সভ্যতার আস্তাকুঁড়ে নারী ও এক পৈশাচিক অধ্যায়
কলমে: স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী
প্রবাদ আছে— “যা নেই ভারতে, তা-ই আছে মহাভারতে।” কিন্তু আজকের এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের দিকে তাকালে মনে হয় প্রবাদটি বোধহয় উল্টে গেছে। মহাকাব্যের সেই জটিলতা আর পাশবিকতাকেও আজ আমাদের এই তথাকথিত সভ্য সমাজ বহুগুণে ছাপিয়ে গেছে। মহাভারতেও বোধহয় এতটা বিষ ছিল না, যতটা বিষাক্ত বীভৎসতা আজ আমরা এই সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি। ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! সেই কুরুসভায় অন্তত একজন ‘কৃষ্ণ’ ছিলেন, যিনি দ্রৌপদীর আর্তনাদে সাড়া দিয়ে তাঁর সম্মান রক্ষা করেছিলেন। দ্রৌপদীর কাছে কৃষ্ণ ছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধু, তাঁর পরম নির্ভরতা। অথচ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটাই সবথেকে বড় আতঙ্কের নাম। আজ যাকে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ ভেবে ভরসা করে হাত বাড়ানো হয়, দেখা যায় সেই বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালেই ওত পেতে বসে আছে এক একটা ক্ষুধার্ত নেকড়ে। বিশ্বাসের সেই পবিত্র ঘর আজ লালসার বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।
ধিক্কার জানাই এই পচা-গলা সমাজকে, যেখানে বাসে-ট্রেনে প্রতিটি পদক্ষেপে একজন নারীকে লোলুপ দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তার চেয়েও বড় ঘৃণা জাগে তখন, যখন একদল তথাকথিত সমাজপতি অপরাধীকে আড়াল করতে লাঞ্ছিতার পোশাকের বিচার করতে বসেন। “মেয়েটির পোশাক ছোট ছিল,” “ওর ওড়না ঠিক ছিল না”— এই কদর্য যুক্তি যারা সাজান, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন— সেই পাঁচ বছরের শিশুটির কী পোশাকের দোষ ছিল? সে তো পৃথিবীর নোংরামি বোঝার আগেই রক্তাপ্লুত হয়ে গেল! এমনকি গর্ভবতী মা, যার জঠরে আগামীর প্রাণ, তাকেও যখন ধর্ষিতা হয়ে ভ্রূণসহ আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমরা এক পৈশাচিক নরকে বাস করছি।
যদি আজ সমাজের মানুষগুলো প্রকৃত মানুষ হতো, যদি তারা কামনার ঊর্ধ্বে উঠে শ্রদ্ধার চোখে তাকাতে জানত, তবে আজ কোনো বোনকে ঘর থেকে বেরোনোর আগে ভয়ে কুঁকড়ে যেতে হতো না; মেয়েরা মাথা উঁচু করে নির্ভয়ে বাঁচতে পারত। কিন্তু এই সমাজ আজ সেই নিরাপত্তার পরিবেশটুকুও বিষিয়ে দিয়েছে। তাই আজ আর মেয়েদের নরম স্বভাবের হলে চলবে না। আজকের দিনে কোনো কৃষ্ণ আসবে না; আজ প্রতিটি নারীকেই নিজের ভেতর ‘মা কালী’, ‘মা চণ্ডী’র সেই সংহারী রূপ জাগিয়ে তুলতে হবে। অন্যায়কে পিষে মারতে ধারণ করতে হবে রুদ্র রূপ। কারণ যে সমাজ নারীর নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে সমাজ শিশুর রক্তে রঞ্জিত হয়, সেই সমাজে টিকে থাকতে হলে কেবল করুণা নয়, খড়্গ হাতেই রুখে দাঁড়াতে হবে।

