) দিতেন কপি করার জন্য, যা থেকে বোঝা যায় অভিজাত সমাজে তার এই লেখার দারুণ কাটতি ছিল।
৬ষ্ঠ খণ্ড: মহাকাব্যিক উপন্যাসের বুনন – ‘দ্য টেল অব গেনজি’-র সূচনা ও রচনা
মুরাসাকি তার এই বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য টেল অব গেনজি’ প্রায় এক দশক ধরে (আনুমানিক ১০০০ থেকে ১০১২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) লিখেছিলেন। এটি একনাগাড়ে লেখা হয়নি; বরং একটি একটি অধ্যায় করে লেখা হতো এবং তা বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে শেয়ার করা হতো। জানা যায়, এই উপন্যাসের মূল্য বুঝতে পেরে প্রভাবশালী মিচিনাগা নিজে মুরাসাকিকে কাগজ, কালি এবং ক্যালিগ্রাফার দিয়ে সাহায্য করতেন। মুরাসাকির ডায়েরিতে একটি মজার ঘটনার উল্লেখ আছে—একবার মিচিনাগা লুকিয়ে মুরাসাকির ঘরে ঢুকে উপন্যাসের একটি নতুন অধ্যায় চুরি করেছিলেন; অবশ্য মুরাসাকি কবিতার মাধ্যমে তার এই আচরণের যোগ্য জবাব দিয়েছিলেন।
গল্পটি সময়ের সাথে সাথে ডালপালা মেলেছিল। শুরুর দিকের অধ্যায়গুলোতে ‘উজ্জ্বল রাজপুত্র’ গেনজি-র যৌবন ও তার প্রেমের গল্পগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু পরের অংশগুলোতে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং বংশপরম্পরার গভীর গল্প উঠে এসেছে। ১০২১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই উপন্যাসের একটি পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে যায় এবং তা রাজদরবারে বেশ জনপ্রিয়তার সাথে পড়া হতো। আধুনিক ইংরেজি অনুবাদে এই বইটি প্রায় ১,১০০ পৃষ্ঠারও বেশি বড় এবং এর মধ্যে প্রায় ৮০০টি ঐতিহ্যবাহী জাপানি কবিতা (ওয়াকা) জুড়ে দেওয়া হয়েছে—যা একে এক বিশাল ও মহিমান্বিত রূপ দিয়েছে।
৭ম খণ্ড: উজ্জ্বল রাজপুত্র ও তার পৃথিবী – উপন্যাসের মূল ভাব, কাঠামো ও চরিত্র
এই বিশাল উপন্যাসটি মোট ৫৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত এবং একে মূলত তিনটি বড় অংশে ভাগ করা যায়:
১ থেকে ৩৩ অধ্যায়: এই অংশের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেন ‘হিকারু গেনজি’ (যার অর্থ উজ্জ্বল গেনজি)। তিনি ছিলেন সম্রাট কিরিত্সুবো এবং এক নিম্নপদস্থ উপপত্নীর সন্তান। রাজপুত্র হওয়া সত্ত্বেও তাকে সাধারণ নাগরিকের স্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু নিজের রূপ, গুণ, প্রতিভা এবং রাজনৈতিক বুদ্ধির জোরে তিনি সমাজে মাথা তুলে দাঁড়ান। নিজের সৎ মা ‘লেডি ফুজিৎসুবো’-র প্রতি তার নিষিদ্ধ প্রেম, অহংকারী ‘আওই’-এর সাথে বিয়ে এবং ছোট ‘মুরাসাকি’-কে নিজের মনের মতো আদর্শ নারী হিসেবে গড়ে তোলার গল্পই এখানে প্রধান। একপর্যায়ে তাকে সুমা ও আকাশি দ্বীপে নির্বাসিত হতে হয়, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
৩৪ থেকে ৪১ অধ্যায়: এখানে গেনজির জীবনের মধ্যগগন ও শেষদিকের গল্প বলা হয়েছে। এই অংশে তিনি চরম ক্ষমতার অধিকারী হন, কিন্তু তার প্রিয়তমা মুরাসাকির মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে জীবনের সব মোহ ও মায়াকে নতুন করে উপলব্ধি করেন।
৪২ থেকে ৫৪ অধ্যায় (উজি অধ্যায়): একটি রূপক অধ্যায়ের পর (যেখানে গেনজির মৃত্যুর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে) গল্পটি মোড় নেয় গেনজির নাতি ‘নিওউ’ এবং তার পালিত পুত্র ‘কাওরু’-র দিকে। ‘উজি’ নামক একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের পটভূমিতে লেখা এই শেষ অংশটি বেশ অন্ধকার ও বিষাদময়। এখানে মানুষের ভেতরের হিংসা, অপূর্ণ ইচ্ছা এবং আধ্যাত্মিক খোঁজের গল্প বলা হয়েছে।
হিয়ান যুগের নিয়ম অনুযায়ী, উপন্যাসের চরিত্রদের কোনো নির্দিষ্ট আসল নাম দেওয়া হয়নি; বরং তাদের পদবি, সামাজিক মর্যাদা বা সম্পর্কের ভিত্তিতে চেনা যায়। গেনজি চরিত্রটিকে সে যুগের একজন আদর্শ পুরুষ (যিনি কবি, সংবেদনশীল এবং প্রেমিক) হিসেবে দেখানো হলেও, মুরাসাকি অত্যন্ত চমত্কারভাবে তার খামখেয়ালিপনা এবং তার কারণে চারপাশের নারীদের কষ্টের কথাও ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসের প্রতিটি নারী চরিত্রকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে, তাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, ইচ্ছা ও দুর্বলতাসহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৮ম খণ্ড: ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিধ্বনি – গভীর মূলভাব ও সাহিত্যিক নতুনত্ব
‘দ্য টেল অব গেনজি’ উপন্যাসের মূল সুরটি গড়ে উঠেছে জাপানি ভাবধারা ‘মোনো নো আওয়ারে’ (mono no aware)-কে কেন্দ্র করে, যার অর্থ হলো—সৌন্দর্যের ক্ষণস্থায়ী রূপ সম্পর্কে এক ধরণের মিষ্টি মধুর বেদনাদায়ক অনুভূতি। বৌদ্ধধর্মের দর্শন, যেমন—সবকিছুর নশ্বরতা, মায়া এবং কর্মফল—এই উপন্যাসের পরতে পরতে মিশে আছে। এখানে দেখানো হয়েছে যে প্রেম যেমন পরম আনন্দ নিয়ে আসে, তেমনি তা অনিবার্যভাবে দুঃখও ডেকে আনে; রাজনৈতিক ক্ষমতা একসময় ফিকে হয়ে যায় এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল জীবনও একদিন অবসান বা Decline-এর দিকে এগিয়ে যায়।
মুরাসাকি এই উপন্যাসে মানুষের মনের এক অতুলনীয় মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উপহার দিয়েছেন। তিনি হিংসা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, বার্ধক্য এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আটকে থাকা নারীদের নীরব প্রতিবাদের গল্প ফুটিয়ে তুলেছেন। তৎকালীন সমাজে যেখানে মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হতো, উপপত্নী করে রাখা হতো এবং পর্দার আড়ালে বন্দী রাখা হতো, সেই ব্যবস্থার সমালোচনা করার পাশাপাশি তিনি জীবনের নান্দনিক রূপটিকেও এই উপন্যাসে উদযাপন করেছেন।
লেখার শৈলীর দিক থেকে এটি ছিল এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। তিনি দীর্ঘ, সাবলীল জাপানি গদ্যের মাঝে মাঝে চমৎকার সব কবিতা জুড়ে দিয়েছেন, যা গল্পের প্লটকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং চরিত্রের ভেতরের আবেগকে প্রকাশ করে। প্রাচীন চীনা ও জাপানি সাহিত্যের নানা উল্লেখ এই বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত এই বিশাল গল্পে চরিত্রের বয়স বেড়ে যাওয়া এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা তিনি যেভাবে বজায় রেখেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। বাহ্যিক অ্যাকশনের চেয়ে মানুষের ভেতরের মানসিক অবস্থার ওপর বেশি জোর দেওয়ার কারণে অনেকেই একে বিশ্ব সাহিত্যের প্রথম ‘মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস’ বলে মনে করেন।
৯ম খণ্ড: উপন্যাসের বাইরে – ‘ডায়েরি অব লেডি মুরাসাকি’ ও তার কবিতার কণ্ঠস্বর
মুরাসাকির লেখা ডায়েরি বা ‘মুরাসাকি শিকিবু নিক্কি’ হলো তার জীবন ও চিন্তাধারাকে বোঝার জন্য একটি অত্যন্ত মূল্যবান দলিল। রাজদরবারে কাজ করার সময় তিনি এটি লিখেছিলেন। এতে যেমন রাজকীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের (বিশেষ করে সম্রাজ্ঞী শোশির সন্তানদের জন্ম) বাস্তব বর্ণনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তার নিজস্ব ভাবনা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং সাহিত্যিক মন্তব্য। এই ডায়েরি থেকে তার এক জটিল ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে: তিনি নিজের মেধা নিয়ে গর্বিত ছিলেন কিন্তু মানসিকভাবে কিছুটা অন্তর্মুখী বা চুপচাপ ছিলেন, রাজদরবারের বাহ্যিক চটকদার জীবনকে তিনি সমালোচনা করতেন এবং নিজের লেখালেখির প্রতি ছিলেন ভীষণভাবে নিবেদিত।
উপন্যাস ও ডায়েরি ছাড়াও তিনি ১২৮টি কবিতার একটি সংকলন (কাশু) রেখে গেছেন, যা তার জীবনীর ধারাবাহিকতায় সাজানো। তার একটি বিখ্যাত কবিতা জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘হিয়াকুনিন ইস্যু’ (১০০ জন কবির ১০০টি কবিতা) সংকলনে স্থান পেয়েছে। তার কবিতায় প্রায়ই একাকীত্ব, অতীত স্মৃতি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে, যা তার উপন্যাসের আবেগের সাথে হুবহু মিলে যায়।
তার সমসাময়িক আরেক বিখ্যাত লেখিকা ‘সেই শানাগন’-এর লেখার স্টাইল যেখানে ছিল বেশ চনমনে ও বহির্মুখী, মুরাসাকির লেখায় সেখানে এক ধরণের গভীর অন্তর্মুখিতা এবং বিষাদের ছোঁয়া পাওয়া যায়। এটি শানাগনের বিখ্যাত বই ‘দ্য পিলোঁ বুক’-এর চটুল বুদ্ধিমত্তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
১০ম খণ্ড: অমর প্রতিধ্বনি – উত্তরাধিকার, প্রভাব, অনুবাদ ও এক অমীমাংসিত রহস্য
তৈরি হওয়ার মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই ‘দ্য টেল অব গেনজি’ একটি ধ্রুপদী বা ক্লাসিক সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এটি অনুপ্রাণিত করেছে দ্বাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত চিত্রিত স্ক্রোল বা চিত্রনাট্য (গেনজি মোনোগাতারি এমাকি), ঐতিহ্যবাহী ‘নোহ’ (Noh) নাটক এবং পরবর্তী শতাব্দীর বহু চিত্রকলাকে। ইদো (Edo) যুগে এসে এই বইটির ওপর ব্যাপক পড়াশোনা, প্যারোডি এবং রূপান্তর করা হয়। আধুনিক জাপানেও এটি শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রে রয়েছে। আজ পর্যন্ত এই গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অসংখ্য মাঙ্গা (জাপানি কমিকস), অ্যানিমে, সিনেমা, অপেরা এবং এমনকি সুগন্ধি নিয়ে একটি বিশেষ খেলা (গেনজিকো)-ও তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব দরবারে এই বইটি পরিচিতি পায় মূলত বিভিন্ন অনুবাদের মাধ্যমে। ১৮৮২ সালে সুয়েমাতসু কেনচো প্রথম এর একটি আংশিক ইংরেজি অনুবাদ করেন। এরপর ১৯২৫ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে আর্থার ওয়েলি এর একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী (যদিও কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও নিজস্ব শৈলীতে সাজানো) অনুবাদ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে এডওয়ার্ড সাইডেনস্টিকার (১৯৭৬), রয়্যাল টাইলার (২০০১, যা মূল লেখার একদম কাছাকাছি) এবং ডেনিস ওয়াশবার্ন (২০১৫) এর পূর্ণাঙ্গ আধুনিক অনুবাদ করেন।
তবে এই বইটিকে ঘিরে কিছু বিতর্ক আজও রয়ে গেছে। যেমন—মুরাসাকি কি একাই এর ৫৪টি অধ্যায় লিখেছিলেন, নাকি শেষের দিকের (বিশেষ করে উজি অধ্যায়গুলো) অধ্যায়গুলো তার মেয়ে বা অন্য কেউ লিখেছিলেন? তার মৃত্যুর সঠিক তারিখ এবং জীবনের অনেক ব্যক্তিগত তথ্য আজও অজানা। তবে এই রহস্যগুলো যেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
উপসংহার
মুরাসাকি শিকিবু এক চরম রক্ষণশীল ও সীমাবদ্ধ সমাজের ভেতর থেকে একজন নারী হিসেবে বিশ্বকে তার প্রথম মহৎ উপন্যাস উপহার দিয়েছিলেন—যা ছিল এক বিশাল আকাঙ্ক্ষা, মানসিক বুদ্ধিমত্তা এবং শৈল্পিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন। আজ এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু তার সেই ‘উজ্জ্বল রাজপুত্র’ এবং তার চারপাশের আবেগঘন পৃথিবী আজও পাঠকদের হৃদয়কে নাড়া দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের জীবনের ভঙ্গুর ও দীপ্তিময় সৌন্দর্যকে ধরে রাখার জন্য সাহিত্যের ক্ষমতা কতটা চিরন্তন।
তার এই অবদান কেবল জাপানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সর্বজনীন। এমন এক যুগে যখন নারীদের কণ্ঠস্বরকে প্রায়শই চেপে রাখা হতো, মুরাসাকি শিকিবু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার স্পষ্ট ও মার্জিত কণ্ঠস্বরে কথা বলে গেছেন। খুব সহজ কথায় বলতে গেলে—তিনি পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা লেখকদের একজন।
তার এই জীবনকাহিনী ও সাহিত্যিক যাত্রা কেবল তার প্রতিভার সামান্য একটু ছোঁয়া মাত্র। এই অসাধারণ নারীর মনকে আরও কাছ থেকে বুঝতে এবং মানব অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব রূপ দর্শন করতে হলে, সরাসরি ‘দ্য টেল অব গেনজি’-র কোনো আধুনিক অনুবাদ বা তার ডায়েরিটি পড়ে দেখার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হচ্ছে। তার গল্প এবং তার এই মাস্টারপিস সৃষ্টির পর সৃষ্টি ধরে টিকে থাকবে লিখিত শব্দের রূপান্তরকারী ক্ষমতার এক জীবন্ত প্রমাণ হিসেবে।

