উলপিটের সবুজ শিশুরা

The Green Children of Woolpit

দুটি পান্না-সবুজ ত্বকের অদ্ভুত শিশু, যারা রূপকথার পাতা থেকে যেন আচমকাই হেঁটে এসেছিল সাফোকের এক ফসলি জমিতে—এবং রেখে গিয়েছিল মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম এক রহস্য।

কল্পনা করুন দ্বাদশ শতাব্দীর সাফোকের এক শেষ বিকেলের সোনালী আলো। বাতাসে পাকা গম আর উষ্ণ মাটির গন্ধ। কৃষকেরা তালে তালে কাস্তে চালাচ্ছেন, ঘামে তাদের জামা ভিজে গেছে। মাঠের চারদিকে হাসি আর মৃদু গুঞ্জনের আওয়াজ। ঠিক তখনই, ‘উলপিট’ গ্রামের নাম যে পুরনো নেকড়ে ধরার গর্তগুলোর (wolf pits) নামানুসারে হয়েছিল, তার কাছাকাছি অলৌকিক কিছু একটা দেখা গেল।

মাঠের ধার থেকে—কিংবা কোনো কোনো গল্প অনুযায়ী প্রাচীন পরিখা বা গর্ত থেকে—দুটি ছোট শিশু বেরিয়ে এলো। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে, একে অপরের হাত ধরে বা পাশাপাশি হেঁটে আসছে। তাদের গায়ের চামড়া একদম জ্যান্ত পাতার মতো বা পুকুরের শ্যাওলার মতো গাঢ় সবুজ! তাদের পরনের পোশাকের ছাঁট এবং কাপড় দুটোই ছিল একদম অচেনা। সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হলো, গ্রামের মানুষ যখন অবাক হয়ে তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করল, শিশুরা এমন এক ভাষায় জবাব দিল যা কেউ কখনো শোনেনি—এমন কিছু শব্দ যা ইংল্যান্ডের কোথাও বলা হতো না।

এটিই হলো উলপিটের সবুজ শিশুদের গল্প, যা মধ্যযুগীয় ইতিহাসে লিপিবদ্ধ অন্যতম অদ্ভুত এবং দীর্ঘস্থায়ী এক রহস্য। দীর্ঘ ৯০০ বছর ধরে এটি ইতিহাসবিদদের ধাঁধায় ফেলেছে, লোকগল্প গবেষকদের আনন্দ দিয়েছে, ঔপন্যাসিকদের অনুপ্রাণিত করেছে এবং জন্ম দিয়েছে অজস্র অদ্ভুত তত্ত্বের। আপনি এটিকে হারিয়ে যাওয়া বাস্তবের দুটি শিশুর গল্প হিসেবেই দেখুন, পরীদের সাথে সাক্ষাৎ ভাবুন, কিংবা তার চেয়েও অদ্ভুত কিছু—এই গল্পকে মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব।

চেনা পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এক গ্রাম
সাফোকের পাহাড়ি অঞ্চলের মাঝে অবস্থিত এই উলপিট গ্রাম। ১১০০ শতকের দিকে এটি ছিল একটি সাধারণ কৃষিপ্রধান এলাকা। এর নামটি এসেছিল প্রাচীন ইংরেজি শব্দ wulf-pytt (নেকড়ের গর্ত) থেকে। এগুলো ছিল মূলত গভীর গর্ত, যা তৈরি করা হয়েছিল গবাদি পশুদের নেকড়েদের হাত থেকে বাঁচাতে, কারণ তখনও ইংল্যান্ডের বুনো অঞ্চলে নেকড়েরা ঘুরে বেড়াত। সেই সময়েও এই গর্তগুলো বেশ পুরনো ছিল, যা এক প্রাচীন বুনো প্রকৃতির স্মৃতি বহন করত।

তখনকার মানুষের জীবন আবর্তিত হতো জমি আর চার্চকে কেন্দ্র করে। বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল ফসল কাটার ঋতু—পরিশ্রমের সময় হলেও এটি স্বস্তি নিয়ে আসত, কারণ পুরো বছরের খাবার ঘরে উঠত তখন। মানুষ মাটির খুব কাছাকাছি বাস করত এবং বিশ্বাস করত যে কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে। দেবদূত, শয়তান, পরী বা অপদেবতারা তাদের কাছে ততটাই বাস্তব ছিল, যতটা বাস্তব ছিল চার্চের পুরোহিতের উপদেশ বা জমিদারের আদেশ।

দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগটি ছিল বেশ অশান্ত। ইংল্যান্ড তখন রাজা স্টিফেন এবং তার ফুফাতো বোন সম্রাজ্ঞী মাতিলদার মধ্যকার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, যা “দ্য অ্যানার্কি” (নৈরাজ্য) নামে পরিচিত, তার কবলে পড়েছিল। আনুগত্যের বদল হচ্ছিল, সৈন্যরা মার্চ করে যাচ্ছিল, ফসল নষ্ট হচ্ছিল এবং সাধারণ মানুষ চরম কষ্ট পাচ্ছিল। বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চল থেকে আসা ভাড়াতে সৈন্যসহ অনেকেই দুই পক্ষে হয়ে লড়াই করছিল। পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছিল, শিশুরা এতিম হচ্ছিল এবং রাস্তাঘাটে বা মাঠেঘাটে অচেনা মানুষদের দেখা মিলছিল। এমন এক বিশৃঙ্খল সময়ে দুটি হারিয়ে যাওয়া শিশু খুঁজে পাওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না… যদি না তাদের গায়ের রঙ সবুজ হতো!

যে দিন সবুজ শিশুরা আবির্ভূত হয়েছিল
এই ঘটনার কয়েক দশক পরে দুজন স্বাধীন ইতিহাসবিদ বা ইতিবৃত্তকার (chroniclers) মানুষের মুখে মুখে চলে আসা স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে এই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেন।

উইলিয়াম অফ নিউবার্গ, একজন অগাস্টিনিয়ান সন্ন্যাসী, যিনি ১১৮৯ সালের দিকে তার Historia rerum Anglicarum (ইংল্যান্ডের ইতিহাস) গ্রন্থে এই ঘটনাটি রাজা স্টিফেনের রাজত্বকালের (১১৩৫-১১৫৪) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছিলেন যে, ফসল কাটার সময় উলপিটের কাছের মাঠে কাজ করা গ্রামবাসীরা দুটি শিশুকে—একটি ছেলে এবং একটি মেয়েকে—আবিষ্কার করে, যারা কিছু প্রাচীন পরিখা বা গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তাদের পুরো শরীর ছিল সবুজ। তারা একটি অদ্ভুত রঙের এবং অজানা কাপড়ের তৈরি পোশাক পরেছিল। এবং তারা এমন এক ভাষায় কথা বলছিল যা কেউ বুঝতে পারছিল না।

Ralph অফ কগশল, একজন সিস্টারসিয়ান মঠাধ্যক্ষ (abbot), ১২২০ সালের দিকে তার Chronicon Anglicanum গ্রন্থে এই ঘটনার আরও বিস্তারিত বিবরণ দেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি এই বিবরণটি সরাসরি স্যার রিচার্ড ডি কালনে-এর কাছ থেকে শুনেছেন। স্যার রিচার্ড ছিলেন স্থানীয় একজন জমিদার, যিনি এই শিশুদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। র‌্যাঁলফের লেখা অনুযায়ী, ফসল কাটার সময় মাঠের কৃষকেরা শিশুদের খুঁজে পায়। ছেলে ও মেয়েটি ভীষণ আতঙ্কিত ও ক্লান্ত ছিল। তাদের স্যার রিচার্ডের প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়, কিন্তু সেখানে তাদের সাধারণ কোনো খাবার দেওয়া হলে তারা তা খেতে অস্বীকৃতি জানায়। বেশ কয়েক দিন তারা কিছুই খায়নি—যতক্ষণ না তারা বাগানে কাঁচা সবুজ শিম বা মটরশুঁটি (green beans) বড় হতে দেখল। চরম ক্ষুধায় ব্যাকুল হয়ে তারা খোসাসহ সেই কাঁচা শিম গোগ্রাসে গিলে খেতে শুরু করল।

কয়েক সপ্তাহের ধৈর্যশীল পরিচর্যার পর শিশুরা আস্তে আস্তে রুটি এবং অন্যান্য খাবার খেতে শুরু করে। আর তাদের খাবারের অভ্যাস বদলানোর সাথে সাথে একটি অলৌকিক কাণ্ড ঘটল: তাদের গায়ের সবুজ রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করল, এবং একসময় তাদের ত্বকের রঙ অন্য যেকোনো ইংরেজ শিশুর মতোই স্বাভাবিক হয়ে গেল।

“আমরা সেন্ট মার্টিনের দেশ থেকে এসেছি”
মেয়েটি যখন মনের ভাব প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট ইংরেজি শিখে নিল, তখন সে তাদের গল্প শোনাল। দুই ইতিহাসবিদের লেখায় এর খুঁটিনাটি বিবরণে সামান্য অমিল থাকলেও মূল বিস্ময়কর জায়গাটি একই ছিল।

মেয়েটি জানায়, সে এবং তার ভাই ‘সেন্ট মার্টিন্স ল্যান্ড’ (St. Martin’s Land) নামের একটি দেশ থেকে এসেছে। সেটি ছিল একটি খ্রিস্টান দেশ, যেখানে সেন্ট মার্টিনকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করা হতো। তাদের মাতৃভূমিতে কখনো সূর্য উঠত না। সেখানকার আলো ছিল সবসময় একটি মৃদু, চিরস্থায়ী গোধূলির মতো—ঠিক যেমনটা আমাদের পৃথিবীতে সূর্য ওঠার ঠিক আগে বা সূর্য ডোবার ঠিক পরের হালকা আলো থাকে। সেখানকার সবকিছুই ছিল সবুজ: মাঠঘাট, গাছপালা, এমনকি আকাশও হয়তো। আর সেখানকার মানুষের গায়ের রঙও ছিল সবুজ, ঠিক যেমনটা তার ও তার ভাইয়ের ছিল।

একদিন, যখন তারা মাঠে তাদের বাবার ভেড়ার পাল (কোনো কোনো গল্পে গবাদি পশু) চরাচ্ছিল, তখন তারা একটি সুন্দর ও জোরালো শব্দ শুনতে পায়—ঠিক যেন চার্চের ঘণ্টার আওয়াজ। তারা সেই শব্দ তাড়া করতে গিয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। র‌্যালফের বিবরণ অনুযায়ী, তারা তাদের পশুদের পিছু পিছু একটি গুহা বা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে এবং দীর্ঘ সময় অন্ধকারের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। অবশেষে যখন তারা সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়, তখন আমাদের পৃথিবীর উজ্জ্বল সূর্যের আলোয় তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তারা নিজেদের আবিষ্কার করে উলপিটের ফসল কাটার মাঠের ঠিক মাঝখানে।

মেয়েটি আরও উল্লেখ করেছিল যে, তাদের দেশ থেকে খুব দূরে নয় এমন একটি উজ্জ্বল বা দীপ্তিময় দেশ দেখা যেত, যা একটি চওড়া নদী দ্বারা তাদের দেশ থেকে আলাদা ছিল। এটি তাদের গোধূলির রাজ্য থেকে দেখা আমাদের এই আলোকিত পৃথিবীর বর্ণনা ছিল, নাকি সম্পূর্ণ অন্য কোনো জায়গা—তা আজও এক রহস্য।

ছেলেটি, যে বয়সে ছোট এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল, সে কখনোই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি। খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত (baptised) হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তবে মেয়েটি বেঁচে গিয়েছিল। সে দীর্ঘ বছর স্যার রিচার্ড ডি কালনের বাড়িতে পরিচারিকা হিসেবে কাজ করে। উইলিয়াম অফ নিউবার্গ উল্লেখ করেছেন যে, সময়ের সাথে সাথে তাকে অন্য ইংরেজ নারীদের থেকে আলাদা করার কোনো উপায় ছিল না এবং সে ‘কিংস লিন’ শহরের এক বাসিন্দাকে বিয়ে করেছিল। অন্যদিকে, র‌্যালফ অফ কগশল তার আচরণকে কিছুটা কঠোরভাবে বর্ণনা করেছেন “nimium lasciva et petulans” হিসেবে—যার অর্থ অত্যন্ত চঞ্চল, বেপরোয়া ও অবাধ্য। সম্ভবত এটি তার মানসিক আঘাত (trauma) বা সংস্কৃতির পরিবর্তনের ধাক্কার বহিঃপ্রকাশ ছিল।

পরবর্তীকালের কিছু জনপ্রিয় গল্পে মেয়েটির নাম ‘অ্যাগনেস’ বলা হয়েছে এবং একটি লোককথা অনুযায়ী সে এক আর্চডেকনকে (চার্চের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা) বিয়ে করেছিল। এই তথ্যগুলো হয়তো পরে কাল্পনিকভাবে যোগ করা হয়েছে, তবে তার বেঁচে থাকা, মানিয়ে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ে করার মূল সত্যগুলো একদম শুরুর দিকের ঐতিহাসিক উৎসগুলোতেই পাওয়া যায়।

Comment