নিশিপদ্মা
✍️ সঞ্চিতা নায়ক
অন্ধকার জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে জগাই , জগাই সর্দার। তার হাতে ছোট্ট একটা ফুল। কিন্তু এটা কোনো সাধারণ ফুল নয়। এ যে এক অলৌকিক ফুল। নবীনগঞ্জের নির্জন এই স্থানে যেখানে কারোর তেমন যাতায়াত নেই, সেখানেই বাঁশ বাগানের পাশের ছোট্ট ডোবায় জগাই ছুঁড়ে ফেলে দিল সেই ফুলটা। আর তারপর ফিরে গেলো নিজের বাড়িতে।
সালটা 1978। এক বর্ষাকালের সন্ধ্যেবেলায়, যখন পাখিরা নিজেদের ঘরে ফিরে গেছে , সূর্য অস্ত গেছে অনেক্ষন হলো, চারিদিকের আপছা অন্ধকারকে আরো বেশি কালো করে দিয়েছে আকাশের জমে থাকা মেঘ, ঠিক এমন সময় ঘন বাঁশ বাগানের পাশের ডোবায় জাল ফেলছিল জেলে পাড়ার খোকন সর্দার। হঠাৎ তার মনে হলো দূর থেকে কেউ যেনো তার নাম ধরে চিৎকার করে ডেকে চলেছে। হাতে থাকা জালটা ডোবার পাড়ে ফেলে রেখে সে পেছন ফিরে চাঁইলো। নাতো, কেউ কোত্থাও নেই। সে আবার নিজের পায়ের কাছে পড়ে থাকা জালটায় হাত দিতে যাবে এমন সময় আবার কেউ যেনো ডাক দিল তাকে। সে পেছন ফিরে দেখল ও পাড়ার হাবলু ছুটতে ছুটতে ওর দিকেই আসছে।
হাবলু – ” খোকন , ও খোকন, তুই ..তুই এখানে জাল ফেলছিস ! ওদিকে তোর বাড়িতে নতুন অথিতি এলো যে। যা দেখিনি তাড়াতাড়ি যা। সকালের মধ্যে আমার কিন্তু মিষ্টি চাই।”
মুহুর্তের মধ্যে খোকনের কাদার ছিটে লেপ্টে থাকা রোদে পোড়া তামাটে মুখটায় একগাল হাসি ফুটে উঠলো। ঠিক যেনো মরুভূমিতে বৃষ্টিপাত হয়েছে।
সে হাবলুর হাতে নিজের জালটা দিয়ে একছুটে নিজের বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো।
একখানা ছোট্ট পানা পুকুরের ধারে ছোট্ট একখানা টিনের চালের মাটির কুঁড়েঘর। ভাঙ্গা টিনের চাল বেয়ে ছেয়ে আছে সবুজ পাতার নীলঅপরাজিতার লতা। দু একটা নীল অপরাজিতা ফুলও ধরেছে তাতে। নতুন চালের গুড়ো দিয়ে আল্পনা আঁকা মাটির ঘরের দাওয়ায় শুয়ে আছে চাঁপা। পাড়ার বেশ কয়েকজন মেয়ে বউ ঘিরে রেখেছে তাকে।
খোকন ইতস্তত করতে করতে বলে উঠলো…” লক্ষী এলে নাকি কাত্তিক?”
পাড়ার এক বউ চাঁপার ছেড়া কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট একটা প্রাণ খোকনের হাতে তুলে দিয়ে বললো….” কাত্তিক এয়েছে ঠাওরপো। মিষ্টি আনো। আমি কিন্তু দুইখান মিষ্টি খাবো আগে থেকে বলে রাখলাম।”
খোকন – ” চৈত্র। আমার ছেলের নাম হবে চৈত্র। কিন্তু চাঁপি ! ও….কেমন…”
চাঁপা – ” আমাকে নিয়ে ভেবোনে। আমি ঠিক আছি। ও পাড়ার ডাক্তার সাহেব বলে গেছে এক হপ্তার মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবো।”
বর্ষা পেরিয়ে শরৎ, শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত আর তারপর এলো শীত। কেটে গেছে বেশ কয়েকটা বছর , চৈত্রের বয়স তখন প্রায় নয় বছর। গ্রামের পাঠশালা থেকে পড়াশোনা করে নবীনগঞ্জের হাইস্কুলের ক্লাস ফাইভে ভর্তি হয়েছে চৈত্র। খোকন এখন মফস্বলের মাছের বাজারে মাছ বেচে আগের তুলনায় খানিক বেশীই রোজগার করছে। চাঁপাও নিজের ছোট্ট একটুকরো জমিতে সবজি ফলিয়ে গ্রামের হাটে বিক্রি করে এখন। ঠিক হয়েছে সামনের ফাল্গুনে ওদের মাটির ঘরটা ভেঙে ইটের দেওয়াল তুলবে ওরা।
গ্রামের লোকে বলাবলি করে চৈত্রের ভাগ্য গুণেই নাকি খোকনের অবস্থা শুধরেছে। নয়তো আগেও অনেকবার অনেক রকম কাজ করেও তাদের এত টাকা আয় হতো না।
জীবনটা বেশ কাটছিল ওদের। চৈত্র একটু একটু করে বড় হচ্ছিল , শিক্ষিত হচ্ছিল। আর খোকন আর চাঁপা দুজনে মিলে একটু একটু করে নিজেদের এক কামরার পাকা বাড়ি বানাচ্ছিল , একটা সাইকেল, একটা ধান ঝরানোর মেশিন কিনছিল। কিন্তু তাদের কপালে এই সুখের দিনগুলো ছিল বড্ড কম।
সে বার খোকন আর চাঁপা চৈত্রকে সাথে নিয়ে বামুন পাড়ার চড়কের মেলায় যাত্রা শুনতে গিয়েছিল। প্রায় অনেক রাতে একহাতে গ্যাসবেলুন বাঁধা ঘুমন্ত চৈত্রকে কাধে ফেলে খোকন আর চাঁপা যখন বাড়ি ফিরল তখন তারা দেখলো ওদের পাকা বাড়ির কাঠের দরজার তালা ভাঙ্গা। কেউ যেনো ভারী কোনো পাথর দিয়ে খুব জোরে আঘাত করে তালাটা ভেঙে ফেলেছে। ঘরের মধ্যে ঢুকে তারা দেখতে পেলো , ঘরের সমস্ত জিনিষ চারিদিকে ছড়ানো রয়েছে। স্পষ্টত বোঝাই যাচ্ছে চুরি হয়েছে ওদের বাড়িতে। ঘুমন্ত চৈত্রের হাত থেকে গ্যাসবেলুনের সুতোটা খুলে দিয়ে তাকে খুবই সাবধানে ধীরে ধীরে খাটের ওপর বালিশে মাথা রেখে শুইয়ে দিলো খোকন।
চাঁপা – ” কার কাজ এটা। কে ? আর কে জানে আমরা ছাড়া ?”
খোকন – ” আহ্ চাঁপি। আস্তে , আস্তে কথা বল। বাচ্চাটা ঘুমোচ্ছে। তুই যা গিয়ে আগে রান্না ঘরে দেখ । আমি নিশ্চিত ওরা নিয়ে যেতে পারেনি।”
চাঁপা একছুটে রান্না ঘরে গিয়ে মাটির উনুনের পাশে থাকা খড়ের আঁটিগুলো সরিয়ে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স হাতে তুলে নিল। নিজের কপালের ঘাম মুছে খুবই ধীরে ধীরে বাক্সটি খুলতেই এক অদ্ভুত স্বর্ণালী আভায় চাঁপার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাসতে হাসতে কাঠের বাক্সটা খোকনের কাছে নিয়ে গেলো।
চাঁপা – ” দেখো , দেখো ওরা পায়নি এর সন্ধান।”
খোকন – ” তারমানে ওরা শুধু সোনাদানা আর টাকা পয়সার লোভে এসেছিল এখানে। এর কথা ওরা আজও জানতে পারেনি। যাহ যেখানো ছিল সেখানেই রেখে আয়।”
চাঁপা – ” কিন্তু এইসব কে করলো সেটা দেখবে না ? আজ চৈত্র সংক্রান্তি। এখন রাত অনেক গভীর। ডাকো তাকে। আমি দেখতে চাই কার কাজ এইসব।”
খোকন – ” কথাটা তুই মন্দ বলিসনি চাঁপি। তোর হাতের শাখা থেকে পিনটা খুলে দে দিকিনি একবার। ”
এরপর খোকন সন্তপর্নে চৈত্রের হাতের আঙুলে পিনটা ফুটিয়ে একবিন্দু রক্ত ফেললো ওই কাঠের বাক্সের ভেতরে। তারপর সেটা বাড়ির উত্তর পূর্ব কোনায় রেখে দুইহাত জোড় করে চাঁপা আর খোকন তাকিয়ে থাকল সেই দিকে। মুহুর্তের মধ্যেই এক অপরূপা সুন্দরী রমণী প্রকট হলো ওদের সামনে। সে শুভ্র বস্ত্র পরিহিতা, নানান অলঙ্কারে সুসজ্জিতা,তার সুদীর্ঘ কেশগুচ্ছ মেঝেতে লোটানো রয়েছে। ওনার আবির্ভাব মাত্রই সারা বাড়িতে একটি সুন্দর সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে।
সে মৃদু হেসে ওদের বলল – ” কি চাও? এত বছর পর আবার
আমাকে ডাকার কারণ কি ?”
খোকন একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জ্ঞানশূন্য ভাবে ভাবতে থাকলো ওই দিনটার কথা যেদিন চৈত্রের জন্ম হয়েছিল।
সেদিন সেই বর্ষার সন্ধ্যে বেলায় যখন খোকন বাঁশ বাগানের পাশের ডোবায় জাল ফেলছিল , ঠিক তখনই ওর জালে উঠে আসে একটা ফুল। ফুলটা রাতের অন্ধকারেও চকমোকিয়ে ওঠার কারণে খোকন জাল থেকে ফুলটা বের করে ডোবার জলে ধোয়া মাত্রই সে চমকে ওঠে। সেই ফুলটা কোনো সাধারণ ফুল ছিলনা। অনেকটা শাপলা বা পদ্মফুলের মত দেখতে হলেও ফুলটা ছিল সোনার। খোকন ভয় পেয়ে ফুলটা দূরে ছুড়ে ফেলতে সেখান থেকে প্রকট হন এই অপরূপা সুন্দরী রমণী। নিজের পরিচয় দিতে এই রমণী সেদিন খোকনকে বলেছিল…
” ভয় পেয়োনা। আমি কোনো অতৃপ্ত অশরীরী আত্মা নই। আর নাতো আমি কোনো ভগবান। আমি ততক্ষন তোমার কোনো ক্ষতি করবনা যতক্ষণ না তুমি আমার কোনো প্রকার ক্ষতি বা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছ।”
খোকন – ” তাহলে কে তুমি মা ? এইভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়ালে ? তোমার রূপে, তোমার তেজে আমি যে প্রায় অন্ধ হয়ে যাবো।”
” আমি নিশিপদ্মা। একজন নিষিদ্ধ অপ্সরা।”
খোকন – ” নিষিদ্ধ অপ্সরা !”
” অপ্সরা হয়েও আমি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তাই আমাকে স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত করে একটি পুষ্পের রূপে মর্তে পাঠানো হয়েছে। আমি জানতাম আমি অন্যায় করেছি, এর জন্য আমি অনুতপ্তও ছিলাম, তবে আমার এই অপরাধ ওরা ক্ষমা করেনি। আর তাই আমিও আমার শাস্তি মাথানত করে স্বীকার করে নিয়ে এখানে চলে আসি। তুমি একজন সৎ মানুষ তা আমি অনুভব করতে পারছি। তাই তুমি তোমার ইচ্ছে আমাকে জানাতে পারো। যদি তা সৎ হয় তাহলে আমি অবশ্যই সেটা পূরণ করব।”
খোকন – ” আমার স্ত্রী পোয়াতি। আমি চাই সে যেনো সুস্থ ভাবে একটা সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেয়। আমরা দিন আনি দিন খাই। তাই এই ভরা মাসেও তার ঠিকভাবে দেখভাল করতে পারিনি। বেচারি ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। তার শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে। তুমি অপ্সরা নাকি ভগবান আমি জানিনা। কিন্তু যদি সত্যিই তোমার ইচ্ছাপূরণের ক্ষমতা থাকে তাহলে আমার বউ আর বাচ্চা দুজনেই যেনো সুস্থ থাকে।”
নিশিপদ্মা – ” আজ অব্দি অনেকেই আমাকে খুঁজে পেয়েছে। যতই সৎ ব্যক্তি হোক তাদের সবার প্রথমে যা চাওয়ার থাকে তা হলো অর্থ, সম্পত্তি , নাম। কিন্তু আমি এতদিন পর এটা দেখে খুশি হলাম যে তুমি অত্যন্ত দরিদ্র হয়েও এইসব কিছু বাদ দিয়ে নিজের স্ত্রী-সন্তানের মঙ্গল চাইলে। অবশ্যই আমি তোমার ইচ্ছে পূরণ করব। কিন্তু আমারও একটা ইচ্ছে রয়েছে, তুমি আমার সেই ইচ্ছে পূরণ না করলেও আমি তোমার ইচ্ছে অবশ্যই পূরণ করব তাই নির্দ্বিধায় উত্তর দাও। আমি তোমার গৃহে স্বর্নপুষ্প রূপে থাকতে চাই, এ যাবৎকাল অনেক অসৎ ব্যক্তির হাতে পড়েছি আমি , তাই তোমার মত কোনো সৎ পুরুষের গৃহে আমি কিছুকাল থাকতে চাই। কালের নিয়মে তোমার মৃত্যু ঘটলে তুমি আবার তোমার মতই সৎ কোনো ব্যক্তির হাতে আমার তুলে দিয়ে যেও। তুমি কি আমাকে তোমার গৃহে নিয়ে যাবে ?
খোকন – ” এ তো আমার পরম সৌভাগ্য। অবশ্যই মা, আমি অবশ্যই তোমাকে আমার ছোট্ট মাটির ঘরে নিয়ে যাব।”
নিশিপদ্মা – ” চিন্তা করোনা। আমি যতদিন তোমার গৃহে থাকবো ততদিন তুমি কখনোই অর্থকষ্ট ভোগ করবে না। আর আমি পুনরায় পুষ্পে রূপান্তরিত হওয়ার পর যদি কখনও আমাকে আবার তোমার প্রয়োজন হয়, তাহলে চৈত্র সংক্রান্তির রাতে নিজের সন্তানের একফোঁটা রক্তবিন্দু ওই পুষ্পে ফেলে তোমার গৃহের উত্তর পূর্ব কোণে রাখলেই আমি পুনরায় প্রকট হবো। তোমার মঙ্গল হোক।”
কথাগুলো বলেই নিশিপদ্মা আবার স্বর্নপুষ্পে পরিণত হয়ে যায়। খোকন সেই পুষ্প নিজের ছেড়া ধুতির কোচরে লুকিয়ে ফেলে। আর তারপরেই সে হাবলুর মুখ থেকে খবর পায় যে সে বাবা হয়েছে। যেহেতু চৈত্র সংক্রান্তির রাতেই নিজের সন্তানের রক্তের দানে নিশিপদ্মা আবার প্রকট হতে পারবে তাই খোকন আর ছেলের নাম রাখে চৈত্র।
চাঁপার ডাকে ঘোর কাটে খোকনের – ” কি গো ! মা জিজ্ঞেস করছেন যে ওনাকে কেনো ডাকা হলো। তা বলো সবটা।”
খোকন – ” হ্যা, হ্যা। মা, মাগো। আমার বাড়ি ঘরের এই অবস্থা কে করলো মা ! আমার কষ্ট করে উপার্জিত অর্থ সম্পত্তি কে চুরি করে নিয়ে গেলো মাঝ রাতে তা তুমি বলে দাও।”
নিশিপদ্মা – ” তোমার আপন ভাই ।”
খোকন – ” আমার আপন ভাই ? মানে জগাই? কিন্তু তার সাথে তো আমার অনেকদিন কোনো যোগাযোগ নেই। সে তো এই পাড়ায় থাকেও না। পাশের পাড়ায় দুইতলা পাকা বাড়িতে থাকে। সে কেনো এই গরিবের বাড়িতে এসে মাঝরাতে চুরি করতে যাবে ?”
নিশিপদ্মা – ” লোভ আর হিংসা যে কলি যুগের মানুষের ধর্ম হয়ে উঠেছে। তুমি যে আর হতদরিদ্র অবস্থায় নেই খোকন। ধীরে ধীরে তোমার উন্নতি, তোমার আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন যে তোমার আপন রক্তের মানুষদের কাছেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তুমি চাইলে আমি ওদের ক্ষতি করতে পারি। তুমি বলো, তুমি সেটা চাও ?”
খোকন – ” আমার ভাই ? আমার আপন ভাই ? জগাই কি না শেষ পর্যন্ত…. ছি ছি ছি। আমি কি চাইবো আর তোমার থেকে ? নিজের মুখে নিজের ভাইয়ের ক্ষতি চাই কি করে ? থাক যা হওয়ার তো হয়েই গেছে আমি এবার থেকে নাহয় আরো বেশি সাবধান হবো।”
নিশিপদ্মা – ” তুমি সত্যিই ভীষণ সরল মানুষ । তোমার ভাই যে শুধুমাত্র আজ তোমার বাড়িতে এসে সবকিছু চুরি করে নিয়ে গেছে তা নয়। তোমার মনে আছে…গতকালই প্রায় সারাটা দিন ধরে তুমি তোমার সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলে! তখন ঠিক সন্ধ্যে নামার পর ওই বাঁশ বাগানের পাশের ডোবার পাড়েই ঘুমন্ত অবস্থায় খুঁজে পেলে ওকে।”
খোকন – ” হ্যা মা। আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি চারিদিকে ওকে খুঁজছিলাম কিন্তু কোথাও পাইনি। আর যখন পেলাম ,ওর ঘুম ভাঙ্গলো, ও তো কিছু বলতেই পারলনা ও কোথায় গেছিল বা ওখানে কিভাবে এলো।”
নিশিপদ্মা – ” তোমার আপন ভাই ওকে নিয়ে গেছিল। ওদের পরিকল্পনা ছিল এই এতটুকু শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার। আমি নিজ শক্তি প্রয়োগ করে ওকে ওখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি ডোবার ধারে। আজকেও আমি এই চুরিটা আটকাতে পারতাম কিন্তু আটকায়নি কেনো জানো? কারণ আমি চেয়েছিলাম তুমি সব সত্যিটা জানো এবার।”
খোকন – ” তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ মা আমাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য। আমি সারাজীবন তোমার ক্রীতদাস হয়ে থাকব। তুমি এই শেষবারের মতো আরো একটা উপকার করো আমার। আমি আমার ভাইয়ের সর্বনাশ দেখতে চাই। সে যে শুধুমাত্র আমার কষ্টের অর্থ সম্পদ নিয়ে গেছে তা নয়, সে আমার ছেলের দিকে হাত বাড়িয়েছে। আমি কিছুতেই ক্ষমা করবনা তাকে।”
নিশিপদ্মা – ” তাহলে নিজের মুখে আমাকে বলো যে তুমি চাও যে আমি যেনো তার সর্বনাশ করি। আমি যেনো তাকে এই ইহলোক ত্যাগ করতে সাহায্য করি।”
খোকন – ” হ্যা মা । আমি চাই যে তুমি তার চরম সর্বনাশ করো। তাকে এই দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দাও।”
নিশিপদ্মা – ” তাই হবে খোকন। তাই হবে।”
*****
প্রায় সাতদিন পর….
জগাই সর্দারের মৃতদেহ ভেসে উঠলো নবীনগঞ্জের নির্জন ওই স্থানে। যেখানে কারোর তেমন যাতায়াত নেই, যেখানেই বাঁশ বাগানের পাশের ছোট্ট ডোবায় 9 বছর আগে সে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছিল ছোট্ট সেই অলৌকিক ফুল।
নিশিপদ্মা। নাতো সে কোনো অতৃপ্ত অশরীরী আত্মা আর না সে ভগবান। সে এক অলৌকিক নিষিদ্ধ অপ্সরা। যাকে অভিশাপ দিয়ে স্বর্নপুষ্প রূপে মর্তে পাঠানো হয়। কোনো ব্যক্তি তাকে স্বর্নপুষ্প রূপে খুঁজে পেলে প্রথম বার সে নিজের ইচ্ছেতে প্রকট হতে পারলেও ,দ্বিতীয় বার প্রকট হওয়ার জন্য তার প্রয়োজন ওই ব্যক্তিরই সন্তানের রক্ত। যা তার চাই চৈত্র সংক্রান্তির রাতে। তবে ব্যক্তির দ্বিতীয় ইচ্ছাও যে সৎ হতে হবে এর কোনো বাধ্যকতা নেই। কিন্তু যতক্ষণ না কোনো সৎ ব্যক্তি নিজের তাগিদে তার থেকে কারোর সর্বনাশ চাইছে ,ততক্ষন সে নিজের ইচ্ছায় কারোর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এটাই ছিল ওর ঈশ্বর প্রদত্ত অভিশাপ।
খোকনের আগে জগাই নিশিপদ্মাকে স্বর্ণপুষ্প রূপে খুঁজে পায়। নিশিপদ্মার শক্তি পরীক্ষার জন্য জগাই নিজের প্রথম ইচ্ছা সৎ রাখলেও। তার দ্বিতীয় ইচ্ছা ছিল নিশিপদ্মাকে মানবীরূপে ভোগ করা। এই অপমান নিশিপদ্মা মেনে নিতে পারেনি। আর এর কারণে নিশিপদ্মা নিজের অপরূপা সুন্দরী রমণী মূর্তির প্রতিচ্ছবি জগাইয়ের মাথা থেকে সরিয়ে সেই জায়গায় নিজের কুৎসিত রূপ প্রতিস্থাপিত করে। তাই ভয় পেয়ে জগাই ওই স্বর্ণপুষ্প জঙ্গলের ডোবায় ফেলে দিয়ে আসে। কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকে নিশিপদ্মা। এরপর যখন সে খোকনের কাছে পৌঁছায় সে নিজ শক্তি দ্বারা বুঝতে পারে এই ব্যক্তি জগাইয়ের রক্তের সম্পর্কের কেউ। তাই কৌশলে সে পৌঁছে যায় খোকনের বাড়িতে। সেদিন চৈত্রকে নিশিপদ্মাই লুকিয়ে রেখেছিল, আর খোকনের বাড়িতে মিথ্যে চুরির ঘটনাও সাজিয়ে ছিল সে নিজে। যার ফলস্বরূপ সে নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে পারল জগাইয়ের থেকে।
পুনশ্চ – নিশিপদ্মা কারোর আপন হতে পারবেনা আবার কারোর পরও হতে পারবেনা। সে নিজের ইচ্ছার মালিক। তাই নিশিপদ্মা হইতে সাবধান। বলা যায়না যাকে আপনি নিজের আপন ভাবছেন সে নিজের সুবিধার্থে আপনার ভালো করছে।
সমাপ্ত
গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবে কোনো ঘটনার সাথে মিল খুঁজে পেলে লেখিকা অর্থাৎ আমি দায়ী নই।

