Subash Sarbabiddya

Subash Sarbabiddya

শীতরাতের একটি কম্বল

এক যন্ত্রনাক্লিষ্ট বৃদ্ধা
==================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
শীতের স্নিগ্ধ ভোর। চারদিকে ঘন কুয়াশার মায়া। এর ফাঁক গলিয়ে, দু’চারটি পরিবহন হেড লাইটের আলো জ্বালিয়ে, দুই পাশের পিচঢালা পথ মাড়িয়ে এগিয়ে যায়-আসে। অদৃশ্য হয়।
নগরীর এই পথটির মাঝখান বরাবর সদ্য নির্মিত একটি উড়ালসেতু। বিশালতার ঢেউ তোলে এগিয়ে গেছে দীর্ঘ ষোল কিলোমিটার পথ।
এটির নিচে একটি স্তম্ভের সামান্য অংশ দখলে নিয়ে তার সাথে দড়ি বেঁধে, দু’দিকে দুটো ইট বিছিয়ে এবং হলুদ রঙের একটি জীর্ণ ব্যানার ছাউনি বানিয়ে অস্থায়ী আবাসন গড়ে তুললেন সত্তোরোর্ধ এক বৃদ্ধা।
বৃদ্ধা এই নগরীতে উদ্বাস্তু। জগত সংসারে তাঁর কেউ নেই। পূর্বে ছিল কিনা একমাত্র তিনি এবং স্বয়ং ঈশ্বর ছাড়া অন্য কেউ জানার কথা নয়।
দীর্ঘ বছর আগে রেলস্টেশনের আশ-পাশ এলাকায় এই বৃদ্ধাকে দেখা যেত। শরীর তখন হৃষ্টপুষ্ট ছিল। একই বয়সী কিংবা তার চেয়ে কম বয়সী আরও কিছু মহিলা তাঁর সহযাত্রী ছিল। ওইসব মহিলা এখন তাঁর সাথে নেই। হয়তো ভাগ্যের নিমর্মতায় আশ্রয়হীন হয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ওরা অন্য কোথাও ঠাঁই নিয়েছে।
শরীরে রূপ আর যৌবনের জৌলুশ যখন ছিল, কৃষ্ণ গহ্বরে থেকে তা বিক্রি হতো। সেসব রূপ আর যৌবন এখন অতীতে ফিরেছে। দেহ-মনে নেমে এসেছে চরম দুর্বিষহ যন্ত্রণার খড়গ।
বলা চলে, বৃদ্ধা বয়সের তুলনায় রোগে-শোকে নুইয়ে পড়েছে বেশ। দেহ-মন কখনও সখনও সচল হয়ে উঠলে, লাঠিখানাকে সঙ্গী করে, কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বেরিয়ে পড়েন। কখনও আবার বিদ্রোহ করে বসলে শুয়ে-বসে রাত, দিন পার করেন।
সেদিন ছিল শুক্রবার। ভোর চারটার কাছকাছি। হর্ণের বিকট শব্দে আচমকা ঘুম ভাঙে বৃদ্ধার। চোখ মেলে মাথা তোলেন। এদিক-ওদিক তাকান। কী সর্বনাশ! আঁতকে উঠলেন তিনি।
গতরাতে দু’জন তরুণ এসেছিল তাঁর কাছে। তরুণদ্বয় কলেজ ছাত্র। কী শীত, কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা! তারা মানবিক কাজ ফেরি করে।
হাড় কাঁপানো শীতে বৃদ্ধাকে জবুুথবু হয়ে পড়ে থাকতে দেখে একটি ভারী,অথচ নরম তুলতুলে বস্তু চড়িয়ে দেয় তাঁর গায়ে। বৃদ্ধা কী যে খুশি হলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিলেন না।
বৃদ্ধার স্মরণে এলো, যাওয়ার সময় ওই তরুণদের একজন নরম কন্ঠে বলেছিল -খালা,ও খালা।
বৃদ্ধা বললেন- কও বাবা।
– সামনে আমাদের ইন্টার ফাইনাল। একটু দোয়ায় রাখিয়েন।
বৃদ্ধা খুশি মনে তাদের মাথায় হাত ছোঁয়ালেন। এবং বললেন- কী কথা যে কও বাবা! দোয়া করুম না ক্যান? এক্কেরে খাসদিলে করুম।
এসব কথা ভাবনায় এলে, বৃদ্ধা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন। হন্য হয়ে দুর্লভ বস্তুটি খোঁজে ফিরলেন। নাঃ! কোথাও ওই বস্তুটির খোঁজ মিলল না। বৃদ্ধার মেজাজ গেল বিগড়ে।
যত রকমের অশ্লীল বাক্য এই নষ্ট সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সেসব অশ্লীল বাক্যগুলো তাঁর মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল বারবার,বারবার। নিজেকে কোনোভাবেই স্বস্তি দিতে পারছিলেন না তিনি। কী করবে এই মুহূর্তে? মাথায় কাজ করছিল না। অতঃপর লাঠিখানা তুলে নেন হাতে। বিছানা ছেড়ে নেমে এলেন রাস্তায়। ধীরে পায়ে খট খট শব্দ তুলেন। শীতের ঘন কুয়াশায় অদৃশ্য হন।
২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ইং।

Comment