Prabir kumar chowdhury

Prabir kumar chowdhury

গল্প – জীবনের যুদ্ধ
প্রবীর কুমার চৌধুরী

রাজীবের জীবনটা যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। বর্তমান জীবনযাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সে যেন হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। বেকারত্বের কষ্ট, মেকি প্রেমের যন্ত্রণা, আর জটিল সাংসারিক জীবনযাত্রার চাপে সে যেন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে। তার দিনগুলো কাটে চাকরির খোঁজে, আর রাতগুলো কাটে নির্ঘুম, ভবিষ্যতের দুঃসহ ভাবনায়।

অল্প বয়সে বাবা মারা গেলেন। তারপর থেকেই মা-ই একা সংসারটা টেনে এনেছেন এতোদিন। রাজীবকে গ্রাজুয়েশান করিয়েছেন। একটাই তাঁর স্বপ্ন। রাজীব বড় হয়ে তাঁর সমস্ত কষ্ট লাঘব করবে। কিন্তু…!

রাজীবের এখন বয়স ২৫, সে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে, কিন্তু চাকরি পাচ্ছে না। তার বন্ধুরা সবাই চাকরি করছে, আর সে একা একা ঘরে বসে থাকে। তার মা তাকে নিয়ে চিন্তিত, আর রাজীব সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

একদিন রাজীব তার বন্ধু বিনয়ের সাথে দেখা করে। বিনয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে, সে পাড়ার এখন সে একজন নেতা। সে রাজীবকে বলে, “তুইও রাজনীতিতে আয়, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু রাজীব রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। সে ভাবে, রাজনীতি কতটা নোংরা হতে পারে। সে নিজের জীবনটা সুন্দরভাবে নিজেই গড়তে চায়।

অধ্যায় ২ – রাজনীতির খেলা

বিনয় কিন্তু চেষ্টা ছাড়ে না।রাজীবকে রাজনীতিতে যোগ দিতে বলে, কিন্তু রাজীব রাজি হয় না। বলে, “আমি রাজনীতি করতে পারবো না, রাজনীতি আমার জন্য না।”
বিনয় বলে, “তুই বুঝিস না, রাজনীতি করলে সব পাওয়া যায়।” সুখ, সাচ্ছন্দ,অর্থ, ক্ষমতা,যশ, খ্যাতি…।

রাজীব বলে, ” তবুও আমি রাজনীতি করবো না। আজকের রাজনীতি তো দেখছি। হ্যা স্বীকার করছি অর্থ, ক্ষমতা দুটোই পাওয়া যায় কিন্তু আগের মতো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পাওয়া যায় না বিনয়। আজ রাজনীতি করলে হয়তো সব পাবো কিন্তু যখন ক্ষমতার হস্তান্তর হবে তখন ঘৃণা আর কলঙ্ক সম্বল করে বাঁচতে পারবো না ভাই। তার থেকে সাধারণ থেকেই আমি নিজের জীবনটা নিজেই গড়তে চাই।”

বিনয় বলে, “ঠিক আছে, তোর জীবন তুই যেমন করে গড়তে চাস…। কিন্তু তুই দেখিস, আমি একদিন খুব বড় নেতা হবো, অনেক উঁচুতে উঠবো। তখন হয়তো তুই আর আমার নাগাল পাবি না ।”

রাজীব বলে, “হ্যাঁ, তুই যে ভাবে এগোচ্ছিস তা তুই পারবি। কিন্তু কতটা শান্তি পাবি জানিনা ” রাজীব বিনয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।

এইভাবে এইভাবেই রাজীব আর বিনয়ের মধ্যে আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়তে লাগলো । রাজীব ইন্টারভিউ, পড়াশুনা, টিউশনি নিয়েই ব্যাস্ত থাকে।

অধ্যায় ৩: প্রেমের মায়া

রাজীবের জীবনে এরই মধ্যে আসে রিয়া। সে রাজীবকে ভালোবাসে, কিন্তু রাজীব বুঝতে পারে না যে রিয়া তার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রেমের যন্ত্রণা রাজীবকে ভোগায়।কিন্তু মাকে কিছুই জানাতে পারে না
একদিন রিয়া রাজীবকে বলে, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”
রাজীব বলে, ” আমি জানি না, আমি এইমুহূর্তে কোন সিদ্ধান্তই নিতে অক্ষম। আমাকে সময় দাও।”
রিয়া বলে, “ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করবো।”
কিন্তু রাজীব বুঝতে পারে না যে রিয়া তার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এই ভালোবাসার শেষ পরিণতি কি। আদৌ তাদের ভালোবাসার পরিণতি শুভ হবে কিনা। কারণ তার জীবনের এখনও কোন স্থিরতা আসে নি। সে নিজেই তার জীবনটা এখনও গড়তেই পারেনি। কি করে রিয়ার দায়িত্ব নেবে।

অধ্যায় ৪: বেকারত্বের কষ্ট

রাজীব পাগলের মতো চাকুরী খুঁজছে। একের পর এক ইন্টারভিউ দিচ্ছে কিন্তু কোথাও কিছু হচ্ছে না। বেকারত্বের কষ্টটা তাকে যেন রাহুর মতো ক্রমেই গ্রাস করছে। এখন মাঝে মাঝে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে।

রাজীবের মা তাকে নিয়ে চিন্তিত। মা সান্ত্বনা দেন , “বাবা, তুই চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু রাজীব বুঝতে পারে না যে সে কি করবে। সে আর কতদিন এই ব্যর্থ জীবন নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। বন্ধুরা তাকে দেখে হাসে, করুনা করে। উপদেশ দেয়। কেউ বলে ” চায়ের দোকান কর, কেউ বলে ” সন্ধ্যায় ক্লাবে না এসে চপ ভাজ, তাতে মায়ের কষ্ট লাঘব হবে। মাসিমা এখনও দোকানে, দোকানে ধুপকাঠি ফেরি করেন দেখতে খারাপ লাগে।
রাজীব মাথা নীচু করে সব শোনে, অনুশোচনায় দগ্ধ হয়। চোখের জল চেপে বেরিয়ে আসে ক্লাব থেকে। নিজের ব্যর্থতায় নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার বাসনা জাগে।

অধ্যায় ৫: সাংসারিক জটিলতা

ক্রমের পরিবারের অবস্থা খারাপ হচ্ছে।মার প্রেসার বাড়ছে। মাঝে মাঝেই শরীর খারাপ হয় তাঁর। সেই অবস্থায় অসুস্থ, মা তবুও বাইরে বের হন। কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন । রাজীবের নিজেকে এখন নিজেকেই অপরাধী মনে হয়।
মা তবু বলেন , “বাবা, তুই চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু রাজীব পাগলের মতো রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। বুঝতে পারে যে কিছু করতে পারছে না। হয়তো কোনদিন পারবেও না। এখন সে নিজেকে অপদার্থ, অপ্রয়োজনীয় মনে করে।

অধ্যায় ৬: রিয়ার চলে যাওয়া

একদিন গম্ভীরমুখে রিয়া এসে রাজীবকে বলল “আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে অনেক সময় দিলাম তুমি কিছুই করতে পারলে না। দেখছি দেখছি চেষ্টা করছি বলে সময় কাটাচ্ছো। একটা প্রাইভেট ফার্মেও কি কিছু জোগাড় করতে পারলে না? এদিকে বাবা আমার বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আমি আর কতদিন আটাকে রাখবো? এবার আমিই তোমায় একমাস সময় দিলাম। কিছু না করতে পারলে বাবার কথায় আমি রাজি হতে বাধ্য হব “। রাজীব কাতর ভাবে বলে, “না, রিয়া, তুমি এই দুঃসময়ে আমায় ছেড়ে যেও না। তুমি আমার শেষ অবলম্বন। আমি নিঃস্ব হয়ে যাব। তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না,আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কিন্তু রিয়া চলে যায়। রাজীব বুঝতে পারে যে সে রিয়াকে কতটা ভালোবাসে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে।

অধ্যায় ৭: রাজীবের ভাঙন

একমাস বাদেই রিয়ার বিয়ে। বিয়ের আগের রাত থেকেই রিয়া নিরুদ্দেশ। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। পুলিশ রাজীবকে সন্দেহের বশে ধরে থানায় নিয়ে গেছিলো কিন্তু বিনয় ভালো উকিল নিয়ে গিয়ে রাজীবকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। রিয়ার নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকেই রাজীব আরও ভেঙে পড়ে। নিজেকেই এই ঘটনার জন্যে মনে মনে দায়ী করে। নিজেকে ভীষণ একা লাগে এখন । মনে হয় আজ তার জীবনটা যেন অর্থহীন।

একদিন রাস্তায় বিনয়ের সঙ্গে রাজীবের দেখা হল। এখন বিনয় এলাকার কাউন্সেলার। অনেক ক্ষমতা। সবসময়ে সাথে দশ, বারজন লোক, লস্কর।বন্ধুকে উদভ্রান্ত অবস্থায় দেখে কাছে এসে বলে
” এতো ভেঙে পড়িস না। চেষ্টা চালিয়ে যা। আমার ক্ষমতা থাকলে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করতাম। তুই চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু রাজীব বুঝতে পারে না যে সে আর কি ভাবে চেষ্টা করবে। আজ যে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।

*অধ্যায় ৮: নতুন সূচনা*

সেইদিন থেকেই রাজীব সম্পূর্ণ পাল্টে গেল।
নতুন উদ্যোমে নিজেকে তৈরী করতে শুরু করলো। মার কাছে প্রতিজ্ঞা করলো। এবার সে কিছু করবেই। রাত জেগে পড়াশুনা শুরু করলো। পাড়ার এক প্রফেসারের স্মরণাপন্ন হলো। ফ্রি কোচিং শুরু করে নিজেকে গোছাতে লাগলো চাকুরীর পরীক্ষার জন্যে। শুরু হলো কঠোর সংগ্রাম। “হয় এবার বাঁচবো নয় মরবো”।

একবছরের মাথায় ভাগ্যের চাকাটা ঘুরলো। রাজীবের জীবনে শুরু হলো নতুন সূচনা। তিনটে চাকুরীর এপয়েন্টমেন্ট লেটার আসলো তার হাতে
শেষে সে জয়েন্ট করলো ব্যাংকের পি,ও
হিসাবে।

অধ্যায় ৯: বন্ধুত্ব

বিনয় সব শুনে এসে বলল “তুই বুঝিস না, রাজনীতি করলে সব পাওয়া যায়। আজ রাজনীতিটা ঠিক মতো শিখেছিলাম বলে
তোকে ঠিক পথে আনতে পেরেছিলাম। যাক এবার রিয়াকে বিয়ে করবি তো?”
রাজীব ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তার চোখদুটো ছলছলে।
বিনয় বলে, ” থাক ভাই তোকে কাঁদতে হবে না, আমি তোর ছোটবেলার বন্ধু। আমি রাজনীতি করেই না হয় তোর জীবনটা পরিপূর্ণ করে দিই। তোর রিয়া তোরই আছে। ”
তখনও রাজীবের ঘোর কাটেনি। ফ্যালফ্যাল করেই তাকিয়ে থাকে। বিনয় বলতে থাকে – ” তোদের শেষ দেখা হওয়ার পর রিয়া আমার কাছে আসে ও সব বলে। ও তোকে ভীষন ভালোবাসে।
দুদিন পর রিয়াকে বলি তোর মাকে জানিয়ে কিছুদিনের জন্যে বাইরে চলে যা।
আমিই ওকে বাঁকুড়ায় একটা প্রাইভেট স্কুলে চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিই। ”
রাজীব বিনয়কে জড়িয়ে ধরে বলে ” বন্ধু তুই আগের জন্মে আমার ভাই ছিলি “।
বিনয় বলে ” থাক, থাক আর সোহাগ মারাতে হবে। রাজনীতি মানে খারাপ আর ঘৃনাই প্রাপ্য এই ভুল ধারণাটা ছাড়। ভালো কাজ করলে সম্মান ও ভালোবাসা এখনও পাওয়া যায়। আমি যাই মাসিমাকে শুভসংবাদটা দিই। জীবনে অনেক তো কষ্ট করলেন…।

*অধ্যায় ১০: প্রেমের ফিরে আসা*

ককদিন বাদেই রিয়া ফিরে আসে। সে রাজীবকে বলে কেমন দিলাম বলো তো। তুমি কি করে ভাবলে তোমায় ছেড়ে চলে যাব? রাজীব এই প্রথম রিয়াকে বুকে টেনে নেয়।

*অধ্যায় ১২: সাংসারিক সুখ*

রাজীবের পরিবারের অবস্থা এখন খুব ভালো । সে ব্যাংকে জয়েন করার কয়েকদিনের মধ্যেই রিয়াকে সংসারে বৌ করে এনেছে। মাও সুস্থ, সবল। খুব খুশি ছেলেও ছেলের বৌ নিয়ে। সদাই হাসি, খুশি, চঞ্চল। রাজীব ও রিয়াই পরিপূর্ণ সংসার নিয়ে।নিজেকে সুখী মনে করে।

কানাঘুষও হচ্ছে বিয়ের আটমাসের পড়ার্পণ ওদের নাকি খুব সুখের হয়েছে।
ওদের সংসারে নাকি নতুন অতিথি আসছে।
রাজীব আজ বুঝতে পারে যে জীবনটা কতটা সুন্দর। সে জীবনের মানে খুঁজে পায়। যে সব বন্ধুরা একদিন বলেছিলো চপ ভাজতে, চা করে বিক্রি করতে তারাই আজ বলে রাজীব আর রিয়ার প্রেম সার্থক , তারা সুখে থাক। সত্যি আজ তাদের জীবনটা যেন একটা স্বপ্নের মতো।

এদানিং কানাঘুষও চলছে, বিয়ের আটমাসের পড়ার্পণে রাজীব – রিয়ার প্রেমের পরিপূর্ণতা পেয়েছে এবং নাকি খুব মধুময় ও সুখের হয়েছে।
মেয়ে মহলের চাপা খবর – ওদের সংসারে নাকি নতুন অতিথি আসছে।

Comment