রেশটুকু থেকে গেল
=============
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
দুপুর গড়াচ্ছিল। অফিসের এসির নিচেও কাজের চাপে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঠিক তখনই রুবিনার ফোন।
– এই যে, শুনছেন? কণ্ঠটা খুব ভারী মনে হলো। ফাইল থেকে চোখ না সরিয়েই তাকে বললাম- শুনছি। বলো।
– একটু সময় হবে আজ? এবং এখনই?
– কেন?
– সব কিছুতেই আপনার ‘কেন’ শব্দটা আমার খুব বিরক্ত লাগে। সময় হবে কি না শুধু সেটুকুই জানতে চেয়েছিলাম।
– না মানে, কাজের যা অবস্থা…
– থাক। ব্যস্ত মানুষ আপনি, কাজই করুন। রাখছি।
রুবিনার গলায় এবার স্পষ্ট অভিমান। ফোনটা কেটে দেওয়ার আগেই আমি বলে উঠলাম- এই যে মেডাম, শুনুন! রাগ করলেন নাকি?
– রাগ কেন করব? সময় যখন নেই…
– আচ্ছা বলুন তো, কী বলতে চেয়েছিলেন?
ওপাশ থেকে রুবিনা একটু সময় নিল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল- খুব ইচ্ছা করছিল, আজ দু’জনে কোথাও বসে একসাথে লাঞ্চ করব।
– হঠাৎ এই ইচ্ছা? অন্য কোনো দিন হলে হতো না?
কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে রুবিনা মুখ খুলল- “ইচ্ছেটা আজই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কে জানে, অন্য কোনোদিন হয়তো এই ইচ্ছের ডালপালাগুলো অকালেই শুকিয়ে যাবে।”
রুবিনার সাথে আমার আত্মার কোনো আত্মীয়তা নেই, অথচ তাঁর অদ্ভুত সব আবদার আমি অবলীলায় মেনে নিই। কাজ আর ব্যস্ততাকে একপাশে সরিয়ে রেখে সেদিনও তাঁর পাশে দাঁড়ালাম।
রুবিনা যখন এলো, নীল শাড়ির স্নিগ্ধতায় তাঁকে শরতের আকাশের মতো শান্ত দেখাচ্ছিল। আমরা যখন হাঁটছিলাম, ভিড়ের মাঝে তাঁর নরম হাতের স্পর্শে মনে হলো পৃথিবীর সব ব্যস্ততা বুঝি স্থির হয়ে গেছে।
আমরা কোনো রোমাঞ্চকর গন্তব্যে যাচ্ছিলাম না, যাচ্ছিলাম সাধারণ এক রেস্তোরাঁয়। তবে সেখানে খাবারের চেয়েও বেশি জরুরি ছিল আমাদের নিভৃত কিছু মুহূর্ত। রেস্তোরাঁর কোণে বসে আমরা যখন লাঞ্চ শেষ করলাম, রুবিনা হঠাৎ খুব শান্ত হয়ে গেল। তাঁর সেই নীল শাড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, শরতের আকাশটা যেন ধীরে ধীরে গোধূলির রঙে মিশে যাচ্ছে।”
আমি বিল মেটানোর জন্য মানিব্যাগ বের করতেই রুবিনা আমার হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। নিচু স্বরে বলল, “আজকের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমার এই শুকনো ডালপালায় তুমি আজ অন্তত কিছুটা সজীবতা ফিরিয়ে দিলে।”
আমি হাসলাম। বললাম, “পাগলামি ছাড়ো তো! চলো, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে ফিরব। অনেক কাজ বাকি।”
রুবিনা মাথা নাড়ল। “না, আজ আমি একাই ফিরব। আপনি আপনার কাজে যান।”
ভিড়ের মাঝে রুবিনাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আমি আবার অফিসের যান্ত্রিকতায় ডুবে গেলাম। কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল ফাইল আর এসির যান্ত্রিক গুঞ্জনে। ঠিক সন্ধ্যায় যখন অবসাদ জেঁকে বসছে, তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল। প্রত্যাশিত রুবিনার বদলে ভেসে উঠল একটা অপরিচিত নাম্বার।
ওপাশ থেকে এক গম্ভীর পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল, “হ্যালো, আপনি কি মি. সুমিত?”
– “হ্যাঁ, বলছি। আপনি?”
– “আমি সিটি হসপিটাল থেকে বলছি। আজ দুপুরে এক মহিলাকে এখানে আনা হয়েছিল, তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে আপনার ভিজিটিং কার্ড আর একটা চিরকুট পাওয়া গেছে। রুবিনা পারভীন… আপনি কি তাঁকে চেনেন?”
বুকের ভেতরটা হঠাৎ হিম হয়ে এলো। “চিনি মানে? আজ দুপুরেই তো আমরা…..। সরি, কী হয়েছে তাঁর?”
ওপাশ থেকে একটু নীরবতা। তারপর লোকটা নিচু স্বরে বলল, “দুপুর আড়াইটার দিকে উনি মারা গেছেন। দীর্ঘদিনের ক্রনিক ডিপ্রেশন আর হার্টের জটিলতা ছিল তাঁর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর হাতের মুঠোয় একটা চিরকুট ছিল। তাতে লেখা ছিল- ‘আজকের দুপুরটা আমার পাওনা ছিল না, তবুও আদায় করে নিলাম। এবার ডালপালাগুলো শুকিয়ে গেলেও কোনো দুঃখ নেই।'”
আমি স্তব্ধ হয়ে জানালার ওপাশে তাকালাম। শ্রাবণের অঝোর ধারায় শহরটা তখন ঝাপসা হয়ে এসেছে। অফিসের নিচে ব্যস্ত শহরটা বরাবরের মতোই যান্ত্রিক; অথচ আমার হাতের তালুতে এখনো লেগে আছে সেই নরম স্পর্শের রেশ- যা কয়েক ঘণ্টা আগে এক ‘অসময়ের আবদারে’ ধরা দিয়েও চিরতরে হারিয়ে গেল।”
“খুব সাধারণ একটা লাঞ্চ ভেবেছিলাম সেটাকে। কিন্তু জানতাম না, নিয়তি ততক্ষণে আমাদের শেষবারের মতো টেবিলে বসিয়ে দিয়েছে। এক জনমের বিচ্ছেদ যে সেই খাবারের থালাতেই অপেক্ষা করছিল, তা বোঝার সাধ্য আমার ছিল না।”
১৪এপ্রিল ২০২৬ইং
Subash Sarbabiddya

Comment
