Prabir kumar Chowdhury

Prabir kumar Chowdhury

চারটি কবিতা

১)

বসন্তের অন্তরীক্ষে এ জীবন
প্রবীর কুমার চৌধুরী

যখন শুষ্কতার দীর্ঘ উপবাস ভেঙে
ধরণীর কণ্ঠে জেগে ওঠে সবুজ উচ্চারণ,
তখন বুঝি –
মৃত্যুরও একটি সীমারেখা আছে,
তার পরেই বসন্তের বিস্ময়।

পাতাহীন ডালপালায়
হঠাৎ রক্তিম স্পন্দন,
কুঁড়ির ভেতর নীরব বিপ্লব;
মাটির গভীরে জমে থাকা অন্ধকার
ধীরে ধীরে আলোয় স্বাক্ষর করে।

হে জীবন,
তুমি কি তবে এই নবপল্লবের নাম?
অবসন্ন রাত্রির শেষে
অতল সূর্যোদয়ের উচ্ছ্বাস?

দেখো –
আকাশ আজ কোনো শোক জানে না,
বাতাসে বিষাদের কোনো রাজনীতি নেই;
শুধু উড়ছে অদৃশ্য সুরের কণা,
যেন প্রতিটি শ্বাসে পুনর্জন্মের অধিকার।

শিমুলের রক্তিম ঘোষণা
পলাশের দীপ্ত অনল
আমাদের অন্তর-অরণ্যে আগুন জ্বালায় –
সে আগুন দহন নয়,
সে আগুন জেগে ওঠার প্রতিজ্ঞা।

মানুষের ভাঙা স্বপ্নের উপরে
যখন বসন্ত রাখে সবুজ হাত,
তখন ক্ষতও হয়ে ওঠে ফুলের সম্ভাবনা।
ভগ্নতার ভিতরে লুকিয়ে থাকে
অপরাজেয় প্রস্ফুটন।

হে প্রভাতের অমৃত-বাতাস,
আমাদের ক্লান্ত অস্থিতে ঢেলে দাও প্রাণ
আমরা আবার হাঁটতে চাই
অজানা পথের দিকে
যেখানে প্রতিটি ধূলিকণাও বলে ওঠে –
“বেঁচে থাকাই সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব।”

বসন্ত মানে শুধু রঙের উল্লাস নয়,
বসন্ত মানে অন্তরের বিপ্লব
যেখানে মানুষ নিজেকে ফিরে পায়
নতুন বিশ্বাসের আলোয়।

এই জীবন
অপরিসীম আঘাতের মাঝেও
এক অনিবার্য ফুল ফোটার আকাঙ্ক্ষা,
এই বসন্ত –
মৃতপ্রায় সময়ের বুকে
অমরত্বের প্রথম স্বাক্ষর।

চলো তবে,
আমরা প্রত্যেকে একটি করে পাতা হই,
একটি করে কুঁড়ি,
অন্ধকারের বিরুদ্ধে
রঙিন প্রতিবাদের ভাষা।

কারণ বেঁচে থাকা মানে
শুধু শ্বাস নেওয়া নয়,
বেঁচে থাকা মানে
নিজের ভিতরে বসন্ত জন্ম দেওয়া।

২)

অন্তিম অনস্তিত্বের অভিসার, ১১/০২/২০২৬
প্রবীর কুমার চৌধুরী

মৃত্যু এক অবচেতনার অবসানবিন্দু নয়
বরং অনস্তিত্বের অভিসার-দ্বার,
যেখানে সময় নিজেই নির্বাক নির্বাসনে যায়।

দেহ কেবল প্রজ্ঞাহীন পরিধেয়,
আত্মা তার অনামা অভিযাত্রার অভিকর্ষে
শূন্যতার সুদীর্ঘ সোপানে আরোহন করে।

আমরা যাকে বলি অবসান,
তা তো কেবল রূপান্তরের গুপ্ত ব্যাকরণ
অস্তিত্বের অবিনশ্বর ব্যঞ্জনবর্ণ।

কবরের মাটি এক নীরব মহাকাব্য,
যেখানে প্রতিটি অস্থি,লিখে যায় ক্ষণস্থায়ীতার স্বরলিপি।

মৃত্যু –
এক মহাজাগতিক বিরামচিহ্ন,
যার পরে শুরু হয় অমৃতের অদৃশ্য উচ্চারণ।

সংরক্ষিত
গড়িয়া, কলকাতা।

৩)

মুক্ত গদ্য

সত্যি করে বল
প্রবীর কুমার চৌধুরী

বুকে হাত দিয়ে সত্যি করে বলোতো তোমায় আমি ভালোবাসিনি ?
কখনো চলতে চলতে, কখনো জানালার পর্দা সরিয়ে আমায় তুমি দেখোনি?
একটুও কি থমকে যাওনি?
একটুও কি তোমার শ্বাসের ভেতর আমার নামের অক্ষর কেঁপে ওঠেনি?

আমি জানি, এই শহর খুব ব্যস্ত।এখানে সিগন্যালের লাল আলোতেও মানুষ মোবাইল দেখে, এখানে আকাশ ভরা চাঁদ উঠলেও কেউ মাথা তোলে না। তবু আমি বিশ্বাস করতাম,এই কংক্রিটের বুকের ভেতর কোথাও না কোথাও এখনো একটু নরম মাটি আছে।যেখানে ভালোবাসা বীজের মতো পড়ে থাকলেএকদিন অঙ্কুর ফুটবেই।

তোমার চোখে আমি বহুবার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেছি। সেটা হয়তো ছিল ক্ষণিক, হয়তো ছিল ভুল,হয়তো ছিল আমারই হৃদয়ের অলীক, মিছে কল্পনা।
কিন্তু কল্পনাও তো হঠাৎ জন্মায় না, কোথাও না কোথাও তার বীজ থাকে।
তোমার নির্লিপ্ত হাসির কোণায়,
তোমার অন্যমনস্ক চুল সরানোর ভঙ্গিতে,
তোমার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ার ভেতর
আমি আমার জন্য একফোঁটা জায়গা খুঁজে পেয়েছিলাম।

আজকাল মানুষ ভালোবাসে না,মানুষ শুধু হিসেব কষে । কে কতটা দেবে, কে কতটা নেবে,কিসে কতটা লাভ, কিসে কতটা ক্ষতি।

ভালোবাসার আগে তারা শর্ত লেখে,
আবেগের আগে লিখে নেয় চুক্তিপত্র।
হৃদয় এখন আর দরজা খুলে দেয় না,
শুধু পাসওয়ার্ড চায়।আর সেই পাসওয়ার্ডও বদলে যায় সুবিধেমতো।

তুমি কি জানো আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম কোনো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চাইনি বলে? আমি চাইনি কোনো প্রতিশ্রুতির সোনালি খাঁচায় তোমাকে বন্দি করতে ।আমি শুধু চেয়েছিলাম – একটা পড়ন্ত বেলার বিকেলের মিঠে রোদে আমরা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকবো,
চুপচাপ,নির্বাক, স্তব্ধ, কোনো শব্দ ছাড়া,
তবু শেষ বিকেলের গোধূলিতে দুটি বুকের ভেতরে ভেতরে হাজার কথার ঢেউ উঠবে। তুমি হয়তো ভাবো- এইসব অতিরিক্ত আবেগের কোনো মূল্য নেই।

এই বর্তমান পৃথিবীটা শক্তদের, হিসেবিদের। যারা চোখের জলকে দুর্বলতা ভাবে, আর হৃদয়কে রাখে তালাবদ্ধ করে।
কিন্তু আমি দেখেছি যারা খুব শক্ত সেজে থাকে তারাই মাঝরাতে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে।কারণ হৃদয়কে অস্বীকার করলে
হৃদয় একদিন প্রতিবাদ করে।

আমি তোমায় ভালোবেসে ডেকেছিলাম যেভাবে নদী সাগরকে ডাকে, জানতাম সে ডাক হয়তো পৌঁছতে পারবে না,
তবু থামি নি।ডেকেই গেছিলাম…।

আমি তোমায় ভালোবেসেছিলাম
যেভাবে শুকনো মাটিও বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে,আকাশ তাকে ভুলে গেলেও
সে কখনো ভুলে যায় না।

আজ মানুষের মন থেকে দরদ হারিয়ে গেছে – কারণ মানুষ ভয় পায় ভালোবাসলে হারাতে হয়,ভালোবাসলে কাঁদতে হয়, ভালোবাসলে নিজেকে উন্মুক্ত করতে হয়। মানুষ এখন নিজের ভাঙাচোরা অংশ কাউকে দেখাতে চায় না।

সবাই শক্ত মুখোশ পরে রাস্তায় হাঁটে, ভেতরে ভেতরে ফাঁকা হয়ে যায়।
তবু আমি জানি,এই ফাঁকা পৃথিবীতেও কোথাও না কোথাও একটা সত্যিকারের স্পন্দন বেঁচে আছে। কেউ না কেউ এখনো জানালার পর্দা সরিয়ে কারও পথচলা দেখে। কেউ না কেউ এখনো বুকের ভেতর একটা নাম গোপনে লালন করে।

তুমি যদি একবার বুকের ভেতর হাত রেখে বলো “না, ভালোবাসোনি” তবু আমি বিশ্বাস করবো না। কারণ ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি মিথ্যে হয় না।
সে হয়তো অসম্পূর্ণ হয়,অপ্রকাশিত হয়,
অস্বীকৃত হয়। কিন্তু থাকে।এই স্বার্থের পৃথিবীতে আমি এখনো ভালোবাসার পক্ষেই দাঁড়িয়ে আছি। কারণ লাভ-ক্ষতির অঙ্ক মিটে গেলে মানুষ যা খোঁজে,তা হলো একটুখানি স্পর্শ,একটু নিশ্চিন্ত শ্বাস,
একটা চোখ। যেখানে নিজের জন্য বিনা শর্তে জায়গা থাকে।

বলতে পারো, আমি বোকা।
বলতে পারো, আমি পুরোনো দিনের মানুষ। তবু আমি বিশ্বাস করি – যেদিন মানুষ আবার নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে শিখবে,সেদিন এই শহরের জানালাগুলো
আবার খুলে যাবে,পর্দা সরবে, মেলা থাকবে দুটি খোলে চোখের তৃস্নার্থ দৃষ্টি।
আরেকজন চলতে চলতে থমকে দাঁড়াবে পথের মাঝে শুধু কারও ভালোবাসা সত্যি ছিল বলেই তো!

( সমাপ্ত )

৪)

সুস্বাগতম ছাব্বিশ, ০২/০১/২০২৬
প্রবীর কুমার চৌধুরী

অবশেষে গেল বছরটা –
হৃদয়ের দেওয়ালের গায়ে রেখে গেল অনেক বেদনা, দুঃখ, হতাশা, বিফলতা। ঝরাল অনেক গ্যালন চোখের জল, অনেক কলঙ্ক,অনেক বিচার হল নিষ্ফল।

কত সতী হারালো ইজ্জত, কত প্রাণ ঝরে গেল অকালে। পথে, পথে ঘুরে বেড়ায় কত হাজারে, হাজারে ঘরহারা অসহায় মা – বাবা, বেআব্রু, উলঙ্গ হল সুসভ্য সময়ের ইতিহাস।

তাপসের সুন্দরী বৌটা আর ফেরেনি স্কুল থেকে। যে স্বাধীনভাবে স্বনির্ভর হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। খুঁদ খুঁটে খাওয়া হরিবুড়ির দেহ পাওয়া গেল ভরা কোটালের জলের মধ্যে গলা কাটা অবস্থায়। এদানিং নাকি সে রাস্তা – ঘাটে, এখানে ওখানে কাদের বিরুদ্ধে কথা বলছিল। মনোজ সাউয়ের পাঁচবছরের মেয়েটাকে লজেন্স দেওয়ার নাম করে নিয়ে গিয়ে কে বা কারা যেন তার কচি, নরম যোনি ছিঁড়েছে। শিশুটা এখন মৃতপ্রায় হাসপাতালে।

ন্যাড়া বস্তির অভুক্ত বিধবাটা তার তিনবছরের রিকেট রুগীর মতো ক্ষুদার্থ ছেলেটাকে বুকে করে হঠাৎ দুইরাত বাইরে কাটিয়ে আজ সপরিবারে পাঁঠার মাংস দিয়ে সাদা চালের ভাত খাচ্ছে। আজ তার পরনে লালপেরে শাড়ি মুখে মধুর হাসি যেন কোনমন্ত্রবলে।

কিছুতেই ভোলা যায়না, মোছা যায়না মন থেকে কিছু, কিছু । ভীষণ ভাবায় – কোটি, কোটি টাকা চুরি করে কিছু মানুষ ঘুমায় কিভাবে। একটা বৌ থাকতেও কোন নেশায় আরেকটা মেয়েমানুষ নিয়ে নতুন অবৈধ সংসার পেতে কি করে জোর গলায় বলে – ” আজ আমায় বাতাসী ভীষণ সুখী করেছে “?

বিমলদের পুকুর বুজে আজ হাইরাইজ ফ্লাট। ওখানে পুকুর ধারে যে তিরিশ ঘরের লোক বাস করত তাঁরা আজ কোথায় কেউ খবর রাখেনি। এখনও কিছু, কিছু
তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়মের বাসন, ভাঙ্গা আলনার কিছু পোড়া কাঠ, কিছু গরীব মায়ের, হাড়ভাঙ্গা খাটুনি বৌ, কিংবা সংসার স্বপনে মগ্ন উঠতি যুবতীর ছেঁড়া, ফাটা রঙচটা চুড়িদার ও ব্রার টুকরো, টাকড়া এখানে ওখানে লুটাচ্ছে। ঐ বস্তিতেই না কয়েকমাস আগে বিশাল অগ্নিকান্ড ঘটেছিল? দমকলের গাড়ি এসে কয়েকঘন্টায় চেষ্টায় আগুন নিভিয়েছিল। পরশুরামের চিরদুখী মা-টা পুড়ে ছাই হয়েছিল সে আগুনে। পুরুষরাম মায়ের প্রাণের বদলে টাকা পেয়ে, টাকা হাতে তৃপ্তির হাসি হেসেছিল। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল পরশুর বৌ ও হাফডজন কুচো, কুচো ছেলেমেয়ে।

শুধু ভবা পাগলার কোন ভাবান্তর নেই। আজও সে বুড়ো বটতলায় বসে,বসে স্বপ্ন দেখে, গান গায়,নাক খোটে আর প্রানভরে মিটি, মিটি হাসে। আচ্ছা আজ কি ভবা ওর ধূর্ত প্রেমিকার কথা ভুলে গেছে। সায়েন্স মাস্টার্ড করা ভবপ্রসাদ ব্যানার্জীর সুন্দরী প্রেমিকা রত্নাবলি একদিন ডাক্তার বরের হাত ধরে চলে যাবার কয়েকমাসের মধ্যেই ভবপ্রসাদ ভবা পাগলা নামে খ্যাত হলো।…
ব্যানার্জী বাড়ির ছেলেরা কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল। তাঁরা ভবাকে কেউ ঘরে ডাকে না। হয়ত কেউ চিনতেই পারেনা। ভবা শুধু ভালোবাসতে চেয়ে আজ অদ্ভুদ এক দেবত্ব শক্তির অধিকারী।ভবার মধ্যে -খিদে নেই, তৃষ্ণা নেই, চাহিদা নেই, আকাঙ্খা নেই। সদাই উদাসী, বৈরাগ্য।

একটার পর একটা স্মৃতির পাতা উল্টায় অবসর । দগদগে ঘা করে দিয়ে নিষ্ঠুর বছরটা চলে গেল। কত বুকের অলিন্দে রক্তাক্ত ক্ষতও রেখে গেল। কত সিঁথির সিঁদুর মুছে দিয়ে গেল, কত অসহায় মায়ের কোল খালি করল। কত রাজাকে ভিক্ষারি করল আবার কত ভিখারিকে রাজা।

দূহাজার পঁচিশ এসেছে। কিছু কি পাওয়া যাবে নেজ্য অধিকার? পথের ধারে ঘামে ভেজা শরীরে, মোমবাতি হাতে করে অন্ধকার সরানোর অভিপ্রায়ে যাঁরা আজও ন্যস্ত দীর্ঘদিন। সব হারানোর ব্যথা বুকে অধীর জন্মদাতারা। যাঁরা একঠায় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেই চলেছেন…।

কোন কিছু চাইতেই ভয় করে। স্বপ্নহীন,আশাহীন, প্রত্যাশাহীন এক জড়ভরৎ ম্যারম্যারে জীবণ।। শুধু প্রার্থনা থাক – আর যেন কোন কোল খালি না হয়, কোন সংসার না ভাঙে। সিঁদুর না মোছে সিঁথির।কোত্থাও না ভাঙে শাখা। আর যেন মাছি না বসে কারুর বাড়া ভাতে…।

শুভেচ্ছা ও শুভকামনায় সতত।

গড়িয়া, কোলকাতা

Comment