এক দরিদ্র সন্ন্যাসী, যিনি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন এক বিশাল সাম্রাজ্য

এক দরিদ্র সন্ন্যাসী, যিনি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন এক বিশাল সাম্রাজ্য

১৫১৭ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন শরতের দিন। জার্মানির উইটেনবার্গ শহরের এক সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সন্ন্যাসী মার্টিন লুথার এমন এক পদক্ষেপ নিলেন, যা পরবর্তী কয়েকশ বছরের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। তখনকার সময়ে গির্জা ‘ইনডালজেন্স’ বা ‘পাপমুক্তি পত্র’ বিক্রি করত। বলা হতো, এই কাগজ কিনলে মৃত্যুর পর আত্মার শাস্তি কম হবে। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ৩৪ বছর বয়সী লুথার ৯৫টি যুক্তি বা প্রস্তাব তৈরি করেন। লোককথা অনুযায়ী, ১৫১৭ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি গির্জার দরজায় তাঁর সেই বিখ্যাত ‘৯৫ থিসিস’ লটকে দিয়েছিলেন।

যা শুরু হয়েছিল সাধারণ এক আলোচনা হিসেবে, তা শেষ পর্যন্ত এক বিশাল ধর্মীয় বিপ্লবে রূপ নেয়, যাকে আমরা আজ ‘প্রোটেস্ট্যান্ট রিফরমেশন’ বা ধর্মসংস্কার আন্দোলন বলে জানি। খনি শ্রমিকের পরিবারের এক সাধারণ সন্তান হয়েও লুথার সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন: রোমান ক্যাথলিক চার্চ এবং পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য।

লুথারের এই সাহসী পদক্ষেপ কেবল খ্রিস্টধর্মকে সংস্কার করেনি, বরং ইউরোপের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। তাঁর এই আন্দোলনের ফলেই:

সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা ও অধিকার পৌঁছাতে শুরু করে।

শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং বিভিন্ন দেশের নিজস্ব ভাষা (যেমন জার্মান, ইংরেজি) গুরুত্ব পেতে থাকে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং আধুনিক গণতন্ত্রের বীজ বপন হয়।

লুথার জন্মগতভাবে কোনো বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন চিন্তিত ও ধার্মিক মানুষ, যিনি মন থেকে ঈশ্বরকে খুঁজছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক সংকটই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের এক বিশাল পরিবর্তনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।

একদিকে ছিল তাঁর নিজের বিবেক ও ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান, আর অন্যদিকে ছিল সেই সময়ের নতুন প্রযুক্তি—ছাপাখানা। এই দুইয়ের জোরেই তিনি গির্জার শত বছরের একাধিপত্য ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন এবং বদলে দিয়েছিলেন বিশ্বাসের মানচিত্র। এটি কেবল ধর্মের লড়াই ছিল না, এটি ছিল ন্যায়ের জন্য এক সাধারণ মানুষের সাহসের গল্প।

মার্টিন লুথার ১৪৮৩ সালের ১০ নভেম্বর জার্মানির স্যাক্সনি অঞ্চলের আইসলেবেনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হ্যান্স এবং মা মার্গারেট লুথার ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী। তাঁর বাবা ছিলেন একজন তামা খনি শ্রমিক, যিনি কঠোর পরিশ্রমে কিছুটা সচ্ছলতা অর্জন করেছিলেন। বড় ছেলেকে নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল: মার্টিন আইন বিষয়ে পড়াশোনা করবেন এবং খনির বিপদজনক কাজ থেকে দূরে থাকবেন। শৈশবে ম্যানসফেল্ড, ম্যাগডেবার্গ এবং আইসেনাচে লাতিন ভাষায় ভালো শিক্ষা লাভের পর তিনি এরফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৫০২ সালে তিনি স্নাতক এবং ১৫০৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন, যেখানে তিনি মেধা তালিকায় প্রথম সারিতে ছিলেন।

কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। ১৫০৫ সালের জুলাই মাসে বাড়ি থেকে এরফুর্টে ফেরার পথে স্টোটার্নহাইমের কাছে এক ভয়াবহ বজ্রপাতের কবলে পড়েন লুথার। তাঁর খুব কাছেই বিদ্যুৎ চমকে উঠলে তিনি আতঙ্কিত হয়ে খনি শ্রমিকদের রক্ষাকর্তা ‘সেন্ট অ্যান’-এর কাছে প্রার্থনা করেন। তিনি মানত করেন যে, যদি তিনি বেঁচে ফেরেন তবে তিনি সন্ন্যাসী হবেন। বাবার প্রচণ্ড আপত্তি সত্ত্বেও—যিনি মনে করেছিলেন এটি হয়তো শয়তানের কোনো কারসাজি—লুথার এরফুর্টের কঠোর অগাস্টিনিয়ান মঠে যোগ দেন।

মঠের জীবন তাঁর ভেতরের অশান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিল। লুথার নিয়ম পালনে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন; ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের পাপ স্বীকার করা, উপবাস করা এবং প্রার্থনা করা—সবই তিনি নিষ্ঠার সাথে করতেন। তবুও তিনি মনের শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরবর্তীতে তিনি তাঁর এই আধ্যাত্মিক লড়াইকে ‘শয়তানের আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একটি প্রশ্ন তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াত: “কীভাবে আমি ঈশ্বরের করুণা লাভ করতে পারি?” তৎকালীন গির্জা শিক্ষা দিত যে, মুক্তি পেতে হলে বিশ্বাসের পাশাপাশি ভালো কাজ, ধর্মীয় আচার এবং সাধু-সন্তদের পুণ্য অর্জন করতে হবে। লুথারের কাছে এই ব্যবস্থাটি ছিল এক অন্তহীন দুশ্চিন্তার পাহাড়।

১৫০৭ সালে তিনি যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং পরে উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এরিস্টটল, বাইবেল এবং ধর্মতত্ত্ব পড়ানোর জন্য প্রেরিত হন। ১৫১০-১৫১১ সালের দিকে রোম ভ্রমণে গিয়ে গির্জার বিলাসিতা ও জাগতিক বিষয় দেখে তিনি আরও হতাশ হয়ে পড়েন। অবশেষে বাইবেলের সামগান এবং বিশেষ করে রোমানীয় ১:১৭ পদ—“ধার্মিক ব্যক্তি বিশ্বাসের মাধ্যমেই জীবন লাভ করবে”—পড়তে গিয়ে তিনি এক বৈপ্লবিক ধারণা খুঁজে পান। তিনি বুঝতে পারেন যে, মানুষের নিজস্ব প্রচেষ্টায় নয়, বরং শুধুমাত্র ঈশ্বরের অনুগ্রহে এবং ‘একমাত্র বিশ্বাসের’ (sola fide) মাধ্যমেই মানুষ মুক্তি লাভ করতে পারে।

এই বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল জোহান টেটজেল নামে একজন ধর্মযাজকের মাধ্যমে। তিনি জার্মানির স্যাক্সনির কাছাকাছি এলাকায় ‘ইনডালজেন্স’ বা ‘পাপমুক্তি পত্র’ বিক্রি করতেন। সেই সময় গির্জা প্রচার করত যে, এই পত্র কিনলে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এটি মূলত একটি ব্যবসায়িক ফন্দিতে পরিণত হয়েছিল। পোপ দশম লিও রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা তৈরির জন্য টাকা চেয়েছিলেন, আর আর্চবিশপ আলব্রেখ্ট তাঁর পদ কেনার জন্য নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণ শোধ করতে চেয়েছিলেন। টেটজেলের প্রচার ছিল নির্লজ্জ। তিনি বলতেন, “বাক্সে যখনই মুদ্রার শব্দ হবে, তখনই নরককুণ্ড (পুরগেটরি) থেকে আত্মা স্বর্গে যাবে।”

লুথার একজন ধর্মতত্ত্ববিদ হিসেবে এর ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি দেখলেন, সাধারণ মানুষ টাকা দিয়ে কাগজ কিনছে এই বিশ্বাসে যে—তারা ঈশ্বরের কৃপা কিনতে পারবে বা তাদের মৃত প্রিয়জনদের কষ্ট থেকে মুক্তি দেবে। ১৫১৭ সালের ৩১ অক্টোবর, তিনি আর্চবিশপ আলব্রেখ্টের কাছে একটি চিঠি পাঠান এবং সাথে বিখ্যাত ‘৯৫টি থিসিস’ (যুক্তি) যুক্ত করে দেন। তিনি খুব নম্রভাবে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানান এবং তর্কের আহ্বান করেন। লুথারের যুক্তি ছিল—পোপের কোনো ক্ষমতা নেই নরকের শাস্তি মাফ করার। তাঁর মতে, প্রকৃত অনুতাপ ভেতর থেকে আসে এবং গির্জার এই ‘পুণ্য বিক্রির ভাণ্ডার’ আসলে একটি বিপজ্জনক মিথ্যা গল্প।

লুথার তখন গির্জা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাননি। তিনি একজন অনুগত ক্যাথলিক হিসেবে ভেতর থেকে সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় নতুন আসা ছাপাখানার কল্যাণে তাঁর লাতিন ভাষায় লেখা যুক্তিগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জার্মান ভাষায় অনুদিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যা ছিল কেবল পণ্ডিতদের আলোচনার বিষয়, তা হয়ে উঠল সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের হাতিয়ার।

ওয়ার্মসের ধর্মসভা: “আমি এখানেই অটল” প্রথমে গির্জা বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি, কিন্তু পরে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ১৫১৮ থেকে ১৫২০ সালের মধ্যে বিভিন্ন বিতর্ক ও সভায় লুথার পোপের ভুল ধরতে থাকেন। তিনি সরাসরি দাবি করেন যে পোপ ভুল করতে পারেন। ১৫২০ সালে পোপ লুথারকে ধর্মচ্যুত করার হুমকি দিলে, লুথার জনসমক্ষে পোপের সেই আদেশনামা পুড়িয়ে ফেলেন।

১৫২১ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে ধর্মচ্যুত করা হয় এবং তরুণ সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সামনে ‘ডায়েট অফ ওয়ার্মস’ (এক বিশাল রাজসভা)-এ তলব করা হয়। ১৭-১৮ এপ্রিল লুথার যখন সম্রাট এবং গির্জার ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সামনে দাঁড়ালেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো—তিনি কি তাঁর লেখাগুলো প্রত্যাহার করবেন? লুথার উত্তরে সেই ঐতিহাসিক কথাগুলো বলেছিলেন:

“যদি না আমাকে পবিত্র শাস্ত্রের প্রমাণ বা স্পষ্ট যুক্তি দিয়ে ভুল প্রমাণ করা যায়, তবে আমি আমার বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ পোপ বা বড় বড় যাজক সভা প্রায়ই ভুল করেছে এবং নিজেদের কথায় নিজেরা ফেঁসে গেছে। আমি আমার উদ্ধৃত শাস্ত্রের ওপর অটল এবং আমার বিবেক ঈশ্বরের বাণীর কাছে বন্দি। আমি আমার কোনো কথা ফিরিয়ে নেব না, কারণ বিবেকের বিরুদ্ধে যাওয়া নিরাপদ বা সঠিক নয়। ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করুন। আমিন।”

তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি—”আমি এখানেই অটল, আমার আর কিছু করার নেই”—পরবর্তীতে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। এর ফলে সম্রাট তাঁকে ‘ধর্মদ্রোহী’ এবং ‘আইনবহির্ভূত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেন, যার অর্থ ছিল তাঁকে যে কেউ গ্রেফতার বা হত্যা করতে পারত।

ওয়ার্টবার্গ দুর্গে গোপন জীবন: সাধারণ মানুষের জন্য বাইবেল স্যাক্সনির শাসক ফ্রেডরিক দ্য ওয়াইজ প্রকাশ্যে সম্রাটের বিরোধিতা করতে পারেননি, কিন্তু তিনি লুথারকে রক্ষা করার জন্য তাঁকে ‘অপহরণ’ করার নাটক করেন এবং গোপন এক দুর্গে (ওয়ার্টবার্গ ক্যাসেল) লুকিয়ে রাখেন। সেখানে ছদ্মবেশে লুথার প্রায় এক বছর কাটান। এই সময়েই তিনি গ্রিক ভাষা থেকে নিউ টেস্টামেন্ট জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। মাত্র ১১ সপ্তাহে তিনি এই বিশাল কাজ সম্পন্ন করেন।

১৫৩৪ সালে তিনি পুরো বাইবেলের অনুবাদ শেষ করেন। এটি ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। শত শত বছর ধরে বাইবেল ছিল লাতিন ভাষায়, যা কেবল যাজক ও পণ্ডিতরা বুঝতেন। লুথারের অনুবাদ বাইবেলকে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দিল। এর ফলে জার্মান ভাষা যেমন সমৃদ্ধ হলো, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সাক্ষরতা বেড়ে গেল। মানুষ প্রথমবারের মতো সরাসরি ঈশ্বরের বাণী পড়ার সুযোগ পেল।

১৫২৫ সালে চারদিকে যখন কৃষক বিদ্রোহের ডামাডোল চলছে, তখন লুথার আরও একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ক্যাটরিনা ফন বোরা-কে বিয়ে করেন। ক্যাটরিনা ছিলেন একজন প্রাক্তন সন্ন্যাসিনী, যিনি লুথারের শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আরও কয়েকজনের সাথে মঠ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। ১৩ জুন যখন তাঁদের বিয়ে হয়, তখন লুথারের বয়স ৪১ আর ক্যাটরিনার ২৬। এই বিয়ে তৎকালীন সমাজে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সমালোচকদের চোখে একজন সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর বিয়ে ছিল এক আধ্যাত্মিক অপরাধ। অনেকে ক্যাটরিনাকে নিয়ে আজেবাজে কথা ছড়াতে লাগলেন, এমনকি কেউ কেউ ভবিষ্যৎবাণী করলেন যে এই দম্পতির ঘরে শয়তানের জন্ম হবে।

তবে বাস্তবে তাঁদের বৈবাহিক জীবন ছিল অত্যন্ত সুখী। তাঁদের ছয়টি সন্তান হয়েছিল। ক্যাটরিনা ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও কর্মঠ। তিনি বিশাল সংসার সামলানোর পাশাপাশি ছাত্র ও অতিথিদের দেখাশোনা করতেন, এমনকি বাগান ও গবাদি পশুর যত্নও নিতেন। লুথার তাঁকে ভালোবেসে ‘লর্ড কেটি’ বলে ডাকতেন। ক্যাটরিনা কেবল সংসারই সামলাতেন না, বরং লুথারের অসুস্থতায় সেবা করতেন এবং তাঁর সাথে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনাও করতেন। তাঁদের এই ঘরোয়া জীবন প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক পরিবারের একটি আদর্শ মডেলে পরিণত হয়—যেখানে যাজকরা অবিবাহিত থাকার বাধ্যবাধকতা ভেঙে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে শুরু করেন।

মূল ধর্মতত্ত্ব: পাঁচটি ‘সোলা’ (Sola) ও খ্রিস্টধর্মের নতুন রূপ লুথারের শিক্ষাগুলো প্রধানত কয়েকটি মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল, যা পরবর্তীতে ‘ফাইভ সোলা’ (Five Solas) নামে পরিচিতি পায়:

সোলা স্ক্রিপচারা (Sola Scriptura): একমাত্র পবিত্র ধর্মগ্রন্থই (বাইবেল) হলো চূড়ান্ত পথপ্রদর্শক; পোপ বা চার্চের প্রচলিত নিয়ম নয়।

সোলা ফিদে (Sola Fide): মুক্তি পাওয়া যায় কেবল অটল বিশ্বাসের মাধ্যমে।

সোলা গ্রাসিয়া (Sola Gratia): মুক্তি হলো ঈশ্বরের এক বিশেষ দান বা অনুগ্রহ, যা মানুষের কাজের দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়।

সোলাস ক্রিস্টাস (Solus Christus): ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে একমাত্র মাধ্যম হলেন যিশু খ্রিস্ট।

সোলি ডিও গ্লোরিয়া (Soli Deo Gloria): সমস্ত গৌরব ও প্রশংসা কেবল একমাত্র ঈশ্বরেরই প্রাপ্য।

লুথার গির্জার সাতটি আচারের বদলে কেবল দুটিকে (বাপ্তিস্ম ও প্রভুভোজ) গুরুত্ব দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে কোনো যাজক বা মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই, প্রতিটি বিশ্বাসী নিজেই একজন যাজকের সমান। তাঁর উদ্যোগে লাতিনের বদলে সাধারণ মানুষের ভাষায় প্রার্থনা শুরু হয়। তিনি নিজেই অনেক ধর্মীয় সংগীত বা স্তব রচনা করেন, যার মধ্যে ‘আ মাইটি ফোর্টেস ইজ আওয়ার গড’ (A Mighty Fortress Is Our God) অত্যন্ত জনপ্রিয়।

এই নতুন চিন্তাধারা মধ্যযুগের গির্জাকেন্দ্রিক জটিল প্রথাগুলোকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিটি মানুষের সাথে ঈশ্বরের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে দেয়। এর ফলে ধর্ম হয়ে ওঠে আরও ব্যক্তিগত এবং সহজলভ্য।

লুথার জার্মানির সেইসব রাজপুত্র বা শাসকদের সমর্থন ও সুরক্ষা পেয়েছিলেন, যারা পোপের কর এবং সাম্রাজ্যের অত্যধিক হস্তক্ষেপ অপছন্দ করতেন। তাঁর এই আন্দোলন রাজনীতির সাথে মিশে গিয়েছিল; শাসকরা এটিকে চার্চের জমি দখল এবং নিজেদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। ১৫২৪-১৫২৫ সালের ‘কৃষক বিদ্রোহ’ লুথারকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয়। শুরুতে কৃষকদের অভিযোগের প্রতি সহমর্মিতা থাকলেও, বিদ্রোহীরা যখন সহিংস হয়ে ওঠে, তখন লুথার কঠোরভাবে তাদের নিন্দা করেন। তিনি শাসকদের এই বিদ্রোহ দমনের আহ্বান জানান। এই সংঘাতে হাজার হাজার কৃষক মারা যায়, যার ফলে কট্টরপন্থী বিপ্লবীদের কাছে লুথারের জনপ্রিয়তা অনেকটা কমে গিয়েছিল।

একই সময়ে উলরিচ জুইংলি এবং জন ক্যালভিনের মতো আরও কয়েকজন সংস্কারকের আবির্ভাব ঘটে, যার ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ আরও বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। লুথারপন্থীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কিছুটা রক্ষণশীল ছিলেন, অন্যদিকে ক্যালভিনপন্থীরা ছিলেন আরও কঠোর। আবার ‘অ্যানাব্যাপ্টিস্ট’ নামে অন্য একটি দল শিশুদের বাপ্তিস্ম দেওয়ার নিয়মটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে।

এই ধর্মীয় মতপার্থক্য মাঝেমধ্যেই সংঘাতের রূপ নিত। প্রোটেস্ট্যান্টরা নিজেদের রক্ষার জন্য ‘স্মালকালডিক লীগ’ গঠন করে। অবশেষে ১৫৫৫ সালে ‘অগসবার্গ শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে একটি নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়—”রাজা যে ধর্মের, প্রজাও সেই ধর্মের হবে।” অর্থাৎ রাজপুত্ররা ঠিক করবেন তাঁদের এলাকায় লুথারবাদ চলবে নাকি ক্যাথলিকবাদ। এটি ছিল ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক। তবে এই চুক্তিতে ক্যালভিনবাদী বা অ্যানাব্যাপ্টিস্টদের কোনো স্বীকৃতি ছিল না, যা পরবর্তীতে ভয়াবহ ‘থার্টি ইয়ার্স ওয়ার’ বা ত্রিশ বছরের যুদ্ধের (১৬১৮-১৬৪৮) বীজ বপন করেছিল।

ধর্মের ওপর: পশ্চিমা খ্রিস্টধর্ম স্থায়ীভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ ব্যক্তিগত বিশ্বাস, বাইবেল পাঠ এবং প্রার্থনায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ক্যাথলিক চার্চও নিজেদের সংস্কার (কাউন্টার-রিফরমেশন) শুরু করে, যেখানে তারা নিজেদের ভেতরের দুর্নীতি দূর করে এবং মূল নীতিগুলোকে আরও শক্তিশালী করে। এর ফলে খ্রিস্টধর্ম আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

রাজনীতি ও সমাজের ওপর: পোপের রাজনৈতিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। আঞ্চলিক রাজা এবং উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একজন ব্যক্তি যে নিজের বিবেক এবং পবিত্র শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে দাঁড়াতে পারে—এই ধারণাটি পরবর্তীতে মানুষের অধিকার এবং সীমিত শাসনব্যবস্থার ধারণাকে প্রভাবিত করেছিল। দীর্ঘকাল ধর্মীয় যুদ্ধের পর সমাজ শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় বহুত্ববাদকে মেনে নিতে বাধ্য হয়।

সংস্কৃতি ও শিক্ষার ওপর: লুথার ছেলে ও মেয়ে—উভয়ের জন্যই স্কুলের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন যাতে তারা নিজেরাই বাইবেল পড়তে পারে। এর ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট অঞ্চলগুলোতে শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাঁর অনূদিত জার্মান বাইবেল সেদেশের ভাষা ও সাহিত্যকে এক নতুন রূপ দেয়। সাধারণ মানুষের ভাষায় গান ও প্রার্থনা ধর্মকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার পরবর্তীতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রোটেস্ট্যান্ট মূল্যবোধ (যেমন—শৃঙ্খলা ও মিতব্যয়িতা) আধুনিক পুঁজিবাদের বিকাশে সহায়তা করেছে।

ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায়: প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চেয়ে ব্যক্তিগত বিবেক এবং শাস্ত্রকে উপরে স্থান দিয়ে লুথার পরোক্ষভাবে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, জ্ঞানদীপ্তি (এনলাইটেনমেন্ট) এবং চিন্তার স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করেছিলেন। সত্যের ওপর একজনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার ফলে অন্যান্য বিষয়েও প্রশ্ন তোলা সহজ হয়ে যায়। ‘ওয়ার্মস’-এ তাঁর সেই অবস্থান আজও নীতিগত সাহসের প্রতীক হয়ে আছে।

তবে লুথার ছিলেন তাঁর সময়ের মানুষ, আধুনিক যুগের উদারপন্থী কোনো নেতা নন। জীবনের শেষ দিকে ইহুদিদের নিয়ে তাঁর লেখাগুলো ছিল অত্যন্ত রূঢ় এবং বিদ্বেষপূর্ণ, যা আজ সর্বজনীনভাবে নিন্দিত। এছাড়া কৃষক বিদ্রোহের প্রতি তাঁর নিষ্ঠুর প্রতিক্রিয়াও তাঁর চরিত্রের একটি নেতিবাচক দিক। ইতিহাস তাঁকে একজন বীর এবং একই সাথে একজন ত্রুটিপূর্ণ মানুষ হিসেবেই বিচার করে।

উপসংহার: বিবেকের অবিনাশী শক্তি ১৫৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মার্টিন লুথার তাঁর জন্মস্থান আইসলেবেনে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একজন ভীতু সন্ন্যাসী থেকে এমন এক মহীরুহে পরিণত হয়েছিলেন, যিনি পোপ এবং সম্রাট—উভয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস রাখতেন। তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম তৈরি বা ইউরোপকে বিভক্ত করতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন কেবল একজন দয়ালু ঈশ্বর এবং একটি কলঙ্কমুক্ত গির্জা। আর সেই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে তিনি এমন এক শক্তির সূচনা করেন যা সবকিছু বদলে দেয়।

এক দরিদ্র সন্ন্যাসী, যিনি একা এক বিশাল সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন—তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে আদর্শের ক্ষমতা অপরিসীম। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে দেখানো সাহস পাহাড়কেও নাড়িয়ে দিতে পারে এবং সত্যের শক্তিতে বলীয়ান একজন সাধারণ মানুষও সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাঁর সংস্কার আন্দোলন হয়তো নিখুঁত ছিল না, ছিল রক্তক্ষয়ী ও অসম্পূর্ণ; কিন্তু এটি ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর নতুন পথ এবং মানুষের স্বাধীনতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিল।

পাঁচশ বছর পরেও তাঁর ঐতিহ্য বেঁচে আছে—নিজ নিজ ভাষায় পড়া প্রতিটি বাইবেলে, প্রতিটি চার্চের সমবেত সংগীতে এবং মানুষের এই বিশ্বাসে যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তির বিবেক এবং পবিত্র বাণী অনেক উপরে। উইটেনবার্গের সেই সন্ন্যাসী কেবল প্রতিবাদই করেননি, তিনি আধুনিক বিশ্বের জন্ম দিতেও সাহায্য করেছিলেন।

Comment