মা সরস্বতী দেবী
রমেশচন্দ্র বিশ্বাস
সরস্বতী বিদ্যার দেবী। সকল বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা সরস্বতী। গায়ত্রীরহস্যোপনিষদে আছে- ” সরস্বত্যাঃ সর্ব্বে বেদা অভবন সরস্বতী থেকেই সৃষ্টি সমস্ত বেদ। প্রিয়পরম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে আব্রহ্মস্তম্ভ পর্যন্ত সব বিষয়েরই আলোচনা হয়েছে। একবার সরস্বতী পূজার প্রাক্কালে উঠল সরস্বতী প্রসঙ্গ। জানতে চাওয়া হল দেবীর সমন্ধে। প্রথমেই ঠাকুর জিঙ্গাসা করলেন, সরস্বতী মানে কি? অভিধান দেখা হল। অভিধানে আছে “সরস্ + বতী”, সরস্ বা সরঃ মানে জল। তাহলে যিনি জলবতী তিনি সরস্বতী। ওভাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে বললে হত না। তিনি প্রতিটি অর্থেরই ধাত্বর্থ অর্থ দেখতে বলতেন। তদনুযায়ী সরস্ শব্দের ধাতু দেখা হল। সরস শব্দের মধ্যে সৃ ধাতু আছে। “সৃ” ধাতু মানে গতি, চলা। শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন “তাহলে সরস্বতী মানে গতিবতী, যিনি গতির প্রতীক”। গতি ছাড়াও সৃ ধাতুর অপর এক অর্থ- “বিকশিত হওয়া”। তাহলে দেখা যাচ্ছে সরস্বতী শব্দের মধ্যে বিকাশের আকুলতাও আছে। সরস্বতীর আর এক নাম হচ্ছে- বাগদেবী। বাক মানে বাক্য বা শব্দ। তা শুনে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেন, “তাহলে সরস্বতী শব্দেরও দেবতা”। এই শব্দই আদি বাক্। আমরা কথা বলি। কথা বলি আমাদের ভাষায়। ভাষার আশ্রয় স্থল হল শব্দ। শব্দ পৃথিবীতে কবে এসেছিল? শব্দ আসবার আগে পৃথিবীতে কী ছিল? কিছুই ছিল না। চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী, গ্রহ, নক্ষত্র, আলো, বাতাস, মাটি কিছুই ছিল না। এ মুহুর্তে প্রনাম করছি ঋগ্বেদ সংহিতাকে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত লিপিবদ্ধ একমাত্র প্রথম গ্রন্থ ঋগ্বেদ। কবে এই গ্রন্থের জন্ম তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। অধ্যাপক হেরম্যান জ্যাকোবির মত হলো এই যে, বৈদিক সাহিত্যের রচনাকাল খৃস্টপূর্ব চার হাজার বছর। মহাপন্ডিত বালগঙ্গাধর তিলক এই মতকেই সমর্থন করেছেন। আধুনিককালের পন্ডিতেরা বলে থাকেন ঋকবেদের রচনা এক হাজার খৃষ্টপূর্বাব্দ। পণ্ডিতি মত পার্থক্য যতই থাকুক, যাই থাকুক হিন্দু বিশ্বাস করে যে বেদ অপৌরুষেয়। সাধারণ মানুষের রচনা নয়। সাধনায় ধ্যান- মগ্ন ঋষিচেতনায় উচ্চারিত অনুভব। ঋষি প্রাণে প্রাণে বেদবাণী শ্রবণ করেছেন । উচ্চারণ করেছেন। ভাষা পেয়েছিলেন বলেই উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন। ভাষার আরেক নাম বাক্। এই বাণী যার প্রাণে অনুভূত হয়েছিল তিনি বাক্ ঋষি। তিনি নারী। সনাতনী ধর্মে যারা নারীত্ব অবহেলা করেন তাদের মনে রাখা উচিত যে হাজার হাজার বছর আগে ঋষি চেতনায় নারী পরম গৌরবান্বিত হয়েছেন। মা সরস্বতী নারী। তাই তিনি দেবী। বাগদেবী। আমাদের জন্মের প্রথম পর্যায়ে আমরা মায়ের গর্ভে মার সাথে যুক্ত থেকেই ধীরে ধীরে বেড়ে উঠি। অনুভব করতে শিখি। আবার পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে প্রথম যে উচ্চারণ শিখি তা মায়ের কাছ থেকেই শিখি। মায়ের কাছে আমাদের ঋণ ও কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। সেই মাকে কোন ক্রমেই অবমূল্যায়িত করতে পারি না। যুগদ্রষ্টা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের উচ্চারণ “মা আমার- জননী আমার- তোমার ইচ্ছা থেকে জন্ম-দেহ থেকে দেহ-ভাষা থেকে ভাষা নিয়ে আমার অসহায় শৈশব থেকে তুমি আমাকে মানুষ করে তুলেছ তোমার কাছে আমার ঋণ ও কৃতজ্ঞতার সীমা নেই”। এই লাইন কয়টি উচ্চারণ করে সৎসঙ্গী যারা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সদাচারী হয়ে খালি পেটে মায়ের জন্য কিছু অর্থ রাখেন আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পরমসত্যের মাঝে যিনি সমাহিত হন তিনি পরমপিতার সাথে একাকার হয়ে যান। স্রষ্টা আর সৃষ্টি একায়িত। তুমি আর আমি অভেদ। একেই ইসলাম ধর্মচেতনায় বলা হয়ে থাকে “ফানা ফিল্লাহ, বাকা বিল্লাহ”। তাইতো স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন-
পুতুল পূজা করে না হিন্দু
কাঠ মাটি দিয়ে গড়া
মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরে
হয়ে যাই আত্মহারা”।
বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন “পূজা অর্চনা মানেই কিন্তু দৈব্যগুণ যা তা সেধে নেওয়া, হাতে কলমে অভ্যাস করে ব্যক্তিত্বে তার রূপটি দেওয়া”। শ্রীমদ্ভগবতে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের বলিষ্ট উচ্চারণ “যে ব্যক্তি সর্বভূতব্যাপী ঈশ্বরকে ত্যাগ করিয়া মূর্খতাবশতঃ প্রতিমার পূজা করে, সে ভষ্মে হোম করে। প্রত্যেক বছর মাঘের শুক্লা ৫মী তিথিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বিদ্যার দেবী স্মরণে সরস্বতী পূজা করে থাকেন। মা সরস্বতী সেই ঈশ্বরেরই পরমশক্তি। এ জ্ঞানে কেউ যদি ঐ মায়ের গুণগুলি নিজের চরিত্রে অনুশীলনের প্রচেষ্টা করেন এবং তাৎপর্য বুঝে কেউ যদি পূজা করেন তাহলে তার পূজা স্বার্থক হয়। সেই পূজাই ঈশ্বরে পর্যবসিত হয়। দুঃখের বিষয় আমরা তাৎপর্য বুঝে পূজা করতে চাই না। অনেকেরই প্রশ্ন জাগে- কেন এই পূজা? পূজা শব্দের অর্থই বা কি? পূজা কথাটির অর্থ হচ্ছে- সম্মান, সমাদর, সম্বন্ধনা অর্থাৎ বৃদ্ধি করা। কারোর পূজা করা মানে পূজিত জনের গুণাবলী নিজের ভিতর অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে গ্রোথিত করা অর্থাৎ নিজেকে তার গুনে গুণ্বাণিত করে তোলা। আর সে গুণ নিজের ভিতর আনতে গিয়ে পূজিত জনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন স্বরুপ ফল-ফুল, তুলসী, প্রভৃতি প্রিয়বস্তু অর্পণ করি। তবে শুধু ফুল, তুলসী গঙ্গাজল দিলেই পূজা হয় না। যে কথা আগেই বলেছি সত্যিকার অনুশীলন ও চর্চা ছাড়া পূজা স্বার্থক হয় না। প্রিয়পরমশ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রে বলেছেন- পূজা পাঠ তুই যতই করিস ফুল তুলসী গঙ্গাজলে অনুশীলনী কৌশল ছাড়া জ্ঞান হবে না কোন কালে”। আলোচনা করছি বিদ্যার দেবী মা সরস্বতী নিয়ে। আমরা মাকে ভক্তি করি, পূজা করি অথচ মায়ের আদেশ বা আর্দশ অনুসরণ করি না। তার মানে ভক্তিও হয় না, পূজাও হয় না। মায়ের আদেশ পালনের মধ্য দিয়ে বিদ্যার্জন করা সম্ভব। বাগদেবী সরস্বতীর আচরণে লক্ষ্য করা যায় তিনি সদা বীনাবাদনরতা। নিজ আচরণ দিয়ে তিনি সকলকে বিদ্যার্জনের কৌশল জানিয়ে দিয়ে থাকেন। তাঁর আচরণ ধারার আর্দশ পালন করলে তাঁর আদেশ পালন করা হবে। মানুষ কোনও বিদ্যায় উন্নতি লাভ করতে গেলে তাকে মায়ের আদেশ পালন করতে হবে অর্থাৎ সেই কাজে লেগে পড়ে থাকতে হবে। সংগীতে, শিক্ষায়, কারিগরীতে, রন্ধনে, কৃষিতে, ব্যবসায়, সাধনায়, আরাধনায় প্রভৃতি কার্যে নিষ্টার সংগে লেগে পড়ে থাকলে সিদ্ধি ও উন্নতি হবে। নিষ্ঠা নিয়ে গুরুর আর্দশে যুক্ত থাকাটা বাকদেবীর বীণাবাদনরত মূর্তির তাৎপর্য। নিষ্ঠাসহকারে আর্দশে লেগে পড়ে থাকলে ঐ বিষয়ে উন্নতি লাভ করবে। নিষ্ঠার জোরে অতি সাধারণ লোকও বৃহৎ বৃহৎ কাজে অভূতপূর্ব কৃতিত্ব দেখাতে পারে। কথায় বলে” নিষ্ঠাসহ কাম পুরে মনস্কাম”। সারে ও অসারে অনেককিছুই আমরা পড়ি ও জানি। তার মধ্য থেকে সারটুকু ধরে রাখার কৌশল আয়ত্ব করতে পারলে পড়াশুনায় ও বিদ্যায় অগ্রসর হয়ে যায় ছাত্র। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এজন্যই তাঁর নিজ হস্তে লেখা সত্যানুসরণে লিখেছেন” pull the husk to draw the seed” অর্থাৎ “তুষটা ফেলে শস্যটা নিতে হয়”। সার অসারের থেকে সার গ্রহণের কৌশল আয়ত্ব করাটা রাজহাঁসের বৈশিষ্ট্য। এই কৌশল যে আয়ত্ব করতে পারে মা সরস্বতী তাকে বাহন করে রাখেন। তিনিই মায়ের প্রিয় হয়ে থাকেন। বিদ্যার্জনও তার সহজ হয়। মাও তাকে ভর করে থাকেন। এজন্যই সরস্বতীর বাহন রাজহংস। রাজহাঁসের সারবস্তু গ্রহণের কৌশল জানা আছে। দুধের ভিতর জল মিশ্রিত থাকলে রাজহাঁস জল রেখে দুধ টুকুই গ্রহণ করে। নিষ্ঠার প্রধান অন্তরায় হল প্রলোভন। প্রলোভন থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে সংযমী হওয়ার দরকার। সংযমের অভাবে সকল বিদ্যার্জন ও পূজা বিফলে যায়। বিদ্যার আধার মা সরস্বতী দেবী। ঐ মায়ের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা থাকলে বিদ্যার পরিপূর্ণ রূপ প্রকটিত হয়। মানুষ তখন সরস কাম্যবস্তু লাভকরতে পারে। উর্ধ্বতনকে শ্রদ্ধা করলে, ভক্তি করলে, সম্মান করলে, তার নির্দেশ মেনে চললে, তার নিকট থেকে গুণ অর্জন করা যায়, শক্তি অর্জন করা যায়। এভাবে বুঝে পূজা করলে সেই পূজাই ঈশ্বরে সমর্পিত হয়, সেই পূজাই সার্থক হয়। পূজারীর জীবন ফুলে ওঠে দুলে ওঠে। পুরুষোত্তমের জয়জয়কার হয়। বন্দে পুরুষোত্তমম। (সহায়ক শ্রীশ্রীঠাকুরের দৃষ্টিতে দেব দেবী)
