মানবজীবনের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রভাবশালী ধারণা সামনে আসে—শৈশব। এই সময়টিকে কেন্দ্র করেই বহু মনোবিজ্ঞানী মানুষের চরিত্র, আচরণ ও পরিচয়ের ভিত্তি নির্ধারণ করেছেন। B. F. Skinner-এর উক্তি—“Give me a child and I’ll shape him into anything.”—এই ধারণাটিকে এক তীব্র ও সরল ভাষায় প্রকাশ করে। এখানে “shape” শব্দটি কেবল বাহ্যিক গঠনের ইঙ্গিত দেয় না; বরং এটি আচরণ, মানসিকতা, অভ্যাস, মূল্যবোধ এবং সামাজিক ভূমিকার গভীর নির্মাণপ্রক্রিয়াকে বোঝায়।
স্কিনারের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত আচরণবাদ (behaviorism) তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই তত্ত্বে মানুষের অভ্যন্তরীণ চিন্তা বা অনুভূতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বাহ্যিক আচরণ এবং সেই আচরণের পেছনে থাকা পরিবেশগত প্রভাবকে। তাঁর মতে, মানুষ জন্মগতভাবে নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র বা প্রবণতা নিয়ে আসে না, বরং পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট আচরণগত কাঠামো তৈরি করে। শিশুকে একটি খালি ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যেখানে পরিবেশই রঙ ও রেখা নির্ধারণ করে।
এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে “conditioning” বা শর্তায়ন। স্কিনার বিশেষভাবে “operant conditioning” ধারণাটি বিকশিত করেন, যেখানে আচরণকে পুরস্কার বা শাস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। একটি শিশু যদি কোনো কাজ করে এবং তার জন্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়, তবে সেই আচরণটি পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা বাড়ে। বিপরীতে, নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আচরণের পুনরাবৃত্তিকে কমিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে একটি শিশুর অভ্যাস, পছন্দ এবং এমনকি তার চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করে।
শৈশবের এই নির্মাণপ্রক্রিয়ায় পরিবার একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। একটি শিশু প্রথমে তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই ভাষা, আচরণ এবং সামাজিক নিয়ম শিখে। পরিবারের পরিবেশে ব্যবহৃত শব্দ, আবেগ প্রকাশের ধরন, সমস্যা মোকাবিলার কৌশল—সবকিছুই শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে। একইভাবে, বিদ্যালয় এবং বৃহত্তর সমাজও শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষকদের আচরণ, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক, এবং সামাজিক প্রত্যাশা—এই সমস্ত উপাদান মিলেই একটি শিশুর পরিচয় গঠনে অবদান রাখে।
স্কিনারের উক্তিতে একটি শক্তিশালী বার্তা রয়েছে—মানুষের আচরণ পূর্বনির্ধারিত নয়; বরং এটি গঠিত হয়। এই ধারণা মানব স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্রতার প্রশ্নও উত্থাপন করে। যদি একজন মানুষ সম্পূর্ণভাবে পরিবেশের দ্বারা গঠিত হয়, তবে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা স্বাধীনতার ভূমিকা কোথায়? এই প্রশ্নটি মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারার মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আচরণবাদ যেখানে পরিবেশকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়, সেখানে মানবতাবাদী (humanistic) মনোবিজ্ঞান ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য এবং অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনার উপর জোর দেয়।
তবে স্কিনারের তত্ত্বকে শুধুমাত্র একটি সীমাবদ্ধ কাঠামো হিসেবে দেখা হয় না। এটি বাস্তব জীবনের বহু ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য। শিক্ষাব্যবস্থায়, উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শেখার প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে পুরস্কারভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। একইভাবে, কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনা ব্যবস্থাও এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এমনকি আধুনিক প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যবহারকারীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে এই নীতিগুলির প্রয়োগ দেখা যায়।
শিশুর বিকাশে ভাষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু তার চারপাশের ভাষা শুনে এবং অনুকরণ করে শিখে। এই প্রক্রিয়াটি কেবল শব্দ শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি চিন্তাভাবনার কাঠামোও নির্ধারণ করে। ভাষার মাধ্যমে একটি শিশু তার অভিজ্ঞতাকে অর্থ দেয় এবং বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করে। ফলে, ভাষা ও পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাব একটি শিশুর মানসিক বিকাশে গভীর ছাপ ফেলে।
সামাজিক মূল্যবোধও শিশুর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি সমাজে যে আচরণকে গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা শিশুর মধ্যে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে সামাজিকীকরণ বলা হয়। একটি শিশু তার চারপাশের মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে। এই মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াই তার সামাজিক পরিচয় গঠনের ভিত্তি তৈরি করে।
স্কিনারের উক্তিতে একটি প্রকারের নিয়ন্ত্রণের ধারণা নিহিত রয়েছে। এখানে “shape” শব্দটি একটি পরিকল্পিত নির্মাণের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী শিশুকে গড়ে তোলা হয়। এই ধারণা শিক্ষা, রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মধ্যে নির্দিষ্ট মূল্যবোধ এবং আচরণ গড়ে তুলতে বিভিন্ন নীতি ও প্রোগ্রাম গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়াটি একধরনের সামাজিক শর্তায়ন হিসেবে কাজ করে।
তবে এই ধারণার মধ্যে একটি জটিলতা রয়েছে। একটি শিশুকে “anything” বা “যেকোনো কিছু” বানানোর ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জেনেটিক বা বংশগত প্রভাবও মানুষের আচরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন শিশুর স্বভাব, বুদ্ধিমত্তা এবং কিছু মৌলিক প্রবণতা জন্মগতভাবেই নির্ধারিত হতে পারে। ফলে, পরিবেশ এবং বংশগতির মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক কাজ করে, যা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে।
এই প্রসঙ্গে আধুনিক মনোবিজ্ঞান একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। এখানে মানুষকে একটি জটিল সত্তা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে বংশগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত প্রভাব এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজ করে। স্কিনারের তত্ত্ব এই বৃহত্তর কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা মানুষের আচরণ বোঝার একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ প্রদান করে।
শৈশবের অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। একটি শিশু যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তা তার ভবিষ্যৎ আচরণ, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এই প্রভাব কখনো সরাসরি দৃশ্যমান হয়, আবার কখনো তা অবচেতনে কাজ করে। একটি ইতিবাচক পরিবেশ একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক দক্ষতা উন্নত করতে পারে, যেখানে নেতিবাচক পরিবেশ তার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
স্কিনারের উক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্নও উত্থাপন করে—মানুষ কি তার পরিবেশের পণ্য, নাকি সে নিজেই তার পরিবেশকে পরিবর্তন করতে সক্ষম? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। বাস্তবতা হলো, মানুষ তার পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু একই সঙ্গে সে তার অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই পারস্পরিক সম্পর্কই মানবজীবনের জটিলতাকে নির্দেশ করে।
সমাজে বিভিন্ন পেশা এবং ভূমিকার দিকে তাকালে এই ধারণার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। একজন শিল্পী, বিজ্ঞানী বা নেতা—প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট গঠনপ্রক্রিয়া, যা তাদের শৈশব এবং পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই গঠনপ্রক্রিয়া কখনো সচেতনভাবে পরিচালিত হয়, আবার কখনো তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে।
স্কিনারের উক্তি মানবজীবনের একটি মৌলিক সত্যকে তুলে ধরে—মানুষ একটি নির্মাণশীল সত্তা। তার পরিচয় স্থির নয়; বরং এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং গঠিত হয়। এই গঠনপ্রক্রিয়ায় শৈশব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যেখানে পরিবেশের প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়।
এই আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, “Give me a child and I’ll shape him into anything” উক্তিটি কেবল একটি তত্ত্ব নয়; বরং এটি মানবজীবনের গঠনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি গভীর উপলব্ধি। এটি আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কিভাবে মানুষকে দেখি এবং বুঝি? একটি স্থির সত্তা হিসেবে, নাকি একটি পরিবর্তনশীল এবং গঠিত সত্তা হিসেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে আমরা মানবজীবনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করি।
লেখক – মাধব রায়

