অনুগল্প
প্রিয় বান্ধবী, ০৬/০৯/২০২৫
প্রবীর কুমার চৌধুরী
সবাই তখন পই পই করে বারণ করেছিল
বিনয় এমন ভুল করিস না। শেষে এই ভুলের কঠিন সাজা পেতে হবে।
বাণী চলে গেছে আজ দু বছর। বিনয় কম চেষ্টা করিনি বাণীকে ধরে রাখার কিন্তু সবই ভাগ্য। মাত্র দুমাস ডাক্তারবাবু বিভিন্নটেস্ট করে বললেন ” লাস্ট স্টেজ কোন লাভ নেই “। দীর্ঘ পয়ত্রিশ বছরের সম্পর্ক ছেদ করে বাণী পরপারে চলে গেল।
তবুও দুই ছেলেকে বুকে নিয়ে বেঁচে আছে বিনয়। আত্মীয় -স্বজন, বন্ধুরা অনেক বলেছিল…। কিন্তু নিজের রক্ত তো অবিশ্বাস করতে পারেনি। একে একে টাকা – পয়সা, বাণীর গয়না,বাড়ির অধিকার সব সব লিখে দিয়েছিল।
দুইমাসও কাটেনি ছেলেরা প্রোমোটারের হাতে তুলে দিল জমি ও বাড়ি। বিনয় নীরব দর্শক। তারপর প্রোমোটারকে বাড়ি ছেড়ে ভাড়াবাড়িতে যাবার আগে ছেলেরা বলল – বিনয় নাকি ছেলের বৌ’দের সাথে মানিয়ে চলতে পারছে না। সংসারে ভাঙ্গন ধরছে তাই তাকে ওল্ড এজ হোমে থাকতে হবে। পেনশনের টাকাটা শুধু ওদের হাতে তুলে দিতে হবে।
আজ সক্কাল বেলাতেই বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বিনয়ের জিনিসপত্র তোলা হচ্ছে। আজই তাকে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে হবে। বিনয়ের চোখে জল। বুকের মধ্যে বাণীর মালা দেওয়া ছবিটা। আজ ওটাতে যে শুধুমাত্র বিনয়ের অধিকার।
বিনয় দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শেষবারের জন্যে নিজের হাতে গড়া বাড়িটাকে ভালো করে দেখে নিচ্ছে। এ কদিন দেখে নিয়েছে আলনায় এখনো বাণীর শাড়ি – ব্লাউজ ভাজ করা। বিছানায় তাঁদের দুজনের বালিশ।কাঠের আলমারিতে বাণীর কত স্মৃতিচিহ্ন। এলবামের পাতায় পাতায় হাসিমুখ। এখনও ড্রয়ারে বাণীর সিঁদুর, ক্রিম, চিরুনি দেখে নিচ্ছে। বিনয় সারারাত বুকে নিয়ে শুয়েছিল। বাগানের মাঝের দোনলাটা যেখানে কতদিন চাঁদনীরাতে তারা দুজনে দুলতো আর গান গাইতো। বাণীর হাতে লাগানো মাধবীলতা গাছটা তুলসী না থাকলেও তুলসীমঞ্চটা আজও আছে শুধু বাণী নেই। এবার থেকে বিনয়ও আর এ বাড়িতে থাকবে না। বড় ছেলে সুবিনয় জোরে ধমকে উঠল বাবাকে ” ন্যাকামি হচ্ছে? এতোবছর তো ভোগ -দখল করলে আর কেন এবার মায়া ছাড় “। বলেই বাবার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিতেই বিনয় টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল দোরগড়ায়। ঠিক সেই সময়ে আরেকটি ক্রিম কালারের একটি গাড়ি এসে থামলো। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক সুন্দরী,ব্যক্তিত্বময়ী ষাটোর্ধ ভদ্রমহিলা। এককালে যে প্রচন্ড সুন্দরী ছিলেন দেখলেই বোঝা যায়। সাদা ধবধবে গায়ের রঙ, মাথার চুলও সব সাদা। পরনে দামি গরদের শাড়ি বিত্তের পরিচয় দেয়।
সারা শরীর থেকে অভিযাত্যর বিচ্ছরণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিনয়ের হাত ধরে তুলে বললেন – ” ভয় নেই।বলেছিলাম না তোমার অসময়ে আমি ঠিক এসে তোমার পাশে দাঁড়াবো। তুমি ভুললেও আমি তো বন্ধুত্বর ভুলিনি বিনু। ”
বিনয়ের মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। আর্তকণ্ঠে বলে উঠলেন – ” মৃনাল… “।
তার কলেজ জীবনের সবথেকে প্ৰিয় বান্ধবী মৃণালিনী
বন্দ্যোপাধ্যায়, বিখ্যাত ” বন্দ্যোপাধ্যায় জুয়েলারি ম্যানশনের “এর প্রপাইটার…। শীর্ণ, দীর্ণ বিনয় প্রিয়বান্ধবীর হাত ধরে গাড়িতে বসতেই গাড়িটা ছুটতে লাগল নির্ভরতা ও শান্তির উদ্দেশ্যে …।
সংরক্ষিত
গড়িয়া, কলকাতা।

