NIRMAL ROY

NIRMAL ROY

অলৌকিক বিষয়ক গল্প

সৌর সরণী

নির্মল রায়

হাঁটব কি করে? এত অন্ধকারে হাঁটা যায়? মানলাম রাত্রি নেমেছে। কিন্তু পথে আলো জ্বালানোর দায়িত্ব যাঁদের তাঁরা করেন কি? পরন্তু গৃহস্থেরা যেটুকু আলো জ্বালেন সেটুকু তাঁদের বাগানের দেওয়াল টপকায় না। কেননা এটাই রেওয়াজ। বাইরের কোন লোক যাতে ফাঁকতালে এতটুকু আলোও না পেতে পারে সে ব্যাপারে গৃহস্থবর্গ এখন প্রত্যেকেই সদা সতর্ক।

অতএব সেই অন্ধকার। সঙ্গে টর্চ নেই। নেই কেন? থাকা উচিত ছিল।সেটা আমারই ভুল। সূর্য অস্ত গেলে টর্চ নিয়ে বেরোতে হয়, এটা সবাই জানে। আমিও তো জানি। যদি জানি তবে বিস্মৃত হলাম কেন?

বাঁদিকের কাঁধ-ঝোলায় শুকনো বই। কাগজ। খাবার নেই। এরই মাঝে কয়েকটি কুকুর আমাকে পেয়ে কেঁদে কঁকিয়ে চিৎকার করে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলল। কয়েকটি ধাতুরঙা মুখ অনমনীয় পাথর হয়ে আমার আগাপাস্তালা পর্যবেক্ষণ করল।

এইভাবে পথের কুকুর- মানুষদের জমাটবাঁধা চাপ পেরিয়ে কিছুটা এগোনোর পর বাঁদিকে বয়স্ক-বাদামী প্রাসাদোপম একটি বিশাল বাড়ি দেখতে পেয়ে আমি কিছু না ভেবেই তার খোলা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

বাঁদিকের ক্রীড়ারত আলো আঁধারির ভেতর দিয়ে একটি সিঁড়ি ধরে কিছুটা ওপরে ওঠার পর দেখি ডানদিকে একটি আলোকিত হলঘর।ভেতরে ঢুকলাম। খুব আরামদায়ক সর্বযন্ত্রণাহর নম্র সাদা আলোয় সারা হলঘর ভেসে যাচ্ছে।

কিছু নর নারী এখানে বসে আছে। তাদের চোখে মুখে ছড়ানো তৃপ্তির মত হালকা উজ্জ্বলতা। নিয়ন্ত্রিত দীপ্তি।

আমি টুকরো টুকরো কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো ডায়াসে উঠে পড়লাম। দেখি সামনেই একটি ব্ল্যাকবোর্ড। কালো ব্ল্যাকবোর্ডের ওপর সাদা চকখড়িতে কিছু নিয়মাবলী আর অনুষ্ঠানসূচী লেখা।

এখানে যারা আছে তারা ব্ল্যাকবোর্ডের এই লেখাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে স্থির হয়ে বসে তৃপ্তি পাচ্ছে দেখে আমি দু’চারজনকে আমার জানতে চাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করতে গিয়ে বুঝলাম এরা এত বেশি জেনে ফেলেছে যে আমার জিজ্ঞাস্য এদের সবজান্তা তৃপ্তির কাছে কোন আবেদনই তুলতে পারছে না।

এ সময়েই আমার ডানহাতের আঙুলে কিছু স্পর্শ লাগতে দেখি এক শিশু আমার আঙুল ধরে টানছে। সে আমাকে হলঘর থেকে বাইরে নিয়ে গেল।

কয়েকটি খাড়াই সিঁড়ি এখান থেকে আরো ওপরে উঠে গেছে। শিশুটির সাথে আমি বেশ কষ্টেসৃষ্টে ওপরে উঠে এলাম। মাত্র এই কয়েকটি সিঁড়ি অথচ সেগুলি ভেঙ্গে উঠতে কি ভীষণ কষ্ট। কিন্তু ওপরে উঠেই হাতের আঙুল ফাঁকা বোধ হওয়াতে দেখি শিশুটি আর নেই।

দেখলাম আমি একটি ছাতে এসে পৌঁচেছি। কয়েকটি পিলারের ওপর ঢালাই করা ছাউনির নিচে এক ভদ্রলোককে দেখতে পেয়ে আমি তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম।

ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে আমার অনেক কিছু জিজ্ঞাস্য’র কিছু কিছু ইঙ্গিত দিতে তিনি আমাকে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা নিয়মাবলী আর অনুষ্ঠানসূচীর কথা উল্লেখ করে নিচের দিকে নেমে গেলেন। আমি চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। আমার জিজ্ঞাস্যগুলি যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে গেল।

একা আমি। উঠে দাঁড়িয়ে সেই ছাউনি পেরিয়ে ডান দিকে এগোতে দেখি বেশ চওড়া চলাফেরা করার মত লম্বা একটি প্যাসেজ সোজা ছাতের উত্তরে একেবারে শেষপ্রান্তে আগের ছাউনির থেকেও অন্তত চারগুণ বড় আয়তনের আর একখানি ছাউনিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। কয়েকটি সুদৃশ্য পিলারের ওপর এটিও ঢালাই করা। চারিদিক খোলা।

আমি প্যাসেজ ধরে এগোতে লাগলাম। কিন্তু প্যাসেজে এত নাবিক- নীল শ্যাওলা। এক পা এগোচ্ছি তো, দু’ পা পেছোতে হচ্ছে। খুবই পিচ্ছিল ।একবার পা ফসকে গেলে নিচে পড়ে গিয়ে ভয়ংকর বিপদ ঘটার সম্ভাবনা। কিছুটা এগোলাম। কিন্তু এভাবে তো আর যাওয়া যায় না। থমকে গেলাম।

চারিদিকে তাকাচ্ছি।হঠাৎ দেখি বাঁদিকেই আর একটি পরিচ্ছন্ন শ্যাওলাহীন অঞ্চল— এটিও সোজা ছাউনিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। আমি খুব সাবধানে আগের প্যাসেজ থেকে পাশের শ্যাওলাহীন অঞ্চলটিতে এলাম।

এই ছাতটায় প্রথমদিকের সন্দিগ্ধ অন্ধকার বা সিঁড়ির মাঝের সেই আলো আঁধারির কানামাছি খেলা নেই। আছে আলোয় দিনের বেলাকার নমনীয় স্বচ্ছতা। আর এই আলোটা গন্ধহীন, ধূলোশূন্য আর এত নরম, বিনয়ী।গায়ে লাগছে কি লাগছে না কিছু টেরই পাওয়া যায় না।

আমি এই শ্যাওলাহীন শুকনো জায়গাটি ধরে চাতালের দিকে এগোতে লাগলাম। ছাউনি এখন প্রায় নাগালের মধ্যেই। আর একটু এগোতে পারলেই হয় আর কি।

হঠাৎ পেছনের বাতাসে উচ্চ কম্পনাংক বিশিষ্ট উত্তপ্ত তরঙ্গ অনুভব করতে দেখি টকটকে লাল পোষাক পরা একটি নারী কিছু যেন বলতে বলতে আমার দিকে খুব দ্রুতবেগে এগিয়ে আসছে। মনে হল কিছু যুক্তি কিংবা কোন বিষয়ে কথা শোনানোর জন্য অথবা আমাকে ফিরে চলে আসার জন্যে সে খুব পীড়াপীড়ি করছে। কিন্তু আমি দাঁড়ালাম না।

আমি একেবারে ছাউনির গায়ে চলে এসেছি। আলের মত কয়েকটি সিমেন্টের ছোট ছোট ঘের দিয়ে ছাউনিটিকে চারিদিকে দিয়ে বেষ্টন করা আছে। আমি ঘেরগুলি থেকে সেই বিশাল ছাউনিটির
ভেতরে তাকালাম।

ভেতরে একটি প্রকাণ্ড সমাধিবেদী। তবে সমাধিবেদী সাধারণত যে রকম হয় এটি সেরকম না। ঠিক যেন বিশাল একটি মানুষের শায়িত শরীর। মাথা, পেট, দুটি হাত, দুটি পায়ের ঠিক ঠিক বানানো অবয়ব।বাঁ পাখানি হাঁটুর কাছে ভাঁজ করে একটু তোলা।

চারিদিক উষ্ণতাহীন ফিনকি দেওয়া আলোয় ভরে যাচ্ছে। ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। সেই লাল পোষাকে সজ্জিতা নারীটিকে এখন আর দেখতে পাচ্ছি না। আমি সেই ঘেরগুলি টপকে ছাউনির বেষ্টনীর মধ্যে মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

এরপরই শরীরের চারিদিকে এক ধরনের অদ্ভুত চাপ অনুভব করতে লক্ষ্য করলাম চারিদিকের প্রকৃতি কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। আমার দু’কানে তালা লেগে গেল। আমার সমস্ত সম্পর্ক ছিঁড়ে মুক্ত হয়ে গিয়ে আমি যেন একেবারেই হালকা হয়ে গেছি। যেন ছাউনির মেঝের সাথে আমার দু’ পায়ের কোন সংযোগ নেই। শারীরিক প্রকৃতির সাথে সরাসরি আমার কোন ভৌত-সম্বন্ধ নেই।

দু’ এক সেকেন্ডের বিরতি। তারপরই বুঝতে পারলাম একটি দমকা ঘূর্ণ্যমান শক্তি সবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে ।চক্রাকার শব্দ তুলে এই প্রবল শক্তি আমাকে ঘিরে সমাধিবেদীর দিকে টেনে নিয়ে চলল।

আমি যতই সমাধিবেদীর কাছাকাছি হতে লাগলাম সেই সশব্দ ঘূর্ণির বেগ ততই বাড়়তে লাগল। আমার পার্থিব অস্তিত্বের সমস্ত অনুভব লোপ পেতে শুরু করল। তারপর পার্থিব চেতনার একেবারে সমাপ্তি বিন্দুতে পৌঁছে একটি সীমান্তরেখায় স্থিত হয়ে আমি ঠিক সেখান থেকেই বিপরীত মুখে নিজেকে জোর করে টানতে শুরু করলাম।

এভাবে সরতে সরতে, দূরে যেতে যেতে বুঝলাম ঘূর্ণিপাকের বেগ ক্রমশ কমে আসছে। তারপর যে ঘেরাটোপ ডিঙ্গিয়ে আমি ছাউনির বেষ্টনীর মধ্যে ঢুকেছিলাম, কিভাবে যেন আমি সেটা পেরিয়ে বাইরে গিয়ে পড়লাম।

ধীরে ধীরে আমার চারপাশের সব কিছু আবার চেতনায় ধরা পড়তে লাগল। একটু পরে যে সিঁড়ি দিয়ে শিশুটির সাথে উঠে এসেছিলাম সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম।

ছাতের সেই ঠান্ডা ভাবটা কমে এল। ঝকঝকে আলোটা কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে এল। একেবারে হালকা ভাবটা সরে গিয়ে এখন আবার শরীরে কিছুটা ভার পড়ছে।

বাঁদিকের সেই হলঘর। ছাতে সেই আগের দেখা ভদ্রলোক হলঘরের দেওয়ালের নোটিশবোর্ডে রুটিনমাফিক প্রোগ্রামের নোটিশ টাঙ্গাচ্ছেন। তাতে দেখলাম একটি বক্তৃতার বিষয়— গল্পে কোলাজ বা কোলাজের গল্প। আমি সেই ভদ্রলোককে আমার একটু আগে লব্ধ অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গেলাম। কিন্তু তিনি হলঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

হলঘরে উঁকি মেরে দেখলাম সেই সব বসে থাকা তৃপ্ত মানুষদের সামনে ঘুরে ফিরে দুজন ভদ্রলোক কি যেন ডেমনস্ট্রেশন দিচ্ছেন। তাঁদের একজনের হাতে টর্চের মত এমন একটা যন্ত্র যার থেকে তীব্র অবিমিশ্র সাদা আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে।

আমি হলঘর থেকে চোখ সরিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালাম। দেখি একটি সাদা পোষাক পরা নারীমূর্তি আমার আগে আগে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। আমি তার তরঙ্গের স্পন্দন অনুসরণ করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম।

গেট দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখলাম রাস্তায় প্রচুর মানুষ খুব ব্যস্ত হয়ে কোলাহল করতে করতে চলাফেরা করছে।

আমি সেই জনস্রোতে নেমে পড়লাম। এখন পথ দেখতে আমার আর কোন অসুবিধে হচ্ছে না। আমার জিজ্ঞাসায়, আমার সর্বাঙ্গে, সমস্ত দেহকোষে, আমার সমগ্র অস্তিত্বের কোণে কোণে অন্ধকার সরিয়ে দিয়ে কেউ যেন হাজার হাজার সূর্যের বাতি জ্বেলে দিয়েছে।

পথের অন্ধকার আর কোনদিন পথ চলা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করতে পারবে না।

লেখক পরিচিতি – কবি গল্পকার প্রাবন্ধিক অনুবাদক । অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সরকারী আধিকারিক।

মাননীয় সম্পাদক/লেখার স্পর্শে

একটি অলৌকিক বিষয়ক গল্প পাঠালাম। প্রীত্যন্তে-নির্মল রায়

নির্মল রায়, তিলবাড়ি, পোস্ট- বিষ্ণুপুর ডিস্ট্রিক্ট- বাঁকুড়া, পিন- ৭২২১২২
whatsapp-9434021699 ,9749908926

Comment