আতঙ্কিত ব্যাটালিয়ন।

Md Fakhrul Islam Sagor

“আতঙ্কিত ব্যাটালিয়ন” — এটি কোনো বাহিনীর কাহিনি নয়; এটি মানুষের ভেতরের যুদ্ধের দলিল। ভয়, সন্দেহ, বিশ্বাসঘাতকতা, সাহস এবং সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে যে লড়াই মানুষকে মানুষ করে—এই গল্প তারই প্রতিফলন।

সৈনিকরা ক্যাম্পে প্রথমবার পা রাখার মুহূর্তে অনুভব করল—কিছু অদৃশ্য ভয় তাদের ঘিরে রেখেছে। হালকা বাতাস ভেসে আসে, কিন্তু বাতাসের সঙ্গে যেন কাঁপুনি বয়ে চলে।

মেজর আরিফ ধীরে ধীরে তাদের দিকে তাকালেন।
— “যে বাহিনী নিজের ভয়কে চেনে না, সে কখনো একত্রিত থাকতে পারে না।”

কেউ বোঝে না, শত্রু কোথায়—কেন বা কিসের ভয়ে ঘৃণা করছে। সেনারা একে অপরের দিকে তাকায়, অস্বস্তি অনুভব করে। একরাশ নীরবতা।

রাত্রি নামার সাথে সাথে, অদ্ভুত গুঞ্জন, অদৃশ্য কণ্ঠ, এবং কিছু ছোট ছোট ঘটনা সৈনিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে থাকে। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না।

আরিফ হালকা করে বলেন,
— “ভয় কখনো বাহ্যিক নয়। আসল যুদ্ধ চলে ভিতরে।”

সৈনিকেরা বুঝতে শুরু করে—যুদ্ধ মানে শুধু অস্ত্র নয়। এটা মানসিক প্রস্তুতি, সাহস এবং একে অপরের উপর বিশ্বাসের লড়াইও।

পরের দিন, একটি ছোট অভিযানের জন্য তারা প্রস্তুতি নিল। সৈনিকদের মধ্যে প্রথমবার সাহস পরীক্ষা হয়। কেউ পিছিয়ে যায়, কেউ নিজের দমে যুদ্ধের কল্পনা করে।

আরিফ বললেন,
— “সাহস শুধু অস্ত্র ধরে রাখা নয়। সাহস হল, ভয়কে চিনে গ্রহণ করা এবং তারপরও এগিয়ে যাওয়া।”

প্রথমবার সৈনিকেরা বুঝল, ভয় মানেই দুর্বলতা নয়—ভয়কে চেনার মাধ্যমেই শক্তি আসে।

ক্যাম্পে বিশ্বাস ভেঙে পড়ল। একে অপরের দিকে সন্দেহ, আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। কেউ কারো দিকে বিশ্বাস রাখতে পারছে না।

— “যে নেতৃত্ব বিশ্বাস হারায়, সে সৈনিকদের বাঁচাতে পারে না। কিন্তু যে সাহস রাখে, সে ইতিহাস গড়ে।”

এখন শত্রু বাহিরে নয়। শত্রু হলো সন্দেহ, অবিশ্বাস, এবং ভয়।

বেশ কয়েকজন সৈনিক মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল। কেউ বিভ্রান্ত, কেউ আত্মহত্যার প্রলুব্ধ।

— “যে বাহিনী একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারায়, সেই বাহিনী কখনো জয়ী হয় না।”

আরিফ তাদের বোঝালেন—ভেতরের আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কেউ নিজের অস্ত্রকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।

— “যে মানুষ নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে ইতিহাসও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”

সৈনিকেরা বুঝল, বাহ্যিক যুদ্ধই প্রধান নয়, ভেতরের যুদ্ধই আসল।

একদিন বড় বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পায়। কেউ শত্রু নয়, বরং ভয়ই তাদের বিভাজন ঘটাচ্ছে।

— “ভয় যখন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন কেউ অপরের দোষী নয়। শত্রু আমাদের ভেতরে।”

সৈনিকরা বুঝতে পারে—নির্দোষে কাউকে দোষারোপ করা যাবে না। তাদের শত্রু তারা নিজেই, তাদের অজানা ভয়।

নীরবতা এখন চিৎকার করতে শুরু করে। অদৃশ্য কণ্ঠ আতঙ্ক ছড়ায়।

— “যখন মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তখন তার ভয় সবচেয়ে জোরে কথা বলে।”

সৈনিকরা এখন ভয়কে শত্রুর মতো চেনে।

সত্য এবং ভ্রম মিলেমিশে যায়। কেউ নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।

— “যে ভয়কে প্রশ্ন করতে শেখে না, তার চোখই তাকে ধোঁকা দেয়।”

এখন যুদ্ধ মানে শুধু বাহ্যিক সংঘর্ষ নয়। যুদ্ধ হলো আত্ম-পরীক্ষা, সাহসিকতা এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তার লড়াই।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসে।
ক্যাম্পের নেতৃত্ব জানে—ভয়কে মোকাবিলা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

— “ভুল সিদ্ধান্ত মানুষকে শেখায়। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা মানুষকে শেষ করে।”

সৈনিকেরা এগোয়। জানে ফিরে আসা বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু এগোনোর দায়িত্ব তাদের।

ক্লাইম্যাক্সে আতঙ্ক এবং ভয়ের মধ্যে মানুষের অন্তর্দৈহিক শক্তি প্রকাশ পায়।
সৈনিকরা বাঙ্কারে পৌঁছায়, কেবল একটি রেকর্ডার শোনায়—

“শত্রু বাহিরে নয়, ভেতরে।”

এবার সবাই বোঝে—মানুষ যুদ্ধ জিতে বড় হয় না।
ভয়কে চেনে এবং মোকাবিলা করে বড় হয়।

যুদ্ধ শেষে, ভোরের আলো ভয় আনে না, ক্লান্তি আনে। সৈনিকরা ফিরে আসে, কেউ উল্লাস করে না।

— “আতঙ্ক আবার আসবেই। কিন্তু এখন তুমি জানো—ভয়কে লুকালে সে বড় হয়, আর চিনলে সে ছোট হয়।”

ব্যাটালিয়ন জয়ী হয়নি, হারও যায়নি।
ভয়কে বোঝার মধ্যেই মানুষ বেঁচে আছে।

শেষ লাইন:
“আতঙ্কিত ব্যাটালিয়ন” — একটি যুদ্ধের গল্প নয়, একটি মানুষের ভেতরের যুদ্ধের দলিল।

মোঃ ফখরুল ইসলাম সাগর

Comment