পিসিমা /২১/১১/২০২৪
প্রবীর কুমার চৌধুরী
পিসিমাই আমাদের সংসারে আসল কত্রী। তাঁর শাসনেই বাড়ীর সবাই সন্ত্রস্ত থাকেন। পা ধুয়ে ঘরে ঢুকতে হবে। সন্ধ্যায় খাওয়া চলবে না । বড়দের আলোচনায় ছোটরা থাকতে পারবে না ।
এবংবিধ বহু অনুশাসন মেনেই আমরা বড় হয়েছি ।
একবার আমার বন্ধু আকবর আমার জন্মদিনে বাড়ি এলো । সবাই খাচ্ছে । এমন সময় দেখি আকবর মাথা নিচু করে আছে । আমি বললাম
” কিরে আকবর তুই যে কিছুই খাচ্ছিস না ।শুধু ভাত আর ডাল নিয়ে বসে আছিস ।” আকবর জানালো সে নিরামিষাশী। আমিষ খায়না । আমিষ খাবারে ছোঁয়া খাবারে একটু অস্বস্তি হচ্ছে।
পিসিমা দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন খেয়াল করিনি । পিসিমার ভীষণ ধর্মীয় গোঁড়ামি।
জাত – ধর্ম মানেন । হঠাৎ পিসিমা বললেন ” তুমি উঠে এসো । আমি তোমায় নিরামিষ খাবার
দিচ্ছি ” । আমি বুঝতে পারলাম এই বলে আকবরকে পিসিমা তুলে নিয়ে গেলেন । আমার
খারাপ লাগলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করলাম না ।
মিনিট পাঁচেক বাদে খাবার জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে দেখি আমাদের পুরান বৈঠকখানা ঘরে পিসিমা কলাপাতায় খেতে দিয়েছেন আকবরকে । ভাত,ডাল,আলুভাজা, আলুপোষ্ট,বেগুনভাজা, দই ও মিষ্টি। আকবর পরম তৃপ্তিতে খাচ্ছে । কিন্তু আমি বুঝেছি পিসিমা আকবর যেহেতু মুসলমান তাই সবার আড়ালে এখানে খেতে দিয়েছেন যাতে ওর ছোঁয়া কোনকিছতেই না লাগে।
রাতে সবাই খাওয়া দাওয়ার পর চলে গেলে পিসিমার বাড়ির সবার সামনেই বললেন ” দেবু তুই দেখছি জাত – ধর্ম সব জলাঞ্জলি দিয়ে দিচ্ছিস । একটা মুসলমানকে কি বলে তুই ঘরে ঢুকিয়ে সব ছোঁয়ালেপা করলি ? তুই কিছু নাই মানিস বা নাই মানতে পারিস কিন্তু আমরা তো মানি । এভাবে সবার জাত ধর্ম নষ্ট করছিস ? ”
সেইরাত্রে পিসিমা রাগে গরগর করতে ,করতে বাড়ি,ঘরদোর , বাসন – পত্র , সব বহুরাত্র পর্যন্ত পরিষ্কার করলেন । আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে
রইলাম অপরাধীর মত।
এর কিছুদিন পর পিসিমা একদিন সিঁড়ি থেকে পা হড়কে পরেই গেলেন । সংজ্ঞাহীন অবস্থা। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হলো। সঙ্গে ,সঙ্গে কাছাকাছি রেমিডি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হল। ডাক্টার বললেন
” শরীর থেকে প্রচণ্ড রক্ত ক্ষরণ হয়েছে । এইমুহুর্তে দুবোতল রক্ত দিতে হবে । এদিকে সুগার,প্রেসার হাই।
কিন্তু রক্ত জোগাড় করতে কাল ঘাম ছুটল। কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা এই রেয়ার গ্রুপের রক্ত । এবি নেগেটিভ । ডাক্টার বললেন আপনাদের বন্ধুদের কাছে খোঁজ করুন এই গ্রুপের রক্ত ।
বিরল রক্তের গ্রুপ হল AB নেগেটিভ (AB-)।
তবে AB- কে সাধারণত সর্বনিম্ন সাধারণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় 1% তৈরি করে।
এমন সময়ে খবর পেয়ে কোথাথেকে আকবর দৌড়াতে,দৌড়াতে এসে বলল ” আমি দেব রক্ত ।আমার শরীরে বইছে এবি নেগেটিভ রক্ত । আড়ালে সবাই আলোচনা করছে পিসিমা সুস্থ হয়ে যদি জানতে পারে মুসলমানের রক্ত তাঁর দেহে প্রবেশ করেছে তাহলে রক্ষে নেই । লঙ্কাকান্ড
বাধাবেন । কথাটা কানে যেতেই ডাক্টারবাবু ডেকে বললেন – আপনারা কোন আদিকালে পড়ে আছেন মশাই । মানুষের প্রাণ আগে না জাত ধর্ম ?
যাইহোক শেষ পর্যন্ত আকবর রক্ত দিল সেই রক্ত পেয়ে পিসিমাও ক্রমে সেযাত্রা বেঁচেও উঠলেন ।
পিসিমা আজ দুদিন হল নার্সিংহোমে থেকে বাড়ি এসেছেন। রাত্রে খাওয়ার সময় হঠাৎ পিসিমা আমাকে বললেন ” কাল আকবরকে দুপুরে ডেকে নিয়ে আসবি তো দেবু …” । আমি অজানা ভয়ে কাঁপতে লাগলাম ।
পিসিমার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা আমার নেই । তাই দুরু ,দুরু বুকে পরদিনই আকবরকে নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম । পিসিমা না খেয়ে বসেছিলেন । আমরা বাড়ি ঢুকতেই পিসিমা আকবরকে হাতধরে বললেন – তুই আমার জীবন দান করেছিস বাবা । আমি তোর কাছে চিরঋণী বাবা । তুই আমার কেউ না তবু তুই আমার ছেলের কাজ করলি । আর একটা অনুরোধ রাখিস নারে আমি মরলে আমার মুখে তুই আগুন দিবি। বল না দিবি তো ?”
আবেগে পিসিমার কথা আটকে গেল। তারপর কাঁদতে , কাঁদতে আকবরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমার চোখেও জল। দেখি মা-হারা আকবরের চোখেও শ্রাবণধারা। আমি নীরব ,নিস্পন্দ হয়ে চেয়ে রইলাম হিন্দু – মুসলমান দুই মা – ছেলের স্বর্গীয় এক মিলন দৃশ্যের একমাত্র সাক্ষী হয়ে।
(সমাপ্ত)

