ধরা যাক একটি মানুষ বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর সে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঘুম থেকে উঠলো। কিন্তু হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে আলোর কিছু বিন্দু ভেসে উঠল, যা দিয়ে সে ঘরের দরজার সীমানা বা প্রিয় কোনো মানুষের হাতের নাড়াচাড়া বুঝতে পারলো। ‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’ (RP) নামক চোখের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তাদের ছোট একটি দলের জীবনে এটি বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। আর এটি সম্ভব হয়েছিল ‘আরগুস II রেটিনাল প্রোস্থেসিস সিস্টেম’ (Argus II Retinal Prosthesis System)-এর মাধ্যমে—যাকে বিশ্বের প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞান-স্বীকৃত (FDA-approved) “বায়োনিক আই” বা কৃত্রিম চোখ বলা হয়।
যদিও বর্তমানে এই ডিভাইসটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, তবুও নিউরো-প্রযুক্তির (মস্তিষ্ক ও স্নায়ু প্রযুক্তি) ইতিহাসে আরগুস II একটি মাইলফলক। এটি প্রমাণ করেছে যে, চোখের মৃত কোষগুলোকে এড়িয়ে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনার মাধ্যমে মস্তিষ্কে আলোর সংকেত পাঠানো এবং দৃষ্টির অনুভূতি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। এই নিবন্ধে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় আলোচনা করব—অন্ধত্বের পেছনের বিজ্ঞান, এই কৃত্রিম চোখের প্রকৌশল, মানবজীবনে এর প্রভাব, এর সীমাবদ্ধতা এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে।
১. অন্ধত্বের বিজ্ঞান: কেন আরগুস II তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল?
‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’ (RP) হলো চোখের বংশগত একটি রোগ। সাধারণত প্রতি ৪,০০০ মানুষের মধ্যে ১ জন এই রোগে আক্রান্ত হন। এটি প্রথমে চোখের ‘রড’ কোষগুলোকে (যা রাতের বেলা এবং চারপাশের দৃষ্টির জন্য দায়ী) নষ্ট করে দেয়। ধীরে ধীরে এটি ‘কোন’ কোষগুলোকেও (যা দিনের আলো এবং রঙ দেখার জন্য দায়ী) ধ্বংস করে ফেলে। রোগীরা প্রথমে সুড়ঙ্গের মতো সরু অংশ দিয়ে দেখতে পান (টানেল ভিশন) এবং বছরের পর বছর ধরে কমতে কমতে একসময় পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই রোগে চোখের বাইরের অংশ (ফোটোরিসেপ্টর বা আলোক-সংবেদনশীল কোষ) মারা গেলেও, চোখের ভেতরের দিকের অংশটি—যেমন বাইপোলার কোষ, গ্যাংগ্লিয়ন কোষ এবং অপটিক নার্ভ (দৃষ্টি স্নায়ু)—বহু বছর ধরে বেশ ভালো বা সচল থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ধত্বের শেষ পর্যায়েও চোখের প্রধান অংশগুলোর প্রায় ৩০% থেকে ৮০% কোষ বেঁচে থাকে।
চোখের ভেতরের এই বেঁচে থাকা কোষগুলোই আরগুস II-এর মতো কৃত্রিম চোখের পথ তৈরি করে দিয়েছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া কোষগুলোকে প্রতিস্থাপন করার বদলে, এই ডিভাইসটি চোখের বেঁচে থাকা ভেতরের স্নায়ুগুলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে উদ্দীপিত করে। এই সংকেতগুলো চোখের দৃষ্টি স্নায়ুর (অপটিক নার্ভ) মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে (মস্তিষ্কের যে অংশ দেখার কাজটি নিয়ন্ত্রণ করে) পৌঁছায়। মস্তিষ্ক তখন এই বৈদ্যুতিক সংকেতগুলোকে আলোর বিন্দু বা ঝলকানি (যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফসফিন্স’ বলা হয়) হিসেবে তৈরি করে।
সহজ উদাহরণ: এটিকে কানের ‘কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট’ (শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র)-এর সাথে তুলনা করতে পারেন। কানের ভেতরে নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশকে এড়িয়ে এই যন্ত্রটি যেমন সরাসরি শ্রবণ স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে, কৃত্রিম চোখও ঠিক একইভাবে চোখের অক্ষত স্নায়ুকে ব্যবহার করে। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এই নতুন “কোড” বা সংকেত বুঝতে শিখে নেয়।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, অন্যান্য কারণে হওয়া অন্ধত্ব (যেমন—গ্লকোমা, ডায়াবেটিসজনিত চোখের ক্ষতি, দৃষ্টি স্নায়ুর আঘাত বা মস্তিষ্কের ক্ষতি)—এই পদ্ধতিতে ঠিক করা সম্ভব নয়। সেগুলোর জন্য সরাসরি মস্তিষ্কে বসানোর মতো ভিন্ন প্রযুক্তির প্রয়োজন।
২. ইতিহাসের পাতায় আরগুস II: গবেষণাগার থেকে স্বীকৃতি লাভের গল্প
ল্যাবরেটরির সাধারণ গবেষণা থেকে একটি সফল চিকিৎসাসামগ্রী হয়ে ওঠার এই পথটি ছিল কয়েক দশকের দীর্ঘ এক যাত্রা:
১৯৯০-এর দশক: জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (USC)-র গবেষক ড. মার্ক হুমায়ুন, ইউজিন ডি জুয়ান এবং তাদের দল এই গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেন। অন্ধ স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর পরীক্ষা করে তারা প্রমাণ করেন যে, চোখে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিলে আলোর বিন্দু বা ঝলকানি তৈরি করা সম্ভব।
১৯৯৮ সাল: ক্যালিফোর্নিয়ার সিলমারে ‘সেকেন্ড সাইট মেডিকেল প্রোডাক্টস’ (Second Sight Medical Products) নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। শ্রবণ সহায়ক যন্ত্রের অগ্রদূত অ্যালফ্রেড মান এবং রবার্ট গ্রিনবার্গ এই কোম্পানিটি চালু করেন।
২০০২ সাল: প্রথমবারের মতো ৬ জন রোগীর চোখে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের জন্য ‘আরগুস I’ (১৬টি ইলেকট্রোড বা তারের সংযোগ বিশিষ্ট) নামের প্রাথমিক যন্ত্রটি বসানো হয়। টেরি বাইল্যান্ড নামের একজন রোগী তার ডান চোখে এটি গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের পরীক্ষায় দেখা যায়, এই যন্ত্রটি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রোগীদের সামান্য হলেও দেখতে সাহায্য করেছে।
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি: গবেষকরা আরও উন্নত এবং আকারে ছোট ‘আরগুস II’ তৈরি করেন। এতে আগের চেয়ে অনেক বেশি, অর্থাৎ ৬০টি ইলেকট্রোড ব্যবহার করা হয়। ২০০৬-২০০৭ সালের দিকে এটি মানুষের চোখে প্রথম পরীক্ষা করা হয়।
২০১১-২০১৩ সাল: ২০১১ সালে এটি ইউরোপে ব্যবহারের অনুমতি পায়। এরপর ২০১৩ সালে আমেরিকার ‘এফডিএ’ (FDA) অত্যন্ত জটিল রোগে আক্রান্ত অন্ধ রোগীদের জন্য এই যন্ত্রটি ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
২০১৪–২০১৯ সাল: আমেরিকা, ইউরোপ এবং কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক উপায়ে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি মানুষের চোখে এই কৃত্রিম চোখ সফলভাবে বসানো হয়।
২০১৯–২০২০ সাল: বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কম থাকা এবং আর্থিক সংকটের কারণে ‘সেকেন্ড সাইট’ কোম্পানিটি আরগুস II-এর উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করে দেয়। তারা তাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ মস্তিষ্কের জন্য তৈরি নতুন একটি প্রযুক্তির (Orion Visual Cortical Prosthesis) দিকে সরিয়ে নেয়। এর ফলে যারা ইতিমধ্যে আরগুস II ব্যবহার করছিলেন, তাদের যন্ত্রপাতির কারিগরি সহায়তা পাওয়া নিয়ে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়।
পরবর্তী অবস্থা: পরবর্তীতে কোম্পানিটি অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করে। আরগুস II হয়তো এখন আর তৈরি হয় না, কিন্তু এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আরও উন্নত কৃত্রিম চোখ তৈরির জন্য বিজ্ঞানের এক বিশাল ভিত্তি ও অনুপ্রেরণা হিসেবে রয়ে গেছে।
৩. আরগুস II যেভাবে কাজ করে: কৃত্রিম রেটিনার প্রকৌশল
এই পুরো সিস্টেমটি মূলত দুটি ভাগে কাজ করে—একটি অংশ থাকে চোখের বাইরে এবং অন্য অংশটি অপারেশনের মাধ্যমে চোখের ভেতরে বসানো হয়।
চোখের বাইরের অংশসমূহ:
বিশেষ চশমা: এই চশমার নাকের ওপরের অংশে একটি ছোট্ট ভিডিও ক্যামেরা লাগানো থাকে।
ভিডিও প্রসেসিং ইউনিট (VPU): এটি বেল্ট বা কাঁধে ঝুলিয়ে রাখার মতো ব্যাটারিচালিত একটি ছোট পোর্টেবল কম্পিউটার। ক্যামেরা যে ছবি তোলে, এই কম্পিউটারটি তাকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে (যেমন—কোনো জিনিসের চারপাশের সীমানা বা বর্ডার স্পষ্ট করা, আলোর কম-বেশি ঠিক করা বা জুম করা)।
চশমার ফ্রেমে একটি ছোট্ট অ্যান্টেনা বা ট্রান্সমিটিং কয়েল থাকে, যা চোখের ভেতরের অংশে সংকেত পাঠায়।
চোখের ভেতরের (অপারেশন করা) অংশসমূহ:
রিসিভিং কয়েল ও ইলেকট্রনিক্স কেস: এটি চোখের বাইরের সাদা অংশের (স্ক্লেরা) চারপাশে একটি ব্যান্ডের মতো করে নিরাপদে বসিয়ে দেওয়া হয়।
একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পাতলা তার চোখের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।
৬০-ইলেকট্রোড বিন্যাস: চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ বা ম্যাকুলার ওপর ৬০টি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তারের একটি গ্রিড বা জাল বসানো হয়। এই পুরো জালটি একটি ক্ষুদ্র টাইটেনিয়াম পিনের সাহায্যে রেটিনার ওপর আটকে দেওয়া হয়।
সংকেত চলাচলের সহজ ধাপ:
১. চশমার ক্যামেরাটি সামনের দৃশ্য ধারণ করে।
২. পকেটে থাকা কম্পিউটারটি (VPU) সেই ছবিকে খুব সাধারণ একটি ‘পিক্সেল’ ম্যাপ বা ডট চিত্রে রূপান্তর করে।
৩. এই তথ্য চশমার অ্যান্টেনা থেকে তারহীন প্রযুক্তির (Wireless) মাধ্যমে চোখের ভেতরের রিসিভারে চলে যায়।
৪. চোখের ভেতরের ইলেকট্রনিক্স অংশটি সেই আদেশ বুঝে নিয়ে নির্দিষ্ট ইলেকট্রোডগুলোতে নিখুঁত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পাঠায়।
৫. এই তরঙ্গ চোখের অক্ষত ও বেঁচে থাকা স্নায়ুগুলোকে উদ্দীপিত করে।
৬. এই উদ্দীপনা বা সংকেত চোখের মূল দৃষ্টি স্নায়ুর (অপটিক নার্ভ) মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছায়।
৭. মস্তিষ্ক তখন এই সংকেতকে আলোর বিন্দু বা ঝলকানি হিসেবে দেখতে পায়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে রোগীরা এই আলোর বিন্দুগুলো জোড়া দিয়ে দরজার সীমানা, মানুষের নড়াচড়া বা কোনো বস্তুর আকার বুঝতে পারেন।
দৃষ্টির ক্ষমতা বা সীমাবদ্ধতা:
এই যন্ত্রটির দেখার ক্ষমতা সাধারণ চোখের তুলনায় বেশ কম ছিল। এর সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ২০/১৬০০ বা ২০/১২৬২ বলা যায়—যা অত্যন্ত ক্ষীণ দৃষ্টির সমতুল্য।
এটি দিয়ে চারপাশের প্রায় ২০ ডিগ্রি কোণ পর্যন্ত দেখা যেত।
যেহেতু ক্যামেরাটি চশমার সাথে স্থির থাকে, তাই সাধারণ চোখের মতো শুধু মণি ঘুরিয়ে সব দেখা যেত না; ব্যবহারকারীকে তার মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশের জিনিস স্ক্যান করে দেখতে হতো।
একটি সহজ উদাহরণ: এটিকে এভাবে কল্পনা করুন—যেন আপনি পুরো পৃথিবীকে খুব কম রেজোলিউশনের একটি ডট-ম্যাট্রিক্স ডিসপ্লে (যেমন ডিজিটাল ঘড়ি বা বাসের ডিজিটাল রুট বোর্ডের লেখা) অথবা ঝিরঝির করতে থাকা সাদা-কালো টেলিভিশনের পর্দার মধ্য দিয়ে দেখছেন। এর মাধ্যমে আপনি একটি উজ্জ্বল দরজার সীমানা দেখতে পাবেন, মেঝের ওপর টানা সাদা দাগ ধরে হাঁটতে পারবেন কিংবা বড় অক্ষরে লেখা কোনো জিনিস চিনতে পারবেন। তবে খুব সূক্ষ্ম বিষয়, মানুষের মুখচ্ছবি কিংবা সাধারণ বইয়ের লেখা পড়ার জন্য এটি যথেষ্ট ছিল না।
৪. অপারেশন বা সার্জারির প্রক্রিয়া
চোখের অভিজ্ঞ সার্জনরা রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান (General Anesthesia) করে রেটিনা অপারেশনের প্রচলিত কিছু ধাপের মাধ্যমে এই যন্ত্রটি চোখের ভেতরে বসাতেন:
ভিট্রেক্টমি: চোখের ভেতরে থাকা জেলের মতো তরল অংশটি (Vitreous gel) প্রথমে পরিষ্কার করা হয়।
লেন্স অপসারণ: অনেক সময় চোখের স্বাভাবিক লেন্সটি সরিয়ে ফেলা হতো, যাতে অপারেশন করতে সুবিধা হয় এবং ভবিষ্যতে ছানি পড়ার সমস্যা এড়ানো যায়।
তারের জাল বসানো: চোখের রেটিনার মূল অংশ বা ম্যাকুলার ওপর ৬০টি ইলেকট্রোডের সূক্ষ্ম জালটি নিখুঁতভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়।
ব্যান্ড দিয়ে আটকানো: চোখের বাইরের সাদা অংশের চারপাশে একটি বিশেষ ব্যান্ড দিয়ে কৃত্রিম চোখের মূল ইলেকট্রনিক্স বক্স ও রিসিভারটি শক্ত করে আটকে দেওয়া হয়।
এই পুরো অপারেশনটি সম্পন্ন হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত। অপারেশনের পর রোগীদের চোখে ড্রপ, স্টেরয়েড এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হতো। অপারেশন সফল হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর চোখের ভেতরের যন্ত্রটি চালু (Activate) করা হতো এবং রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী সংকেতের মাত্রা ঠিক করা হতো।
৫. ক্লিনিক্যাল প্রমাণ: এটি কতটা নিরাপদ ও কার্যকর ছিল?
আমেরিকা ও ইউরোপের ১০টি বড় চিকিৎসা কেন্দ্রে ৩০ জন অন্ধ রোগীর ওপর এই যন্ত্রটির একটি বড় পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। অপারেশন করার পর প্রায় ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের ওপর নজর রাখা হয়।
মূল ফলাফল (যন্ত্রটি চালু এবং বন্ধ থাকার মধ্যকার পার্থক্য):
জিনিসের অবস্থান নির্ণয়: প্রায় ৯৬% রোগী যন্ত্রটি চালু থাকা অবস্থায় সামনের কোনো বস্তুর অবস্থান অনেক ভালো ও নির্ভুলভাবে বলতে পেরেছিলেন।
নড়াচড়া বুঝতে পারা: সামনের কোনো কিছুর নড়াচড়ার দিক বোঝার ক্ষমতা ৫০% থেকে ৫৭% পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল।
দৃষ্টির ক্ষমতা বৃদ্ধি: অনেক রোগীই আগে যেখানে শুধু আলোর উপস্থিতি ছাড়া কিছুই বুঝতেন না, তারা এই যন্ত্রের সাহায্যে বড় আকারের অক্ষর বা নকশা দেখতে পেয়েছিলেন।
দৈনন্দিন কাজ: রোগীরা ঘরের দরজা খুঁজে পাওয়া, ফুটপাত ধরে হাঁটা এবং সামনের বাধা এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে দারুণ উন্নতি করেছিলেন।
অক্ষর পড়া:কিছু কিছু রোগী বড় আকারের একক অক্ষর বা ছোট শব্দও পড়তে পারতেন।
জীবনযাত্রার মান: বেশিরভাগ রোগীই জানিয়েছেন যে, এটি ব্যবহারের পর তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে এবং তারা অন্যের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন।
নিরাপত্তা: দীর্ঘমেয়াদে এই যন্ত্রটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় কোনো বড় বিপদ দেখা যায়নি। কিছু রোগীর চোখে হালকা ইনফেকশন বা রেটিনার সমস্যা দেখা দিলেও চিকিৎসকরা তা সহজেই সারিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার হার ছিল অত্যন্ত কম। ৫ বছর পরের তথ্যও নিশ্চিত করেছে যে, যারা নিয়মিত এটি ব্যবহার করেছেন তারা দীর্ঘসময় এর সুফল পেয়েছেন।
৬. বাস্তব জীবনের গল্প: টেরি বাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা
টেরি বাইল্যান্ড নামক একজন ব্যক্তি ‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’ (RP) রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪০ বছর বয়সের দিকে তার দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি হলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এই কৃত্রিম চোখের দুটি সংস্করণই (Argus I এবং Argus II) ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিলেন:
২০০৪ সাল: তার ডান চোখে ১৬টি ইলেকট্রোড বিশিষ্ট ‘আরগুস I’ বসানো হয়।
২০১৫ সাল: তার বাম চোখে ৬০টি ইলেকট্রোড বিশিষ্ট উন্নত ‘আরগুস II’ বসানো হয়।
তার নিজের মুখের অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ:
“আরগুস II চালু করার সাথে সাথেই আমি চোখের সামনে আলোর বিন্দুগুলো দেখতে পাই। আগের মডেলের চেয়ে এটি দিয়ে খুব দ্রুত আমি চারপাশের জিনিস বুঝতে পারছিলাম। আমি আলো, মানুষের নড়াচড়া এবং বড় বড় জিনিসের সীমানা দেখতে পাচ্ছিলাম। এমনকি বহু বছর পর আমি রাতের আকাশে আতশবাজির আলো দেখে আনন্দ পেয়েছি!”
তার এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, এই প্রযুক্তি মানুষের জীবনে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। তবে তিনি এটিও বলেছিলেন যে, এই আলোর ভাষা বোঝার জন্য রোগীকে নিয়মিত অনুশীলন করতে হয় এবং আমাদের মস্তিষ্কও ধীরে ধীরে নিজেকে এই নতুন নিয়মের সাথে মানিয়ে নেয়।
৭. সীমাবদ্ধতা এবং চ্যালেঞ্জ
এখানে মনে রাখা জরুরি যে, আরগুস II কিন্তু অন্ধত্বের কোনো স্থায়ী নিরাময় বা পুরোপুরি চোখ ভালো করার ওষুধ ছিল না। এর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল:
কম রেজোলিউশন: মাত্র ৬০টি আলোর বিন্দু (পিক্সেল) দিয়ে নিখুঁত কোনো ছবি, রঙ বা জটিল কোনো দৃশ্য দেখা সম্ভব ছিল না।
ভারী যন্ত্রপাতি: রোগীকে সবসময় চশমা এবং কোমরে বা কাঁধে একটি কম্পিউটার ইউনিট (VPU) বহন করতে হতো।
শেখার কষ্ট: অপারেশন করলেই সব দেখা যেত না; আলোর সংকেতগুলো বোঝার জন্য রোগীকে দীর্ঘদিনের ট্রেনিং ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো।
অত্যধিক খরচ:এই যন্ত্রটির দাম ছিল প্রায় ১,০০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশী টাকায় কোটির উপরে), এর সাথে অপারেশন ও হাসপাতালের খরচ তো ছিলই। ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল এটি।
সবাই ব্যবহার করতে পারতেন না: এটি শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা রোগীদের জন্যই কাজ করত, যাদের চোখের ভেতরের স্নায়ুগুলো এখনো বেঁচে আছে।
৮. ব্যবসায়িক পরিণতি এবং শিক্ষা
চিকিৎসা ক্ষেত্রে সফল হওয়া সত্ত্বেও, বাণিজ্যিকভাবে এই প্রযুক্তিটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ রোগীর সংখ্যা ছিল খুবই কম, কিন্তু এটি তৈরি ও গবেষণার খরচ ছিল অনেক বেশি। ফলে ২০১৯-২০২০ সালের দিকে কোম্পানিটি এর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। তারা তাদের মনোযোগ চোখের বদলে সরাসরি মস্তিষ্কে বসানোর মতো প্রযুক্তি (Orion)-র দিকে ঘুরিয়ে নেয়।
এই ঘটনাটি একটি বড় শিক্ষা দেয় যে—বিজ্ঞানের আবিষ্কার যতই চমৎকার হোক না কেন, তা বাজারে টিকিয়ে রাখতে হলে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও লাভজনক হওয়া প্রয়োজন। তবে আরগুস II বিদায় নিলেও এর প্রযুক্তি আগামী দিনের বিজ্ঞানীদের জন্য আলোর পথ দেখিয়ে গেছে।
৯. প্রতিযোগী এবং সমসাময়িক অন্যান্য প্রযুক্তি
বর্তমানে আরগুস II ছাড়াও বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আরও বেশ কিছু প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে:
ক) চোখের ভেতরের অন্যান্য যন্ত্র (Retinal Prostheses)
পিক্সিয়াম ভিশন প্রিমা (Pixium Vision PRIMA): এটি চোখের রেটিনার নিচে বসানো একটি তারহীন ব্যবস্থা। এতে অনেক বেশি ইলেকট্রোড থাকে, যার ফলে রোগীরা মানুষের মুখ এবং বইয়ের অক্ষর আরও ভালো বুঝতে পারেন।
সুপ্ৰাকোরয়ডাল পদ্ধতি: এটি চোখের এমন এক স্তরে বসানো হয় যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিরাপদ এবং চোখের ভেতরের অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না।
খ) মস্তিষ্কের কৃত্রিম দৃষ্টি (Cortical Visual Prostheses)
ওরিয়ন (Orion): এটি চোখ বা চোখের স্নায়ুকে পুরোপুরি এড়িয়ে সরাসরি মস্তিষ্কের যে অংশ দেখার কাজ করে (Visual Cortex), সেখানে বসানো হয়। ২০২৫-২০২৬ সালের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব মানুষের চোখের স্নায়ু স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে (যেমন গ্লকোমা বা দুর্ঘটনায়), তাদের ক্ষেত্রেও এই যন্ত্রটি দারুণ কাজ করছে।
গ) অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসা
জিন থেরাপি (Gene Therapy): রোগের শুরুর দিকে চোখের নির্দিষ্ট ত্রুটিপূর্ণ জিন ঠিক করার জন্য এটি ব্যবহার করা হয় (যেমন- Luxturna)।
এছাড়া স্টেম সেল থেরাপির (Stem Cell Therapy) মাধ্যমে চোখের মৃত কোষ সতেজ করার গবেষণাও চলছে।
১০. বায়োনিক ভিশন বা কৃত্রিম দৃষ্টির ভবিষ্যৎ
আরগুস II প্রমাণ করেছে যে কৃত্রিম চোখ দিয়ে দেখা সম্ভব। এখন বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতের জন্য আরও উন্নত কিছু করার চেষ্টা করছেন:
হাজার হাজার ইলেকট্রোড:৬০টির বদলে শত শত বা হাজার হাজার ইলেকট্রোড ব্যবহার করা, যাতে ছবি আরও পরিষ্কার ও নিখুঁত দেখা যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI):** চশমার ক্যামেরার সাথে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যোগ করা, যা রোগীকে বলে দেবে সামনে কী জিনিস আছে, কত দূরে আছে বা কোনো বিপদের ঝুঁকি আছে কি না।
চোখের মণির সাথে মিল রেখে ক্যামেরা: চশমার ক্যামেরাটি যেন সাধারণ চোখের মণির মতোই নড়াচড়া করতে পারে, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।
সম্পূর্ণ তারহীন ব্যবস্থা: চোখের বাইরে কোনো চশমা বা তার না রেখে পুরোপুরি চোখের ভেতরেই বসিয়ে দেওয়া যায় এমন প্রযুক্তির উন্নয়ন।
এটি শেষ গন্তব্য নয়, বরং আশার আলো
২১ শতকের চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং প্রকৌশলবিদ্যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক অর্জন হলো এই আরগুস II। এটি শত শত অন্ধ মানুষের জীবনে স্বাধীনতার নতুন আলো এনে দিয়েছিল এবং প্রমাণ করেছিল যে বিজ্ঞানের পক্ষে অসম্ভবকেও সম্ভব করা সম্ভব।
এর রেজোলিউশন কম ছিল, খরচ বেশি ছিল এবং বাজারে এটি টিকতে পারেনি—সেটি সত্যি। কিন্তু এর আসল সাফল্য হলো, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে গেছে। টেরি বাইল্যান্ডের মতো মানুষদের জন্য বছরের পর বছর অন্ধকারের পর আবার আলো দেখতে পাওয়া ছিল এক পরম বিজয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত প্রযুক্তি এবং মানব মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের গভীর জ্ঞান প্রতিনিয়ত এই প্রযুক্তিকে আরও নিখুঁত করে তুলছে। আরগুস II ছিল সেই দীর্ঘ ও অসাধারণ যাত্রার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

