ইতিহাস
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
বানাড়িপুর স্কুল এন্ড কলেজ। মফসসলের একটি প্রথিতযশা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘবছর পূর্বে শহর থেকে দক্ষিণে শান্ত এবং নিরিবিলি পরিবেশে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছিল।
যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি এবং কোলাহলমুক্ত হওয়ায় উত্তর-দক্ষিণ প্রান্ত হতে অসংখ্য শিক্ষার্থী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষা নিতে আসে। এছাড়া রয়েছে শিক্ষকদের নিখাদ আন্তরিকতা। যার কারণে এই প্রতিষ্ঠানটির মান এখনও অক্ষুন্ন রয়েছে।
একটি কথা ধ্রুব সত্য যে, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় জেলা পর্যায়ে ৭ম স্থানের রেকর্ড ভেঙে ৬ষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি কলেজ শাখার একজন সিনিয়র শিক্ষক দীর্ঘ সতের বছর অধ্যাপনা শেষে অবসরে গেলেন।
বয়োজ্যেষ্ঠ এই শিক্ষকের নাম অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়। কীর্তিমান এই শিক্ষকের সম্মানার্থে গেল সপ্তাহে এক বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করল কলেজ কর্তৃপক্ষ। মাঠের পূর্ব পশ্চিম কোণার এক প্রান্ত জুড়ে তৈরি করা হলো বিদায় মঞ্চ। জেলা শিক্ষা অফিসার, কলেজ অধ্যক্ষ, শিক্ষক প্রতিনিধি, গর্ভনিং বডির সভাপতি ও সদস্যদের পদভারে গম গম করছিল বিদায় মঞ্চ। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ক’জন শিক্ষার্থী তাদের প্রিয় স্যারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে যে যার মত করে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিল। দু’জন শিক্ষার্থী এতটাই আবেগপ্রবণ হলো যে,তাদের প্রাণপ্রিয় স্যারের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চেয়ে গুমরে কেঁদে মঞ্চ ত্যাগ করল।
আচমকা নিকট দূরের কোনো এক মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল ‘আসর’ নামাজের আযান। খানিক নামাজ বিরতি। এরপর আবারও শুরু হলো অর্মত্যবাবুর সুদীর্ঘ কর্মজীবনের বয়ান।
মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিবৃন্দ একেক করে একজন বিদায়ী শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সততা, নিষ্টা এবং একাগ্রতার উজ্জল দৃষ্টান্ত যাঁর যাঁর বক্তৃতায় তুলে ধরছিলেন।
উপস্থিত অতিথিবৃন্দের বক্তব্য শোনে বারবার আবেগ তাড়িত হচ্ছিল শিক্ষার্থীর দল। চোখের কোণে ভেসে উঠা অশ্রুকণা মুছে তারা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিল।
এরপর মাইক্রোফোন হাতে নিলেন প্রবাল বর্মন। তিনি জেলা শিক্ষা অফিসার। এই বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একজন প্রধান অতিথি। বক্তৃতার শুরুতে স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি তাঁর কিশোর বেলার দিকে ফিরে গেলেন। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন- স্যার, এই কলেজের হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট-এর শিক্ষক হলেও, তাঁর প্রথম শিক্ষকতা শুরু হয়েছিল গ্রামের এক অখ্যাত স্কুলে। যদিও স্যারকে আমরা বেশিদিন পাইনি। যা ক’দিন পেয়েছিলাম, সেসময় স্যার আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। স্কুলটির পাশের গ্রামে ছিল আমাদের বাড়ি।
আমরা ছিলাম এসএসসি পরীক্ষার্থী। সেদিন ছিল আমাদের ফরম ফিলাপ-এর শেষ দিন। ঘরের জমানো চাউল বিক্রি করে মা কিছু টাকা যোগাড় করে আনলেন। অল্প টাকায় ফরম ফিলাপ! কিছুতেই হিসাব মিলছেনা। পাশের বাড়ি থেকে মা আরও কিছু টাকা ধার করলেন।
আমাদের চাষের জমি ছিল ঠিকই। তবে যৎসামান্য। বাবা আয়-রোজগারে তেমন মনোযোগী ছিলেন না।
প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন মাদকাসক্ত। মদ – জুয়া ছিল তাঁর প্রথম এবং দ্বিতীয় নেশা। মা’র হাতে এতগুলো টাকা দেখে বাবার তর সইছিল না। কীভাবে হাতিয়ে নেওয়া যায়, তিনি কৌশলী হয়ে উঠলেন। কিন্তু মা? বাবার পাতা ফাঁদে তিনি পা দিলেননা। তারপরও মা’র কাছ থেকে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিয়ে তিনি কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন।
মা’র সামনে তখন সমূহ বিপদ। অনেক কাঁদলেন তিনি। এরপর আমাকে নিয়ে ছুটে গেলেন হেড স্যারের রুমে। কেঁদেকেটে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু মা’র কষ্ট-ক্রন্দন হেড স্যারের কর্ণ কুহরে পৌঁছাল না।
আমার স্পষ্ট স্মরণে আছে, সেদিন হেড স্যারের উল্টো দিকে বসে আলাপচারিতায় ছিলেন আরও তিন শিক্ষক। ওই তিন শিক্ষকের একজন ছিলেন এই অমর্ত্যবাবু। এমন এক উদ্ভট পরিস্থিতির শিকার হতে দেখে আমাদের তিনি কাছে ডাকলেন। বাবার কুকীর্তির কথা শোনে তিনি খুবই মর্মাহত হলেন। আমাদের আশ্বস্ত করে তিনি হরিপদবাবুকে ডাকলেন। হরিপদবাবু ছিলেন ওই স্কুলের কেরানী।
তবে, একথা সত্য যে- সেদিন স্যারের বদান্যতা না পেলে হয়তঃ আমার শিক্ষা জীবন ভিন্ন স্রোতে প্রবাহিত হতো।
মঞ্চের বক্তারা কে কি বলছিলেন, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই এই কীর্তিমান শিক্ষকের। টেবিলের ওপর মাথাটি রেখে তিনি উড়াল দিলেন ভাবনার মধ্যাকাশে।
এইতো ক’দিন আগে তাঁর কানাডা প্রবাসী কন্যা ফোনে জানিয়েছিল, একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সাহায্য নিয়ে জমিটি উইল করে আসতে। এই মহৎ কাজটি সঠিকভাবে সারাতে পেরে মন-মেজাজ বেশ ফুরফুরে লাগছিল।
তাঁর মৃত্যুর পর এই জমির ওপর গড়ে উঠবে একটি বৃদ্ধাশ্রম। প্রফিডেন্ট ফান্ড হতে যে টাকাগুলো আসবে,
সেই টাকাগুলো তিনি ব্যাংকে রাখবেন, বৃদ্ধাশ্রমের ব্যয়ের জন্য।
প্রবাসী কন্যা যে টাকা ব্যাংকে ফিক্সড করে গেছে, তার ইন্টারেস্টই চলবে তাঁর পুরো মাস।
মুহূর্তে মৃন্ময়ীদেবীকে তাঁর মনে পড়ছিল। মৃন্ময়ীদেবী তাঁর স্ত্রী। ভারী সমঝদার মহিলা। স্বামীর এক রৈখিক জীবন-যাত্রায় কখনও তিনি বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বরং প্রতিটি কাজে তাঁর ছায়া-সঙ্গী হয়ে থাকতেন। বছর দুয়েক আগে তিনি প্রয়াত হন, হিট স্ট্রোকে। ওই থেকে অমর্ত্যবাবুর নিঃসঙ্গ পথ চলা।
জগত সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও একমাত্র মেয়েটি ছাড়া অন্য দু’ছেলে বিপত্মীক বাবার খোঁজ-খবর রাখে না। একবার দেশে এসেছিল বটে। মা’র মৃত্যুজনিত সংবাদে নয়। উদ্দেশ্য ওই এক একর জমি। নিবুদ্ধিতা হবে জেনে অমর্ত্যবাবু ভিন্ন কোনো পদক্ষেপ নিলেন না।।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি কিছু বলবেন। কলেজ অধ্যক্ষ মাইক্রোফোন হাতে তাঁকে বারবার ডেকে যাচ্ছিলেন।
অমর্ত্যবাবু ছিলেন নিশ্চুপ, নিশ্চল। কিন্তু জন্ম দিলেন আরেক নতুন ইতিহাস।
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ইং।
Subash Sarbabiddya
Comment
