ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি (The Voynich Manuscript) হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ধাঁধাগুলোর একটি। এটি ১৫ শতকের একটি সচিত্র বই (Codex), যা সম্পূর্ণ এক অজানা লিপিতে লেখা। বইটির পাতাগুলো অদ্ভুত সব গাছপালা, জ্যোতির্বিজ্ঞানের নকশা, অদ্ভুত জলছত্র বা পাইপলাইনের মধ্যে নগ্ন মানুষের ছবি এবং ঘন, অপাঠ্য লেখায় ভরা।
কার্বন ডেটিং (বিজ্ঞানসম্মত বয়স নির্ধারণ পদ্ধতি) পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বইটি ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮ সালের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অনেক চেষ্টা করেও কেউ এর একটি শব্দও উদ্ধার করতে পারেনি। পোলিশ-আমেরিকান দুর্লভ বই বিক্রেতা উইলফ্রিড ভয়নিচ (Wilfrid Voynich) ১৯১২ সালে এই বইটি খুঁজে পান এবং তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়। বর্তমানে এটি ইয়েল ইউনিভার্সিটির ‘বাইনিকি রেয়ার বুক অ্যান্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরি’-তে সংরক্ষিত রয়েছে। এটিকে প্রায়শই “বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় পাণ্ডুলিপি” বা “এমন একটি বই যা কেউ পড়তে পারে না” বলে অভিহিত করা হয়।
আজ পর্যন্ত এর কোনো প্রমাণিত অনুবাদ মেলেনি। এর লেখক কে, তাও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বইটি আসলে কী উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল—এটি কোনো গোপন ভেষজ চিকিৎসার বই, নাকি কোনো কিমিয়াবিদ্যা (Alchemy), নারীদের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা, কৃত্রিম কোনো ভাষা তৈরির পরীক্ষা, নাকি কোনো চতুর প্রতারণা (Hoax)? এর কোনো উত্তর নেই। তবুও, এর অস্তিত্ব মধ্যযুগীয় জ্ঞান, ক্রিপ্টোগ্রাফি (গোপন সংকেতের বিদ্যা), ভাষাবিজ্ঞান এবং মানুষের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে চলেছে।
এই প্রবন্ধে বইটির ভৌত গঠন, এর ইতিহাস, বিভিন্ন অধ্যায়, ছবির বিবরণ, লেখার অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য, লিপি উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বইটির ভৌত গঠন এবং বাস্তব রূপ
বইটি আকারে খুব বেশি বড় নয়, তবে বেশ ভারী। এটি পার্চমেন্ট বা পশুর চামড়া (Vellum) দিয়ে তৈরি। এর আকার প্রায় ২২.৫–২৩.৫ সেমি × ১৬–১৬.২ সেমি (প্রায় ৯ × ৬.৩ ইঞ্চি)। বইটিতে বর্তমানে প্রায় ১০২টি ফোলিও বা পাতা রয়েছে (ভাঁজ করা পাতা এবং হারিয়ে যাওয়া পাতার হিসাব ধরলে প্রায় ২৩৪–২৪০ পৃষ্ঠা)। ধারণা করা হয়, ইতিহাসের কোনো এক সময়ে এর ১৪ থেকে ২৮টি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে বা হারিয়ে গেছে।
প্রোটিন বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই পার্চমেন্ট তৈরি করতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫টি বাছুরের চামড়া ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে মধ্যযুগীয় চামড়ার সাধারণ খুঁত, যেমন—ছোট ছিদ্র, জোড়াতালি এবং চামড়ার মানের তারতম্য দেখা যায়। তবে এটি কোনো ‘পালিম্পসেস্ট’ (Palimpsest) নয়, অর্থাৎ আগের কোনো লেখা মুছে তার ওপর নতুন করে এই বইটি লেখা হয়নি।
বইটির মূল লেখাগুলো পালকের কলম এবং ‘আয়রন-গল’ (Iron-gall) কালি দিয়ে লেখা হয়েছে। ছবির আউটলাইন বা বর্ডার তৈরিতেও একই কালি ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিগুলো রঙ করার জন্য জলছাপ বা ওয়াটার কালার ব্যবহার করা হয়েছে। এই রঙগুলো তৈরিতে সস্তা কিন্তু সেই আমলের প্রচলিত উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল; যেমন—সবুজ রঙের জন্য তামা, নীল রঙের জন্য অ্যাজুরাইট খনিজ, লাল ও বাদামির জন্য গেরুয়া মাটি বা হেমাটাইট এবং সাদা রঙের জন্য চক বা ডিমের সাদা অংশ।
ছবির আঁকার শৈলীকে বিশেষজ্ঞরা “গ্রামীণ কিন্তু প্রাণবন্ত” বলে বর্ণনা করেছেন। এটি কোনো রাজকীয় বা উচ্চমানের শিল্পীর কাজ নয়, তবে যিনি এঁকেছেন তিনি বেশ দক্ষ এবং কল্পনাপ্রবণ ছিলেন। বইটিতে বেশ কিছু বড় বড় ভাঁজ করা পাতা (Foldouts) রয়েছে, যা সেই যুগের বইয়ের ক্ষেত্রে বেশ বিরল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো নয়টি বৃত্তাকার নকশাবিশিষ্ট মহাজাগতিক চিত্র, যাকে “রোজেটস” (Rosettes) বলা হয়।
বইটির বর্তমান বাঁধাইটি আসল নয় (বর্তমানে এটি কাঠের ওপর ছাগলের চামড়া দিয়ে বাঁধানো)। বইয়ের পাতায় পোকার কাটার দাগ দেখে বোঝা যায়, একসময় এর আসল বাঁধাইটি কাঠের ছিল। ‘মাল্টিস্পেক্ট্রাল ইমেজিং’ (আধুনিক আলোকচিত্র প্রযুক্তি) পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে আধুনিক যুগের কোনো জালিয়াতি বা রদবদলের প্রমাণ নেই। বইটির পৃষ্ঠাগুলোতে দাগ এবং ব্যবহারের চিহ্ন দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এটি একসময় বেশ যত্ন সহকারে ব্যবহার করা হতো এবং কিছু পাতায় হয়তো পরে রঙের কাজও করা হয়েছিল।
ছবি ও অলঙ্করণের ওপর ভিত্তি করে পুরো পাণ্ডুলিপিটিকে মূলত ছয়টি প্রধান অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে (বইটির লেখায় নিজস্ব কোনো শিরোনাম বা অধ্যায়ের নাম নেই):
১. উদ্ভিদবিজ্ঞান বা ভেষজ অংশ (Botanical/Herbal): (পৃষ্ঠা ১র–৬৬ভি, প্রায় ১২৬ পৃষ্ঠা)
২. জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্র (Astronomical/Astrological): (প্রায় ১৭ পৃষ্ঠা)
৩. জীববিজ্ঞান বা স্নানবিদ্যা (Biological/Balneological): (প্রায় ২০ পৃষ্ঠা)
৪. মহাজাগতিক বা সৃষ্টিতত্ত্ব (Cosmological): (ভাঁজ করা পাতাসহ প্রায় ১৪ পৃষ্ঠা)
৫. ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধ প্রস্তুতবিদ্যা (Pharmaceutical): (প্রায় ১৬ পৃষ্ঠা)
৬. রেসিপি বা নক্ষত্রমালা (Recipes/Stars): (ধারাবাহিক লেখায় ঠাসা, প্রায় ২৫+ পৃষ্ঠা)
এর বাইরে কিছু পৃষ্ঠা রয়েছে যাতে কোনো ছবি নেই, শুধু লেখা বা খুব সামান্য নকশা রয়েছে। পুরো বইটি সম্ভবত একাধিক লিপিকার বা লেখক মিলে তৈরি করেছিলেন (গবেষক লিসা ফাগিন ডেভিস অন্তত পাঁচজন ভিন্ন লেখকের হাতের লেখার ছাপ চিহ্নিত করেছেন)। এটি নির্দেশ করে যে, বইটি কোনো একজন খামখেয়ালী মানুষের কাজ নয়, বরং এটি কোনো কর্মশালা বা যৌথ প্রচেষ্টার ফসল।
ইতিহাস ও মালিকানার গতিপথ: শতকের পর শতক পেরিয়ে
রেডিওকার্বন ডেটিং এবং ছবি আঁকার শৈলী বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বইটি ১৫ শতকের শুরুতে (রেনেসাঁর সময়ে সম্ভবত উত্তর ইতালি বা সেন্ট্রাল ইউরোপে) তৈরি করা হয়েছিল। তবে এর লিখিত দলিলের ইতিহাস শুরু হয় ১৭ শতকের শুরুর দিকে।
১৬৬৫ বা ১৬৬৬ সালে জোহানেস মার্কাস মার্সি (প্রাগের চার্লস ইউনিভার্সিটির একজন বোহেমিয়ান চিকিৎসক ও উপাচার্য) নামক এক ব্যক্তি জেসুইট পণ্ডিত আথানাসিয়াস কির্চারকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটি এই পাণ্ডুলিপির ভেতরেই গোঁজা ছিল এবং এটিই বইটির ইতিহাস সম্পর্কে সবচেয়ে বড় সূত্র দেয়:
মার্সি দাবি করেছিলেন যে, বইটি একসময় পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফের (শাসনকাল: ১৫৭৬–১৬১২) মালিকানায় ছিল, যিনি এটি ৬০০ স্বর্ণমুদ্রা (ডুকাট) দিয়ে কিনেছিলেন।
ধারণা করা হয়েছিল এটি ১৩ শতকের ইংরেজ পণ্ডিত রজার বেকনের কাজ (যদিও পরে কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে এই দাবি ভুল প্রমাণিত হয়)।
এর আগের মালিকদের মধ্যে একজন ছিলেন জ্যাকোবাস হরসিকি ডি টেপেনেক (সম্রাট রুডলফের রাজকীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক)। বইটির প্রথম পৃষ্ঠায় আল্ট্রাভায়োলেট (ইউভি) আলোর নিচে তাঁর স্বাক্ষর (“Jacobi de Tepenecz”) স্পষ্ট দেখা যায়।
এরপর এটি প্রাগের আলকেমিস্ট জর্জ বারেশের কাছে যায়, যিনি এর রহস্য উন্মোচনের জন্য পণ্ডিত কির্চারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
কির্চারের পর এটি জেসুইট ‘কোর্লেজিও রোমানো’ লাইব্রেরিতে চলে যায়। জেসুইটদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা ও নানা ঝামেলার মধ্যেও বইটি টিকে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত রোমের কাছে ভিলা মন্ড্রাগোনে (একটি জেসুইট কলেজ) পৌঁছায়। ১৯১২ সালে তহবিলের জন্য কিছু পাণ্ডুলিপি বিক্রির সময় উইলফ্রিড ভয়নিচ এটি কিনে নেন। তিনি তাঁর জীবনের বাকি সময়টা এর রহস্য সমাধান এবং প্রচারের পেছনে ব্যয় করেন।
১৯৩০ সালে ভয়নিচের মৃত্যুর পর বইটি তাঁর স্ত্রী, বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ইথেল লিলিয়ান ভয়নিচের কাছে যায়। পরে এটি দুর্লভ বইয়ের ব্যবসায়ী হ্যান্স পি. ক্রসের কাছে বিক্রি করা হয়, যিনি ১৯৬৯ সালে এটি ইয়েল ইউনিভার্সিটিকে দান করেন।
১৬০০ সালের আগের মালিকানার কিছু ইতিহাস এখনও অজানা থাকলেও, সম্রাট রুডলফের আমল থেকে শুরু করে প্রাগের বুদ্ধিজীবী এবং জেসুইটদের হাত ঘুরে বইটি আসার ধারাবাহিক ইতিহাসটি বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত। রজার বেকনের মাধ্যমে এর ইংল্যান্ডে থাকার বা এটি আধুনিক যুগের কোনো জালিয়াতি হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।
চিত্রকর্মের বিবরণ: এক অদ্ভুত জগতের দৃশ্যপট
বইটির ভেতরের লেখাগুলোর মতো এর ছবিগুলোও সমান রহস্যময়। বইয়ে আঁকা গাছপালাগুলোর সাথে চেনা কোনো উদ্ভিদের মিল পাওয়া যায় না (অথবা এগুলোকে একাধিক গাছের মিশ্রণে অদ্ভুতভাবে আঁকা হয়েছে)। জ্যোতির্বিজ্ঞানের নকশাগুলো চেনা গেলেও বেশ বিকৃত। বিশেষ করে এর “জীববিজ্ঞান” অংশটি মধ্যযুগীয় শিল্পের ইতিহাসে সম্পূর্ণ অনন্য ও নজিরবিহীন।
উদ্ভিদবিজ্ঞান অংশ: এতে ১১৩টিরও বেশি বড় বড় উদ্ভিদের ছবি রয়েছে, সাধারণত প্রতি পৃষ্ঠায় একটি বা দুটি করে গাছ দেখানো হয়েছে। গাছেদের মূল, পাতা, ফুল এবং কিছু ক্ষেত্রে বীজ বা ফলও আঁকা হয়েছে। কিছু ছবি আসল গাছের মতো মনে হয় (যেমন- বুনো প্যান্সি বা মেডেনহেয়ার ফার্ন)। তবে বেশিরভাগই আজ পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি বা এগুলো কাল্পনিক। লেখার লাইনগুলো ছবির চারপাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে। অনেক পৃষ্ঠা মধ্যযুগীয় ভেষজ বইয়ের মতো হলেও, আসল প্রজাতিগুলো খুঁজে পাওয়া মুশকিল—হতে পারে এগুলো কাল্পনিক, আলকেমির কোনো গোপন প্রতীক, অথবা দূরের কোনো অঞ্চলের অদক্ষ হাতে আঁকা ছবি।
জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্র অংশ: এই অংশে রয়েছে বৃত্তাকার সব নকশা, যেখানে সূর্য, চাঁদ, তারা এবং রাশিচক্রের প্রতীক (বৃষ রাশি হিসেবে ষাঁড়, মীন রাশি হিসেবে মাছ, ধনু রাশি হিসেবে তিরন্দাজ ইত্যাদি) আঁকা আছে। কিছু পৃষ্ঠায় দেখা যায় ৩০ জন নগ্ন নারী মূর্তি নক্ষত্র ধরে আছেন বা নক্ষত্রের সাথে যুক্ত হয়ে আছেন। কিছু রাশির চিহ্ন অবশ্য নিখোঁজ (যেমন টিকে থাকা পৃষ্ঠাগুলোতে কুম্ভ বা মকর রাশির স্পষ্ট ছবি নেই)। এগুলো মধ্যযুগীয় পঞ্জিকা বা জ্যোতিষশাস্ত্রের বইয়ের মতো হলেও এর ভেতরের প্রতীকগুলো খুবই অদ্ভুত।
জীববিজ্ঞান বা স্নানবিদ্যা অংশ: এটি সম্ভবত এই পাণ্ডুলিপির সবচেয়ে বিখ্যাত এবং অদ্ভুত অংশ। এখানে ডজন ডজন ছোট ছোট নগ্ন নারীর ছবি রয়েছে (যাদের অনেকেরই পেট এবং নিতম্ব অস্বাভাবিক রকমের ফোলা বা বড়)। তারা একে অপরের সাথে যুক্ত থাকা বিভিন্ন টব, পাইপলাইন বা ক্যাপসুলের মতো কাঠামোর ভেতরে সবুজ রঙের কোনো তরলে স্নান করছেন বা চলাচল করছেন। কাউকে কাউকে মাথায় মুকুট পরা অবস্থায় বা দলবদ্ধভাবে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি হয়তো প্রসূতিবিদ্যা বা নারীদের স্বাস্থ্য জ্ঞান, কোনো থেরাপিউটিক বা ঔষধি স্নান, অথবা আলকেমি বা রসায়নের কোনো উপাদানের মিশ্রণ প্রক্রিয়ার প্রতীকী রূপ। এই পাইপলাইনের নকশাগুলো অত্যন্ত জটিল এবং বাস্তবসম্মতভাবে অকার্যকর।
মহাজাগতিক অংশ: এই অংশে বেশ কয়েকটি পাতা জুড়ে থাকা একটি দুর্দান্ত বড় ভাঁজ করা ছবি রয়েছে, যা “রোজেটস” (Rosettes) বা নয়টি বৃত্তাকার মেডেলিয়ন নামে পরিচিত। এই গোল নকশাগুলোতে সম্ভবত দ্বীপ, শহর, দুর্গ, আগ্নেয়গিরি বা কোনো মহাজাগতিক মানচিত্র বোঝানো হয়েছে। অন্য পৃষ্ঠাগুলোতে কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়া বৃত্ত এবং নক্ষত্রের প্যাটার্ন রয়েছে। এগুলো এই পাণ্ডুলিপির সবচেয়ে জটিল ও দর্শনীয় চিত্রকর্মগুলোর একটি।
ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধ প্রস্তুত অংশ: এখানে বিভিন্ন গাছের মূল, লতাপাতা এবং উদ্ভিদের নানা অংশের ছবি রয়েছে (যেগুলোর পাশে প্রায়ই লেবেল বা নাম লেখা আছে)। এর সাথে লাল, নীল এবং সবুজ রঙের নানা নকশার রাজকীয় ওষুধের বয়াম ও পাত্রের ছবি দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে যে, বইটি হয়তো কোনো ব্যবহারিক চিকিৎসা পদ্ধতি বা আলকেমির নির্দেশিকা ছিল।
রেসিপি বা বিধিমালা অংশ: এই অংশে ঘন প্যারাগ্রাফে ঠাসা লেখা রয়েছে, যার মার্জিন বা কিনারে তারা (star) বা ফুলের মতো চিহ্ন দেওয়া আছে। ধারণা করা হয়, এগুলো বিভিন্ন ওষুধ তৈরির রেসিপি, নির্দেশনাবলী অথবা কোনো গোপন মন্ত্র হতে পারে।
এই ছবিগুলো কিন্তু কোনো আনাড়ির হাতের হিজিবিজি আঁকা নয়; এগুলো অত্যন্ত চিন্তাভাবনা করে সাজানো, রঙ করা এবং পুরো বইজুড়ে একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা মেনে তৈরি। তবুও এগুলোকে সহজে চেনা যায় না।
বইটির লিপি: ‘ভয়নিচিজ’—এটি কি কোনো ভাষা নাকি জটিল সংকেত?
বইটির লেখাগুলো বাম থেকে ডানে সুন্দর লাইনে সাজানো। এতে মূলত ২০ থেকে ৩৮টি আলাদা অক্ষর বা প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে (প্রতীকগুলোর ভিন্নতা ও যুক্তাক্ষরের হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যা কম-বেশি হয়)। লেখাগুলোর মধ্যে একটি চমৎকার ছন্দ বা টানা হাতের লেখার (Cursive) ভাব আছে। গবেষকরা এই লেখা নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য EVA (European Voynich Alphabet) নামক একটি বিশেষ রূপান্তর পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
এই লেখার গাণিতিক বা পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই চমৎকার:
সাধারণ ভাষার মতোই এটি ‘জিপফের আইন’ (Zipf’s law – যা ভাষার শব্দ ব্যবহারের ফ্রিকোয়েন্সি বা হার নির্দেশ করে) মেনে চলে।
এখানকার শব্দগুলো সাধারণত ২ থেকে ১০টি অক্ষরের হয়ে থাকে।
লেখায় বারবার ফিরে আসা কিছু অদ্ভুত প্যাটার্ন রয়েছে (যেমন: “ororor”, “daiin”, “chedy” ইত্যাদি)। এমনকি বিভিন্ন অধ্যায়ে ভিন্ন শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করা হয়েছে (যেমন: উদ্ভিদ ও ওষুধ অংশে এক ধরণের লিপি, আবার জীববিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যা অংশে আরেক ধরণের লিপি)।
অক্ষরের গঠন এবং বিন্যাস দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় এটি কোনো এলোমেলো বা অর্থহীন লেখা নয়, এর একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো আছে।
তবে, কিছু ক্ষেত্রে (যেমন দুটি অক্ষরের পাশাপাশি বসার হার) এটি সাধারণ ইউরোপীয় ভাষাগুলোর চেয়ে আলাদা।
এটি যে সাধারণ কোনো ‘সাবস্টিটিউশন সাইফার’ (যেখানে একটি অক্ষরের বদলে অন্য একটি অক্ষর বসিয়ে কোড করা হয়) নয়, তা নিশ্চিত। এটি হতে পারে কোনো রূপক সংকেত, সংক্ষিপ্ত রূপের ব্যবহার, কোনো কৃত্রিম ভাষা, শর্টহ্যান্ড, অথবা কোনো চেনা ভাষাই যা সম্পূর্ণ এক অজানা লিপিতে লেখা হয়েছে। বইয়ের মার্জিনে অন্য কারও হাতের লেখায় লাতিন মাসের নাম এবং একটি রহস্যময় শব্দ “Michitonese” পাওয়া গেছে।
লিপি উদ্ধারের চেষ্টা: এক শতাব্দীর হতাশা এবং বিতর্ক
শত শত মানুষ এই বইয়ের রহস্য সমাধানের দাবি করেছেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের কড়া পরীক্ষায় কোনো দাবিই টিকে থাকেনি।
উইলিয়াম রোমেইন নিউবোল্ড (১৯২০-এর দশক): তিনি দাবি করেছিলেন যে, রজার বেকনের শর্টহ্যান্ডের মাধ্যমে অতি সূক্ষ্ম আকারে এতে বৈজ্ঞানিক রহস্য লুকিয়ে আছে। পরে প্রমাণিত হয় যে, তিনি যেগুলোকে অক্ষর ভেবেছিলেন, সেগুলো আসলে কালির শুকিয়ে যাওয়া ফাটল এবং তাঁর মনের ভুল (Pareidolia)।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোডব্রেকাররা: উইলিয়াম ফ্রিডম্যান এবং তাঁর দক্ষ দল আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে জানান, এটি কোনো সহজ কোড নয়, বরং এটি সম্ভবত কোনো কৃত্রিম বা সাংকেতিক ভাষা।
পরবর্তী অন্যান্য দাবি: কেউ বলেছেন এটি স্বরবর্ণ ছাড়া লেখা ইউক্রেনীয় ভাষা, কেউ বলেছেন ওল্ড তুর্কিক, হিব্রু, কিংবা নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহৃত সংক্ষিপ্ত লাতিন ভাষা। ২০১৯ সালে জেরার্ড চেশায়ার দাবি করেন এটি সন্ন্যাসিনীদের ব্যবহৃত ‘প্রোটো-রোমান্স’ ভাষা। তবে তাঁর এই দাবি বিশ্বজুড়ে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যাত হয় এবং ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটি তাঁর এই গবেষণা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।
স্টিফেন ব্যাক্স (২০১৪): তিনি উদ্ভিদের নাম এবং প্রকৃতির কিছু বিষয় আংশিক অনুবাদের প্রস্তাব করেছিলেন; যা বেশ আশাব্যঞ্জক হলেও অসম্পূর্ণ এবং অপ্রমাণিত রয়ে গেছে।
এআই (AI) এবং কম্পিউটার প্রযুক্তি: মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে এটিকে বিভিন্ন চেনা ভাষা ও লিপির (যেমন কিছু ভারতীয় লিপির সাথে সামান্য মিল) সাথে তুলনা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, লাতিন বা ইতালীয় ভাষা থেকে “নাইব্বে” (Naibbe) নামক মধ্যযুগীয় এক ধরণের কোড ব্যবহার করে ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির মতো গাণিতিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করা সম্ভব।
তবুও, আজ পর্যন্ত কোনো গবেষকই এমন কোনো ধারাবাহিক অনুবাদ বের করতে পারেননি যা বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা মেনে নিয়েছেন।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: পাণ্ডুলিপির সত্যতা যাচাই
রেডিওকার্বন ডেটিং (২০০৯, অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়): বইটির বিভিন্ন পাতা থেকে চারটি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলো নিশ্চিতভাবে ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ের। এর মাধ্যমে রজার বেকনের (১৩ শতক) তত্ত্ব এবং এটি আধুনিক যুগের কোনো জালিয়াতি হওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ হয়ে যায়।
কালি ও রঙের পরীক্ষা: পরীক্ষায় দেখা গেছে, এতে ব্যবহৃত আয়রন-গল কালি এবং রঙগুলো সম্পূর্ণ মধ্যযুগীয়। আধুনিক বা কৃত্রিম কোনো উপাদানের অস্তিত্ব এখানে নেই।
মাল্টিস্পেক্ট্রাল ইমেজিং (Multispectral imaging): এই আধুনিক আলোকচিত্র প্রযুক্তির মাধ্যমে বইটির ভেতরের লুকিয়ে থাকা বিবরণ এবং খসড়া ড্রয়িং সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের গবেষণায় বইটির প্রথম পৃষ্ঠায় কিছু পুরোনো নোট বা কোড ভাঙার প্রাথমিক চেষ্টার দাগ দেখা গেছে। এটি যে কোনো আধুনিক জালিয়াতি নয়, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
এই সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ জোরালোভাবে সমর্থন করে যে, বইটি ১৫ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপেই তৈরি হয়েছিল।
বিভিন্ন ধারণা: এটি আসলে কী হতে পারে?
পণ্ডিত এবং গবেষকরা বহু বছর ধরে অনেক ধারণা বা হাইপোথিসিস দিয়েছেন, তবে কোনটিই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি:
সাংকেতিক প্রাকৃতিক ভাষা: কোনো আসল ভাষা (হতে পারে কোনো উপভাষা বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভাষা) যা আড়াল করার জন্য বিশেষ কোড বা নিজস্ব লিপিতে লেখা হয়েছে।
কৃত্রিম ভাষা বা লিপি: চিকিৎসা বা আলকেমির গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য তৈরি করা কোনো ভাষা।
প্রতারণা বা অর্থহীন বই: সম্রাট রুডলফের মতো ধনকুবেরদের বোকা বানিয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য তৈরি করা কোনো চতুর জাল বই। তবে এর ভেতরের জটিল ভাষাগত কাঠামো এবং এটি তৈরিতে যে বিপুল শ্রম লেগেছে, তা এই জালিয়াতির ধারণাকে দুর্বল করে দেয়।
নারীদের স্বাস্থ্য বা স্নান নির্দেশিকা: বইটির স্নানের দৃশ্য এবং গর্ভবতী নারীদের মতো অবয়ব দেখে ধারণা করা হয়, এটি প্রসূতিবিদ্যা, উর্বরতা বা ঔষধি স্নানের কোনো গোপন নির্দেশিকা, যা লোকলজ্জার ভয়ে লুকিয়ে লেখা হয়েছিল।
জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান: যেখানে মানবদেহের বিভিন্ন অংশের সাথে নক্ষত্রের সংযোগ (Melothesia) দেখানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে লিসা ফাগিন ডেভিস এবং রেনে জ্যান্ডবার্জেনের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি ১৫ শতকের শুরুতে বেশ কয়েকজন মানুষের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি একটি অত্যন্ত অর্থপূর্ণ এবং বিশেষ কোনো রেফারেন্স বই (Reference work), যদিও এর আসল রহস্য এখনো কুয়াশায় ঢাকা।
আধুনিক গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ পথচলা
ইয়েল ইউনিভার্সিটির বাইনিকি লাইব্রেরি এই বইটির উচ্চ-মানের ডিজিটাল কপি ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করে দেওয়ায় এখন সাধারণ মানুষও এটি নিয়ে গবেষণা করতে পারছে। পরিসংখ্যানগত ভাষাবিজ্ঞান, নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ এবং ডিপ লার্নিং (Deep Learning)-এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে এর ওপর কাজ চলছে। ২০২৬ সালেও ইতিহাসবিদ, ক্রিপ্টোগ্রাফার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও কনফারেন্সের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এআই (AI) এখনো এর সমাধান করতে পারেনি, কারণ আমাদের কাছে এর সমসাময়িক কোনো অনুবাদ বা চাবিকাঠি (Key) নেই। তবে এআই গবেষকদের বিভিন্ন ধারণা পরীক্ষা করতে সাহায্য করছে।
সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং চিরন্তন আকর্ষণ
ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি যুগে যুগে অসংখ্য উপন্যাস, তথ্যচিত্র, গেম, শিল্পকর্ম এবং বিভিন্ন রহস্যময় তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। এটি মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং অমীমাংসিত রহস্যের প্রতি আমাদের চিরন্তন আকর্ষণের প্রতীক। ২০১৬ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস এর একটি হুবহু প্রতিরূপ (Facsimile edition) প্রকাশ করে, যা সাধারণ মানুষকে এটি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
ইতিহাস, শিল্প, বিজ্ঞান এবং কোড-ব্রেকিংয়ের এক অদ্ভুত মোহনায় দাঁড়িয়ে আছে এই বইটি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের সুপারকম্পিউটার এবং আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও মানুষের তৈরি কিছু সৃষ্টি শত শত বছর ধরে অধরা থেকে যেতে পারে।
উপসংহার: এক শাশ্বত রহস্য
ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি কেবল একটি অমীমাংসিত বই-ই নয়, এটি মধ্যযুগীয় মানুষের সৃজনশীলতা এবং যোগাযোগের এক অনন্য নিদর্শন। এটি কোনো হারিয়ে যাওয়া চিকিৎসা জ্ঞান, আলকেমির দর্শন, নাকি কোনো পণ্ডিত দলের নিজস্ব গোপন ভাষা—তা আমরা এখনো জানি না।
২০২৬ সালেও এটি একটি পরম রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি বা নতুন কোনো ঐতিহাসিক আবিষ্কার হয়তো একদিন এর দরজা খুলে দেবে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় মেধার অহংকার ভেঙে দিয়েছে। এটি আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন করে ভাবতে এবং প্রশ্ন করতে শেখায়।
আপনি গবেষক হোন বা কেবলই একজন কৌতূহলী পাঠক, বাইনিকি লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে গেলেই এই বইটির পাতাগুলো নিজের চোখে দেখতে পাবেন। প্রায় ছয় শতাব্দী আগে কিছু মানুষের মস্তিষ্কে জন্ম নেওয়া এই ধাঁধার সমাধান খোঁজার যাত্রা আজও চলছে… হয়তো পরবর্তী অধ্যায়টি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে!

