Prabir kumar Chowdhury

Prabir kumar Chowdhury

#আর_কি_ফিরে_দেখা_হবে_বরাহনগর, ০৬/০২/২৬

প্রবীর কুমার চৌধুরী

কখনও কখনও ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলে মনে হয়, আমি যেন আর আজকের এই মানুষটা নই, আমি ফিরে গেছি বরাহনগরের শীলেদের সেই পুকুরপাড়ের সেই ছোট্ট গলির ভেতর, যেখানে আমার ছেলেবেলার দিনগুলো রোদ্দুর হয়ে খেলা করত। চোখ মুছলেই দেখি, পুরনো দুইতলা বাড়ির বারান্দা, নিচের বাগানে নানান গাছের সমাহার। গাছে ঝুলছে কাঁচা হলুদ রঙের বাতাবি, ঝাঁকে ঝাঁকে কাশির লাল শাসওয়ালা পেয়ারা, নারকেল গাছের উপর থেকে গাছিদাদু হাঁক পারছে,
” সরে যাও খোকাবাবু মাথায় গামরা পড়বে… “। আজও যেও নাকে আসে পাকশালের সামনের বড় কাঁঠাল গাছের কচি কাঁঠালের গন্ধ। আজও এই সুদূর গড়িয়ায় বসে বাড়ির সামনের তারকদের পুকুর থেকে উঠে আসা উত্তরের হাওয়াকে মনে হয় দূর থেকে ভেসে আসা কুঠিঘাট থেকে উঠে আসা গঙ্গার হাওয়া।

বরাহনগর তখন আমার কাছে ছিল একটা পৃথিবী,
নিজস্ব, নির্ভেজাল, নিরাপদ। মনে পড়ে মার হাত ধরে বিকেলে পাঠবাড়ির সামনের পথটা ধরে রেবামাসির বাড়িমুখো হাঁটলে মনে হতো ইতিহাসের বুকের ওপর দিয়ে হাঁটছি। সেই জমিদার বাড়ির ইটের দেওয়াল, জজবাড়ির সেই নিরবতা – শীলেদের পুকুরের সানবাঁধানো পুকুরঘাটে যেন কত অজানা কথা জমা করে রেখেছে। আমরা ছোটরা অবশ্য ইতিহাস বুঝতাম না, শুধু দৌড়ে বেড়াতাম, হাসতাম, আর তখন শুধু ভেবেই নিতাম এই পৃথিবীটা চিরকাল এমনই থাকবে। এতো আলো, বাতাস, নীলাকাশ, আর একবুক নিস্বার্থ ভালোবাসায় ভরানো পৃথিবী…।

মনে পড়ে রবিবারের সন্ধ্যায় রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাঙ্গণে দেখানো হত চার্লি চ্যাপ্লিন, লোরেন্স হার্দি, কোনদিন বিপ্লবী ক্ষদিরাম, দেশপ্রেমিক নেতাজি সুভাষচন্দ্র…। দিদার হাত ধরে ঢুকলেই কেমন একটা শান্তি নামত বুকের ভেতর। মিশনে রোজ সন্ধ্যারতিতে ঘণ্টার শব্দ, ধূপের গন্ধ, ভক্তিগানের সুর – এসবের মানে সেই পাঁচবছর বয়সে তখন পুরো বুঝতাম না, কিন্তু আজ বুঝি, সেখানেই প্রথম শিখেছিলাম স্থির হতে, চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরটা শুনতে। মিশনের সবুজ চত্বর যেন আমাদের ছেলেবেলার নির্ভার হাসিকে আশ্রয় দিয়েছিল।

ঝুলনতলার নামটা শুনলেই আজও মনে পড়ে বিকেলের আলো। মা – দিদা আর মাসি আমরা কয়েকজন মিলে যেতাম সেখানে। প্রতিবছর বসতো ঝুলন। কি বড় বড় সব মাটির পুতুল। কৃষ্ণ, রাধা, আযান ঘোষ, কংস আরও কত পুতুল দিয়ে হত সেই ঝুলন যাত্রা। তাকে কেন্দ্র করেই মেলা। নাগরদোলা, পাঁপড় ভাজা। নারকেলপাতায় লাল – নীল কাগজ সাটা ভেঁপু। সেই ভেঁপু বাজিয়ে বাড়িশুদ্ধ মানুষের পাঁচ বছরের আমি প্রাণ অতিষ্ট করতে সক্ষম হতাম।
সেই ঝুলনতলার ধুলো আজও আমার স্মৃতির গায়ে লেগে আছে।
সরস্বতী পুজোয় কারও হাতে থাকত ঘুড়ি, কারও হাতে মার্বেল। হেরে গেলে রাগ, জিতলে অহংকার—সবকিছুই ছিল ক্ষণস্থায়ী, অথচ গভীর।

রবিবার কুঠিঘাট মানেই গঙ্গার সিঁড়ি। কত বিকেল দিদার বসে থেকেছি সেখানে! ওপারে বেলুড় মঠ, লালবাবার আশ্রম। জলে সূর্যের প্রতিচ্ছবি কাঁপত, আর
আমি ভেবেই নিতাম – ওটাই হয়তো স্বপ্নের দরজা। নৌকা ভেসে যেত, মাঝিরা সুর ভাঁজত। মনে হতো জীবন খুব সহজ, জলের মতোই বয়ে যাবে, কোথাও না কোথাও একদিন গিয়ে মিশবে। তখন জানতাম নাতো , বড় হয়ে জীবন এত হিসেব চাইবে।

দক্ষিনেশ্বরে ছিল আমাদের এক অদ্ভুত টান। মা – বাবার সাথে প্রায়ই ছুটির দিন আলমবাজার দিয়ে ডানলপে পৌঁছাতাম। মন্দিরের চূড়ো দূর থেকে দেখলেই মনে হতো, যেন আকাশ ছুঁতে চেয়েছে। ওঁদের হাত ধরে গিয়েছি কতবার। ভিড়, প্রসাদ, ঘণ্টাধ্বনি
ভক্তিগীতি সব মিলিয়ে এক উৎসব। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা। হাওয়ায় চুল উড়ত, আর মনে হতো—আমি বড় হয়ে খুব বড় কিছু হবো। সেই স্বপ্নগুলো কবে যে হারিয়ে গেল, টের পাইনি। আমি ছা – পোষা মানুষ ছাড়া কিছুই হতে পারেনি।

আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে বুঝি—সেই দিনগুলোই ছিল আমার সত্যিকারের সম্পদ। বরাহনগরের সে দিনের নরম রাস্তাগুলো, পাঠবাড়ির নীরবতা, মিশনের শান্তি, ঝুলনতলার হাসি, কুঠিঘাটের জলের ঢেউ, আর দক্ষিনেশ্বরের আকাশ,- এসব মিলেই আমার শৈশবের এক নীল মানচিত্র।

আজও মাঝেমধ্যে স্বপ্নে দেখি, আমি আবার ছোট হয়ে গেছি। বন্ধুদের ডাক শুনে ছুটছি। কোথাও কোনো দায় নেই, কোনো ভয় নেই। শুধু রোদ, বাতাস আর সীমাহীন সময়।
হয়তো মানুষ বড় হয়, কিন্তু তার ভেতরের সেই ছোট্ট ছেলেটা কখনও বড় হয় না। সে আজও বরাহনগরের গলিতে ঘুরে বেড়ায়, কুঠিঘাটের সিঁড়িতে বসে থাকে,অবাক চোখে আকাশের তারা গোনার চেষ্টা করে। আর দক্ষিনেশ্বরের আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে।
আর আমি, এই প্রাপ্তবয়স্ক আমি, প্রতিদিন রাতে চোখ বন্ধ করে তাকে একবার ছুঁয়ে দেখি।
কারণ, আমার সমস্ত ক্লান্তির ভেতরেও আমার ছেলেবেলাটা এখনো বেঁচে আছে।

বরাহনগরের মানচিত্রে আজও কি আছে আমার শৈশব। কখনও কখনও মনে হয়, আমার শৈশবটা আসলে একটা পাড়ার নাম। একটা রাস্তার মোড়। একটা দোকানের গন্ধ। একটা বিকেলের আলো।
তাঁতিপাড়া দিয়ে হাঁটলেই কেমন যেন অন্য এক সময়ে ঢুকে পড়ি। কুঠিঘাট রোডের সেই ধুলো, শ্রীমানী পাড়ার সরু গলি, প্রিয়নাথ দে লেনের বিকেলের নরম রোদ—সব যেন আজও আমার পায়ের চেনা পথ। দর্জিপাড়ায় সেলাই মেশিনের টকটক শব্দ কি আজও আছে? ডোম বাগানের গাছপালার গন্ধ, ভোলানাথ স্ট্রিটের চেনা মুখগুলো- সব,সব আগের মতো কি ঠিক আছে? আমার ছোটবেলার পৃথিবীটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু ভীষণ গভীর ছিল। ষষ্ঠীতলায় পুজোর সময় আলো জ্বলত, আর মনে হতো দেবতা যেন সত্যিই নেমে এসেছেন। গোপাল লাল ঠাকুর রোড দিয়ে হেঁটে গেলে একটা আলাদা উত্তেজনা হতো। আজও গেলে কি কোথাও কেউ ডাকবে, কেউ কি আগের মতোই হাসবে, কেউ কাছে বসিয়ে গল্প শোনাবে। সিঁথির মোড়, চিড়িয়ামোড় এইসব নামগুলো তো শুধু জায়গা নয়, এরা আমার জীবনের একটা সময়ের চিহ্ন।
শ্রীমানী পাড়ার সেই খেলার মাঠ, আহা! কত দৌড়েছি, কত পড়েছি, কত হেরেছি, কত জিতেছি। তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ছিল বিকেলের খেলায় কে গোল দেবে। মাঠের ধুলো মেখে, মেখে বাড়ি ফিরলে বড়দের বকুনি আসত, কিন্তু সেই বকুনিও ছিল আদরের মতো।

ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল আমার ছোটবেলার স্কুল। প্রথম হাতেখড়ি, প্রথম বন্ধু, প্রথম শাসন। প্রথম একা রাজপথে চলা, সেদিনের খাতার পাতায় টানা অক্ষরগুলো আজও যেন বুকের ভেতর কাঁপে। স্কুলের ঘণ্টা পড়লেই মনে হতো, জীবন কত সুন্দর, কত সম্ভাবনায় ভরা

কুঠিঘাটের খড়গোলার গায়ের পায়ে হাটা সরু নরম মাটির রাস্তাটা আজও কি আগের মতোই সোদা গন্ধ বহন করছে? সেই সোদা গন্ধ আজও কিন্তু আমার নাকে লেগে আছে আর বাঁশগোলা মাঠের পাশে জয়নিতাইয়ের দোকানের ছয় পয়সার মুড়িমুড়কি! কোথায় গেলে পাবো… কত সুখ ছিল সেই ছোট্ট কাগজের ঠোঙায়। পাঁচটার বিকেলে রোজ ফেরিওয়ালা আসত কাঁধে বোচকা ঝুলিয়ে, দশ পয়সায় চারটে নিমকি বিস্কুট। দিদা প্রত্যেকদিন ছোটমামা আর আমাকে কিনে দিতেন, আমরা যেন রাজা হয়ে যেতাম। আজ লক্ষ টাকার জিনিসেও সেই আনন্দ নেই।

আর মনে পড়ে বিশুদাদুকে কি ভীষণ ভয় পেতাম। অথচ দাদু আমায় কত ভালোবাসতেন। উপহার দিতেন। কিন্তু বাঁধ সাধতো দাদুর বিশাল গোঁফজোড়া। সাথে দৈত্যকার চেহারা, আর্মির পোশাক, ছুটিতে বাড়ি ফেরা মানেই আমার আতঙ্ক। মনে হতো, তিনি যেন গল্পের কোনো বীরপুরুষ—কঠিন, দৃঢ়, অদম্য। অথচ দূর থেকে তাকিয়ে থাকতাম অবাক বিস্ময়ে।

দিদার স্নেহ ছিল আমার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তাঁর আঁচলের গন্ধ, তাঁর হাতের ভাত, মাছের ঝোল, সবই ছিল মাতৃত্বর অমৃতের ধারার মতো। বড়মামার বুকুনি ভয় মেশানো ভালোবাসা। ছোটমামা ছিল আমার খেলার সাথী, যেন বড়দের ভেতরেও একটা শিশু লুকিয়ে থাকতো । মাসির পুতুলঘরে আমি ছিলাম “পুতুল বর ”। একটা আলাদা সম্মান, আলাদা আদর। সেইসব কণা-কোণে ছড়িয়ে থাকা মুহূর্তগুলো আজও মনের অ্যালবামে ঝকঝক করে।

আজ যখন দাঁড়িয়ে ভাবি, বুঝতে পারি সুখ আসলে খুব ছোট ছোট জিনিসে লুকিয়ে ছিল। ছয় পয়সার মুড়িমুড়কি, দশ পয়সার নিমকি, বিকেলের মাঠ, দিদার কোলে মাথা রাখা – এসবই ছিল আমার স্বর্গ।
কোথায় গেল সে সব দিন? রাস্তা কি বদলে গেছে, না আমি বদলে গেছি? তাঁতিপাড়ার গলি কি আজও আমার নাম ধরে ডাকে? শ্রীমানী পাড়ার মাঠ কি আজও সন্ধ্যায় ধুলো উড়িয়ে দেয়?
সময় আমাদের বড় করে দেয়, কিন্তু বিনিময়ে শৈশবটা কেড়ে নেয়। তবু গভীর রাতে, যখন চারদিক চুপচাপ, আমি স্পষ্ট শুনতে পাই – কুঠিঘাট রোড দিয়ে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে যাচ্ছে। তার হাতে মুড়িমুড়কির ঠোঙা, চোখে অগাধ স্বপ্ন।
সে আমিই। সে আজও হারিয়ে যায়নি।
সে রয়ে গেছে বরাহনগরের মানচিত্রে – চিরকাল।

বরাহনগরের মানচিত্রে আমার শৈশব…
কখনও কখনও মনে হয়, আমার শৈশবটা আসলে একটা পাড়ার নাম। একটা রাস্তার মোড়। একটা দোকানের গন্ধ। একটা বিকেলের আলো।
তাঁতিপাড়া দিয়ে হাঁটলেই হয়তো একটা অন্য এক সময়ে ঢুকে পড়বো। কুঠিঘাট রোডের সেই ধুলো, শ্রীমানী পাড়ার সরু গলি, প্রিয়নাথ দে লেনের বিকেলের নরম রোদ – সব যেন আজও আমার পায়ের চেনা পথ। দর্জিপাড়ায় সেলাই মেশিনের টকটক শব্দ, ডোম বাগানের গাছপালার গন্ধ, ভোলানাথ স্ট্রিটের চেনা মুখগুলো – আমার ছোটবেলার পৃথিবীটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু ভীষণ গভীর ছিল।

সময় আমাদের বড় করে দেয়, কিন্তু বিনিময়ে শৈশবটা নিয়ে নেয়। তবু গভীর রাতে, যখন চারদিক চুপচাপ, আমি স্পষ্ট শুনতে পাই—কুঠিঘাট রোড দিয়ে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে যাচ্ছে। তার হাতে মুড়িমুড়কির ঠোঙা, চোখে অগাধ স্বপ্ন।
সে আমিই। সে আজও হারিয়ে যায়নি। সে রয়ে গেছে বরাহনগরের মানচিত্রে…।

Comment