‘শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের’ সেই ঘোর অন্ধকার দিনগুলোতে যখন ইংল্যান্ড এবং তাদের মিত্র বারগুন্ডিয়ানরা পুরো ফ্রান্সকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক নিরক্ষর কিশোরী এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর সম্বল ছিল অটল বিশ্বাস, অসীম সাহস আর কিছু অলৌকিক কণ্ঠস্বর যা কেবল তিনিই শুনতে পেতেন। জোয়ান অফ আর্ক—যাঁকে ফরাসিরা ‘জান দার্ক’ বলে চেনেন—তিনি কেবল একটি সেনাবাহিনীকেই অনুপ্রাণিত করেননি, বরং ফরাসিদের মনে এমন এক জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন যা শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের ফ্রান্স থেকে বিতাড়িত করতে এবং সপ্তম চার্লসের সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করেছিল। তাঁর কাহিনী ইতিহাসের পাতায় ভাগ্য, স্পর্ধা এবং অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের এক বিস্ময়কর উপাখ্যান হয়ে রয়েছে।
যে পৃথিবীতে তাঁর জন্ম: ধ্বংসস্তূপের এক রাজত্ব ১৪১২ সালের দিকে উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের দঁরেমি (Domrémy) গ্রামে যখন জোয়ানের জন্ম হয়, তখন শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছিল। ফরাসি সিংহাসন নিয়ে শুরু হওয়া এই বিরোধ তখন এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইংরেজদের শক্তিশালী ধনুর্বিদরা ফরাসি বীরদের পরাজিত করছিল। ফরাসি রাজা ষষ্ঠ চার্লস মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। ১৪২০ সালের এক চুক্তিতে ফরাসি রাজপুত্র (ডফিন) চার্লসকে সরিয়ে ইংরেজ শিশু-রাজা ষষ্ঠ হেনরিকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করা হয়। প্যারিসসহ উত্তর ফ্রান্সের বিশাল এলাকা তখন ইংরেজদের দখলে। ফ্রান্সের ভাগ্য তখন ঝুলছিল ওর্লিয়েন্স শহরের ওপর, যা ছিল সেই যুদ্ধের প্রধান রণক্ষেত্র।
ফ্রান্স তখন খণ্ডবিখণ্ড, মনোবলহীন এবং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ঠিক এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে এক মেয়ের জন্ম হলো, যে মাত্র কয়েক বছরেই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
দঁরেমি-তে এক ধর্মপ্রাণ শৈশব জোয়ান এক সাধারণ কিন্তু সম্মানীয় কৃষক পরিবারে বড় হয়েছিলেন। তাঁর বাবা জাক্ দার্ক ছিলেন একজন প্রান্তিক কৃষক ও গ্রামের ছোট কর্মকর্তা। মা ইসাবেল রোমি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং তিনি সন্তানদের প্রার্থনা ও বিশ্বাসের শিক্ষা দিতেন। জোয়ান ভাইবোনদের সাথে বড় হয়েছেন এবং ছোটবেলা থেকেই চাষাবাদের কাজে সাহায্য করতেন—যেমন গবাদি পশু চরানো, সুতো কাটা এবং ঘরের কাজ। তিনি কখনও পড়তে বা লিখতে শেখেননি।
জোয়ানের গ্রামটি এমন এক সীমান্তে ছিল যেখানে প্রায়ই আক্রমণ ও সংঘর্ষের ভয় লেগে থাকত। ছোটবেলা থেকেই জোয়ান ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। তিনি নিয়মিত গির্জায় যেতেন এবং গরিব-অসুস্থদের সাহায্য করতেন।
তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন নিজের বাড়ির বাগানে তিনি প্রথম এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জানিয়েছিলেন যে, তিনি এক প্রবল জ্যোতি বা আলো দেখতে পান এবং প্রধান দেবদূত মাইকেল ও সাধ্বী ক্যাথরিন ও মার্গারেটের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। এই স্বর্গীয় দূতেরা তাঁকে এক মহান দায়িত্বের কথা জানান: ইংরেজদের বিতাড়িত করে ফ্রান্সকে রক্ষা করা এবং রাজপুত্র চার্লসকে রেইমসের পবিত্র গির্জায় রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা।
সেই কণ্ঠস্বরগুলো শুরুতে তাঁকে শান্তভাবে মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত করতে থাকে। এই অসম্ভব কাজের জন্য জোয়ান নিজেকে উৎসর্গ করেন। এমনকি তাঁর বাবা যখন তাঁর বিয়ের চেষ্টা করেন, তখন কিশোরী জোয়ান দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের প্রতিজ্ঞায় অটল থাকেন।
আহ্বান যখন জরুরি হয়ে উঠল: গ্রাম থেকে রাজদরবারে ১৪২৮ সালের দিকে যখন ইংরেজরা ওর্লিয়েন্স (Orléans) শহরটি অবরুদ্ধ করে ফেলে, তখন জোয়ানের কানে আসা সেই অলৌকিক কণ্ঠস্বরগুলো আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ওর্লিয়েন্সের পতন মানেই ছিল ফ্রান্সের হৃদপিণ্ড ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়া। ১৬ বা ১৭ বছর বয়সী জোয়ান তখন নিকটবর্তী ভাকুলার (Vaucouleurs) নামক এক দুর্গে যান। সেখানে তিনি ক্যাপ্টেন রবার্ট ডি বোড্রিকোর্টকে রাজি করান যাতে তাঁকে রাজপুত্র চার্লসের দরবারে যাওয়ার অনুমতি ও প্রহরী দেওয়া হয়।
১৪২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শত্রুবেষ্টিত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জোয়ান চিনন (Chinon) প্রাসাদে পৌঁছান। রাজপুত্র চার্লস প্রথমদিকে তাঁকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। প্রচলিত আছে যে, রাজপুত্রকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি ছদ্মবেশে সভাসদদের ভিড়ে লুকিয়ে ছিলেন, কিন্তু জোয়ান তাঁকে দেখামাত্রই চিনে ফেলেন। তিনি রাজপুত্রকে একান্তে এমন কিছু কথা বলেছিলেন (যার রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি) যা চার্লসকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে জোয়ান ঈশ্বরপ্রেরিত। জোয়ান ঘোষণা করেন যে, তাঁর লক্ষ্য ওর্লিয়েন্সকে মুক্ত করা এবং রাজপুত্রকে রেইমস শহরে নিয়ে গিয়ে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা।
পয়টিয়ার্স-এর বড় বড় ধর্মতত্ত্ববিদ ও পণ্ডিতরা টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে জোয়ানকে পরীক্ষা করেন। তাঁরা তাঁর মধ্যে কোনো অধর্ম খুঁজে পাননি, বরং তাঁর সরল বিশ্বাস ও বুদ্ধিমত্তা দেখে মুগ্ধ হন। শেষ পর্যন্ত রাজপুত্র তাঁকে এক সুযোগ দিতে রাজি হন। ১৪২৯ সালের এপ্রিলে ১৭ বছর বয়সী জোয়ান সাদা বর্ম, একটি বিশেষ ধর্মীয় নিশান (ব্যানার) এবং একটি অলৌকিক তলোয়ার নিয়ে ফরাসি সেনাবাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ওর্লিয়েন্সের সেই অলৌকিক বিজয় ১৪২৯ সালের এপ্রিলের শেষে জোয়ান ওর্লিয়েন্সে পৌঁছান। শহরটি তখন সাত মাস ধরে অবরুদ্ধ, মানুষ দিশেহারা। কিন্তু জোয়ানের আগমন যেন নিভে যাওয়া ফরাসি সৈন্যদের মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করল।
জোয়ান পেছনে বসে নির্দেশ দিতেন না। তিনি নিজে বর্ম পরে, হাতে নিশান নিয়ে একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। মে মাসের ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে তাঁর নেতৃত্বে ফরাসিরা ইংরেজদের প্রধান দুর্গগুলো দখল করে নেয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে জোয়ানের কাঁধে তীর বিঁধলেও তিনি দমে যাননি; সামান্য চিকিৎসার পরই পুনরায় রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৮ মে ইংরেজরা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং অবরোধ তুলে নেয়। যে কাজ মাস পর মাস ধরে অভিজ্ঞ জেনারেলরা করতে পারেননি, সেই অসম্ভবকে মাত্র ৯ দিনে সম্ভব করে দেখান ‘ওর্লিয়েন্সের এই কুমারী’।
এই জয় কেবল সামরিক বিজয় ছিল না, এটি ছিল এক মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব। জোয়ান সৈন্যদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনেন এবং যুদ্ধের আগে প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের মনোবলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
লঁয়ার অভিযান ও রেইমসের রাজপথ এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে জোয়ান আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। জুন মাসে লঁয়ার (Loire) উপত্যকায় একের পর এক যুদ্ধে ফরাসিরা জয়লাভ করে। ১৮ জুন পঁতে (Patay)-এর যুদ্ধে ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনী ইংরেজদের বিখ্যাত দীর্ঘ ধনুকধারী বাহিনীকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দেয়।
লঁয়ার অঞ্চল সুরক্ষিত হওয়ার পর জোয়ান জেদ ধরেন যে, চার্লসকে রেইমস শহরে যেতেই হবে রাজা হিসেবে অভিষেকের জন্য। এলাকাটি তখন শত্রুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তাই এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু জোয়ানের সাহসে ভর করে সেনাবাহিনী দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। পথে শহরগুলো বিনা যুদ্ধে জোয়ানের জন্য তাদের দরজা খুলে দিচ্ছিল।
১৬ জুলাই ১৪২৯ সালে চার্লস রেইমসে প্রবেশ করেন। পরদিন ১৭ জুলাই এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি সপ্তম চার্লস হিসেবে ফ্রান্সের বৈধ রাজা ঘোষিত হন। জোয়ান তাঁর নিজের নিশান হাতে রাজার পাশেই গর্বিতভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতির প্রধান অংশটি পূরণ করেন। রাজাকে অভিষিক্ত হতে দেখে জোয়ান হাঁটু গেড়ে বসে বলেছিলেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। সেই মুহূর্তটি ফ্রান্সের ইতিহাসে এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একজন রাজপুত্র থেকে চার্লস যখন বৈধ রাজা হলেন, তখন ফরাসিদের মনে নিজেদের দেশের প্রতি এক নতুন ভালোবাসা ও অধিকারবোধ জন্ম নিল।
পরবর্তী যুদ্ধ, বন্দিত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতা
অভিষেকের পরও জোয়ান থেমে থাকেননি। ১৪২৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিস উদ্ধারের একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং তিনি আবারও আহত হন। এরপর রাজনৈতিক টানাপড়েন শুরু হলে জোয়ানের প্রভাব কিছুটা কমতে থাকে; কারণ রাজা চার্লস ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক ও ধীরগতির, অন্যদিকে দরবারের অন্যান্য নেতারা জোয়ানের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত ছিলেন।
১৪৩০ সালের মে মাসে কঁপিয়েন (Compiègne) শহরকে বারগুন্ডিয়ানদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার সময় জোয়ান শত্রুপক্ষীয়দের হাতে বন্দি হন। তাঁকে ঘোড়া থেকে টেনে নামানো হয় এবং বন্দি হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বারগুন্ডিয়ানরা একটি বিশাল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে (প্রায় ১০,০০০ ফ্রাঙ্ক) তাঁকে ইংরেজদের কাছে বিক্রি করে দেয়। ইংরেজরা তাদের পরম শত্রুকে হাতে পেয়ে যায়—যে মেয়েটি তাদের বারবার পরাজিত ও অপমানিত করেছিল, তাকে ধ্বংস করার সুযোগ তারা আর হাতছাড়া করতে চায়নি।
রুয়ঁ-র বিচার: বিচারের নামে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
১৪৩১ সালের জানুয়ারিতে ইংরেজ অধিকৃত রুয়ঁ (Rouen) শহরে জোয়ানের বিচার শুরু হয়। এটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক চাল, যার উদ্দেশ্য ছিল জোয়ান এবং তাঁর মাধ্যমে রাজা সপ্তম চার্লসকে কলঙ্কিত করা। এই বিচারে সভাপতিত্ব করেন ইংরেজঘেঁষা যাজক বিশপ পিয়ের কোশন।
টানা কয়েক মাস ধরে জোয়ানকে অসংখ্যবার জেরা করা হয়। কোনো প্রথাগত শিক্ষা বা আইনি জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও, জোয়ান অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের সাথে নিজেকে রক্ষা করেন। তিনি বারবার বলেন যে, সেই কণ্ঠস্বরগুলো সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে এবং তিনি কেবল তাঁর আদেশ পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধানত ধর্মদ্রোহিতা এবং পুরুষের পোশাক পরার (যা তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য পরতেন) অভিযোগ আনা হয়।
তীব্র মানসিক চাপ এবং মৃত্যুর হুমকির মুখে পড়ে ১৪২৯ সালের ২৪ মে তিনি একটি দলিলে সই করতে বাধ্য হন, যেখানে তিনি নিজের দাবিগুলো প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু কয়েকদিন পরেই তিনি আবার নিজের অবস্থানে ফিরে আসেন। তিনি ঘোষণা করেন যে তাঁর সেই ঐশ্বরিক কণ্ঠস্বরগুলো সত্য ছিল। যেহেতু তিনি পুনরায় তাঁর আগের অবস্থানে ফিরে গিয়েছিলেন, তাই চার্চ তাঁকে ‘অংশোধনযোগ্য অপরাধী’ হিসেবে ঘোষণা করে।
১৪৩১ সালের ৩০ মে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে জোয়ানকে রুয়ঁ-র ওল্ড মার্কেট স্কয়ারে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে তাঁর শেষ কথা ছিল “যিশু” এবং নিজের বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকার ঘোষণা। বলা হয়, এক ইংরেজ সৈন্য যে আগে তাঁকে উপহাস করেছিল, সে পরে অনুশোচনা করে বলেছিল যে সে আগুনের শিখা থেকে একটি সাদা ঘুঘুকে উড়ে যেতে দেখেছে।
দোষমুক্তি, সন্তত্ব এবং চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার আগুনের কুণ্ডলীতেই জোয়ানের গল্প শেষ হয়ে যায়নি। ১৪৫৫-১৪৫৬ সালে তাঁর পরিবারের অনুরোধে এবং রাজা সপ্তম চার্লসের সমর্থনে পোপের নির্দেশে এই বিচারের পুনর্বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর আগের রায়টিকে সম্পূর্ণ অন্যায়, জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ঘোষণা করা হয়। জোয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমস্ত কলঙ্ক থেকে মুক্ত করা হয়।
শতাব্দী পরে, ১৯০৯ সালে তাঁকে ‘ধন্য’ (Beatified) ঘোষণা করা হয় এবং ১৯২০ সালের ১৬ মে পোপ পঞ্চদশ বেনেডিক্ট তাঁকে ‘সন্ত’ (Saint) হিসেবে অভিষিক্ত করেন। ৩০ মে তাঁর স্মৃতিতে বিশেষ দিবস পালন করা হয়। তিনি আজ ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান রক্ষাকর্তা এবং সৈন্য, বন্দি ও কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা নারীদের আদর্শ।
ইতিহাসে প্রভাব ও তাৎপর্য ফরাসি ইতিহাসে জোয়ান অফ আর্কের প্রভাব ছিল অপরিসীম। তাঁর জয় এবং রাজার অভিষেক ফরাসিদের মনোবল ও বৈধতাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এটিই ছিল ফ্রান্সে ইংরেজদের আধিপত্যের শেষের শুরু (অবশেষে ১৪৫৩ সালে ফরাসিদের বিজয়ের মাধ্যমে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে)। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ফরাসি ঐক্য এবং প্রতিরোধের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হন—একজন সাধারণ কৃষক কন্যা, যিনি নিজেই যেন গোটা জাতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁর আদর্শকে বিভিন্ন দল ও মতাদর্শের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও ফরাসিরা তাঁর ত্যাগ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। অগণিত মূর্তিতে, চিত্রকলায়, শেক্সপিয়র বা বার্নার্ড শ-এর নাটকে এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর স্মৃতি আজও অম্লান।
জোয়ানের কাহিনী কেন আজও চিরন্তন? তা কেবল তাঁর সামরিক সাফল্যের জন্য নয়—যা কি না একজন প্রশিক্ষণহীন কিশোরীর জন্য ছিল অবিশ্বাস্য—বরং তাঁর অটল বিশ্বাসের জন্য। এক সাধারণ গ্রাম থেকে উঠে এসে তিনি সমাজের অবিশ্বাস, লিঙ্গবৈষম্য এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে জয় করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে সাহস এবং মনের স্বচ্ছতা থাকলে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব, এমনকি যখন পরিস্থিতি একদম প্রতিকূলে থাকে।
দঁরেমি গ্রামের সেই কিশোরী কেবল ১৪২৯ সালে ফ্রান্সকে রক্ষা করেননি, বরং তিনি ‘ফ্রান্স’ নামক একটি জাতির ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর বিজয়ের নিশান হয়তো অনেক আগে গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাঁর জ্বালিয়ে দেওয়া দেশপ্রেমের শিখা আজও উজ্জ্বল।
জোয়ান অফ আর্ক চিরকাল সেই সাহসী ‘কুমারী’ হিসেবেই পরিচিত থাকবেন—যিনি ফ্রান্সকে বাঁচিয়েছিলেন এবং সারা বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

