ঘ্রাণ
‘কী লা নীরা? ইন্দা বেড়া দি রাইখছত্ কিল্লাই?’ বলেই হুড়মুড় করে টিনের ফাঁক গলে কাকী আমার পাশে ধপ করে বসলেন, পুকুর পাড়ে।
আমি মুখে হাঁসি ঝুলিয়ে মিনমিনে গলায় বললাম—
– কাকী, ছাগল কুত্তা এইসব ঢুকে, এল্লিগা প্রচ্ছদের বাবা বেড়া দিছে।
কৈফিয়তের সুরে বললাম। এ গ্রামে এখনো স্বামীর নাম মুখে নিলে বয়স্করা রাগ করেন, তাই এভাবে বলতে হলো। ঘর লাগোয়া টিউবওয়েল এর পাশে শর্টকার্ট রাস্তায় বেড়া দেওয়া হয়েছে বলে কাকী অনুযোগের সুরে জানতে চাইলেন।
অন্য একটি কারণও আছে, বাইরে মাটির উনুনে রান্না করতে বসলে সরদার বাড়ির কিছু লোক এদিক দিয়ে হাঁটা দেন।
কাকী হচ্ছেন আমার চাচি শ্বাশুড়ি, আমার শ্বশুরের চাচাতো ভাইয়ের বউ। এ বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকে দেখছি ওনাকে সবাই রানী কাকী বলে ডাকে।
মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল—অমাবস্যার রাতের মতো, মেদহীন নিটোল মুখখানা পৌষের সকালের রোদের মতো মায়াময়। আর সবচেয়ে যা আমাকে টানে তা হচ্ছে কাকীর চোখ, কচুরিপানার জলের মতো স্বচ্ছ আর স্নিগ্ধ। কাকী যখন কথা বলেন, ঝুরঝুর করে সুগন্ধ ছড়ায়, পানের সুঘ্রাণ। আমি আবিষ্ট হয়ে পড়ি।
সেই সুগন্ধ ছড়াতে ছড়াতে বলেন—
– ও। অন কষ্ট করি গুরি আওন লাইগবো।
– ঘুইরা আইবেন কিল্লিগা? আমনে ঘরের ভিতর দিয়া আইবেন।
– হ, কইছে তোরে? শেষে বালু বরবো গর।
– আমনে ঘরের ভিতর দিয়া ই আইয়েন।
তর্ক জুড়ে দেন কাকী, উনি ঘুরে আসবেন, তবুও ঘরের ভেতর দিয়ে চলাচল করবেন না। দুপুরের এই সময়টায় কাকী ফ্রি হয়ে ঘুরতে বের হন। খাবার দাবার সেরে একটা পান মুখে দিয়ে আসর নামাজের আজান পর্যন্ত গল্পে মাতেন।
আমি গ্রামে থাকলে প্রথম আমার কাছেই আসেন। না হলে সরদার বাড়ীর মেয়ে-বৌদের নিয়েও গল্প করেন। আমি ও দুপুরে ভাত খেয়ে এই পুকুর ঘাটে বসি কিছুক্ষণ। তখন কাকীসহ অন্যান্য অনেকে আসেন। পুকুরের শানবাধানো ঘাটটা আমার ভালো লাগে।
ঘাট সোজা পশ্চিম দিকে খোলা মাঠ, দূরে আবছা ঘরবাড়ি, উত্তর পাশে ধানক্ষেত। দক্ষিণ পশ্চিমে সরদার বাড়ী। আর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে উঠোন।
আমার দাদা শ্বশুর এই গাঁয়ে ওনার ভিটেতে বাড়ি করেছেন, শ্রীপুর থেকে দিগৈ এসে। উনি আর রানী কাকীর শ্বশুর। আমার মতে ওঁরা এই শাখা বাড়িতে থাকে। কিন্তু এ বাড়ির লোকজন কিছুতেই স্বীকার করবে না, ওদের মতে দিগৈ এরটা নতুন, শ্রীপুরের টা পুরোনো বাড়ি।
কাকী সুগন্ধি ছড়িয়ে গল্প জুড়ে দেন—হয়তো নিজের সম্পর্কে বা সমসাময়িক নানা বিষয়ে, বৌ-ঝিয়েদের কান্ডকারখানা থেকে শুরু করে সব কিছুই।
আমাকে একা পেলে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেন। একটু কম শুনেন বলে আমি চুপচাপ শুনি বেশি। নিজের ভবিষ্যতের আশঙ্কা, সন্তানদের অবাধ্যতা কিংবা সংসারের অভাব-অনটনের কথা বলেন। অন্যদের সামনে রাশভারী আভিজাত্য বজায় রাখেন।
গল্পের ফাঁকে দু’কাপ চা নিয়ে আসলে তিনি হাসি দিয়ে বলেন—
– তুই বুঝি হারাদিন চা খাছ?
আমি ও হেসে বলি—
– খাইতো।
আমাদের চা এর আড্ডায় মাঝে মাঝে সরদার বাড়ীর মেয়ে বৌরা যোগ দেন। ওনারা আসলে চা বানানো থেকে কাপ ধোয়া পর্যন্ত সবটাই করেন। আজান হলে যে যার মতো বিদায় নিয়ে চলে যায়।
ঢাকার দুপুর পানসে আর নিঃসঙ্গ। হয় সেলাই নিয়ে বসি, না হয় বই ঘাঁটা, অথবা এমনি শুয়ে গড়াগড়ি করা। এই সময়ে হাজবেন্ড থাকে অফিসে, সন্তান কলেজে। ফোন ঘাঁটতে ইচ্ছে করে না। সন্ধ্যার পর দরকারি ফোন সারি।
কিন্তু গ্রামের দুপুর বড্ড জীবন্ত। প্রাণের স্পর্শ চারিদিকে। সবুজে ছাওয়া গল্পেরা কথা কয়, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি।
কিছুদিন পর পর গ্রামে আসি, শুধু গ্রামের টানে। কেউ থাকে না গ্রামে, আমার হাজবেন্ড সহ ওরা চারজন—ভাসুর আমেরিকা, দেবর জার্মানি, আর বাকি দুইজন শহরে। বোন একজন তা-ও ঢাকা থাকে।
বেশি মন চাইলে একাই চলে আসি গাঁয়ে। কাকী সহ অনেকেই আছেন, ঘুরে যান—
– কি লা নীরা, অননি নাস্তা খাছ? রাইনবি কতোক্ষণ? আইজ কি রাইনবি?
– হ কাকি, সকালের সব কাম শেষ করতে করতে দেরি অইলো। চা খাইছেন নি?
ছোড মাছের জোল রান্দুম চালতা দিয়া। আমনে কি রানছেন?
– ডিমাই হাগ দি ডাইল দি, মাছ বিরন কইচ্ছি, আর তোর কাকার লে ডাইল। এবো ছুলার উরফে। হাগ খাবিনি?
– হ, খামুত।
গিমা শাককে এখানে ডিমাই শাক বলে। কাকী কে যদি নোয়াখাইল্লা বলি, খুব রাগ করেন। বলেন—
– আমরা কিয়ের নোয়াখাইল্লা? আঙ্গো বাড়ি মনিহার। চাঁদপুর জেলায়। হাজীগঞ্জ, রামগঞ্জ কাছাকাছি এল্লে এরুম, আঁই কি বালা কতা হারিনানি?
– পারেন, আমি জানি।
আসলে সত্যি বলতে আমি কখনো কাকী কে শুদ্ধ বাংলা বলতে শুনি নাই। হয়তো আমি নোয়াখালী আর মনিহার অঞ্চলের ভাষা আলাদা করতে পারি না।
সেবার বেশিদিন থাকা হয়নি গ্রামে। সাত-আট মাস পরে শুনলাম কাকা হঠাৎ মারা গেছেন। রানী কাকীর হাজবেন্ড।
বাড়ি গিয়ে কাকীকে দেখে, পরদিন সকালে ফিরে এলাম ঢাকা। এর কিছুদিন পর আবার গেলাম গ্রামে।
সব কিছু ঠিক আগের মতো, কিন্তু রানী কাকী নেই। তিনি বড় ছেলের সাথে চলে গেছেন শহরে।
ঝোপঝাড় কাটিয়ে পরিষ্কার করালাম, পুকুর ঘাটে শ্যাওলা জমেছে, তাও পরিষ্কার করালাম। কিন্তু সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকটা একটু বেশি তীব্র লাগে, পুকুর ঘাটে রোদ বড্ড বেশি। ঝরা পাতায় ভরে যায় উঠোন, ঝাঁট দিলাম।
যারা গল্প করতে আসে, কেমন একঘেয়ে গল্প জুড়ে দেয় এবার। আগে কি গল্প করতো, মনে করতে পারছিলাম না। চা কেমন যেন তিতকুটে লাগে আজকাল। ঢাকার অবসাদ যেন নেমে এলো গাঁয়েও।
পানের সোনালী ঘ্রাণ সাথে নিয়ে গেছে বুঝি রানী কাকী!
ঠিক করলাম, ফিরে যাবো ঢাকা।
কিন্তু পরদিন কাকী এলেন।
বললেন—
– হুনছি কাইল তোর আওনের খবর, আগে হুনিনাই।
সন্ধ্যা হয় হয়, কাকী আমার হাত ধরে টেনে পুকুর ঘাটে নিয়ে গেলেন।
– তোর লে আমার কি হরান ডাই না হড়ছে নীরা।
বলে বুকে টেনে নিলেন। “হরান হড়া” মানে মিস্ করা, প্রাণের কথা।
বলতে বলতে আমার চোখ ভিজে আসে, আর কাঁধে জলের স্পর্শ টের পাই।
মুখ না তুলেও বুঝতে পারছি, কাকীর চোখের জল।
কারো প্রতি অভিযোগ নেই কাকীর, তবুও স্বার্থপরের মতো ভাবলাম আমি যতদিন পর্যন্ত গাঁয়ে আসবো এই সূবাস যেন ঘিরে থাকে আমাকে।

