– সৈয়দ হৃদয়
অন্ধকার এক সাগরের গভীরে যখন হঠাৎ করে কোনো আলোকচ্ছপ ঝলসে ওঠে, তখন মানুষের চোখে তা হয়ে ওঠে মুক্তির দিশারী। কিন্তু যদি সেই আলো কেবল মরীচিকার প্রতিচ্ছবি হয়, যদি তা সত্যিকারের মুক্তি না হয়ে শূন্যতার প্রতারণাময় উল্লাস হয়? মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই প্রশ্নটি চিরকালই বেজে চলেছে। আমরা কি সত্যিই বেঁচে আছি, নাকি আমরা শুধু বেঁচে থাকার ভ্রমে ভেসে চলেছি?
প্রতিদিন আমরা জীবনকে অনুভব করি নিঃশ্বাসের স্পন্দনে, হৃদয়ের ধ্বনিতে, শহরের কোলাহলে কিংবা গ্রামের নির্জনতায়। কিন্তু বেঁচে থাকার আসল অর্থ কি কেবল প্রাণ ধারণ করা? নাকি তার ভেতরে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর দর্শনের মর্ম? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দাঁড়িয়ে যাই এক বিশাল শূন্যতার রাজ্যে, যেখানে মানুষের উল্লাস কখনো হয়ে ওঠে প্রতারণাময়, আবার কখনো হয়ে ওঠে সত্যিকারের মুক্তির গান।
ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন, “Nothingness lies coiled in the heart of being.” অস্তিত্বের ভেতরে শূন্যতার এক অদৃশ্য ফণা লুকিয়ে থাকে। মানুষ হয়তো হাসছে, উৎসব করছে, পতাকা ওড়াচ্ছে। কিন্তু এই হাসির ভেতরে লুকানো থাকে এক বেদনাময় শূন্যতা। আমরা ভাবি আমরা বেঁচে আছি, অথচ হয়তো আমরা কেবল বেঁচে থাকার অভিনয় করছি।
গভীর রাতে শহরের আলো ঝলমলে রাস্তায় যখন দেখি মানুষ হাসছে, নাচছে, কিংবা মদে মদির, তখন মনে হয়, হয়তো এই উল্লাসই তাদের বেঁচে থাকার প্রমাণ। কিন্তু সকালের আলোয় ভোরের ক্লান্ত চোখ যখন আয়নায় তাকায়, তখন সেই চোখে আমরা দেখতে পাই শূন্যতার গহ্বর। আমরা যে আনন্দকে বেঁচে থাকার প্রমাণ ভেবেছিলাম, তা আসলে ছিল মৃত্যুর হাতছানি। আমরা যে উল্লাস করি, তা আসলে আমাদের অন্তর্গত দুঃখকে ঢেকে রাখার একটা কৌশলমাত্র। কিন্তু সেই দুঃখ কখনো লুকিয়ে থাকে না—তা ফিরে আসে, আমাদের ভেতরের বেঁচে থাকার প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তোলে। আমরা নিজেদের বলি—আমরা সুখী, আমরা মুক্ত, আমরা জীবিত। অথচ, এর ভেতরেই রয়েছে এক বিভ্রম।
আধুনিক ভোক্তাবাদী সমাজে মানুষ প্রতিদিন নতুন নতুন উল্লাসে মত্ত হয়—নতুন প্রযুক্তি, নতুন পণ্য, নতুন বিনোদন। কিন্তু এই উল্লাস কি সত্যিকারের জীবনের প্রমাণ, নাকি কেবল শূন্যতার ওপর সাজানো রঙিন কাগজ? আমরা হয়তো মোহে বিভোর, কিন্তু অন্তরে এক শূন্যতা আমাদের গ্রাস করছে। আজকের উল্লাস আসলে সেই শূন্যতার মধ্যে নিজেকে ভোলানোর চেষ্টা। এই শূন্যতার রাজ্যে মানুষ সবচেয়ে বেশি ডুবে যায় আত্মপ্রবঞ্চনায়। আমরা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, অথচ সেই স্বপ্নের বাস্তবতা হয়তো কখনো আসবে না। তবুও আমরা উল্লাস করি, কারণ উল্লাস ছাড়া আমাদের শূন্যতার ভেতর বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় নেই।
জাতি ও রাষ্ট্রের ইতিহাসেও শূন্যতার উল্লাস স্পষ্ট। জনতার স্লোগান, রঙিন পতাকা, সমাবেশ—সবই মনে হয় জীবনের জয়ধ্বনি। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, অনেক সময় এই উল্লাস ক্ষণস্থায়ী। কারণ বিপ্লবের পর আসে হতাশা, স্বাধীনতার পর আসে দুঃশাসন। জনগণ ভাবে তারা বেঁচে আছে, অথচ তারা শূন্যতার মধ্যে আটকা পড়ে গেছে। তারা শুধু স্লোগান দিয়ে ভাবে তারা জীবিত, অথচ তাদের অন্তরে মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। কবিতার ভেতরে, চিত্রকলার ভেতরে, সংগীতের ভেতরেও মানুষ সবসময় শূন্যতার প্রতিচ্ছবিই এঁকেছে।
TS Eliot ট তার “The Hollow Men”-এ লিখেছিলেন, “This is the way the world ends, not with a bang but a whimper.” আমাদের উল্লাস হয়তো সেই “whimper”—এক মৃদু শব্দ, যা মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। তবুও মানুষ জীবনকে অর্থ দিতে চায়। কিন্তু অর্থ দিতে হলে মানুষকেই তার দায়িত্ব নিতে হবে। আলবার্ট কামু বলেছিলেন, “The only serious philosophical question is suicide.” শূন্যতার রাজ্যে আমাদের উল্লাস হয়তো আত্মহত্যার বিপরীতে দাঁড়ানো এক প্রতিরোধ।
আমরা উল্লাস করি, কারণ তা না হলে আমরা অর্থহীনতার কাছে হার মানব। কিন্তু এই উল্লাস সত্যিকারের বেঁচে থাকার প্রমাণ নয়। সত্যিকারের জীবন মানে প্রশ্ন করা, চ্যালেঞ্জ নেওয়া, আত্মসচেতন হওয়া। বেঁচে থাকা মানে কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস নয়। বেঁচে থাকা মানে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো। যখন আমরা শূন্যতার রাজ্যে উল্লাস করি, তখন আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—এই উল্লাস কি সত্য, নাকি মরীচিকা? যদি আমরা কেবল মরীচিকায় ভেসে চলি, তবে আমরা মৃত। যদি আমরা শূন্যতার ভেতরে সত্যকে খুঁজে পাই, তবেই আমরা সত্যিকারের জীবিত।
