লা সুরিয়ঁত মাদাম বোদে (১৯২৩): জার্মেইন দুলাকের এক অনন্য সিনেমা এবং চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রথম প্রকৃত নারীপ্রধান সৃষ্টি
নির্বাক (কথাছাড়া) চলচ্চিত্রের যুগে, এক অত্যাচারী বৈবাহিক সম্পর্কের বেড়াজালে বন্দি নারীর ভেতরের ছটফটানি আর মানসিক যন্ত্রণাকে খুব কম সিনেমাই এত গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল ১৯২৩ সালের ফরাসি সিনেমা ‘লা সুরিয়ঁত মাদাম বোদে’ (ইংরেজিতে: The Smiling Madame Beudet)। মাত্র ৩৮ মিনিটের এই ছোট ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম পথিকৃৎ নারী জার্মেইন দুলাক। সিনেমার ইতিহাসে এটি একটি মূর্ত প্রতীক হয়ে আছে—শুধু মনের ভেতরের ভাবনাকে পর্দায় দেখানোর নতুন কৌশলের জন্য নয়, বরং সিনেমাটোগ্রাফির মাধ্যমে নারীর অধিকার ও মনের কথা তুলে ধরার এক জোরালো প্রতিবাদ হিসেবেও।
১৯২১ সালের ডেনিস অমিয়েল এবং আন্দ্রে ওবের একটি নাটক অবলম্বনে জার্মেইন দুলাক এই ছবিটি তৈরি করেন। তবে তিনি থিয়েটারের চেনা রূপকে বদলে দিয়ে একে রূপান্তর করেন চিন্তা, কল্পনা আর অনুভূতির এক চমৎকার দৃশ্যকাব্য বা ভিজ্যুয়াল সিম্ফনিতে।
গল্পটি এক বুদ্ধিমতী ও সংস্কৃতিমনা নারীর, যিনি এক মফস্বল শহরে তাঁর স্থূল মানসিকতার ও অনুভূতিহীন স্বামীর সাথে সংসার করতে গিয়ে দমবন্ধ হয়ে বাঁচছেন। তাঁর স্বামী একটি খালি রিভলভার দিয়ে বারবার আত্মহত্যার এক নিষ্ঠুর ‘কৌতুক’ বা নাটক করেন, যা আসলে ওই নারীর ওপর এক ধরণের মানসিক নির্যাতন।
সিনেমার নানা আধুনিক কৌশল—যেমন একটি দৃশ্যের ওপর আরেকটি দৃশ্য বসানো (সুপারইমপোজিশন), মনের ভেতরের দিবাস্বপ্নকে পর্দায় দেখানো, প্রতীকি ক্লোজ-আপ শট এবং চমৎকার সম্পাদনার মাধ্যমে পরিচালক দুলাক মাদাম বোদের মনের ভেতরের জগতটাকে দর্শকের সামনে নিখুঁতভাবে মেলে ধরেছেন। তিনি এক অদৃশ্য বেদনাকে দৃশ্যমান করেছেন এবং একজন নারীর ব্যক্তিগত কষ্টকে সমাজের এক বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বৈবাহিক বন্দিদশা ও এক নারীর মনস্তাত্ত্বিক লড়াই: চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জার্মেইন দুলাকের এক কালজয়ী অধ্যায়
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও ‘লা সুরিয়ঁত মাদাম বোদে’ সিনেমাটি এক অদ্ভুত আধুনিকতার ছোঁয়া দেয়। বিয়ের নামে এক নারীর বন্দি জীবন, নিজের ইচ্ছেশক্তির সীমাবদ্ধতা এবং সেই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে কল্পনার জগতে আশ্রয় নেওয়ার গল্প এটি। ১৯২০-এর দশকে ফ্রান্সে এক ধরণের নতুন ধারার সিনেমা তৈরি হচ্ছিল, যাকে বলা হতো ‘ফরাসি ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলন’ (French Impressionist movement)। এই ধারার অন্য পরিচালকরা যেখানে পুরুষদের গল্প বলতেন, সেখানে পরিচালক জার্মেইন দুলাক পুরো সিনেমার ফোকাস বা কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিলেন একজন নারীর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতিকে।
জার্মেইন দুলাক: সাংবাদিক, নারীবাদের কণ্ঠস্বর এবং সিনেমার এক নির্ভীক পথপ্রদর্শক
জার্মেইন দুলাক (১৮৮২-১৯৪২) ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, নাট্য সমালোচক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর ছোটবেলা খুব একটা সুখে কাটেনি। ছোট বোনের মৃত্যু, মায়ের মানসিক হতাশা এবং বাবার অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশের মধ্যে তিনি বড় হন। প্যারিসে থাকার সময় তিনি নারীবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য আসলে মানুষেরই তৈরি করা এবং তিনি সবসময় নারীদের স্বাধীনতা ও খেটে খাওয়া মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলতেন।
সিনেমায় আসার আগে দুলাক বিভিন্ন নারীপ্রধান পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। প্রথমে তিনি ভাবতেন সিনেমা পরিচালনা হয়তো নারীদের কাজ নয়। কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি—বিশেষ করে গান, ছবি তোলা, পেইন্টিং এবং নাচের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তাঁকে সিনেমার রূপালী পর্দার দিকে টেনে আনে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৫-১৯১৬ সালের দিকে) তিনি সিনেমা বানানো শুরু করেন। তিনি প্রায় ৩০টিরও বেশি সিনেমা তৈরি করেছিলেন, নিজের একটি প্রযোজনা সংস্থাও খুলেছিলেন এবং চলচ্চিত্র তত্ত্ব নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা ও লেখালেখি করেছিলেন। ১৯২৮ সালে তাঁর তৈরি ‘দ্য সিশেল অ্যান্ড দ্য ক্লার্জিম্যান’ সিনেমাটিকে পৃথিবীর প্রথম ‘সুরিয়ালিস্ট’ বা পরাবাস্তববাদী সিনেমা হিসেবে গণ্য করা হয়।
দুলাক বিশ্বাস করতেন সিনেমা হলো “চোখের জন্য এক ধরণের সঙ্গীত”। গান যেমন শুধু সুর আর তাল দিয়ে মন ছুঁয়ে যায়, সিনেমাকেও তেমনি নাটক বা সাহিত্যের ওপর নির্ভর না করে শুধু আলো, ছায়া, ক্যামেরার কোণ এবং দৃশ্যের গতির (এডিটিং) মাধ্যমে মানুষের মনের আবেগ প্রকাশ করা উচিত। ‘লা সুরিয়ঁত মাদাম বোদে’ সিনেমাটি ছিল তাঁর এই ভাবনার এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ১৯৪২ সালে জার্মানি যখন ফ্রান্স দখল করে, সেই যুদ্ধের উত্তাল দিনগুলিতে এই মহান শিল্পী মারা যান।
মূল নাটক থেকে সিনেমার পর্দায়: রূপান্তরের এক অনন্য জাদু
এই সিনেমাটি আসলে ১৯২১ সালের একটি জনপ্রিয় ফরাসি নাটকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। নাটকটি লিখেছিলেন ডেনিস অমিয়েল এবং আন্দ্রে ওবে। নাটকের মূল বিষয় ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের অসুখী দাম্পত্য জীবন, যেখানে স্বামী কথায় কথায় রিভলভার মাথায় ঠেকিয়ে আত্মহত্যার এক বিশ্রী ‘কৌতুক’ করতো, আর স্ত্রী মুখ বুজে সেই কষ্ট সহ্য করতো।
নাটকটি মঞ্চে দারুণ সফল হলেও থিয়েটারে সবকিছু বোঝাতে হতো সংলাপ বা সংলাপের জোরে। কিন্তু জার্মেইন দুলাক যখন এটিকে সিনেমায় রূপান্তর করলেন, তিনি মুখের কথার চেয়ে চোখের দেখাকে বেশি গুরুত্ব দিলেন। তিনি সিনেমার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন কিছু দৃশ্য তৈরি করলেন যা সরাসরি দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়।
যেমন—মাদাম বোদে যখন একা বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন, তখন তাঁর মনের ভেতরের ইচ্ছেগুলো বা দিবাস্বপ্নগুলো পর্দায় ভেসে ওঠে। দুলাক নাটকটিকে হুবহু ক্যামেরাবন্দি না করে, সিনেমার নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে মাদাম বোদের মনের ভেতরের এক অদৃশ্য ঝড়কে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন। এর ফলে এটি কেবল একটি সিনেমা থাকেনি, হয়ে উঠেছিল এক নারীর মনের না-বলা কথার এক অসাধারণ দৃশ্যকাব্য।
সিনেমার নেপথ্যের গল্প (Production Context)
চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছিলেন চার্লস দেলাক এবং মার্সেল ভান্দাল। সে যুগের তুলনায় এটি ছিল বেশ সাহসী এবং আধুনিক চিন্তাভাবনার একটি কাজ। ভেতরের দৃশ্যগুলোর জন্য সম্ভবত স্টুডিওর সেট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং মফস্বল শহরের রূপ বোঝাতে বাইরের কিছু দৃশ্যের শ্যুটিং করা হয়েছিল। ছোট দৈর্ঘ্যের (৩৮ মিনিট) হওয়ায় গল্পের মূল আবেগ ও মানসিক টানাপোড়েন খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।
অভিনয়শিল্পীদের চমৎকার পারফরম্যান্স এই সিনেমাটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল:
জার্মেইন দেরমোজ (মাদাম বোদে): তিনি অত্যন্ত দক্ষ একজন অভিনেত্রী ছিলেন, যিনি খুব সামান্য মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে একজন বুদ্ধিমতী নারীর ভেতরের নীরব কষ্ট আর ক্ষণস্থায়ী আশার আলো ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
আলেকজান্দ্রে আরকিলিয়ার (মঁসিয়ে বোদে): তিনি একজন অনুভূতিহীন এবং স্থূল মানসিকতার স্বামীর চরিত্রটি নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন।
রাউল পাওলি (টেনিস চ্যাম্পিয়ন): তিনি মাদাম বোদের কল্পনার পুরুষ হিসেবে হাজির হন।
এছাড়াও গৃহপরিচারিকা এবং একটি বিড়ালের উপস্থিতি ঘরের ভেতরের পরিবেশকে একদম জীবন্ত করে তুলেছিল।
সিনেমার বিস্তারিত গল্প (Detailed Plot Summary)
সিনেমার শুরুতেই একটি লেখা পর্দায় ভেসে ওঠে, যা ইঙ্গিত দেয়—ছোট মফস্বল শহরগুলোর ভদ্র আচরণের আড়ালে কতশত তীব্র মানসিক কষ্ট আর চাপা ক্ষোভ লুকিয়ে থাকে।
এক অসম জুটি:
গল্পের মূল চরিত্র মাদাম বোদে (জার্মেইন দেরমোজ) একজন বুদ্ধিমতী, স্বপ্নবাজ এবং শিল্পমনা নারী। তাঁর স্বামী মঁসিয়ে বোদে (আলেকজান্দ্রে আরকিলিয়ার) একজন অলস, বয়সে বড় কাপড় ব্যবসায়ী, যিনি সমাজে নিজের নাম কামাতে ব্যস্ত। স্বামী যখন কাজে থাকেন, মাদাম বোদে তখন পিয়ানো বাজিয়ে বা রোমান্টিক কবিতা ও ম্যাগাজিন পড়ে নিজের মনের শান্তি খোঁজেন। অন্যদিকে, তাঁর স্বামী তাঁর এই পড়াশোনা আর সংস্কৃতিমনস্কতাকে সারাক্ষণ ঠাট্টা-তামাশা করেন। স্বামীর সবচেয়ে প্রিয় ‘কৌতুক’ হলো—কথায় কথায় একটা খালি রিভলভার নিজের মাথায় ঠেকিয়ে আত্মহত্যার নাটক করা এবং এর জন্য স্ত্রীকে দায়ী করে বলা, “দেখো, তুমি আমাকে কী করতে বাধ্য করছ!” তিনি বন্দুক এবং গুলি আলাদা ড্রয়ারে রাখতেন, যা প্রমাণ করে যে পুরো ব্যাপারটাই ছিল স্রেফ এক নিষ্ঠুর নাটক।
একাকীত্ব ও কল্পনার জগত:
এক সন্ধ্যায় মঁসিয়ে বোদে একটি অপেরা (গান-নাটক) দেখার টিকিট পান। কিন্তু মাদাম বোদে স্বামীর সাথে না গিয়ে বাড়িতে একা শান্তিতে সময় কাটানোই শ্রেয় মনে করেন। এতে রেগে গিয়ে স্বামী আবার সেই আত্মহত্যার নাটক করেন এবং পরে বন্ধুরা এলে তাঁদের সামনেও একই কাণ্ড করেন। এরপর সবাই মিলে থিয়েটারে চলে গেলে মাদাম বোদে বাড়িতে একা হয়ে পড়েন।
বাড়িতে একা থাকার এই সময়ে তিনি গভীর দিবাস্বপ্নে মগ্ন হন। পরিচালক দুলাক এই দৃশ্যগুলো চমৎকারভাবে পর্দায় দেখিয়েছেন:
মাদাম বোদে ম্যাগাজিনে একজন সুদর্শন টেনিস খেলোয়াড়ের ছবি দেখছিলেন। তাঁর কল্পনায় সেই খেলোয়াড়টি জীবন্ত হয়ে ম্যাগাজিনের পাতা থেকে লাফিয়ে নেমে আসে এবং তাঁর অত্যাচারী স্বামীকে পিটিয়ে ঘর থেকে টেনে নিয়ে যায়।
তিনি কবিতার মতো এক সুন্দর ভালোবাসার দুনিয়া কল্পনা করেন, যা তাঁর বাস্তব জীবনের ভাঙা বিছানা আর সাধারণ সংসারের চেয়ে অনেক আলাদা।
একটি মারাত্মক সিদ্ধান্ত:
এই চরম হতাশা আর একাকীত্বের মুহূর্তে মাদাম বোদের সহ্যক্ষমতার বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি ড্রয়ার থেকে একটি আসল গুলি এনে রিভলভারে ভরে রাখেন। তিনি ঠিক করেন, পরের বার যখন তাঁর স্বামী আবার সেই আত্মহত্যার নোংরা নাটক করতে যাবেন, তখন যেন সত্যি সত্যিই তাঁর মৃত্যু হয়। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ থেকেই তিনি এই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেন।
চরম মুহূর্ত ও পরিণতি:
পরদিন সকাল থেকেই মাদাম বোদে অনুশোচনায় ভুগতে থাকেন। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে বন্দুক থেকে গুলিটি বের করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বারবার বাইরের নানা ঝামেলার কারণে ব্যর্থ হন। এর মধ্যে তাঁর স্বামী ঘরের হিসাবপত্র নিয়ে বসেন এবং খরচের বহর দেখে রেগে গিয়ে স্ত্রীকে ডেকে পাঠান।
উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, স্বামী তাঁর চেনা অভ্যাসবশত ড্রয়ার থেকে রিভলভারটি বের করেন। প্রথমে নিজের দিকে তাক করে তামাশা করার পর হুট করে তিনি স্ত্রীর দিকে বন্দুক ঘুরিয়ে বলেন, “তার চেয়ে বরং তোমাকেই গুলি করি!” এই বলেই তিনি ট্রিগার চেপে দেন।
গুলিটি মাদাম বোদের পাশ দিয়ে চলে যায়, তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। কিন্তু ভয়ে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাঁর স্বামী এই ভয় আর আতঙ্ককে ভুল বোঝেন। তিনি ভাবেন স্ত্রী বোধহয় নিজেই আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলেন। স্বামী তখন আবেগে আপ্লুত হয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব কীভাবে?”
সিনেমাটি এক অদ্ভুত ও অমীমাংসিত নোটে শেষ হয়। ওপর ওপর মনে হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল হয়ে গেল, কিন্তু মাদাম বোদের মুখ বিষণ্ণ ও ম্লানই থেকে যায়। সিনেমার নাম ‘হাস্যোজ্জ্বল মাদাম বোদে’ হলেও, তাঁর সেই হাসি আসলে ছিল ভেতরের কান্না আড়াল করার এক করুণ মুখোশ। কোনো মৃত্যু হলো না ঠিকই, কিন্তু এই ‘সুখের সমাপ্তি’ আসলে এক ফাঁকি। মনের সেই অন্ধকার খাঁচায় তিনি আগের মতোই বন্দি রয়ে গেলেন।
সিনেমার নির্মাণশৈলী ও আধুনিক কৌশল (Cinematic Style & Techniques)
পরিচালক দুলাক এই সিনেমায় মুখের সংলাপ বা অতিরঞ্জিত অভিনয়ের ওপর নির্ভর না করে, কিছু অসাধারণ ও নতুন ধরণের ক্যামেরার কারসাজি ব্যবহার করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল দর্শকের মনকে সরাসরি মাদাম বোদের মনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া। যেমন:
একটি দৃশ্যের ওপর আরেকটি দৃশ্য বসানো (Superimpositions): ম্যাগাজিন থেকে টেনিস খেলোয়াড়ের জীবন্ত হয়ে উঠে আসা কিংবা বাস্তব জীবনের ভাঙা বিছানার সাথে কল্পনার সুন্দর দুনিয়ার তুলনা—এই দৃশ্যগুলো চমৎকারভাবে মাদাম বোদের মনের ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলে।
প্রতীকী ক্লোজ-আপ (Symbolic Close-ups): সিনেমায় পিয়ানো হলো মাদাম বোদের মুক্ত মনের প্রতীক, যা তাঁর স্বামী বারবার তালাবন্ধ করে রাখতো। বন্দুকটি হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অত্যাচার ও মানসিক নির্যাতনের প্রতীক। আর একটি পুতুল, যার মাথা মঁসিয়ে বোদে রাগের মাথায় ভেঙে ফেলেন, তা দিয়ে বোঝানো হয়েছে নারীরা সমাজের কাছে কতখানি খেলনা আর ভঙ্গুর।
দৃশ্য সম্পাদনার গতি (Rhythmic Editing): মাদাম বোদে যখন অনুশোচনায় ভুগে সারা রাত ছটফট করছিলেন এবং বন্দুক থেকে গুলি বের করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন, তখন দৃশ্যের দ্রুত পরিবর্তন দর্শকের বুকেও এক ধরণের উত্তেজনা তৈরি করে।
আলোকসম্পাত ও বিষণ্ণতা (Lighting & Tone): সিনেমার দৃশ্যগুলোতে আলো-ছায়ার এমন ব্যবহার করা হয়েছিল যা মনের ভেতরের একাকীত্ব ও দুঃখকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে।
মূল বিষয়বস্তু ও সামাজিক বার্তা (Themes & Social Critique)
সহজ কথায়, এই সিনেমাটি সে যুগের মধ্যবিত্ত সমাজের বিয়ে ব্যবস্থা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ।
মানসিক নির্যাতনকে কৌতুক বানানো: মঁসিয়ে বোদে হলেন এমন এক পুরুষ যিনি স্ত্রীর আবেগের দাম দেন না, টাকা-পয়সা দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং রসিকতার ছলে প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন করেন। কথায় কথায় মাথায় বন্দুক ঠেকানোর এই নাটকটি আসলে দেখায় যে, কীভাবে সমাজ ঘরের ভেতরের অত্যাচারকে ‘মশকরা’ বলে উড়িয়ে দেয়।
নারীর অবদমিত ইচ্ছা: মাদাম বোদে হলেন একজন আধুনিক ও সংস্কৃতিমনা নারী, যাঁর ডানা ছেঁটে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাঁর পিয়ানো বাজানো আর কবিতা পড়া হলো এই বন্দিদশা থেকে মুক্তির আকুল চেষ্টা। তাই পিয়ানোর ঢাকনা বন্ধ করা মানে আসলে তাঁর ইচ্ছের গলা টিপে ধরা।
বাস্তব বনাম কল্পনা: বাস্তব জীবনে যখন কোনো আশা থাকে না, মানুষ তখন কল্পনার জগতে সুখ খোঁজে। মাদাম বোদের দিবাস্বপ্নগুলো তাঁর বেঁচে থাকার রসদ জোগাতো।
এক অমীমাংসিত বন্দিদশা: সিনেমার শেষটা সবচেয়ে বেশি ভাবায়। স্বামী যখন তাঁকে ভুল বুঝে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরেন, তখন মাদাম বোদের মুখের মৃদু হাসিটি আসলে আনন্দের ছিল না; ওটা ছিল এক ধরণের মেনে নেওয়া এবং ভাগ্যের পরিহাস। সমাজ ভাবলো সব ঠিক হয়ে গেল, কিন্তু তাঁর মনের খাঁচাটি আসলে আগের মতোই বন্ধ রয়ে গেল।
সিনেমার মূল্যায়ন ও কালজয়ী অবদান (Reception & Legacy)
মুক্তির সময়ে সিনেমাটি হয়তো খুব বড় ব্যবসা করতে পারেনি, তবে সিনেমা বোদ্ধাদের মনে এটি গভীর দাগ কেটেছিল। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে যখন নারী অধিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়, তখন এই সিনেমাটিকে “ইতিহাসের প্রথম প্রকৃত নারীপ্রধান বা নারীবাদী সিনেমা” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পৃথিবীর সেরা সিনেমার তালিকায় (যেমন: 1001 Movies You Must See Before You Die) এই ছবির নাম সসম্মানে জড়িয়ে আছে।
আজকের যুগে দাঁড়িয়েও যখন আমরা গার্হস্থ্য হিংসা, মানসিক নির্যাতন এবং বৈবাহিক জীবনে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলি, তখন শত বছর আগের এই সিনেমাটি ভীষণ প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
‘লা সুরিয়ঁত মাদাম বোদে’ কেবল ইতিহাসের একটি পুরনো সিনেমা নয়; এটি মানুষের মনের কষ্টকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। জার্মেইন দুলাক প্রমাণ করেছিলেন যে, সিনেমার ক্যামেরা কেবল বাইরের জগতের ছবি তোলে না, তা মানুষের অবিনাশী আত্মার ভেতরের আলো-অন্ধকারকেও তুলে ধরতে পারে।
মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না, লোড করা বন্দুক আর এক অলীক মুক্তির স্বপ্ন—সব মিলিয়ে এই সিনেমাটি নারীর টিকে থাকার লড়াইয়ের এক চিরন্তন দলিল। সিনেমার ইতিহাসে এবং নারীর অধিকারের লড়াইয়ে এই ছবি সবসময় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।


