মনোবিজ্ঞান আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। স্ট্রেস কমানোর অ্যাপ, স্কুলে কাউন্সেলিং, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘মন’ বোঝার চেষ্টা—সবখানেই এর ছোঁয়া। কিন্তু ভাবুন তো, এই বিজ্ঞানের শুরু কোথায়? কীভাবে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিকদের ‘আত্মা’ নিয়ে ভাবনা আজকের ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় পরিণত হলো? ১৯২৯ সালে প্রকাশিত একটি বই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এসেছিল—ওয়াল্টার বাওয়ার্স পিলসবারির ‘The History of Psychology’ (দ্য হিস্ট্রি অফ সাইকোলজি)। এটি ছিল মনোবিজ্ঞানের প্রথম জনপ্রিয় এবং সত্যিকারের সুগঠিত গ্রন্থ। ৩৩৬ পৃষ্ঠার এই বই পাঠককে ২৫০০ বছরের যাত্রায় নিয়ে যায়—প্লেটো-অ্যারিস্টটল থেকে ফ্রয়েড, ওয়াটসন ও গেস্টাল্ট পর্যন্ত।
আজকের যুগে যখন নিউরোসায়েন্স, কগনিটিভ সায়েন্স ও এআই দ্রুত এগোচ্ছে, তখন এই বই পড়লে মনে হয়—মনোবিজ্ঞান কোনো আকস্মিক আবিষ্কার নয়, মানবজাতির দীর্ঘ চিন্তার ফসল। চলুন, এই বইটির মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানের আকর্ষণীয়, কখনো রহস্যময় ইতিহাসে ডুব দেই।
লেখক: ওয়াল্টার বাওয়ার্স পিলসবারি—একজন ‘প্রথম প্রজন্মের’ মনোবিজ্ঞানী
১৮৭২ সালের ২১ জুলাই আইওয়া, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেন ওয়াল্টার বাওয়ার্স পিলসবারি। তিনি ছিলেন আমেরিকায় প্রথম প্রজন্মের মনোবিজ্ঞানীদের একজন যিনি পুরোপুরি দেশের ভিতরে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পেন কলেজে দু’বছর পড়ার পর মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং সেখানেই দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন।
তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল অ্যাটেনশন (মনোযোগ)। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত ‘Attention’ বইটি এখনো ক্লাসিক। তিনি ‘The Essentials of Psychology’ (১৯১১) লিখে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ পাঠ্যপুস্তক তৈরি করেন। ১৮৯৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত—প্রায় ৬৪ বছর—তিনি American Journal of Psychology-এর সহযোগী সম্পাদক ছিলেন।
কেন তিনি ইতিহাস লিখতে বসলেন? ১৯২০-এর দশকে মনোবিজ্ঞান বিভিন্ন ‘স্কুলে’ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল—স্ট্রাকচারালিস্ট, ফাংশনালিস্ট, বিহেভিয়ারিস্ট, সাইকোঅ্যানালিস্ট। পিলসবারি অনুভব করেছিলেন, নতুন প্রজন্মকে শিকড় দেখানো দরকার। তিনি চেয়েছিলেন সাধারণ পাঠকও বুঝুক—আজকের তত্ত্বগুলো আকাশ থেকে পড়েনি। ১৯২৯ সালে W.W. Norton প্রকাশ করে এই বই। মূল ব্লার্বে বলা হয়েছিল: “এটি মনোবিজ্ঞানের প্রথম জনপ্রিয় ইতিহাস… সাধারণ পাঠকের জন্য সঠিক বিবরণ।”
১৯২৯ সালের প্রেক্ষাপট: মনোবিজ্ঞানের ‘কৈশোর’
১৯২৯ সাল—বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার বছর। কিন্তু মনোবিজ্ঞানে উত্থান চলছিল। ১৮৭৯ সালে ভিলহেল্ম ভুন্ডট জার্মানিতে প্রথম সাইকোলজি ল্যাব খোলেন। তারপর মাত্র ৫০ বছরে বিজ্ঞানটি দর্শন থেকে বেরিয়ে এসেছে।
জন ওয়াটসনের বিহেভিয়ারিজম (১৯১৩) বলছে—মন নয়, আচরণই আসল।
সিগমুন্ড ফ্রয়েডের অবচেতন তত্ত্ব জনপ্রিয় হচ্ছে।
জার্মানিতে গেস্টাল্ট স্কুল নতুন ধারা তৈরি করছে—“সমগ্র অংশের যোগফলের চেয়ে বড়”।
আমেরিকায় ফাংশনালিজম (উইলিয়াম জেমস, জন ডিউই) মনের ‘কাজ’ বোঝার চেষ্টা করছে।
এই বিভক্তির মধ্যে পিলসবারি একটি সেতু তৈরি করলেন। তাঁর বই দেখায়—প্রতিটি স্কুল আগের চিন্তার ধারাবাহিকতা।
বইটির সুগঠিত কাঠামো: সময়ের স্রোতে যাত্রা
পিলসবারি বইটিকে কালানুক্রমিক ও বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজিয়েছেন। ১৮টি অধ্যায়—প্রাচীন থেকে আধুনিক। প্রতিটি অধ্যায় সহজ ভাষায় লেখা, উদাহরণসহ। চলুন সংক্ষেপে দেখি (বিস্তারিত আলোচনা সহ)।
অধ্যায় ১-২: প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় গ্রিক মনোবিজ্ঞান
প্লেটো (খ্রি.পূ. ৪২৭-৩৪৭) মনকে রথের সারথি বলেছেন—যুক্তি ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। অ্যারিস্টটল (খ্রি.পূ. ৩৮৪-৩২২) বলেছেন ‘সাইকি’ (আত্মা) শরীরের রূপ—জীবন্ত জিনিসের সারাংশ। হিপোক্রেটিস (খ্রি.পূ. ৪৬০-৩৭০) চারটি হিউমার (রক্ত, কফ, পিত্ত, কালো পিত্ত) দিয়ে মেজাজ ব্যাখ্যা করেন—আজকের ‘বিগ ফাইভ’ পার্সোনালিটি তত্ত্বের আদি রূপ! গ্যালেন (১৩০-২০০) এটিকে আরও বিস্তারিত করেন। মধ্যযুগে চার্চের প্রভাবে আত্মা ‘অমর’ বলে ঘোষিত হয়।
কৌতূহল জাগানো প্রশ্ন: আজকের ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটির চিকিৎসায় যে ‘হিউমারাল’ ভারসাম্যের কথা বলা হয়, তার শুরু কি ২৫০০ বছর আগে?
অধ্যায় ৩-৮: আধুনিক যুগের সূচনা
রেনেসাঁর পর ডেকার্ত (১৫৯৬-১৬৫০) বললেন—মন ও দেহ দুটি আলাদা সত্তা (দ্বৈতবাদ)। কিন্তু মিলন ঘটে পাইনিয়াল গ্রন্থিতে! (আজকের নিউরোসায়েন্স বলে—এটি মেলাটোনিন তৈরি করে, ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে।) স্পিনোজা মন-দেহকে সমান্তরাল বললেন।
ইংল্যান্ডে জন লক (১৬৩২-১৭০৪) ‘ট্যাবুলা রাসা’—মন জন্মের সময় ফাঁকা স্লেট, অভিজ্ঞতায় ভরে ওঠে। বার্কলে বললেন—বস্তু শুধু ধারণা। হিউম অ্যাসোসিয়েশনিজম দিলেন—ধারণা যুক্ত হয় অভ্যাসে। জার্মানিতে কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) বললেন—কিছু জ্ঞান জন্মগত (a priori)।
অধ্যায় ৯-১০: পরীক্ষামূলক মনোবিজ্ঞানের জন্ম
জোহানেস মুলার (১৮০১-১৮৫৮) ‘স্পেসিফিক এনার্জি অফ নার্ভস’—প্রতিটি স্নায়ু নির্দিষ্ট অনুভূতি তৈরি করে। গুস্তাভ ফেখনার (১৮০১-১৮৮৭) সূর্যের দিকে তাকিয়ে চোখের ক্ষতি করে মন-দেহ সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তিনি গণিত দিয়ে দেখালেন—অনুভূতির তীব্রতা = উদ্দীপকের লগারিদম (Weber-Fechner Law)।
ভিলহেল্ম ভুন্ডট (১৮৩২-১৯২০) ১৮৭৯ সালে লাইপজিগে প্রথম ল্যাব খোলেন। তাঁর স্ট্রাকচারালিজম—মনকে সাধারণ উপাদানে ভাঙা (যেমন রসায়নে অণু)। কিন্তু সমালোচকরা বললেন—অন্তর্দর্শন (introspection) বিজ্ঞানসম্মত নয়।
অধ্যায় ১১-১৪: ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিশ শতাব্দীর শুরু
হার্বার্ট স্পেন্সার, আলেকজান্ডার বেইন—বিবর্তন তত্ত্ব মনোবিজ্ঞানে আনে। চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২) ‘The Expression of the Emotions’ লিখে দেখান—আবেগ বিবর্তিত। ফ্রান্সিস গ্যালটন (১৮২২-১৯১১) পরিসংখ্যান ও ইউজেনিক্স নিয়ে আসেন (আজকের জেনেটিক্সের আদি, কিন্তু বিতর্কিত)।
জার্মানিতে ফ্রান্স ব্রেন্টানো, হেরমান এবিংহাউস (স্মৃতি পরীক্ষা), কার্ল স্টাম্ফ। ফ্রান্সে জাঁ-মার্টিন শারকো হিপনোসিস দিয়ে হিস্টিরিয়া চিকিৎসা করেন—ফ্রয়েড এখান থেকেই অনুপ্রাণিত। আমেরিকায় উইলিয়াম জেমস ‘Principles of Psychology’ (১৮৯০) লিখে ফাংশনালিজমের ভিত্তি দেন।
অধ্যায় ১৫-১৮: অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞান ও আধুনিক স্কুল
অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞানের উত্থান—মেসমারিজম থেকে ফ্রয়েডের ‘The Interpretation of Dreams’ (১৯০০)। অবচেতন, ইড, ইগো, সুপারইগো—মনের ‘অন্ধকার’ দিক উন্মোচিত। আলফ্রেড অ্যাডলার ‘ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স’ দেন।
আধুনিক স্কুল:
স্ট্রাকচারালিজম (এডওয়ার্ড টিচেনার)—মনের উপাদান বিশ্লেষণ।
ফাংশনালিজম—মন কী করে, কেন করে?
বিহেভিয়ারিজম (জন ওয়াটসন)—“মন দেখা যায় না, আচরণ দেখা যায়।” লিটল অ্যালবার্ট এক্সপেরিমেন্ট—শিশুকে ভয় শেখানো (আজকের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন)।
গেস্টাল্ট (ম্যাক্স ওয়ার্টহাইমার)—আলোর বিন্দু দ্রুত জ্বালালে চলমান দেখি (phi phenomenon)। সমগ্রতার নিয়ম।
হর্মিক সাইকোলজি (উইলিয়াম ম্যাকডুগাল)—মনের উদ্দেশ্য ও ইনস্টিংক্ট আছে।
বইটির গুরুত্ব ও প্রভাব
পিলসবারির বই ১৯২৯ সালে এসে মনোবিজ্ঞানকে ‘বৈধ’ করে তোলে। এর আগে ইতিহাস ছিল দার্শনিকদের লেখায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। তিনি প্রথম সুসংহত, জনপ্রিয় আকারে তুলে ধরেন। সমালোচকরা বলেছিলেন—“খুব সুন্দর লেখা, সাধারণ পাঠকের জন্য আদর্শ।” একই বছর এডউইন জি. বোরিং ‘A History of Experimental Psychology’ লেখেন—যেটি আরও গভীর, কিন্তু কম জনপ্রিয়। পিলসবারির বই দুটোর মধ্যে সেতু হয়ে ওঠে।
আজকের দৃষ্টিতে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পুরনো মনে হতে পারে (যেমন গ্যালটনের ইউজেনিক্স বা কিছু লিঙ্গ-সম্পর্কিত মন্তব্য), কিন্তু সেটাই যুগের প্রতিফলন। বইটি ২০২০-এর দশকে Routledge থেকে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে—এখনো পাঠযোগ্য।
কেন এই বই আজও পড়া উচিত? কৌতূহলের শেষ নেই
পিলসবারি দেখিয়েছেন—মনোবিজ্ঞানের প্রতিটি ধাপে ‘বিপ্লব’ ঘটেছে, কিন্তু কোনোটাই সম্পূর্ণ নতুন নয়। প্রাচীন ‘আত্মা’ আজ ‘কনশাসনেস’ বা ‘কগনিশন’ হয়েছে। ফেখনার গণিত আজকের সাইকোফিজিক্স ও নিউরোইমেজিংয়ের ভিত্তি। ফ্রয়েডের অবচেতন আজকের ‘implicit bias’ গবেষণায় জীবিত।
আপনি কি জানেন? আজকের AI মডেলগুলো ‘attention mechanism’ ব্যবহার করে—যার শিকড় পিলসবারির অ্যাটেনশন গবেষণায়! বা গেস্টাল্টের ‘whole is greater than sum’ আজকের মেশিন লার্নিংয়ের ‘emergent properties’-এর সাথে মিলে যায়।
ইতিহাস জানা মানে ভবিষ্যৎ দেখা
১৯২৯ সালের পিলসবারির বই শুধু ইতিহাসের তালিকা নয়, একটি আকর্ষণীয় গল্প। এটি পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়: মন কী? যন্ত্র? গল্প? নাকি আরও কিছু? আজ যখন আমরা মস্তিষ্কের ৮৬ বিলিয়ন নিউরন নিয়ে গবেষণা করি, তখন পিলসবারি স্মরণ করিয়ে দেন—প্রতিটি আবিষ্কারের পেছনে হাজার বছরের চিন্তা আছে।
লেখক – মাধব রায়

