এক অজানা কিশোর মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধজয়ের স্বপ্নগাথা!

আর একটি সফল অপারেশন শেষ। ক্যাম্পের কোনায় ছোট্ট প্রিয় ডায়েরি নিয়ে বসা কিশোর ছেলেটি, মাকে আবারো মনে পড়ছে বারবার, ক্যাম্পের আর সবার মত যুদ্ধজয়ের হাতছানিভরা টলমল করা তার দু চোখ, অন্যদের থেকে একটু ভিন্ন -চুপচাপ, যৌবনের সন্ধিক্ষণে পৌঁছা ছেলেটির অবসর ভাবনায় শুধু মায়ের মমতা মাখানো সেই অদ্ভুত হাসি!

মা কে না বলে যে যুদ্ধে এসেছে, তাতেই তার মায়ের জন্য যত কষ্ট! পকেটের ছোট্ট ডায়েরি তে মায়ের জন্য না বলা যত কথাই যার

এখন নিত্য- কল্পনাসঙ্গী। ছোট্ট ছোট্ট গুটি গুটি হাতে আজো লিখে চলেছে যুদ্ধগাথা। “জানো মা,

তুমি না তোমার পাগল এই ছেলেটার রেখেয়ালিপনা নিয়ে সদা চিন্তিত থাকতে;

যে ছেলে সামান্য একটা তেলাপোকার উড়াউড়িতে ভয় পেয়ে মাকে ডেকে ঘর সাড়া করতো!

আজ অবাক হবে মা, পাঁচ পাঁচটা তাগড়া পাক মেলেটারি কে রাইফেলের গুলিতে খতম করেছে তোমার এই তেলাপোকাভীতু ছেলেটা।

একটি গুলিতো তোমার ছেলের কানের বা পাশ দিয়ে চলে গেছে আজ; শুনলেতো তুমি শিহরে উঠতে। তুমিই যে আমার শক্তি মা! করে যে বলবো তোমায় এই ভীরু ছেলেটার সাহসের কীর্তিকথা। তোমার ছেলে, এক একটা গেরিলা অপারেশনের শুরুতেই তার মায়েরই স্নেহাশীষ ভরা হাত তার মাথায় কল্পনা করে।

সামনে সবুজ প্রান্তের মাঠে দাঁড়িয়ে তার মা। যেন সবুজ দেশ মাতৃকার মাঝখানে দাড়িয়ে আছো তুমি। ভাবতেই তেজে ভরে উঠে মন।

রাইফেল তাক করে চালাতে থাকি গুলি। সেই সুখকল্পনা থেকে এখনো সফল করে চলেছে তোমার ছেলে- ছোট্ট ছোট্ট অপারেশন।”

তেমনি আরো একটি অপারেশন আজ। লিডার বলেছে আজ একটা কঠিন অপারেশন। শত্রুর মুখোমুখি সম্মুখপানে ছুটতে লাগ্লো পাগলা সে ছেলেটি।বেশ কজন কে উড়িয়ে দিলো…

হটাৎ একটা গুলি বাঁ পায়ের উরুর মাঝখানে বিদ্ধ হলো। পরে আরেকটি বুকের মধ্যে। সাথীরা লড়াই করে সবুজ প্রান্তে নিরাপদে আনলো তাকে।

রক্তে ভেসে যাচ্ছে বুক। কিন্তু ছেলেটির এক হাত তখন
বাম পায়ের ক্ষতস্থানের উপরে রক্তে ভেজা পকেটে।

ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে পকেট থেকে বের করলো ছোট্ট সেই ডায়েরি।

বক্তে ভেজা ডায়েরি’র শেষ ক’টা লাইন,– “মাগো-

আমার মন বলছে আর কদিন পর দেশ স্বাধীন হবে, স্বাধীন দেশে যুদ্ধজয়ের এই বীরত্বের গাথা তোমায় শুনাতে পারবো তো। শুনে তুমি তোমার এই ভীরু ছেলেটির গর্বে আবেগে আপ্লুত কান্নাহাসি ভেজা সেই অদ্ভুত হাসি দিবে-

তোমার চোখ বেয়ে বিজয়ের আনন্দের অশ্রুফোঁটা ঝরে পড়বে। সেই আনন্দের দৃশ্য দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি মা”।

একজন সাথী এভাবে রক্তে ভেজা ডায়েরির তার শেষ কথাগুলো পড়ছিলো। এ যেন মায়ের কাছে দেয়া তার আশার বানী।

আর থাকা যাচ্ছেনা। মা, মা দু’বার কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল সে।

সাথী ১০ জনের চোখের জল টপটপ পড়তে লাগলো তার রক্ত ভেজা যুকে। এ যেন বিরাট সবুজ ক্যানভাসের মাঝখানে অশ্রুভেজা রক্তিম সমাধি। এ যেন তার মায়ের চোখের অশ্রু ঝরার সেই দৃশ্যেরই প্রতিফলন।

ছেলেটির নিষ্প্রান খোলা চোখের দিকে তাকিয়ে ওরা ক’জন।
আবারো দৃপ্ত তেজে উদ্দীপ্ত ওরা। কঠিন সময় তাদের;দেশকে স্বাধীন করতেই হবে। যুদ্ধ জয়ের স্বপ্নগাথা শেষ করার দায়িত্বে অটল তারা!

Suman Malakar

Comment