Raja Chakraborty

গল্প :- শিশুতোষ
পিঁপড়ে আর হাঁস
✍️ রাজা চক্রবর্তী

গ্রীষ্মের প্রখর রোদে যখন চারিদিক ফেটে চৌচির, তখন বেরুবাড়ী গ্রামের মাঝখানে ছিল এক বিশাল পুকুর। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুকুর যেন গ্রামবাসীর একমাত্র স্বস্তি। পুকুরে প্রচুর মাছ ছাড়া হয়েছিল…
রুই, কাতলা, মৃগেল… সবাই সেখানে খেলা করত। পুকুরের চারপাশে গাছ খুব বেশি না থাকলেও একটি বড় ডুমুর গাছ ছিল, যা তার গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত ফলভর্তি হয়ে, তার ভারে হেলে পড়েছিল পুকুরের দিকে।
ডুমুর গাছের পাতাগুলো ছিল খসখসে। সেই পাতার আড়ালে-আবডালে বাস করত নানা রকম পোকামাকড়। একদিন দুপুরবেলা, হালকা বাতাস বইছিল। তখন একটি পুরনো পাতা ভেঙে পড়ে যায় ডুমুর গাছ থেকে। সেই পাতার ওপর বসে ছিল কুড়ি-পঁচিশটি লাল পিঁপড়ে। হঠাৎ করে পাতাটি হাওয়ায় দুলতে দুলতে সোজা পড়ে গেল পুকুরের জলে।
পাতাটি নৌকার মতো ভাসতে লাগল। পিঁপড়েগুলো ভয়ে জলে নামতে পারছিল না। তারা একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে বসে রইল। পাতাটি হাওয়াতে ভাসতে ভাসতে পুকুরের মাঝখানে চলে এলো। তখনই বড় বড় মাছেরা বিষয়টা খেয়াল করল, যে পাতার উপর অনেকগুলো লাল পিপড়া বসে আছে। তারা পাতাটিকে উল্টে দিতে চাইলো, যাতে পিঁপড়েগুলো জলে করলেই তারা গিলে খেতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য! পাতাটি এমনভাবে জলের ওপর ভাসছিল যে মাছেরা অনেক চেষ্টা করেও সেটিকে উল্টাতে পারল না।

এই দৃশ্য দেখে পুকুরপাড়ে বসে থাকা হাঁসগুলোর চোখে পড়ল। চারটি হাঁস ছিল সেখানে। তাদের মধ্যে একটি হাঁস হঠাৎ সাঁতার কেটে পুকুরের মাঝখানে চলে গেল। সে তার চওড়া ঠোঁট দিয়ে পাতাটিকে আস্তে আস্তে ঠেলে পুকুরের পাড়ের দিকে নিয়ে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাতাটি ডাঙায় ঠেকল। পিঁপড়েগুলো দৌড়ে উঠে গেল নিরাপদ স্থানে। তারা প্রাণে বেঁচে গেল। এরপর পিঁপড়েগুলো পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়ের কোণে নতুন করে বাসা বাঁধল। তারা কখনো ভুলে যায়নি সেই ভালো হাঁসটির কথা।

একদিন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, চারিদিক নিস্তব্ধ, পুকুরে চারটি হাঁসের মধ্যে তিনটি হাঁস প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু একটি হাঁস কেমন যেন ছটফট করছিল। তার পায়ে একটি ছোট দড়ি জড়িয়ে গিয়েছিল। হাঁসটি ডেকে উঠতেই পিঁপড়েগুলো, সেই হাঁসটি চিৎকার শুনে ছুটে এলো। তারা দল বেঁধে দড়িটি মুখ দিয়ে কাটতে লাগল। একটু একটু করে দড়িটি নরম হলো। কিছুক্ষণ পর হাঁসটি তার পা, টান দিতেই দড়িটি ছিঁড়ে গেল।
হাঁসটি আনন্দে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে যেন বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, আমার ছোট বন্ধুরা!” তারপর সে হাসতে হাসতে বাড়ির পথে উড়ে গেল। এইভাবেই বেরুবাড়ী গ্রামের পুকুরপাড়ে সবাই শিখে নিল… কারো ভালো করলে, বিপদে পড়লে একদিন না একদিন সত্যিই উপকার পাওয়া যায়।

Comment