Badhon Hara Mon

কাপের ধোঁয়ায় হারিয়ে যেওনা
লেখক: বাঁধন হারা মন

কাপের ধোঁয়ায় হারিয়ে যেওনা।
একটা বিনীত অনুরোধ। শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, এই বাক্যটার ভেতরে লুকিয়ে আছে একটা অদ্ভুত দ্বিধা, একরাশ অচেনা ভয় আর না-বলা অনেক কথা। তখন অবশ্য আমি নিজেও ঠিক বুঝতাম না—কাপের ধোঁয়া মানে কী। কাপ থেকে আবার ধোঁয়া বেরোয় নাকি! চায়ের কাপ হলে তো বাষ্প উঠতে দেখেছি, কিন্তু ধোঁয়া? পরে বুঝেছিলাম, সব ধোঁয়াই আগুনের নয়; কিছু ধোঁয়া আসে মনের ভেতর থেকে, চোখের সামনে ঝাপসা পর্দা নামিয়ে দেয়, সত্য আর মিথ্যের মাঝখানে একটা নরম অথচ বিপজ্জনক আবরণ তৈরি করে। ঘটনাটা সেই সময়ের, যখন সদ্য ষোলোতে পা দিয়েছি। দশম শ্রেণীতে উঠেছি। শরীরটা তখন সমূদ্রেরর জোয়ার ভাটার জলের মতো—অকারণে ফুলে ওঠে, আবার হঠাৎ শান্ত হয়ে যায় ।গোঁফের নরম রেখা ঠোঁটের ওপর স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের মুখটাই কেমন যেন অপরিচিত লাগে। গলার স্বর ভারী হয়ে গেছে অনেক আগেই, কথা বললে নিজের কানে নিজের কণ্ঠটাই অচেনা শোনায়। শরীরের এই দ্রুত বদলটা চোখে পড়ার মতো হলেও, মনে তখনও তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি—এই বিশ্বাসটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। পরিবর্তন আসছিল, খুব নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে; আমি টের পাচ্ছিলাম না বলেই বোধহয় তার অভিঘাতটা পরে আরও তীব্র হয়েছিল।

আমি আনভী নূর আহমেদ। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। স্বপ্নগুলো তাই আকাশছোঁয়া হলেও, পায়ের নিচের মাটিটা সবসময় শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। লোকে বলে সাহসী, কিন্তু নিজেকে কখনো সেভাবে মনে হয়নি। সাহস আর অভ্যাস—দুটোর তফাৎ তখন বুঝতাম না। বাবা সবজি বিক্রেতা। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাঁর দিন শুরু হয়, আর আমাদের ঘুম ভাঙে তাঁর বাজারে যাওয়ার শব্দে। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় আদর যেমন পেয়েছি, দায়িত্বও তেমনি বেশি। আমরা যৌথ পরিবারে থাকি—চাচাতো ভাইবোন, পিসতুতো মাঝে মাঝে বাদ , কিন্তু বাড়িটা সবসময়ই মানুষের শব্দে ভরা। ছোটদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফল—সব কিছুর একটা অদৃশ্য দায় আমার কাঁধে এসে পড়ে। কারও ফল খারাপ হলে দোষটা আগে থেকেই আমার ঘাড়ে। আবার আমার ফল খারাপ হলে সেটা তো আরও বড় অপরাধ। বড় ছেলে বলে কথা। ‘দাদা’—এই ডাকটা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কেউ দাদা বলে ডাকলেই ভেতরে ভেতরে বিরক্ত লাগে, অথচ মুখে সেটা দেখানো যায় না। হাসিমুখে থাকতে হয়—এটাও এক ধরনের অভ্যাস। অভ্যাসগুলোই বোধহয় মানুষকে ভিতর থেকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে দেয়।

এই সবের মাঝেই পড়াশোনার একটা পরিবর্তন এলো। আগে যে টিউশনে পড়তাম, সেই স্যার হঠাৎ করেই জানালেন আর পড়াতে পারবেন না। ব্যক্তিগত সমস্যা—এই দুটো শব্দের আড়ালে কত গল্প লুকিয়ে থাকে, তখন বুঝিনি। বাবা নতুন টিউশন খুঁজতে শুরু করলেন। আশপাশে জিজ্ঞেস করছেন, কে ভালো পড়ায়, কার কাছে ফল ভালো হয়। সেই সময়েই বাবার মনে পড়ল একটা শিক্ষকের কথা। সেখানে আগে থেকেই পড়তো এক ছেলে। আশীষ ইসলাম—আমার খুব ভালো বন্ধু। না, প্রিয় বন্ধু বলব না; কিন্তু খুব কাছের। বন্ধুত্বের এই সংজ্ঞাটা তখনও পরিষ্কার ছিল না। আমরা ছোটবেলার বন্ধু নই সে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে নতুন স্কুলে উঠেই ওর সঙ্গে প্রথম দেখা। ক্লাসরুমের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা ছেলেটা, চোখে একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব, কথাবার্তায় অল্প কিন্তু ঠিকঠাক। তখন থেকেই যেন আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলা শুরু। আলাদা আলাদা স্বভাব, আলাদা আলাদা সংসার—তবু কোথাও একটা মিল ছিল, যেটা ভাষায় ধরা পড়ে না। আশীষের বাড়িটা আমাদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। ওদের ঘরে পড়ার পরিবেশটা একটু আলাদা। ওর বাবা চাকরি করেন, মা সংসার সামলান। বাবা যখন বলেছিলেন নতুন শিক্ষকের নামটা। তখন ভেতরে ভেতরে একটা অজানা উত্তেজনা কাজ করেছিল। নতুন কিছু শুরু করার আগের সেই অদ্ভুত অনুভূতি—ভয় আর কৌতূহলও একসঙ্গে। আর আরেকটা উত্তেজনা কারণ টা হলো—আশীষ।

প্রথম দিন আমাকে আশীষই ডাকতে এসেছিল।বিকেলটা তখনো পুরো নামেনি, রোদ আর ছায়া মিলেমিশে রাস্তার ওপর একটা নরম আলো ফেলে রেখেছে। আশীষ বলল, “চল, আজ একটু আগেই বেরোই।” আমি কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। ওর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অদ্ভুত এক হালকা লাগছিল—যেন নতুন কিছু শুরু হতে যাচ্ছে, অথচ ঠিক কী, তা স্পষ্ট নয়। রাস্তায় যেতে যেতে আশীষ হঠাৎ বলল, “চা খাবি?” প্রশ্নটা এমন স্বাভাবিক ছিল যে, মাথা নেড়ে সম্মতি জানানো ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। আমরা রাস্তার ধারের সেই চায়ের দোকানটায় দাঁড়ালাম—চেনা দোকান, চেনা মুখ, কিন্তু সেদিনের দাঁড়ানোটা যে একেবারে আলাদা হবে, তখন কে জানত। দোকানের সামনে দু-একজন লোক গল্প করছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, চারপাশে বিস্কিট আর চায়ের গন্ধ।

আমি হাতে চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। গরম কাপটা আঙুলে ছুঁতেই একটা আরাম লাগছিল। আশীষ কিছু বলছিল—পড়াশোনা, অঙ্ক, পরের সপ্তাহের পরীক্ষা—কিন্তু কথাগুলো যেন কানে ঢুকেও ঢুকছিল না। চোখ অন্যমনস্ক হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। ঠিক তখনই দোকানের পিছনের বাড়িটার দরজা খুলে গেল। একটা কিশোরী মেয়ে বেরিয়ে এলো। খুব ধীরে, যেন তাড়াহুড়োর কোনো দরকার নেই। বয়স হয়তো আমার কাছাকাছি, কিংবা এক-দু’বছর কম। পরনে হালকা রঙের সালোয়ার- কামিজ, রঙটা ঠিক বোঝা যায় না—মাটি আর আকাশের মাঝামাঝি কিছু। খোলা চুল দু’কাঁধ ছুঁয়ে নেমেছে, বাতাসে একটু নড়ছে। মুখে কোনো সাজ নেই, তবু চোখে পড়ার মতো একটা স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা। চোখ দুটো বড় নয়, আবার ছোটও নয়—কেমন যেন শান্ত, অথচ গভীর।

তার হাতে ছিল বিস্কিট ভরা একটা কাঁচের কৌটা। কৌটার ভেতরে বিস্কিটগুলো এলোমেলোভাবে রাখা, কাঁচের গায়ে বিকেলের আলো পড়ে ঝিলমিল করছে। সে দোকানওয়ালার দিকে এগিয়ে গেল। কোনো বাড়তি কথা নয়, শুধু কৌটাটা বাড়িয়ে দিল। দোকানওয়ালা অভ্যস্ত ভঙ্গিতে কৌটাটা নিয়ে রাখলো। মেয়েটা তখন একপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠল। অনুভূতিটা নতুন, অচেনা, অথচ অসম্ভব তীব্র। জোয়ারের জলের ঢেউ যেন হঠাৎ করে এসে আছড়ে পড়ল মনের সৈকতে। চোখটা অজান্তেই থমকে গেল মেয়েটার দিকে। আমি তাকিয়ে আছি—খেয়াল আছে, আবার নেইও। চারপাশের শব্দগুলো কেমন যেন দূরে সরে গেল। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু সেটা আর চায়ের ধোঁয়া মনে হচ্ছে না—মনের ভেতরেই যেন ধোঁয়া জমছে। মেয়েটা একবার আমাদের দিকে তাকাল। খুব ক্ষণিকের জন্য। চোখাচোখি বলা যায় না, তবু সেই এক ঝলকেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপুনি হলো। সে আবার নিচের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা একটা ভাঁজ—হাসি নয়, আবার গম্ভীরও নয়। সেই অভিব্যক্তিটা আজও মনে পড়লে ঠিক ভাষা খুঁজে পাই না।

আশীষ তখনও কথা বলছে। “এই অঙ্কটা কিন্তু খুব ইম্পর্ট্যান্ট,” সে বলল। আমি যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়লাম। সত্যি বলতে কী, অঙ্ক, পরীক্ষা, দায়িত্ব—সবকিছু যেন ওই চায়ের দোকানের ধুলোয় মিশে গেছে। চোখ বারবার ফিরে যাচ্ছিল মেয়েটার দিকে। দোকানওয়ালা ৫০ টাকার একটা নোট দিলে। মেয়েটা সেটা হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। যাওয়ার সময় আবার এক ঝলক তাকাল। সেই তাকানোয় কোনো বার্তা ছিল কি না জানি না, কিন্তু আমার ভেতরে একটা প্রশ্ন রেখে গেল—এটা কি শুধুই কৌতূহল, না কি এর চেয়েও কিছু বেশি? সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল নিঃশব্দে। কিন্তু আমার ভেতরের দরজাটা তখন আর বন্ধ হলো না। চায়ের কাপটা প্রায় শেষ, ধোঁয়াটাও মিলিয়ে যাচ্ছে। তবু মনে হচ্ছে, কোথাও একটা ধোঁয়া রয়ে গেছে—ঘন, অস্পষ্ট, চোখ ঝাপসা করে দেওয়ার মতো।

আশীষ বলল, “চল, দেরি হয়ে যাবে।” আমি চুপচাপ কাপটা ফেলে দিয়ে। হাঁটা শুরু করলাম ওর সঙ্গে। রাস্তাটা আগের মতোই, আশীষও আগের মতোই। বদলে গেছি শুধু আমি। সেই দাঁড়ানোটা, সেই কয়েক মুহূর্ত—অজান্তেই জীবনের আরেকটা অধ্যায় শুরু করে দিয়েছে। তখনও বুঝিনি, এই প্রথম ধোঁয়াটাই ভবিষ্যতে আমাকে কতটা পথ ঘুরিয়ে দেবে।

টিউশনে গিয়ে বসলাম শিক্ষক আসার আগেই। ঘরটা তখনো পুরো ভরে ওঠেনি। কয়েকটা চেয়ার ফাঁকা, কয়েকজন ছাত্রছাত্রী আগেই এসে বসেছে। কেউ
জানালার বাইরে তাকিয়ে অন্যমনস্ক। আমি নিজের জায়গাটায় বসে ব্যাগটা নামালাম। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করছিল, যার ঠিক কারণ তখনও বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আজকের বিকেলটা অন্য রকম হবে—কেন হবে, সেটা জানতাম না, শুধু অনুভব করছিলাম। ঠিক তখনই দরজাটা খুলল।
একটা মেয়ে ভেতরে এলো। মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখ স্থির হয়ে গেল। চেনা মুখ। খুব চেনা। বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করে নিঃশব্দ হয়ে গেল। এই তো সেই মেয়েটাই। চায়ের দোকানের সামনে, বিকেলের আলোয়, হাতে বিস্কিট ভরা কাঁচের কৌটা নিয়ে যে মেয়েটাকে দেখেছিলাম—একই মুখ, একই চোখ, একই শান্ত উপস্থিতি। এবার আর কোনো সন্দেহ রইল না। নিশ্চিত হলাম, মেয়েটাও টিউশনে পড়ে। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকল। যেন এই ঘরটা তার প্রতিদিনের চেনা জায়গা। ব্যাগটা নামাল, চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল। কারও দিকে বিশেষ তাকাল না। তবু ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত নড়াচড়া শুরু হয়ে গেল—অন্তত আমার ভেতরে।

মেয়েটার নাম মিঠি হোসেন।
নামটা পরে জেনেছি, কিন্তু নামটার সঙ্গে মুখটা এমনভাবে মিলে গিয়েছিল যে, মনে হয় নামটা আগে থেকেই জানা ছিল। মিঠি—নামটার মধ্যেই একটা নরম ভাব, একটা ধীরতা আছে। ওর মুখেও সেই ধীরতা। চোখ দুটো খুব বড় নয়, আবার ছোটও নয়—কিন্তু চোখে এমন একটা গভীরতা ছিল, যেটা দেখলে মনে হয় অনেক কথা লুকিয়ে আছে, অথচ সে কথা বলতে চায় না।
শিক্ষক আসার আগের কয়েক মিনিট আমার কাছে অদ্ভুতভাবে দীর্ঘ মনে হলো। আমি বই খুলে রাখলাম, কিন্তু পড়তে পারছিলাম না। চোখ বারবার নিজের অজান্তেই ওর দিকে চলে যাচ্ছিল। খুব সাবধানে তাকাচ্ছিলাম, যেন ও বুঝতে না পারে। ওর চুলগুলো গুছানো, কপালের পাশে হালকা করে নেমে এসেছে। কোনো বাড়তি সাজ নেই, তবু কেমন করে যেন আলাদা লাগছিল। শিক্ষক এসে পড়ানো শুরু করলেন। বোর্ডে অঙ্ক লেখা হচ্ছে, খাতায় হিসাব কষা হচ্ছে। আমি সব বুঝছিলাম, তবু মনটা কোথাও আটকে ছিল। মাঝে মাঝে খেয়াল করতাম, মিঠি খুব মন দিয়ে পড়ছে। কোথাও কিছু বুঝতে না পারলে ভুরু কুঁচকে যায়, কলমটা একটু থেমে যায়, তারপর আবার লিখতে শুরু করে।

দিন এগোতে লাগল।
প্রতিদিনের টিউশন, প্রতিদিনের দেখা। প্রথমে শুধু দেখা, তারপর ধীরে ধীরে পরিচিতি। খুব বেশি কথা হতো না। প্রয়োজনের বাইরে একটাও শব্দ খরচ করতাম না আমরা। তবু অদ্ভুতভাবে এক ধরনের নীরব সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল। আমি বুঝতে পারতাম, ও অঙ্কে একটু দুর্বল। কোনো কোনো প্রশ্নে ও থেমে যায়। তখন আমি নিজে থেকে বলে দিতাম না—শুধু জিজ্ঞেস করতাম, “এইটা বুঝছ?” ও প্রথমে একটু চমকে তাকাত। তারপর মাথা নেড়ে না বলত। আমি ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিতাম। খুব সহজ ভাষায়, খুব ধীর করে। ও মন দিয়ে শুনত। মাঝে মাঝে হালকা একটা “আচ্ছা” বলত। সেই এক শব্দেই যেন আমার সব চেষ্টা সার্থক হয়ে যেত। এইভাবে সাহায্য করতে করতে দিন কেটে যাচ্ছিল। কখনো খাতা এগিয়ে দিতাম—“এইটা দেখে নাও।” কখনো কলমটা তুলে দিতাম—“তোমারটা পড়ে গেছে।” কখনো শুধু বলতাম—“এইটা তুমি পারবে।” ছোট ছোট

কথা, ছোট ছোট মুহূর্ত। কিন্তু আমার কাছে এগুলো বিশাল হয়ে উঠছিল। মনের কথা বলার চেষ্টা করেছি অনেকবার। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি।

কখনো মনে হতো, আজ বলব। আজই বলব। বুকের ভেতর কথাগুলো গুছিয়ে নিতাম। ভাবতাম, কীভাবে শুরু করব। “তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে”—এইটুকু বলার জন্যই যেন হাজারটা সাহস দরকার হতো। কিন্তু ঠিক যখনই সুযোগ আসত, শব্দগুলো কেমন করে যেন গলার ভেতর আটকে যেত। ও বসে আছে, বই খুলে পড়ছে। আমি তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে, এখনই বলব। কিন্তু মুখ খুললেই অন্য কথা বেরিয়ে আসত—“এই অঙ্কটা দেখেছ?” বা “কালকেরটা করেছ?” মিঠি হয়তো বুঝতেই পারত না, এই সাধারণ প্রশ্নগুলোর আড়ালে কত অগোছালো অনুভূতি লুকিয়ে আছে। একদিন সাহস করে চকলেট নিয়ে গেলাম। খুব সাধারণ একটা চকলেট। দামি নয়, ঝকঝকে নয়। টিউশন শেষ হওয়ার পর ও ব্যাগ গুছোচ্ছে, আমি ধীরে করে বললাম, “নাও।” হাতটা একটু কেঁপে গিয়েছিল। ও অবাক হয়ে তাকাল। তারপর মৃদু হাসি। বলল, “কেন?” আমি কী উত্তর দেব, জানতাম না। তাই শুধু বললাম, “এমনিই।” ও চকলেটটা নিল। সেই মুহূর্তটা আমার কাছে অদ্ভুতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইল। ও হয়তো সেটা বিশেষ কিছু ভাবেনি, কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল নিজের মনের কথা বলার এক অসম্পূর্ণ চেষ্টা।
এরপর মাঝে মাঝে চকলেট নিয়ে যেতাম। কখনো ও নিত, কখনো বলত, “আর না।”কখনও আবার সেও আমায় দিতো। আমি জোর করতাম না। শুধু হাসতাম।

দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিল।
মিঠি ধীরে ধীরে আমার দৈনন্দিন চিন্তার অংশ হয়ে উঠছিল। টিউশন ছাড়া অন্য সময়েও হঠাৎ করে ওর কথা মনে পড়ত। কোনো অঙ্ক করতে গিয়ে ভাবতাম—এইটা মিঠি বুঝতে পারবে তো? কোনো চকলেট দেখলে মনে হতো—এটা ওর ভালো লাগবে। তবু আমি কিছু বলতে পারিনি।ভয় ছিল। প্রত্যাখ্যানের ভয় নয়—ভয় ছিল, এই নীরব সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে। ও যদি দূরে সরে যায়? ও যদি আগের মতো কথা না বলে? এই ভয়টাই আমাকে চুপ করে থাকতে শিখিয়েছিল। একদিন টিউশন শেষে ও হঠাৎ বলল, “আজকেরটা বুঝতে পেরেছি, তোমার জন্য।” খুব সাধারণ একটা কথা। কিন্তু সেই কথাটার ভেতরে আমি অনেক কিছু খুঁজে পেলাম। শুধু মাথা নাড়লাম। মুখে কিছু বললাম না। ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক আনন্দ। এইভাবেই দিন এগিয়ে চলছিল।
কোনো ঘোষণা ছাড়া, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়া, শুধু নীরবতা আর অসম্পূর্ণ কথার ভেতর দিয়ে। আমি মনের কথা বলার চেষ্টা করেই গেলাম—চোখে, কাজে, সাহায্যে, ছোট ছোট চকলেটের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু শব্দে বলা হলো না। হয়তো কিছু কথা শব্দে বলার জন্য নয়। হয়তো কিছু অনুভূতি শুধু কাপের ধোঁয়ার মতো—চোখের সামনে ভাসে, কিন্তু ধরতে গেলে মিলিয়ে যায়।

একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—এই কথা আর মুখে বলা যাবে না। কিছু কথা আছে, যেগুলো মুখে বললে ছোট হয়ে যায়। শব্দে বেরোবার আগেই ভেঙে পড়ে। আমি যতবারই চেষ্টা করেছি, ততবারই শব্দগুলো আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। গলা শুকিয়ে গেছে, বুকের ভেতর ধকধক করেছে, অথচ মুখ খুলে একটা বাক্যও বেরোয়নি। তখন বুঝলাম—এই কথাগুলো মুখের জন্য নয়। এগুলো কলম আর কাগজের জন্য। সেদিন রাতে অনেকক্ষণ জেগে ছিলাম। ঘরটা নিস্তব্ধ। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। জানালার বাইরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল, আবার চুপ করে গেল। টেবিলের ওপর একটা সাদা কাগজ রাখলাম। কলমটা হাতে নিলাম। কিন্তু লেখা শুরু করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, লিখে ফেললে সব বদলে যাবে। না লিখলেও বদলাবে—এই দ্বন্দ্বের মাঝেই অনেকক্ষণ কেটে গেল।
শেষে লিখলাম।

লেখার সময় হাত কাঁপছিল। শব্দগুলো খুব সাবধানে বেছে নিচ্ছিলাম। কোথাও যেন বাড়াবাড়ি না হয়ে যায়, কোথাও যেন সত্যিটা আড়াল না হয়ে যায়। চিঠিটা শেষ করতে করতে রাত অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছিল। কাগজটা ভাঁজ করলাম। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ফাঁকা অনুভূতি—যেন নিজের ভেতরের কিছু একটা আলাদা করে রেখে দিলাম ওই কাগজের মধ্যে। পরের দিন চকলেট কিনলাম। খুব সাধারণ একটা। চকচকে মোড়ক, ভেতরে মিষ্টি স্বাদ—অথচ ভেতরে যে চিঠিটা ঢুকিয়ে দিলাম, তার স্বাদ ছিল একেবারেই আলাদা। চকলেটটা হাতে নিয়ে টিউশনে গেলাম। সেদিন অদ্ভুতভাবে সময় খুব ধীরে চলছিল। ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছিল না। পড়া শেষ হলে, সবাই যখন ব্যাগ গুছোচ্ছে, তখন আমি ধীরে ওর কাছে গেলাম। চকলেটটা বাড়িয়ে দিলাম। ও আগের মতোই অবাক হয়ে তাকাল।
— “এর ভেতরে কী?”
কৌতুহল ছিল চোখে। সরল কৌতুহল।
আমি চোখ নামিয়ে বলেছিলাম,
— “বাড়ি গিয়ে দেখবে।”
ও একটু থমকাল। তারপর বলল,
— “উত্তর দিতে হবে?”
আমি মাথা নাড়লাম। খুব আস্তে করে বলেছিলাম,
— “চিঠি পড়লেই বুঝবে।”
সেই কথাগুলো বলার সময় বুকের ভেতর কেমন একটা টান ধরেছিল। মনে হচ্ছিল, এখন যদি কিছু ঘটে যায়—ভালো বা খারাপ—আমি প্রস্তুত। ও চকলেটটা ব্যাগে রাখল। হাসল। সেই হাসিটা আজও মনে পড়ে। খুব সাধারণ, খুব ছোট। অথচ আমার জীবনের সবচেয়ে ভারী হাসিগুলোর একটা।

আমি অপেক্ষা করতে শুরু করলাম।প্রথম দিন গেল। কোনো উত্তর নেই। ভাবলাম, হয়তো পড়েনি। দ্বিতীয় দিন গেল। ও এল না টিউশনে। ভাবলাম, হয়তো অসুস্থ।
তৃতীয় দিনও এল না। বুকের ভেতর অস্বস্তি শুরু হলো।
চতুর্থ দিন। পঞ্চম দিন। মিঠি নেই। প্রথমে নিজেকে বোঝালাম—সব ঠিক আছে। মানুষ মাঝে মাঝে আসে না। কিন্তু দিন যত এগোচ্ছিল, ততই ভেতরের চিন্তাটা গাঢ় হচ্ছিল। কোথায় গেল সে? কেন এল না? চিঠিটা কি পড়েছে? পড়ে কি রেগে গেছে? নাকি হাসছে?
একদিন সাহস করে খোঁজ নিতে গেলাম। যেটা জানলাম, সেটা জানার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। চিঠিটা মিঠির হাতে পৌঁছায়নি। চিঠিটা গিয়ে পড়েছিল মিঠির মায়ের হাতে। সেই কাগজটা—যার মধ্যে আমি নিজের ভেতরের সবচেয়ে নীরব অনুভূতিগুলো রেখে দিয়েছিলাম—অচেনা চোখে পড়া হয়েছে। ভুল হাতে। ভুল সময়ে। মিঠির মা চিঠিটা পড়েছিলেন। পড়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—এই গল্প এখানেই শেষ হবে। বাবাকে কিছু না জানিয়ে, বা মিথ্যা কথা বলে, মিঠিকে হোস্টেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। খুব দ্রুত। যেন প্রশ্ন করার সময় না থাকে। যেন ব্যাখ্যার সুযোগ না থাকে।
মিঠি হারিয়ে গেল।
কোনো বিদায় ছাড়া।
কোনো কথা ছাড়া।
কোনো উত্তর ছাড়া।

আমি তখনো অপেক্ষা করছিলাম। চিঠির উত্তরের জন্য।
ওর দেখা পাওয়ার জন্য। কিন্তু দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস—মিঠি আর ফিরে এলো না। টিউশনের চেয়ারটা ফাঁকা পড়ে থাকত। আমি বসে থাকতাম। পাশে কেউ নেই। খাতার পাতায় অঙ্ক, কিন্তু চোখে অদৃশ্য জল জমে থাকত। কেউ সেটা দেখত না। ধীরে ধীরে বুঝলাম—কিছু চিঠির উত্তর আসে না। কিছু প্রশ্নের জবাব জীবনে লেখা থাকে না। একটা চিঠির প্রভাবে, একটা মেয়ে হারিয়ে গেল। আর আমি রয়ে গেলাম—এক কাপ চায়ের ধোঁয়ার মতো স্মৃতির ভেতরে। তখনই বুঝেছিলাম— এটাই কাপের ধোঁয়ায় হারিয়ে যাওয়া।
সে হারিয়ে গিয়েছিল।
আর আমি শিখে গিয়েছিলাম—কিছু হারিয়ে যাওয়া এতটাই নিঃশব্দ হয়, যে শব্দ দিয়ে তাকে ডাকা যায় না।
নিঃশব্দে তখন নিজেকেই বলেছিলাম—

কাপের ধোঁয়ায় হারিয়ে যেওনা।

…………………………………………

Comment