অনুভব
অরবিন্দ পোদ্দার
(প্রকাশিত উপন্যাস – মাতৃভূমির খোঁজে, মুসাফির ; কাব্যগ্রন্থ ছায়া মানবী, প্রেম শতদল)
” বিশ্বাস ক্রীড়া “সামগ্রী দোকানের মালিক সুনীল বিশ্বাস। সুদর্শন পুরুষ বলতে যা বোঝায় তিনি তাই। ছিপছিপে গড়ন। চিকন, চোখা নাক। শিল্পীর হাতে তৈরি মুখাবয়ব। এমন সুন্দর মুখশ্রী! টানা টলটলে সাদা দুটো চোখ। নিরুদ্বেগ মুখে অনাবিল একটা আনন্দ যা সবাইকে স্পর্শ করে। তিনি এলাকায় সুনীলদা নামে পরিচিত। তাকে ঐরকম মেধাবী বলা চলে না, তবে শিক্ষিত। তার দোকানে ছেলে বুড়ো সব ধরনের ক্রেতা পরম বিশ্বাসে জিনিসপত্র কিনে থাকে এবং সবচেয়ে বড়কথা সবসময় ভীড় লেগেই আছে- তা বেচাকেনা হোক আর না হোক।
বিকালবেলা খেয়ে দেয়ে দ্বিতীয় দফায় আবার দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে লেনদেনে ব্যস্ত সুনীল। এমন সময় মোস্তাফা ভাই দোকানে ঢুকলেন। মোস্তাফা ভাই এলাকার বিশেষ প্রভাবশালী ব্যক্তি – হিন্দু মুসলমান সবাই তাকে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে। সুনীলদা তাকে মান্য তো করেই আরও খাতিরের বিষয় হলো – দুজনেই স্থানীয় ক্লাবের সাবেক ফুটবলার। সবাই তাদের গুরু শিষ্য বলেই জানে। সুনীল মাথা নীচু করে টাকা গুনতে গুনতেই বললো – বসেন।
দুজনে একটু ক্লোজড হলেন এবং মোস্তফা ভাই ইঙ্গিতে বললেন- চলো।
রেস্তোরাঁয় একান্তে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মোস্তফা ভাই বললেন –
সুনীল – তুই কি বিয়ে করবি না?
সুনীল এবার মোস্তফা ভাইয়ের প্ল্যান বুঝতে পারে। হেসে বললো – আমি কি না করছি নাকি –
মোস্তফা ভাই গোঁফে তা দিলেন। চোখ বড় বড় করলেন। পকেটে থেকে সিগারেট বেড় করে ম্যাচের কাঠিতে সটান শব্দ করে অগ্নি সংযোগ করে বললেন – আমার কথা রাখতে হবে –
– কি কথা?
– চৌধুরী বাবুর মেয়েকে তুই দেখভাল করবি
– মানে? কোন চৌধুরী বাবু –
– এলাকায় চৌধুরী বাবু তো একজন’ই-
– সুনীল এবার উঠে দাঁড়ায়। মোস্তফা ভাই এসব ঠাট্টা আর ভাল্ লাগে না।
– বৎস্য, প্রেম করেছিলে এখন বোঝ –
– কিসের কি ; যা তা কথা বলেন আপনি । সেই কলেজ জীবনে একটু চোখাচোখি। বাকিটা আপনার কল্যানে কলেজে প্রীতি ফুটবল ম্যাচে দুটো নজরকাড়া গোল করে প্রতিপক্ষকে হারালে আনন্দে- সবাই হৈচৈ। এটা এমন কি? আর সুলোচনা সুন্দরী -মেধাবী, সুপার সিঙ্গার – কলেজ স্টার , পরবর্তীতে সর্বত্র স্কলার এবং বিসিএস চাকরিজীবী। আপনি কি যে বলেন –
– হু। তুই তো জানিস না জীবনে কখন কি ঘটে যায়! আচ্ছা সুলোচনা যদি অন্ধ হয়ে যায়, পঙ্গু হয়ে যায় – তুই কি তাকে ভালবাসবি না?
– সুনীল অবাক হয়ে তাকায়। মোস্তফা ভাই অসাধারণ বক্তা। সুনীলকে কাবু করে ফেললো।
সন্ধ্যার পর পর মোস্তফা সেলিম আলমগীর ওরফে মোস্তফা ভাই এবং সুনীল বিশ্বাস একত্রে অনিমেষ চৌধুরীর পুরনো ইমারতের গেটের কাছে গিয়ে পৌছাল।
দোতলার বিশাল রুমে সাদা আলোয় চৌধুরী মহাশয় চা পান করছিলেন। সামনে একটা গোল টেবিলে কিছু বিস্কুট। বাম হাতে দৈনিক পত্রিকা। তিনি পত্রিকায় চোখ রেখে ঝুকে পড়ে কিছু একটা পড়ছেন –
দারোয়ান বললো, বাবু –
অনিমেষ চৌধুরী ইঙ্গিতে দুজনকে ডাকলেন –
পেছন পেছন মোস্তফা সাহেব এবং সুনীল প্রবেশ করলো।
সুনীলের নজর পাশেই একটা হুইলচেয়ারের দিকে আটকে যায়। যুবতী তরুণী! মুখখানা চেনা চেনা। কালো চশমায় আবৃত চোখ। কপালে অনেক কাটাছেঁড়া। কপোলেও দাগ। পায়ের দিকে তাকিয়ে আরও আঁতকে উঠল সে। দুটো পা-ই নেই! একটা নকল পা শাড়ির নীচে দেখা যাচ্ছে, অপর পায়ে এখনো ব্যান্ডেজ!সে বিস্মিত হয়।
চৌধুরী বাবু দুজনকে নিয়ে সন্তর্পণে পাশের রুমে গেলেন।
অনিমেষ বাবু পরিচয় পর্ব শেষে সুনীলের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে আছেন। মোস্তফা ভাই চা পানরত অবস্থায় তা খেয়াল করলো। সুনীলও নীরবে সুযোগ বুঝে অনিমেষ চৌধুরীকে দেখছে। অতি কঠিন মানুষ। চোখে, বুদ্ধিতে- সে চিহ্ন পরিস্কার। এক সময় তিনি কথা বললেন –
সুনীল –
– বলুন-
– আমার মেয়ে সুলোচনা। তাকে তো দেখলে। তার দুর্ভাগ্য। তবে ঈশ্বর তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এটাই বড় কথা। সে একজন শিল্পী। অন্য কথা বাদ থাক। যাহোক – তাকে তুমি যদি একবেলা সঙ্গ দাও- একটু হারমোনিয়াম বাজাতে কিংবা তবলায় সংগত কর ইত্যাদি – মানে তুমি সঙ্গীতে পারদর্শী বলে আমি শুনেছি।
– মোস্তফা ভাই বললেন – সুনীল তবলায় পারদর্শী, একটু আধটু গাইতেও পারে।
– বাহ্ অনিমেষ বাবু খুশি হলেন। কিছু মনে করোনা – টাকা পয়সা কোন সমস্যা নয় –
– না না সেটা কোন বিষয় নয়। দোকানের অজুহাত তুলতেই
সুনীল কে বাধা দিয়ে অনিমেষ বাবু বললেন-
আমি তা জানি। তুমি সুযোগ বুঝে ঘন্টা খানেক সময় যদি দাও –
– মোস্তফা ভাই খুব খুশি হলেন চৌধুরী বাবুর ব্যবহারে। তিনি কথা পাকা করে বললেন – আজই সুলোচনা সাথে পরিচিত হলে কেমন হয়?
– নিশ্চয় –
তিনজনে সুলোচনার কক্ষে প্রবেশ করলো। তবে সুলোচনা অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ায় আর আলোচনা হলো না।
প্রথম দিন সুনীল সফেদ ট্রাউজার গেঞ্জি পড়ে বিকেলে সুলোচনার মুখোমুখি হলো।
খুব মিষ্টি কণ্ঠে সে বললো, নমস্কার-
আপনি সঙ্গীত ভালোবাসেন?
ধীরে ধীরে সুনীল বললো হ্যাঁ – সঙ্গীত শুনতে খুব ভালো লাগে।
-গাইতে পারেন?
তেমন নয়- সুনীল বলে।
-তবলা সংগত করতে পারেন?
– কিছুটা।
– আচ্ছা -আমরা শুরু করতে পারি –
আমি একটু দাদরা তালটা শুনতে চাই –
সুনীল নিকটে থাকা তবলা কাছে টেনে নিয়ে তার ওস্তাদকে স্মরণ করে মূহুর্তে তবলায় লহরী তুলে দিলো। তার হাতের যাদুতে সুমধুর ধ্বনি চারিদিকে ছন্দ তোলে। সুলোচনা বহু দিন পর একটু শ্রবণ-শান্তি পেয়ে প্রশান্ত মনে বললো –
খুব সুন্দর হয়েছে। মন ভরে গেল।
– কিছু মনে করবেন না- আপনার নাম –
– নীলকাম্ত
– নীলকান্ত!
সুলোচনা কণ্ঠ এবং নামের যোগসূত্র খুজতে থাকে। তার মনে ইচ্ছা ছিল সুনীলদা, মানে – সেই কলেজ জীবনের তবলা বাদক, যিনি ছিলেন অসাধারণ ফুটবলার এবং অনিন্দ্য সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী -তিনি আসবেন কিন্তু! নীলকান্ত –
সুলোচনা কিছুটা হতাশ এবং অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
চলবে
