সাহারা মরুভূমির চোখ

সাহারা মরুভূমির চোখ

পৃথিবীর বুকে প্রকৃতির তৈরি সবচেয়ে বিস্ময়কর এক স্থাপত্য — রিশাত কাঠামো (Richat Structure), যা বিশ্বজুড়ে ‘সাহারা মরুভূমির চোখ’ (Eye of the Sahara) নামে পরিচিত।

এই বিশাল বৃত্তাকার অবয়বটি মৌরিতানিয়ার সাহারা মরুভূমির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। মহাকাশ থেকে দেখলে মনে হয় যেন মরুভূমির বুক থেকে একটি বিশাল চোখ বা তীরের নিশানা (bullseye) মহাশূন্যচারীদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু মাটিতে দাঁড়িয়ে এর বিশালতার কারণে এটি সহজে বোঝাই যায় না। আজ আমরা এই কাঠামোটি নিয়ে বড় বড় কিছু প্রশ্ন করব এবং সেগুলোর খুব সহজ ও বিস্তারিত উত্তর খুঁজে বের করব।

রিশাত কাঠামোটি আসলে কী, আর মহাকাশ থেকেই বা কেন এটিকে একটি চোখের মতো দেখায়?

রিশাত কাঠামো (যাকে ‘গুয়েলব এর রিশাত’ বা ‘আফ্রিকার চোখ’-ও বলা হয়) হলো আসলে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়ে যাওয়া একটি বিশাল পাথুরে গম্বুজ। এটি প্রায় ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) জুড়ে বিস্তৃত — এবং এটি পুরোপুরি গোল নয়, কিছুটা ডিম্বাকৃতির। এটি উত্তর মৌরিতানিয়ার ‘আদরার মালভূমি’র (Adrar Plateau) ওপর, সাহারা মরুভূমির গভীরে অবস্থিত।

মহাকাশ থেকে এটিকে এত স্পষ্ট ও সুন্দর দেখানোর মূল কারণ হলো এর এককেন্দ্রিক বৃত্তাকার রিং বা বলয়গুলো, যা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ধরণের পাথরের স্তর দিয়ে। এখানকার শক্ত পাথরগুলো (মূলত কোয়ার্টজ সমৃদ্ধ বেলেপাথর) ক্ষয় প্রতিরোধী হওয়ায় উঁচু বৃত্তাকার পর্বতশিরা বা ‘কুয়েস্তা’ (cuestas) তৈরি করেছে। আর এই শক্ত পাথরগুলোর মাঝখানের নরম পাথরগুলো বছরের পর বছর ধরে ক্ষয়ে গিয়ে নিচু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। এর ফলেই তৈরি হয়েছে হালকা ও গাঢ় রঙের পর্যায়ক্রমিক বৃত্তাকার এক প্রাকৃতিক নিশানা।

মহাকাশ থেকে চারপাশের ধু-ধু বালির পটভূমিতে এই উঁচু-নিচু পাথুরে বলয়গুলোর ওপর যখন সূর্যের আলো পড়ে, তখন এটি হুবহু একটি ‘চোখ’-এর রূপ নেয়। ১৯৬৫ সালে নাসার (NASA) ‘জেমিনি ৪’ (Gemini IV) মিশনের মহাকাশচারীরা প্রথমবার এর একটি স্পষ্ট ছবি তোলেন এবং এটি পুরো পৃথিবীর নজরে আসে। তবে, মাটিতে দাঁড়িয়ে এর বিশালতা টের পাওয়া কঠিন। আপনি হয়তো এর একটি বলয়ের ভেতর দিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে যাবেন, অথচ বুঝতেই পারবেন না যে আপনি একটি বিশাল পাথুরে চোখের ভেতরে আছেন।

এটি আসলে কতটা বড়, এবং ঠিক কোন জায়গায় এটি অবস্থিত?

এমন একটি বৃত্ত যার এক মাথা থেকে অন্য মাথার দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার — এটি একটি বড় শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্বের সমান, অথবা একটি ম্যারাথন দৌড়ের প্রায় দশগুণ! এর কেন্দ্রভাগে রয়েছে সিলিকা সমৃদ্ধ ভাঙা পাথরের এক বিশাল স্তূপ (যা ভূগর্ভস্থ গরম তরলের কারণে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে গেছে) এবং এটিই প্রায় ৩০ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে।

এটি মৌরিতানিয়ার আদরার অঞ্চলে, ‘উয়াদানে’ (Ouadane) নামক একটি ছোট মরুশহরের কাছে অবস্থিত। এটি বিশাল ‘তাওদেনি অববাহিকা’র (Taoudeni Basin) উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে পড়েছে। সাহারার এই অংশটি অত্যন্ত শুষ্ক। এর চারপাশেই রয়েছে বিশাল সব বালির ঢিবি বা ডিউন এবং প্রাচীন শুকিয়ে যাওয়া নদীর পথ। পুরো কাঠামোটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে এটি চারপাশ থেকে মাঝখানের দিকে কিছুটা উঁচু হয়ে ওঠা একটি বিশাল ক্ষয়প্রাপ্ত গম্বুজ।

এর বিশালতার আরেকটি ধারণা দেওয়া যাক: এর কেন্দ্রের সবচেয়ে কাছের ভেতরের পাথুরে দেওয়ালটি বা ‘রিং ডাইক’ কেন্দ্র থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এটি প্রায় ৩০ মিটার চওড়া। আর বাইরের দেওয়ালটি কেন্দ্র থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা প্রায় ৭০ মিটার চওড়া। এই বিশাল বৃত্তের ভেতরে মাটির নিচে জমে যাওয়া লাভা বা আগ্নেয় শিলার যে নানা রূপ রয়েছে, এগুলো তার সামান্য কিছু উদাহরণ মাত্র।

এই বিশাল অবয়বটি প্রথম কীভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং এটি নিয়ে কীভাবে গবেষণা শুরু হয়?

স্থানীয় মানুষ হাজার হাজার বছর ধরেই এই এলাকাটি সম্পর্কে জানতেন। ১৯৩০ এবং ১৯৪০-এর দশকে ফরাসি ভূগোলবিদ ও অভিযাত্রীরা প্রথমবার এই জায়গার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। এর বৃত্তাকার আকৃতির কারণে তারা কখনো কখনো এটিকে “রিশাত ক্রেটার” বা “বোতামের ঘর” (buttonhole) বলে ডাকতেন। এরপর ১৯৫২ সালে থিওডোর মনোদ এবং তার সঙ্গীদের একটি বিখ্যাত অভিযাত্রী দল এই অঞ্চলের বেশ কিছু বৃত্তাকার বৈশিষ্ট্যের মানচিত্র তৈরি করেন।

তবে ১৯৬৫ সালের ‘জেমিনি ৪’ (Gemini IV) মহাকাশ মিশন-এর আগে পর্যন্ত বাইরের পৃথিবীর কাছে এটি একপ্রকার অলক্ষিতই ছিল। মহাকাশচারী এড হোয়াইট (যিনি পরবর্তীতে প্রথম আমেরিকান হিসেবে মহাকাশে হেঁটেছিলেন) এবং জেমস ম্যাকডিভিট তাদের কক্ষপথ ভ্রমণের সময় এর ছবি তোলেন। মরুভূমির একঘেয়ে ধূসর ভূমির বুকে এমন নিখুঁত বৃত্তাকার নকশার সেই ছবিগুলো পুরো পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের মাঝে তুমুল আলোড়ন তৈরি করে।

প্রথমদিকের গবেষকরা ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনো উল্কাপাতের ফলে তৈরি গর্ত বা ক্রেটার। তবে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং ল্যাব পরীক্ষার পর এই ধারণা বদলাতে শুরু করে। ২০০০ সালের দিকে এসে বিশদ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা (যার মধ্যে ভূ-চৌম্বকীয় এবং মহাকর্ষীয় জরিপ অন্তর্ভুক্ত ছিল) নিশ্চিত করে যে এটি কোনো উল্কাপাতের কারণে তৈরি হয়নি। ২০২২ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব জিওলোজিক্যাল সায়েন্সেস’ এটিকে বিশ্বের ১০০টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

মানুষ কেন প্রথমে এটিকে উল্কাপাতের গর্ত ভেবেছিল, আর কোন প্রমাণটি তাদের ভুল প্রমাণ করল?

পৃথিবীর বুকে যেকোনো বড় বৃত্তাকার আকৃতি দেখলেই প্রথমে মাথায় আসে উল্কাপাতের কথা — আমরা সবাই চাঁদের গায়ে এমন অসংখ্য গর্তের ছবি দেখেছি। রিশাত কাঠামোর প্রায় নিখুঁত গোল রিং বা বলয়গুলো দেখে প্রথম দেখায় তেমনটা মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু উল্কাপাতের ফলে তৈরি গর্তের কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণ থাকে: যেমন ‘শক্ট কোয়ার্টজ’ (তীব্র চাপে বিকৃত হয়ে যাওয়া আণুবীক্ষণিক স্ফটিক), গলে যাওয়া পাথর এবং বিশেষ ধরনের ফাটলের দাগ। এর কোনোটিই এখানে সন্তোষজনকভাবে পাওয়া যায়নি। শুরুতে এখানে ‘কোয়েসাইট’ (উচ্চ চাপে তৈরি এক ধরনের খনিজ) পাওয়ার দাবি করা হলেও, পরে জানা যায় সেটি আসলে ভুল ছিল এবং ওটি ছিল মূলত ‘ব্যারাইট’ নামক অন্য একটি সাধারণ খনিজ।

আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে এটি আসলে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ (endogenous) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। মাটির গভীর থেকে ম্যাগমা বা গলিত তরল পাথর ওপরের দিকে ঠেলে উঠে আসে এবং ওপরের পাথরের স্তরগুলোকে একটি গম্বুজের মতো ফুলিয়ে তোলে। এরপর কোটি কোটি বছর ধরে আবহাওয়া ও বাতাসের ক্ষয়কার্যের ফলে আজকের এই বৃত্তাকার রিংগুলো তৈরি হয়েছে।

তাহলে এটি আসলে কীভাবে তৈরি হলো? ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসটা যদি একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলতেন।

চলুন আমরা প্রায় ১০ কোটি বছর আগে ডাইনোসরদের যুগে ফিরে যাই, যখন ‘প্যানজিয়া’ নামক এক বিশাল মহাদেশ ভেঙে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল।

আজকের যেখানে মৌরিতানিয়া, তার ঠিক মাটির গভীরে এক বিশাল পরিমাণ অ্যালকালাইন ম্যাগমা (ক্ষারীয় গলিত পাথর) ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে। তবে এটি আগ্নেয়গিরির মতো প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেনি। বরং এটি খুব ধীর ও মৃদুভাবে ওপরের দিকে চাপ দিতে থাকে, যার ফলে শত কোটি বছর ধরে জমে থাকা প্রাচীন পাথরের স্তরগুলো ওপরের দিকে ফুলে ওঠে।

এর ফলে মাটির ওপর একটি বিশাল গম্বুজ তৈরি হয় — ঠিক যেন চামড়ার নিচে ওঠা কোনো বড় ফোসকার মতো। এই গম্বুজটি যত ওপরের দিকে উঠছিল, এর চারপাশে গোলাকার ফাটল তৈরি হতে থাকে। এই ফাটলগুলোর ভেতর দিয়ে গলিত লাভা ঢুকে গিয়ে শক্ত হয়ে পাথুরে দেওয়াল বা ‘রিং ডাইক’ তৈরি করে। একই সাথে উত্তপ্ত তরল পদার্থ এই ফাটল ধরা পাথরগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে, যা এখানকার পাথরগুলোর রাসায়নিক রূপ বদলে দেয় এবং কেন্দ্রের পাথরগুলোকে ভেঙে একাকার করে ফেলে।

এরপর শুরু হয় প্রকৃতির ধীর ও ধৈর্যশীল কাজ — ক্ষয়কার্য। কোটি কোটি বছর ধরে বাতাস, হঠাৎ আসা বন্যা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে এই গম্বুজটি ক্ষয়ে যেতে থাকে। এর ভেতরের নরম পাথরের স্তরগুলো দ্রুত ক্ষয়ে ধুয়ে মুছে যায়, কিন্তু শক্ত কোয়ার্টজ ও বেলেপাথরের স্তরগুলো ক্ষয় রোধ করে টিকে থাকে এবং উঁচু বৃত্তাকার পর্বতশিরার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় আজকের এই চমৎকার গোল গোল রিং বা বলয়।

এই বিশাল চোখের ভেতরে আসলে কী ধরনের পাথর দেখতে পাওয়া যায়?

এই কাঠামোটি আসলে পৃথিবীর ইতিহাসের এক চমৎকার জীবন্ত প্রদর্শনী।

এর ঠিক কেন্দ্রে বা মাঝখানে আপনি পাবেন সবচেয়ে প্রাচীন পাথরগুলো — যা শত কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো প্রাচীন পলল শিলা এবং কেন্দ্রে ভেঙে জমাটবদ্ধ হওয়া শক্ত সিলিকা পাথর। এরপর আপনি কেন্দ্র থেকে যত বাইরের বলয়গুলোর দিকে যাবেন, তত তুলনামূলকভাবে নতুন বা কম পুরোনো পাথরের স্তর দেখতে পাবেন।

এই শিলাস্তরগুলোর ভেতরে এবং চারপাশে ক্রিটেসিয়াস যুগের কিছু আগ্নেয় শিলা বা লাভা পাথর প্রবেশ করেছিল:

গ্যাব্রো রিং ডাইক (বৃত্তাকার পাথুরে দেওয়াল)

কার্বোনাটাইট ডাইক এবং সিল (যা প্রায় ৯ কোটি ৪০ লক্ষ থেকে ১০ কোটি ৪০ লক্ষ বছরের পুরোনো)

একটি কিম্বার্লিটিক প্লাগ (প্রায় ৯ কোটি ৯০ লক্ষ বছরের পুরোনো)

রাইওলিটিক আগ্নেয়গিরির অবশিষ্টাংশ এবং গরম পানির প্রতিক্রিয়ায় খনিজ বদলে যাওয়া কিছু পাথর।

মহাকাশ থেকে আপনারা যে বিভিন্ন রঙের খেলা দেখেন (যেমন—কমলা, ধূসর, বাদামী), তা মূলত এই ভিন্ন ভিন্ন ধরণের পাথর এবং বছরের পর বছর ধরে সেগুলোর ওপর আবহাওয়ার প্রভাবের কারণে তৈরি হয়েছে। উঁচু বৃত্তাকার পর্বতশিরাগুলো মূলত শক্ত কোয়ার্টজ পাথর দিয়ে তৈরি, যা চারপাশের নরম শেল (shale) এবং চুনাপাথরের চেয়ে বেশি সময় টিকে রয়েছে।

রিশাত কাঠামোর ওপর গিয়ে দাঁড়ালে আসলে কেমন অনুভূতি হয়? স্যাটেলাইটের ছবির সাথে মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখার অভিজ্ঞতা কতটা আলাদা?

মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথম দেখায় রিশাত কাঠামোটিকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কারণ এটি এতই বিশাল যে, এর বলয়গুলোকে খাড়া পাহাড়ের বদলে মৃদু ঢালু মনে হয়। আপনি হয়তো একদম সমতল মরুভূমির ওপর দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন, হুট করে খেয়াল করলেন আপনি কালো পাথরের একটি নিচু পাহাড়ে উঠছেন, তারপর আবার একটি নিচু উপত্যকায় নেমে যাচ্ছেন, তারপর আবার আরেকটি পাহাড়ে উঠছেন—এর অনেক পরে হয়তো আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনি আসলে সেই বিশাল বৃত্তাকার চোখের বলয়গুলোর ওপর দিয়ে চলছেন।

এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য এক অদ্ভুত সুন্দর: পাথুরে মরুভূমি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বড় বড় পাথর, শুকনো নদীর পথে (ওয়াদি) জন্মানো দু-একটি বাবলা জাতীয় গাছ আর মাথার ওপরে এক অন্তহীন আকাশ। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রাচীন প্রস্তর যুগের (Paleolithic) পাথরের হাতিয়ার এবং নব্য প্রস্তর যুগের (Neolithic) গুহাচিত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো প্রমাণ করে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে যখন সাহারা অঞ্চলটি সবুজ ছিল—হ্রদ, নদী আর বন্যপ্রাণীতে ভরপুর ছিল—তখন এখানে মানুষের আনাগোনা ছিল।

এর বাইরের কোনো একটি পর্বতশিরায় দাঁড়ালে আপনি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত সমতল ভূমি দেখতে পাবেন এবং দূরে পরের রিংটি জেগে উঠতে দেখবেন। এটি আপনাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেবে। স্যাটেলাইটের ছবি আপনাকে এক নজরে চমকে দেবে সত্যি, কিন্তু মাটিতে দাঁড়ালে আপনি প্রকৃতির কোটি কোটি বছরের ধীর ও ধৈর্যশীল সৃষ্টির আসল রূপটি উপলব্ধি করতে পারবেন।

অনেকে দাবি করেন যে এটিই নাকি হারিয়ে যাওয়া রহস্যময় শহর ‘আটলান্টিস’ (Atlantis)। এই তত্ত্বের পেছনের গল্পটা কী?

অনলাইন ভিডিও এবং কিছু আর্টিকেলের কারণে এই ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে বলা হয়, রিশাতের এই এককেন্দ্রিক বৃত্তাকার বলয়গুলো প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর বর্ণিত আটলান্টিস শহরের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায় (প্লেটো বলেছিলেন আটলান্টিস ছিল একটি কেন্দ্রীয় দ্বীপকে ঘিরে থাকা স্থল ও জলের বৃত্তাকার বলয়)। কেউ কেউ এর আকার ও গঠন দেখে দাবি করেন যে কোনো প্রাচীন উন্নত সভ্যতা হয়তো এটি তৈরি করেছিল।

যদিও এই দৃশ্যমান মিলটি বেশ আকর্ষণীয় এবং মানুষের কল্পনাকে নাড়া দেওয়ার মতো, তবুও বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক সত্যটি একেবারে পরিষ্কার: এটি কোনোভাবেই আটলান্টিস নয়।

প্লেটোর বর্ণনা অনুযায়ী, আটলান্টিস ছিল ‘পিলার্স অব হারকিউলিস’ (জিব্রাল্টার প্রণালী)-এর ওপারে অবস্থিত একটি দ্বীপ সাম্রাজ্য, যা তার সময়ের প্রায় ৯,০০০ বছর আগে—অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১১,৬০০ বছর আগে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। অথচ এই রিশাত কাঠামোটি:

একটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গম্বুজ, যা প্রায় ১০ কোটি বছর আগে তৈরি হয়েছে।

এটি সমুদ্র উপকূল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে মরুভূমির ভেতরে অবস্থিত, কোনো দ্বীপে নয়।

এখানে ব্রোঞ্জ যুগ বা তার আগের কোনো উন্নত সভ্যতার তৈরি খাল, মন্দির বা প্লেটোর বর্ণনার মতো কোনো সমাজব্যবস্থার বিন্দুমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলেনি।

এই অঞ্চলে প্রাচীন যুগের কিছু পাথরের সরঞ্জাম এবং গুহাচিত্র পাওয়া গেলেও, তার সাথে প্লেটোর বর্ণনার কোনো মিল নেই।

অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, প্লেটোর আটলান্টিসের গল্পটি ছিল একটি রূপক কাহিনী অথবা কোনো বাস্তব ঘটনার (যেমন সান্তোরিনি আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়) একটি অতিশয়োক্তি রূপ। রিশাত সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক বিস্ময়—এর জন্য কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার কাল্পনিক কাহিনীর প্রয়োজন নেই। মানুষ রহস্য ভালোবাসে বলেই এই তত্ত্বটি এখনো টিকে আছে, তবে ভূতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব একে সমর্থন করে না।

রিশাত কাঠামোটিকে বিজ্ঞানীদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় কেন?

পৃথিবীর বুকে মাটির নিচে ম্যাগমা জমা হয়ে কীভাবে বৃত্তাকার ভূপ্রকৃতি তৈরি হয় (magmatic concentric alkaline complex), তার সবচেয়ে স্পষ্ট এবং উন্মুক্ত উদাহরণ হলো এই রিশাত কাঠামো। এর মাধ্যমে ভূতাত্ত্বিকরা এক জায়গায় বসেই দেখতে পারেন কীভাবে মাটির নিচের লাভা, ফাটল, উত্তপ্ত পানির প্রবাহ এবং দীর্ঘদিনের ক্ষয়কার্য একসাথে মিলে এমন একটি চমৎকার প্রাকৃতিক রূপ তৈরি করে।

পাশাপাশি এটি নিচের বিষয়গুলো বোঝার জন্য একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে:

মাটির নিচে ম্যাগমার চাপে কীভাবে ওপরের ভূমি গম্বুজের মতো ফুলে ওঠে।

আবহাওয়া ও বাতাসের কারণে পাথর কীভাবে আলাদা আলাদা গতিতে ক্ষয়ে যায়।

কার্বোনাটাইট এবং কিম্বার্লিটের মতো বিরল আগ্নেয় শিলার আচরণ কেমন হয়।

ক্রিটেসিয়াস যুগের পর থেকে সাহারা অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছে।

২০২২ সালে আইইউজিএস (IUGS) কর্তৃক এটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এর আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গুরুত্বকেই প্রমাণ করে।

ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন কি রিশাত কাঠামোর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে?

সাহারা বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক স্থান হলেও, বিভিন্ন গবেষণা বলছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দশকগুলোতে এর কিছু অংশে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। যদি বৃষ্টিপাত বাড়ে, তবে তা এই অঞ্চলের ক্ষয়কার্যকে ত্বরান্বিত করবে—যার ফলে এই বৃত্তাকার বলয়গুলো আরও গভীর হতে পারে অথবা নিচু জায়গাগুলোতে সাময়িক হ্রদ বা জলাশয় তৈরি হতে পারে।

আমরা ইতিমধ্যেই স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখেছি যে, মাঝেসাঝে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হলে এখানকার নিচু জায়গাগুলোতে পানি জমে যায়। প্রকৃতির কোটি কোটি বছরের ইতিহাসের তুলনায় এটি খুব ছোট পরিবর্তন হলেও, মানুষের জীবনদ্দশায় এটি এই অঞ্চলের রূপ এবং সেখানে যাতায়াতের পথ বদলে দিতে পারে। তবে মূল কাঠামোটি যেহেতু শক্ত পাথর দিয়ে তৈরি, তাই এটি আগামী কোটি কোটি বছর ধরে এভাবেই টিকে থাকবে।

যদি কেউ এখানে ঘুরতে যেতে চান, তবে তাঁর কী কী জানা উচিত?

এখানে যেতে হলে বেশ ভালো প্রস্তুতির প্রয়োজন। সবচেয়ে কাছের লোকালয় হলো উয়াদানে (Ouadane), যা মরুভূমির ভেতরের একটি প্রত্যন্ত প্রাচীন শহর। সেখানে যাওয়ার জন্য আপনার একটি শক্তিশালী ফোর-বাই-ফোর (4×4) গাড়ি, একজন অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড এবং পর্যাপ্ত পানি, জ্বালানি ও খাবার প্রয়োজন হবে। এটি কোনো সাধারণ একবেলার চড়ুইভাতি বা পিকনিক নয়—এটি পুরোদস্তুর একটি মরুভূমি অভিযান।

অনেকে এই ভ্রমণের সাথে ইউনেস্কো স্বীকৃত প্রাচীন শহর ‘শিনগেতি’ (Chinguetti) এবং মরুভূমির অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলোকেও যুক্ত করে নেন। এখানে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো তুলনামূলক শীতল মাসগুলো (সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ)। স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি। আর এর পুরস্কার হিসেবে আপনি পাবেন পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি ভূতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভেতরে দাঁড়িয়ে প্রায় পর্যটকহীন এক শান্ত পরিবেশে নিজেকে হারিয়ে ফেলার সুযোগ।

‘সাহারা মরুভূমির চোখ’-এর এই গল্প থেকে আমাদের পাঠকদের শেষ পর্যন্ত কী মনে রাখা উচিত?

রিশাত কাঠামো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী নিজেই এক মস্ত বড় শিল্পী, যার ক্যানভাসে আঁকতে এমন সময় লাগে যা আমরা মানুষরা সহজে কল্পনাও করতে পারি না। মহাকাশ থেকে যাকে একটি নিখুঁত চোখের মতো দেখায়, তা আসলে কোটি কোটি বছর ধরে মাটির নিচের ম্যাগমার চাপ, পাথরের ফাটল এবং বাতাস ও পানির ধীর ভাঙাগড়ার এক মহাকাব্যিক ফল।

এটি আমাদের বিজ্ঞানের শক্তির কথা মনে করায়: যাকে প্রথমে উল্কাপাতের সাধারণ একটি গর্ত মনে করা হয়েছিল, নিবিড় গবেষণার পর দেখা গেল সেটি আসলে আমাদের পৃথিবীর ভেতরের রহস্য বোঝার এক দারুণ জানালা।

সবচেয়ে বড় কথা, এটি আমাদের মনে বিস্ময় জাগায়। আপনার বয়স ১৮ হোক কিংবা ৭৫, প্রকৃতির এমন এক বিশাল সৃষ্টির সামনে দাঁড়ালে বা তা নিয়ে ভাবলে, আপনি আমাদের এই জীবন্ত পৃথিবীর এক আদিম ইতিহাসের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারবেন। সাহারা মরুভূমিকে হয়তো দূর থেকে ফাঁকা বা শূন্য মনে হতে পারে, কিন্তু এর বুকেই লুকিয়ে আছে এমন সব অমূল্য সৃষ্টি, যা মানব সভ্যতার উত্থান-পতনের বহু আগে থেকেই নীরবে তৈরি হয়ে চলেছে।

সাহারা মরুভূমির চোখ
Comment