নাম ছাড়া “বুয়া”
সকালে কলিং বেলের শব্দে আমি দরজা খুললাম,দেখি বুয়া । আজকে তিন দিন পর দেখা, আমি কিছু বললাম না। সে বিস্তৃত হাসি দিয়ে বলল,
—“বাবি, বালা আছুইন?”
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। যখনই কাজে ফাঁকি দেয় তখন ই এই হাঁসিখানা দেখা যায়।সে হড়হড় করে বলল, গ্রামে গিয়েছিলো জরুরি কাজে, তাই তিন দিন আসতে পারে নি। আমার অফিস যাওয়ার তাড়া ছিল,তাই কিছু বললাম না।তার চোখে খুশির ঝলক, অথচ স্বাভাবিক ভাবেই রান্না ঘরের দিকে চলল। যেতে যেতে বলল –
“আইজ ছা খাইয়াম আগে। আফনে খাইবান?”
আমি শুধু হালকাভাবে বললাম, “আচ্ছা, বসিয়ে দেন।”
সে দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেল, হাতের কাজগুলো করছে—আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হচ্ছে, এই ছোটখাট রুটিনেই তার পুরো দিন।অথচ তাকে ছাড়া এই তিন দিন আমার অবস্থা শেষ।কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম অন্য রুমে।তার জীবন কখনো সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই কাজ করতে করতে শিখেছে, ভয়ে নয়, কিন্তু টিকে থাকার প্রয়োজনে।সে প্রথমে বলে নিয়েছে তাকে বকাবকি করা যাবে না।তিন দিন গ্রামের কাজে থাকলেও, মুখে স্বাভাবিক হাসি; অথচ ভেতরে সে জানে—এই হাসি তার নিজের জন্য, আমি ও বলেছিলাম না এলে আগে থেকেই জানাতে।কি সে বেলা! নিজের বেলায় ষোল আনা।একমাত্র এই ছোট কাজগুলোই তাকে ধরে রাখে। থালা বাসন ধোয়া, বাসন সাজানো, গজগজ—সবকিছুর মধ্য দিয়ে সে নিজেকে বোঝায়: “আমি টিকে আছি। কেউ আমার জীবন বা আমার অনুভূতিকে ভেঙে দিতে পারবে না।”সে প্রধানত তিনটি কাজ করে, কাপড় ধোয়া,ঘর মোছা আর থালাবাটি ধোয়া। মুড ভালো থাকলে তবকারি কেটে দেয়, কখনো আমার শ্বাশুড়ির চুলে তেল লাগিয়ে দেয়। কিন্তু কাজ বেশি হলে থালাবাটি ঝনঝন শব্দে ধোবে আর একা একা গজগজ করতে থাকবে। সেদিন চা খেতে খেতে গল্প করছিল – বাবি, আমার ফুলায় আমারে জিগায় – মা তুমারে বেকতে বুরা কয় কিল্লিগা, তুমি তো জুয়ান। আমি কইছি-বুরা না, “বুয়া” কয়। কামের মাইনষেরে বেকতে বুয়া কয়। _”কেন্ ? তোমার কি নাম নাই।”ওর ছেলের সহজ প্রশ্ন টা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। আমি বললাম আচ্ছা আমি আপনাকে কি বলে ডাকবো? জবাবে হেঁসে বলল -বাবি, শফিকের মা ডাইক্কেন।ওর চোখের ঝিলিক টা আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেলো না। ঈদের আগে একদিন আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল ওর হাজব্যান্ড সব টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায়। তিন বাসায় কাজ করে, ওর হাসবেন্ড রিকশা চালায় কিন্তু সংসারে অশান্তি আর টানাটানি লেগেই থাকে। বললাম – তোমার ছোট ছোট তিন বাচ্চা, অন্য কি এমন খরচ? মুখটা শক্ত হয়ে গেল নিমিষেই -“ব্যাডাইনে জুয়া খেললে সংসারো আয় থায়ে? আমার ডিও তাইনের লাগে।পোলানডি না থাকলে একমি যাইতাম মনলয়।শুদু এদ্দুর? আমি কিছু কইলে আমার গাও আত তুলে হে।”থাক কিছু বলতে যাইয়েন না। যখন শান্ত থাকে তখন না হয় বুঝিয়ে বলবেন, এটুকু বলে সেদিন স্বান্তনা দেই। আমার কাছে তার রোজগারের সঞ্চয় চব্বিশ হাজার টাকা রেখে যায়। আবার সপ্তাহ খানেক খবর নেই রফিকের মায়ের। আমি কতবার বলেছি যদি দরকার পরে আগে থেকে জানাবেন, আমরা আশা করে থাকবো না। না, সে না জানিয়েই লা পাত্তা থাকবে। সপ্তাহখানেক পর এসে চুপচাপ রান্না ঘরে ঢুকে শব্দ ছাড়া কাজ করছে।কথা না, হাঁসি না, আবার থালাবাটি বেশি দেখে গজগজ ও করছে না। আমি নরম স্বরে জানতে চাই – কি? এবার কোথায় গেলেন? ফোন নম্বর টা ও বন্ধ?কলের জলের সাথে চোখের জল মিশে যাচ্ছিল। কিন্তু চোখ তুলে বলল – “আর এমত অইবো না। আমি আর কামাই দিতাম না। রফিকের বাফে আরেক খান বিয়া কইরা আমগোরে ছাইরা গেছে।”আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না।ওর চোখ বলছিল ও ধাক্কাটা সামলে নিতে পারবে। “দরকার অইলে আরো দুইডা বাসা লইয়াম।”চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল।
